মারধরকে ‘প্রতিরোধ’ দাবি রাকসু নেতাদের, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার হুমকি

রাবি প্রতিনিধি
আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২৬, ২৩: ৩৪
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাকসু কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ এবং জিএস সালাউদ্দিন আম্মার। ছবি: সংগৃহীত

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) তিন শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনাকে ‘হামলা’ নয়, ‘প্রতিরোধ’ বলে দাবি করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ ও জিএস সালাউদ্দিন আম্মার। একই সঙ্গে নিজেদের ‘ভুক্তভোগী’ দাবি করেছেন তারা। এ ছাড়া এ ঘটনাকে ‘হামলা’ হিসেবে উল্লেখ করে সংবাদ প্রকাশ করায় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন রাকসুর ভিপি।

মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) সন্ধ্যায় রাকসু কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ এবং জিএস সালাউদ্দিন আম্মার।

সংবাদ সম্মেলনে মোস্তাকুর রহমান জাহিদ অভিযোগ করেন, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম সংঘর্ষের ঘটনাকে ‘একপাক্ষিকভাবে’ প্রচার করেছে এবং ‘ছাত্রলীগের পক্ষে’ উপস্থাপন করেছে।

সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আপনারা সংবাদে যেসব শব্দ ব্যবহার করছেন, সেগুলোর বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নেব। গতকাল অনেকেই এমনভাবে সংবাদ প্রকাশ করেছেন, যাতে ছাত্রলীগকে ডিফেন্ড করা হয়েছে। এখানে উপস্থিত সাংবাদিকদের মধ্যে যারা এ ধরনের সংবাদ করেছেন, আমরা সেগুলো সংগ্রহ করছি এবং তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেব।”

রাকসুর ভিপি আরও বলেন, “আপনারা বলছেন, আমরা হামলা করেছি। এটা কীভাবে হামলা হয়? তারা হামলা করেছে, আমরা ‘প্রতিরোধ’ করেছি। ‘প্রতিরোধ’ শব্দটি ব্যবহার করতে আপনাদের এত সংকোচ কেন? ছাত্রলীগের প্রতি এত মায়াকান্না কেন? সাংবাদিকদের এই ভূমিকার বিরুদ্ধে আমরা পদক্ষেপ নেব।”

পরে রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মার বলেন, “আমরা যেটাকে প্রতিরোধ বলছি, সেটিকে আপনারা প্রতিরোধ হিসেবে দেখতে পারছেন না কেন? গত দুই বছর ধরে আমরা ছাত্রলীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, আওয়ামী লীগপন্থি শিক্ষক এবং সংশ্লিষ্টদের বিচারের দাবি জানিয়ে আসছি।”

তিনি বলেন, “এই ঘটনার জন্য যারা দায়ী, তাদের বিরুদ্ধেও আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানাব। আমার বিশ্বাস, আগের ঘটনাগুলোর বিচার সময়মতো হলে আজকের এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না।”

নিজেদের ‘ভুক্তভোগী’ দাবি

সোমবার ক্যাম্পাসে সংঘর্ষ ও মারধরের ঘটনায় নিজেদেরও ‘ভুক্তভোগী’ বলে দাবি করেন রাকসুর ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ ও জিএস সালাউদ্দিন আম্মার।

মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, “গতকালের ঘটনার কেন্দ্রীয় যে ব্যক্তিকে নিয়ে আগে মানববন্ধন হয়েছিল, তাকে আবার ছাত্রলীগ মারধর করেছে— এ বিষয়টি পরিষ্কার করা প্রয়োজন। আমাদের বিজ্ঞপ্তিতে আমরা স্পষ্টভাবে বলেছি, ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত হিসেবে অভিযুক্ত হচ্ছেন আনাস। পাশাপাশি, আনাসের সঙ্গে ছাত্রদলের যেসব নেতাকর্মী হামলায় অংশ নিয়েছেন, তাদের সবার বিচারও আমরা দাবি করেছি। অর্থাৎ, আনাস ছাত্রলীগের সঙ্গে জড়িত এবং তার সঙ্গে ছাত্রদলের কিছু ব্যক্তি মিলে এই হামলা চালিয়েছে— এ বিষয়টিই আমরা স্পষ্ট করতে চাই।”

