কোরবানিহীনদের ‘কোরবানির বাজার’

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
বাড়ি বাড়ি থেকে সংগ্রহ করা কোরবানির মাংস নিয়ে ভ্যানে বসেছে ‘কোরবানির বাজার’। বৃহস্পতিবার রাজধানীর হাটখোলা রোডে। ছবি: রাজনীতি ডটকম

চারিদিকে যখন উৎসবের আমেজ, বাতাসে চর্বি আর কাঁচা মাংসের চেনা গন্ধ, ঠিক তখনই ঈদের দিন বিকেল নামতেই রাজধানী ও এর আশপাশের চেনা গলির মোড়ে বসে এক অন্যরকম বাজার। সে বাজারেও পাওয়া যায় মাংস, তবে সে মাংসের ধরনটা অন্যরকম।

ঢাকা শহরের টিকাটুলির হাটখোলা মোড় কিংবা বুড়িগঙ্গার ওপারে কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে দেখা মিলল এই অস্থায়ী হাটের। ভ্যানের ওপর লাল প্লাস্টিক বিছিয়ে স্তূপ করে রাখা হয়েছে মাংস। তবে এই মাংস কোনো কসাইয়ের দোকান থেকে আসেনি, এসেছে শত শত মানুষের দুয়ার ঘুরে সংগ্রহ করা কোরবানির দান থেকে।

ঈদের দিন শহরের সাধারণ মাংসের দোকানগুলো সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। ফলে যাদের ঘরে কোরবানি হয় না, তাদের মাংস কেনার স্বাভাবিক কোনো উপায় থাকে না। এ অবস্থায় লোকলজ্জার ভয়ে যারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে মাংস চাইতে পারেন না, অথচ ঈদের দিন পরিবারকে একটু মাংস খাওয়াতে চান, এমন মধ্যবিত্ত আর নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের জন্য এই অস্থায়ী হাটগুলোই হয়ে ওঠে একমাত্র ভরসা।

রয়েছে বিপরীত চিত্রও। সারা দিন বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঘুরে যারা মাংস সংগ্রহ করেন, তারা সেই কোরবানির মাংস কিছুটা খাওয়ার জন্য রেখে বাকিটা বিক্রি করতে নিয়ে আসেন এই বাজারে। মাংস বিক্রির টাকা দিয়ে তারা তখন অন্যান্য জিনিসপত্র কেনাকাটা করেন।

এই বাজারের পেছনে রয়েছে এক অন্যরকম সমীকরণ। মাঠপর্যায়ে ঘুরে দেখা যায়, একদল ছিন্নমূল ও নিম্নবিত্ত মানুষ ভোর থেকে শুরু করে তীব্র গরমের মধ্যে মাইলের পর মাইল হেঁটে বাড়ি বাড়ি গিয়ে এই মাংসগুলো সংগ্রহ করেন। দিন শেষে ক্লান্ত শরীরে তারা এই মাংসের স্তূপ নিয়ে আসেন ভ্যান বা অস্থায়ী টেবিলে।

ক্ষুধা আর ক্লান্তিতে ভেঙে পড়া মাংস সংগ্রহকারী এক বিক্রেতা বলেন, ‘সারা দিন রোদে পুইড়া, দুয়ারে দুয়ারে গিয়া এই মাংস টোকাইছি ভাই। নিজেরা খানিকটা রাখছি রাধার লাইগা, আর বাকিটা বেচতাছি ৬৫০-৭০০ টাকা কেজিতে। এই টাকা দিয়া চাল-ডাল আর তেল কিনুম।’

‘কোরবানির বাজারে’ ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয় মাংস। ছবি: রাজনীতি ডটকম
‘কোরবানির বাজারে’ ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয় মাংস। ছবি: রাজনীতি ডটকম

এই বাজারে দেখা মিলবে আরেক শ্রেণির মানুষের। বাড়ি বাড়ি ঘুরে সংগ্রহ করা মাংসগুলো এই বাজারেই কিনে নেন তারা। সেগুলো আবার একটু বেছে গুছিয়ে তারা অন্য ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করেন ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি দরে। কেজিতে ৫০ টাকা থেকে ১০০ টাকার এই ব্যবধানেই এসব মানুষের এক সন্ধ্যার উপার্জনে ঘরে ঢোকে পোলাওয়ের চাল, সেমাই, দুধ, চিনি।

