নিবেদিতপ্রাণ শিশুসাহিত্যিক আখতার হুসেনের প্রয়াণ

শিশু-কিশোরদের জন্য ছড়া, গল্প ও গান লিখে দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে আলাদা একটি জায়গা করে নিয়েছিলেন আখতার হুসেন। নিবেদিতপ্রাণ এই শিশুসাহিত্যিক ও ছড়াকার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে মারা গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
৮১ বছর বয়সী আখতার হুসেনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং তার দুই ছেলে পান্থ ও প্রমিত। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন তিনি। তার প্রয়াণে দেশের শিশুসাহিত্যে তৈরি হলো গভীর শূন্যতা।
শিশুদের জন্য লেখা তার সৃষ্টির সঙ্গে কয়েক প্রজন্মের শৈশব জড়িয়ে আছে। আর কোনো দিন আখতার হুসেন লিখবেন না ‘হ্যাঁরে খবরটা কী উড়ো’র মতো ছড়া, মায়াময় গল্প বা উদ্দীপনা জাগানো গান। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তার লেখনীতে উঠে এসেছিল স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। লিখেছিলেন ‘স্বাধীন স্বাধীন দিকে দিকে জাগছে বাঙালিরা’। ছোটদের জন্য প্রায় ছয় দশক ধরে যে আনন্দের ভুবন তিনি গড়ে তুলেছিলেন, তার পরিসমাপ্তি ঘটল তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।
পরিবার জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন আখতার হুসেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে প্রথমে ফার্মগেটের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে বারডেম হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে গ্রিন লাইফ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এরপর তাকে আবার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে নেওয়া হয়। সর্বশেষ গত শুক্রবার থেকে তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। এর মধ্যে তার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয় এবং শরীরে রক্তচাপও কমে যায়।
নাটোরের লালপুর উপজেলার নুরুল্লাপুর গ্রামে ১৯৪৫ সালের ১ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন আখতার হুসেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি সাহিত্য ও সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দুই ছেলে, স্বজন-সুহৃদ ও অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন তিনি। পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তার জানাজা ও দাফনের সময়সূচি পরে জানানো হবে।
সবার আপন মানুষ
সাদাসিধে জীবনযাপনের জন্য পরিচিত ছিলেন আখতার হুসেন। খ্যাতি ও পুরস্কার পেয়েও তার মধ্যে তার কোনো অহংকার ছিল না। আন্তরিকতা, হাস্যোজ্জ্বল স্বভাব ও নির্লোভ জীবনযাপনের কারণে সহকর্মী ও সাহিত্যাঙ্গনের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন আপনজন। অন্যের সঙ্গে সহজেই মিশতে পারতেন। শিশু-কিশোরদের মতোই তার নিজের স্বভাবেও ছিল সরলতা ও শিশুসুলভ আনন্দ।
নিজের কাজটুকু নীরবে করে যাওয়াই ছিল তার স্বভাব। শিশু, তরুণ প্রজন্ম ও সহকর্মীদের উৎসাহ দেওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন উদার। বিনয়ের সঙ্গে চলতেন এবং খ্যাতিকে কখনো নিজের কাজের চেয়ে বড় করে দেখেননি। অজাতশত্রু কথাটি সম্ভবত এমন মানুষদের জন্যই।
সাংবাদিকতা দিয়েই পেশাজীবন শুরু ও পরিচালনা করেছেন আখতার হুসেন। দৈনিক সংবাদ, দৈনিক জনকণ্ঠ, প্রথম আলোসহ বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করেছেন। ২০০৯ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রথমা প্রকাশনে পাণ্ডুলিপি সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। পরে সেখান থেকে অবসর নেন।
সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও প্রগতিশীল সংগঠনের সঙ্গেও তার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিল। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, খেলাঘর ও উদীচীর সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে যুক্ত ছিলেন তিনি। বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা সদস্যও ছিলেন।
ছড়ায় সহজ ভাষা
শিশুদের জন্য লেখার ক্ষেত্রে আখতার হুসেনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল সহজ ও প্রাণবন্ত ভাষা। তার ছড়ায় শব্দের সঙ্গে খেলার সুযোগ থাকত, ছন্দও ছিল স্বাভাবিক। ফলে শিশুদের কাছে তার লেখা সহজেই গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছিল। তার বহু ছড়া বিভিন্ন শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকেও জায়গা করে নেয়। এভাবেই তার সাহিত্য এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের শিশুর শৈশবের অংশ হয়ে ওঠে।
মুক্তিযুদ্ধের সময়ও সক্রিয় ছিল তার লেখনী। স্বাধীনতার পক্ষে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে তিনি লিখেছেন গান ও নানা ধরনের রচনা। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত তার লেখা এবং সুরকার অজিত রায়ের সুরে শিল্পী তিমির নন্দীর গাওয়া সেই কালজয়ী গান ‘স্বাধীন স্বাধীন দিকে দিকে জাগছে বাঙালিরা/ আজ রুখবে তাদের কারা’ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই গান থেকে অনুপ্রেরণা পাবে।
শতাধিক গ্রন্থ
শিশু-কিশোরদের জন্য ছয় দশকের বেশি সময় ধরে লিখেছেন আখতার হুসেন। ছড়া ও শিশুতোষ মৌলিক বইয়ের পাশাপাশি জীবনী, অনুবাদ ও সম্পাদনার কাজও করেছেন। সব মিলিয়ে তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক।
বাংলাদেশ শিশু একাডেমি থেকে প্রকাশিত পাঁচ খণ্ডের ‘শিশু-বিশ্বকোষ’-এ সর্বাধিকসংখ্যক লেখার (ভুক্তি) কৃতিত্বও আখতার হুসেনের। তার উল্লেখযোগ্য বইয়ের তালিকায় রয়েছে ‘সমুদ্র অনেক বড়’, ‘রামধনুকের সাঁকো’, ‘উল্টোপাল্টা’, ‘হালচাল’, ‘আমার দুটো ডানা’, ‘ও হাওয়া ও হাওয়া’, ‘পাজি বেড়ালের শাস্তি’, ‘ফ্রিডম ফাইটার’, ‘কর্ণকুসুম ও কালোপাখার প্রজাপতি’, ‘খেলাঘরের পুতুলগুলো’, ‘ছোটদের চারণ কবি মুকুন্দদাস’ ইত্যাদি।
পুরস্কার ও সম্মাননা
দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে নানা পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন আখতার হুসেন। এর মধ্যে রয়েছে ‘বাংলা একাডেমি পুরস্কার’, ‘অগ্রণী ব্যাংক-শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার’, ‘আলাওল সাহিত্য পুরস্কার’, ‘ভাষাশহীদ আবদুল জব্বার স্মৃতি পদক’, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্টাডিজ অনুষদ প্রদত্ত ‘মুক্তিযোদ্ধা কলম সৈনিক সম্মাননা স্মারক’, ‘মনিরউদ্দীন ইউসুফ সাহিত্য পুরস্কার’, ‘এম নুরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার’ ও ‘বজলুর রহমান স্মৃতিপদক’। এ ছাড়া আরও অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। তিনি ছিলেন বাংলা একাডেমির ফেলো।
শিশুসাহিত্যিক আখতার হুসেনের জীবনাবসান হলো। ছয় দশকের বেশি সময়ের সাহিত্যকর্মে তিনি যে জগৎ তৈরি করে গেছেন, সেখানে তার ছড়া, গল্প ও গান হয়ে থাকবে শিশুদের আনন্দের সঙ্গী। মুক্তিযুদ্ধের গানেও থেকে যাবে তার অবদান।

















