পাখি

দৈইখাওয়া গ্রামের হট্টিটি

শেখ জাহাঙ্গীর আলম শাহীন
আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২৫, ২১: ৪৬
দৈইখাওয়া গ্রামে লাল লতিকা হট্টিটি পাখির দেখা মিলেছে। এই পাখিটি জলাভূমির সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ । ছবি: লেখক

নীলফামারীর হাতীবান্ধা উপজেলার ভেলাগুড়ি ইউনিয়নের পূর্বকদমা গ্রামের বড়দল বিল আর সীমান্তঘেঁষা মালদা নদীর জলাভূমি যেন এক অদ্ভুত নৈঃশব্দ্যের আশ্রয়। ভারত সীমান্তের কাটাতারের পাশের নোম্যান্স ল্যান্ডে অবস্থিত এই বিলগুলোতে মানুষের চলাফেরা খুবই কম। নির্জনতার এই শান্তি যেন প্রকৃতিকে নতুন করে প্রাণ দিয়েছে। এখানে আবার ফিরেছে অতিথি পাখি, সাথে দেশীয় পাখিও। সেই দেশীয় পাখিদের মধ্যেই অন্যতম লাল লতিকা হট্টিটি (Vanellus indicus)।

একসময় এই হট্টিটির ডাক গ্রামীণ বাংলার ভোরবেলার পরিচিত সুর ছিল। খাল-বিল, ধানক্ষেত আর জলাভূমি জুড়ে দেখা যেত এদের। কিন্তু আধুনিক কৃষিকাজে কীটনাশক ব্যবহার, জলাশয়ের ভরাট, বন-ঝোপঝাড় উজাড় আর অতিরিক্ত শিকারের কারণে এরা আজ অনেকটাই বিরল। তবু পূর্বকদমার মতো কিছু জায়গায় এখনও তারা প্রাকৃতিক ভারসাম্যের অংশ হয়ে টিকে আছে।

রূপ-গুণে অনন্য

লাল লতিকা হট্টিটির দৈর্ঘ্য ৩৪–৩৭ সেন্টিমিটার। চোখের সামনে টকটকে লাল চামড়ার রেখা—যাকে স্থানীয়রা “লতিকা” বলে—মুখমণ্ডল ঘিরে যেন লাল চশমার মতো দেখায়। মাথা-গলা সাদা, পিঠ-ডানা বাদামি-ধূসর, ঠোঁট লাল আর পা উজ্জ্বল হলুদ বা সবুজাভ। এরা চঞ্চল, সতর্ক আর দ্রুত দৌড়াতে পারায় আলাদা করে চোখে পড়ে। পুরুষ-স্ত্রীতে চেহারার তেমন পার্থক্য নেই, যা অনেক পাখির মধ্যে বিরল।

অভ্যাস ও জীবনচক্র

লাল লতিকা হট্টিটি পানির ধারে ঘন ঘাসঝোপে বাস করে। এরা ভালো সাঁতারু নয়, বরং হঠাৎ ঝাঁকুনি দিয়ে দৌড়ানোতেই পারদর্শী। তবে বিপদের সময় পানিতে ঝাঁপ দিয়েও বাঁচতে পারে।

খাবারের তালিকায় থাকে ছোট মাছ, পোকামাকড়, শামুক, ব্যাঙাচি, ধান ও শস্য। এরা সাধারণত একা বা জোড়ায় দেখা যায়। প্রজনন মৌসুম বসন্ত থেকে বর্ষা পর্যন্ত। ঘাস, পাতা আর ছোট ডালপালা দিয়ে বাসা বানায় পানির ধারে। স্ত্রী পাখি ৩–৪টি ডিম পাড়ে। ডিমে তা দেওয়া থেকে শুরু করে ছানাদের খাবার জোগানো পর্যন্ত মা-বাবা দু’জনেই দায়িত্ব ভাগ করে নেয়। ছানা প্রথমে হাঁটাহাঁটি শিখে, পরে উড়তে শেখে। তখন বাবা-মা তাদের স্বাধীন করে দেয়।