প্লাস্টিকের ব্যাগ হাতে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ ধরে মাংসের ভ্যানগুলো ঘুরে দেখছিলেন একজন ক্রেতা। জানতে চাইলে মলিন হেসে তিনি বললেন, ‘সারা বছর তো পারিই না। তবে বছরের এই একটা দিন পোলাপান একটু পেট ভইরা মাংস খাইতে চায়। দোকানপাট সব বন্ধ, নিজেরাও তো কোরবানি দিবার পারি না। পারি না কারও ঘরে গিয়া হাত পাততে। তাই বাধ্য হইয়া এইখান থিক্কাই নিয়া যাইতাছি।’

রাজধানীর মালিবাগ রেলগেট, হাজারীবাগ এলাকাতেও ঈদুল আজহার দিন বসে এমন মাংসের বাজার। সামর্থ্যবানদের দেওয়া কোরবানির মাংস হাত ঘুরে এসে পৌঁছায় এই বাজারে। সেখান থেকে এক কেজি মাংস হয়তো কোরবানি দিতে না পারা কোনো ঘরে বয়ে আনে ঈদের খুশি। আত্মসম্মান, জীবিকা আর অভাবের ত্রিমুখী টানাপোড়েনে শহরের এই কোণগুলো যেন হয়ে উঠেছে কোরবানিহীনদের এক চিলতে নিজস্ব ‘কোরবানির বাজার’।

রাজনীতি/এনআই/টিআর

ad
ad

মাঠের রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

আসামির মৃত্যুর গুজবে থানায় হামলা, ৬ পুলিশসহ আহত ১২

বৃহস্পতিবার স্থানীয়ভাবে গুজব ছড়িয়ে পড়ে, রিয়াজ মারা মারা গেছেন। এতে তার স্বজনসহ স্থানীয়রা ক্ষুব্ধ হয়ে থানায় হামলা চালান। প্রায় শতাধিক মানুষের হামলায় পুলিশ সদস্যরা কোণঠাসা হয়ে পড়েন। এ সময় হামলাকারীরা থানায় কর্তব্যরত সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আবদুল হালিমকে মারধর করেন।

১৮ ঘণ্টা আগে

পাহাড়ি ঢলে ডুবল গোমতীর চরাঞ্চল, সহস্রাধিক কৃষকের ফসলহানি

সকালে বুড়িচং উপজেলার বালিখাড়া, ভান্তি ও কামারখাড়া এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চরাঞ্চলের শত শত একর সবজি ক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে। পানির ওপর ভেসে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি। লোকসান কিছুটা কমাতে স্থানীয় কৃষকদের কোমর সমান পানিতে নেমে অপরিপক্ব ফসল কেটে ঘরে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করতে দেখা গেছে।

১ দিন আগে

ধলাই নদীর বাঁধ ভেঙে ভাসছে কমলগঞ্জ, পানিবন্দি ১৫ গ্রাম

রাতের আঁধারে প্রবল স্রোতে নদীর পানি লোকালয়ে প্রবেশ করতে শুরু করলে মুহূর্তের মধ্যে ইসলামপুর, মাধবপুর ও আদমপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। এতে মোখাবিল, গোলের হাওর, ভান্ডারিগাঁও, গঙ্গানগর, কোনাগাঁও, বেরীগাঁও, শ্রীপুর, পাতারিগাঁও, কালারায়বিল, আধকানী, ছনগাঁও, বন্দেরগাঁও, তেইতইগাঁও, ভানুবিল ও ঘোর

১ দিন আগে

কিশোরগঞ্জের হাওরে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ২টি নৌ ডাকাতি

ভুক্তভোগী সদরঞ্জন দাস জানান, তিনি সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার যাত্রাপুর গ্রাম থেকে অন্য এক ব্যক্তিসহ নৌকায় করে হাঁসের বাচ্চা কিনতে কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার দামিহা এলাকায় যাচ্ছিলেন। পথে বর্শিকুড়া-শেরপুর সেতু সংলগ্ন এলাকায় পৌঁছালে মাথায় হেলমেট পরিহিত সাতজনের একটি সশস্ত্র দল দেশীয় অস্ত্রের মুখে তাদের

১ দিন আগে