৬ মাসে ইসলামী ব্যাংকের ১৩১৬ কোটি টাকার লোকসান

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২৬, ১২: ৪৪
ইসলামী ব্যাংক পিএলসির লোগো

ইতিহাসের সর্বোচ্চ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) ব্যাংকটি রেকর্ড ১,৩১৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকার সমন্বিত নিট লোকসান গুনেছে। মূলত এস আলম গ্রুপের ঋণ জালিয়াতি ও অনাদায়ী বিনিয়োগের বিপরীতে আমানতকারীদের মুনাফা দিতে গিয়েই ব্যাংকটির এই নজিরবিহীন বিপর্যয় ঘটেছে।

গত বছর অর্থাৎ ২০২৩ ও ২০২৪ সালের ধারাবাহিক মুনাফার পর এবং ২০২৫ সালের কাগজ-কলমে দেখানো মুনাফার বিপরীতে ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে এসে ব্যাংকটি এই নজিরবিহীন আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।

২০২৫ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে ব্যাংকটির সমন্বিত মুনাফা হয়েছিল ৬৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের জুন শেষে সমন্বিত শেয়ারপ্রতি লোকসান (ইপিএস) দাঁড়িয়েছে ৮ টাকা ১০ পয়সা।

প্রধান কার্যালয়ে পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকের পর বুধবার (২৯ জুলাই) এ আর্থিক ফলাফল প্রকাশ করে ইসলামী ব্যাংক।

সাম্প্রতিক আর্থিক পারফরম্যান্সের তুলনায় এই লোকসান এখন ব্যাংকের অবস্থায় বড় ধরনের অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত পাঁচ বছর ইসলামী ব্যাংক মুনাফায় ছিল। এর মধ্যে ২০২৫ সালে ১৩৬ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, ২০২৪ সালে ১০৮ কোটি ৭৮ লাখ টাকা এবং ২০২৩ সালে ৬৩৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকা মুনাফা করে ব্যাংকটি। এই সময়ের মধ্যে ২০২৩ সালেই সর্বোচ্চ মুনাফা হয়েছিল।

২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকেই ব্যাংকটি ২৮৮ কোটি টাকা লোকসান করেছিল। মূল্য সংবেদনশীল তথ্য অনুযায়ী, মোট সমন্বিত লোকসানের মধ্যে এপ্রিল-জুনের দ্বিতীয় প্রান্তিকে লোকসান হয়েছে ১,০২৮ কোটি ২৬ লাখ টাকা।

সহযোগী প্রতিষ্ঠান বাদ দিয়ে এককভাবে বছরের প্রথম ছয় মাসে ইসলামী ব্যাংকের লোকসান দাঁড়িয়েছে ১,৩২৬ কোটি ৮১ লাখ টাকা। এ সময়ে শেয়ারপ্রতি লোকসান নেমে হয়েছে ৮ টাকা ২৪ পয়সা।

ব্যাংকটি জানিয়েছে, আমানতের বিপরীতে মুনাফা পরিশোধের ব্যয় বেড়ে যাওয়া, খেলাপি বিনিয়োগ বৃদ্ধির কারণে বিনিয়োগ আয় কমে যাওয়া এবং অন্যান্য ব্যাংকে রাখা অর্থ থেকে আয় হ্রাস পাওয়াই মূলত এই লোকসানের কারণ।

এ বিষয়ে ইসলামী ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, "আমাদের এই লোকসানের অন্যতম প্রধান কারণ হলো, ব্যাংকের সম্পদের একটি বড় অংশ এস আলম গ্রুপ অনিয়মের মাধ্যমে ঋণ হিসেবে নিয়ে গেছে। সেখান থেকে কোনো অর্থ আদায় হচ্ছে না। অথচ আমানতকারীদের আমানতের পুরো মুনাফা পরিশোধ করতে হচ্ছে।"

তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের মোট আমানত ১ লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে মাত্র ৬০ হাজার কোটি টাকা থেকে অর্থ আদায় সম্ভব হচ্ছে। বাকি প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার সিংহভাগই এস আলম ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়েছে, যা থেকে কোনো অর্থ আদায় হচ্ছে না।’

সংকট থেকে উত্তরণের উপায় সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠন করতে যাচ্ছে। তারা যদি এই মন্দ সম্পদগুলো কিনে নেয় অথবা কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিশেষ আদেশের মাধ্যমে এস আলমের এই ঋণের অংশ ব্যালান্স শিট থেকে আলাদা রাখার সুযোগ দেয়, তাহলে আমাদের এই সংকট কেটে যাবে।’

ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘গত দুই দিনে আমাদের প্রায় ৫০০ কোটি টাকার নতুন আমানত এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করে দিলে গ্রাহকদের আস্থা আগের চেয়ে অনেক বাড়বে এবং আরও বেশি করপোরেট আমানত পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।’

লোকসানের বিষয়ে ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হোসেন বলেন, ‘বিষয়টি খুব পরিষ্কার। একটি বড় গ্রুপে ইসলামী ব্যাংকের বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে, কিন্তু সেখান থেকে কোনো আয় হচ্ছে না। অথচ আমানতকারীদের অর্থ থেকেই এই বিনিয়োগ করা হয়েছে। ফলে ব্যাংককে আমানতকারীদের মুনাফা পরিশোধ করতে হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘একদিকে বিনিয়োগ থেকে আয় আসছে না, অন্যদিকে আমানতকারীদের মুনাফা দিতে হচ্ছে। এ কারণেই লোকসান হয়েছে।’

আলতাফ হোসেন আরও বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংক শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক হওয়ায় যে অর্থ আদায় হচ্ছে না, সেটিকে আয় হিসেবে দেখানো হয় না; বরং সাসপেন্স হিসাবে রাখা হয়। ভবিষ্যতে এই অর্থ আদায় হলে ইসলামী ব্যাংকের মুনাফা ব্যাপকভাবে বাড়বে।’

Ad
Ad
ad
ad
ad

অর্থের রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

বিএসইসির ১৭ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর, বেতন কমল ৫ জনের

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের ভিত্তিতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। গত বছর বিএসইসির তৎকালীন চেয়ারম্যানকে অবরুদ্ধ করার ঘটনায় ২৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছিল মন্ত্রণালয়। তাদের মধ্যে ২২ জনের বিষয়ে মঙ্গলবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।

৩ দিন আগে

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ৬ সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ

৩ দিন আগে

শেয়ারবাজারে মার্জিন অর্থায়নে বড় পরিবর্তন, ইক্যুইটি-ঋণের অনুপাত সর্বোচ্চ ১:১

সংশোধিত বিধানে কোনো মার্জিন অর্থায়নকারী গ্রাহকের ইক্যুইটির চেয়ে বেশি মার্জিন অর্থায়ন করতে পারবে না। অর্থাৎ গ্রাহকের ইক্যুইটি ও মার্জিন অর্থায়নের অনুপাত সর্বোচ্চ ১:১ থাকবে। পাশাপাশি কোনো মার্জিন অর্থায়নকারী তার প্রকৃত মূলধন বা নিট সম্পদের চারগুণের বেশি মার্জিন অর্থায়ন করতে পারবে না।

৩ দিন আগে

ঋণনির্ভরতা কমাতে রাজস্ব ব্যবস্থায় বড় সংস্কারের কথা জানালেন অর্থমন্ত্রী

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে রাজস্ব সম্মেলন-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

৩ দিন আগে