গ্রামীণ বিশ্বাস ও লোককথা

বাংলার গ্রামে লাল লতিকা হট্টিটি সৌভাগ্যের প্রতীক। অনেকেই বিশ্বাস করেন, এদের ডাক বর্ষার আগমনী বার্তা। গ্রামের মানুষের ভাষায়, “হট্টিটির ডাক শুনলেই বোঝা যায়, এবার মেঘ নামবে।”

পূর্বকদমার কৃষক ও পাখিপ্রেমী আরাফাত হোসেন কাকনের কাছে এই ডাক এক বিশেষ অভিজ্ঞতা। তিনি বলেন, ভোরের আলো ফুটবার আগেই বড়দল বিল থেকে ভেসে আসে তীক্ষ্ণ সেই সুর। কখনো ঘাসের ফাঁক দিয়ে মাথা উঁচু করে তাকায়, আবার হঠাৎ দৌড়ে মিলিয়ে যায় ঝোপে। যেন জলাভূমির নীরব প্রহরী।

পরিবেশের বন্ধু

শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়, লাল লতিকা হট্টিটি জলাভূমির পরিবেশ রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ। এরা পোকামাকড় ও জলজ প্রাণী খেয়ে ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য বজায় রাখে। বিজ্ঞানীরা বলেন, কোনো এলাকায় লাল লতিকা হট্টিটির উপস্থিতি মানে সেখানে জলাশয় এখনও সুস্থ আছে। তাই এরা প্রকৃতির “জীবন্ত সূচক”।

সংকট ও সংরক্ষণ

তবু এই পাখির টিকে থাকার পথ সহজ নয়।

  • • জলাশয় ভরাট হয়ে কৃষিজমি হচ্ছে।
  • • অতিরিক্ত কীটনাশক তাদের খাদ্যশৃঙ্খল নষ্ট করছে।
  • • অযাচিত শিকারও কমাচ্ছে সংখ্যায়।

সংরক্ষণবিদদের মতে, স্থানীয়ভাবে মানুষকে সচেতন করা, জলাশয় সংরক্ষণ, এবং কীটনাশক কমানো ছাড়া এ প্রজাতিকে রক্ষা সম্ভব নয়।

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

তরুণদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে জাতীয় অগ্রগতিই লক্ষ্য: প্রধানমন্ত্রী

এ বছরের বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের প্রতিপাদ্য, ‘তারুণ্যের আশা-আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন করি, আজকের প্রস্তুতিতে সুন্দর আগামী গড়ি’ আমাদের জাতীয় উন্নয়ন দর্শনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘জনগণের জীবনমান উন্নয়ন ও প্রতিটি নাগরিকের জন্য সুস্থ, শিক্ষিত, দক্ষ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা বর্তমান

৪ ঘণ্টা আগে

তরুণরাই দেশের ভবিষ্যৎ ও প্রধান চালিকাশক্তি: রাষ্ট্রপতি

আগামীকাল (শনিবার, ১১ জুলাই) বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি আজ (শুক্রবার, ১০ জুলাই) এক বাণীতে এসব কথা বলেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ‘বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস ২০২৬’ পালিত হচ্ছে জেনে আমি আনন্দিত।

৪ ঘণ্টা আগে

হাম ও উপসর্গে দেশে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ১২৮ জনের শরীরে ল্যাব পরীক্ষার মাধ্যমে হামের সংক্রমণ নিশ্চিত করা হয়েছে। একই সময়ে হামের সুনির্দিষ্ট উপসর্গ নিয়ে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন আরও ৯০১ জন। সব মিলিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে হামের উপসর্গ দেখা দেওয়া মোট রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়ে

৪ ঘণ্টা আগে

প্রস্তুতি সম্পন্ন, শিগগিরই খুলছে জুলাই জাদুঘর: সংস্কৃতিমন্ত্রী

সংস্কৃতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী বলেছেন, জুলাই জাদুঘর পুনরায় দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়ার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। নতুন ব্যবস্থাপনা কমিটিও গঠন করা হয়েছে। শিগগিরই জাদুঘরটি আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেওয়া হবে।

৬ ঘণ্টা আগে