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে জিএস সালাউদ্দিন আম্মার বলেন, “আমরা পুলিশ প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে সব ধরনের প্রমাণ দেখিয়ে বলেছিলাম, প্রয়োজন হলে অজ্ঞাত মামলায় হলেও তাকে গ্রেপ্তার করা হোক। কিন্তু তা করা হয়নি। আমরা প্রশ্ন করেছি, ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের একজন শিক্ষার্থী এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন অবস্থান করছে। ইতিহাস বিভাগের একজন শিক্ষার্থীর অনার্স শেষ হতে সর্বোচ্চ সাড়ে পাঁচ বছর লাগার কথা। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া যায়নি।”

তিনি বলেন, “প্রক্টর স্যার আমাদের বলেছিলেন, সবাই তার শিক্ষার্থী, তাই তিনি কিছু করতে পারবেন না। পরে তিনি আমাদের একটি কক্ষে অপেক্ষা করতে বলেন। কিছুক্ষণ পর দেখি আনাসও নেই, পুলিশও নেই। পরে জানতে পারি, তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।”

পরবর্তী ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আম্মার বলেন, “আমরা রাকসু ভবনে যাওয়ার পর সাতজন সেখানে আসে। একজন ভিডিও ধারণ করছিল আর ছয়জন অতর্কিত হামলা চালায়। কেউ আমাকে মারধর করেছে, কেউ অস্ত্র তাক করেছে, কেউ আবার পুরো ঘটনাটি ভিডিও করেছে। আমার মনে হয়েছে, উদ্দেশ্য ছিল শুধু শারীরিকভাবে আঘাত করা নয়; সামাজিকভাবেও আমাকে হেয় করা এবং একটি নির্দিষ্ট বয়ান তৈরি করা।”

রাকসু জিএস বলেন, “জুলাই আন্দোলনে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ভূমিকা রেখেছেন। তাই ছাত্রলীগের প্রশ্নে কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। হামলার পরপরই আমরা প্রক্টর অফিসে যাই। তখন হামলাকারীরা কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির পাশে অবস্থান করছিল। আপনারা যে ভিডিও দেখাচ্ছেন, সেখানে শুধু আমাদের অংশটি দেখানো হয়েছে। কিন্তু সেখানে ২০-২৫ জন দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের তখন আটকানো না হলে তারা পালিয়ে যেত।”

তিনি আরও দাবি করেন, “এই পুরো ঘটনায় ২০-২৫ মিনিট সময় লেগেছে। আমি তখন নোটিশ দেওয়ারও সুযোগ পাইনি। পরে ভিডিও প্রকাশ হওয়ার পর সবাই বিষয়টি জানতে পারে। এই সময়জুড়ে আমরা প্রশাসনকে বারবার বলেছি হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করতে। কিন্তু তারা তা করেনি।”

ছয় দফা দাবি

সংবাদ সম্মেলনে রাকসুর পক্ষ থেকে ছয় দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—নারী শিক্ষার্থীকে প্রাণনাশের হুমকির ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, রাকসু ভবনে হামলা ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় জড়িতদের গ্রেপ্তার ও বিচার, দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ তদন্ত, ক্যাম্পাসে সন্ত্রাস ও রাজনৈতিক পরিচয়ের অপব্যবহার বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অতীতে নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত ও ছাত্রলীগ-সংশ্লিষ্টদের বিচার নিশ্চিত করা।

যা ঘটেছিল সোমবার

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এক নারী শিক্ষার্থীকে হেনস্তার একটি ঘটনায় সোমবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর দপ্তরে ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট ছাত্রকে নিয়ে বৈঠকে বসেন প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান। এ সময় সেখানে উপস্থিত হন রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মার ও এজিএস সালমান সাব্বির।

পরে আম্মার ও সাব্বির এর আগের দিন (রোববার) রাতে প্রক্টরের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগে আনাসকে প্রক্টর দপ্তরে ডেকে নেন। আনাস সেখানে উপস্থিত হলে দুই পক্ষের কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে তাকে চড়-থাপ্পড় দেন জিএস ও এজিএস। একই সঙ্গে তাকে ‘ছাত্রলীগ কর্মী’ আখ্যা দিয়ে গ্রেপ্তারের দাবিও তোলেন তারা। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকায় প্রক্টর আনাসকে ছেড়ে দেন।

এরপর ছাড়া পাওয়ার পর আনাস কয়েকজন সঙ্গীকে নিয়ে রাকসু কার্যালয়ে হামলা করেন বলে দাবি করেন জিএস সালাউদ্দিন আম্মার। পরে রাকসু ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা তাদের ধাওয়া করলে আনাস ও তার সঙ্গীরা কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে আশ্রয় নেন।

এ সময় রাকসুর জিএস আম্মার, এজিএস সালমান সাব্বির, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক নাজমুস শাকিব, বিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক ইমরান লস্কর, সিনেট ছাত্র প্রতিনিধি ফাহিম রেজা এবং বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক হাফেজ মেহেদী হাসানের নেতৃত্বে তাদের ওপর হামলা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময় রিডিং রুমে থাকা শিক্ষার্থীরা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তাদেরও হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে।

পরে লাইব্রেরির পরিচালক ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আনাস এবং তার সঙ্গে থাকা দুই শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করে অ্যাম্বুলেন্সে তোলার চেষ্টা করলে জিএস আম্মারের নেতৃত্বে তাদের অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামিয়ে আবারও মারধর করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

সোমবার রাতেই পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. আনাস এবং সংস্কৃত বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসানকে ‘ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের’ আগের একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

এদিকে তিন শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনায় পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সোমবার রাতেই প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. রেজাউল করিমকে আহ্বায়ক করে এ কমিটি গঠন করা হয়। মঙ্গলবার কমিটির সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

সংসদ ভবনে গণপূর্ত কার্যালয়ে আগুন, তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ

ভারপ্রাপ্ত স্পিকার আগুন লাগার কারণ অনুসন্ধান, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়নের জন্য তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন।

৬ ঘণ্টা আগে

বাংলাদেশের কাছে টনপ্রতি ১০ ডলার কমে ইউরিয়া সার বিক্রির আগ্রহ রাশিয়ার

বাংলাদেশের কাছে অন্যান্য দেশ থেকে আমদানি করা ইউরিয়া সারের তুলনায় প্রতি মেট্রিক টন ১০ ডলার কম দামে বিক্রির আগ্রহ প্রকাশ করেছে রাশিয়া। দেশটি সরকারি পর্যায়ে (জিটুজি) বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) কাছে প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া সার সরবরাহে আগ্রহের কথা জানিয়েছে।

৭ ঘণ্টা আগে

আম্মার ও শিবিরের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থী মারধরের অভিযোগ, তদন্তে রাবি প্রশাসন

সোমবার রাতেই প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. রেজাউল করিমকে আহ্বায়ক করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। মঙ্গলবার সকালে কমিটির সদস্যরা কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি ও রাকসু ভবন পরিদর্শন করে আলামত সংগ্রহ করেন।

৮ ঘণ্টা আগে

নিবন্ধিত নিউজপোর্টালের সম্পাদকদের সংগঠন ‘অনলাইন এডিটরস ফোরাম’ গঠন, নেতৃত্বে পিন্টু-ইফতেখার

সংগঠনটির নয় সদস্যের আহ্বায়ক কমিটির আহ্বায়ক নির্বাচিত হয়েছেন রাজনীতি ডটকমের সম্পাদক ও প্রকাশক শরিফুজ্জামান পিন্টু। সদস্যসচিব মনোনীত হয়েছেন ঢাকা স্ট্রিমের সম্পাদক ও প্রকাশক গোলাম ইফতেখার মাহমুদ।

৮ ঘণ্টা আগে