টিকার মাধ্যমে জরায়ুমুখের ক্যান্সার প্রতিরোধ সম্ভব: এনআইসিআরএইচ পরিচালক

বাসস
ডা. মোস্তফা আজিজ সুমন। ফাইল ছবি

জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের (এনআইসিআরএইচ) পরিচালক ডা. মোস্তফা আজিজ সুমন বলেছেন, সব ধরনের ক্যান্সার প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও জরায়ুমুখের ক্যান্সারের মতো কিছু ক্যান্সার, টিকার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা যায়।

তিনি বলেন, সরকারের উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও জনসচেতনতার অভাবে অনেক পরিবার সন্তানদের টিকা দিচ্ছে না। একইভাবে সময়মতো হেপাটাইটিস-বি টিকা নিশ্চিত করা গেলে লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকিও অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

রাজধানীর মহাখালীতে এনআইসিআরএইচ-এ তার কার্যালয়ে বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি দেশের ক্যান্সার প্রতিরোধ, চিকিৎসা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার নানা দিক তুলে ধরেন।

ডা. সুমন বলেন, ক্যান্সার মোকাবিলায় নতুন হাসপাতাল, আধুনিক যন্ত্রপাতি বা ওষুধের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন জনসচেতনতা তৈরি, প্রতিরোধমূলক টিকাদান এবং জাতীয় স্ক্রিনিং কর্মসূচি।

তিনি বলেন, দেশে বায়ুদূষণ, খাদ্যে ভেজাল ও পরিবেশগত নানা ঝুঁকির কারণে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। তবে সময়মতো টিকাদান, স্ক্রিনিং ও জনসচেতনতা নিশ্চিত করা গেলে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ক্যান্সার প্রতিরোধ করা এবং প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা সম্ভব।

এনআইসিআরএইচ পরিচালক বলেন, সার্ভিক্যাল ক্যান্সার প্রতিরোধে স্কুলগামী মেয়েদের ভ্যাকসিনের আওতায় আনা হলেও সচেতনতার অভাবে এখন পর্যন্ত মাত্র ৩ শতাংশ কভারেজ অর্জিত হয়েছে। সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের লজিস্টিক সহায়তা দিলেও মানুষ সচেতন না হলে ক্যান্সার প্রতিরোধ করা প্রকৃতপক্ষে কঠিন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো জাতীয় ক্যান্সার স্ক্রিনিং কর্মসূচির অভাব। উন্নত দেশগুলোতে ব্রেস্ট, কোলনসহ বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা হয়। কিন্তু দেশে অধিকাংশ রোগী হাসপাতালে আসেন রোগের অগ্রসর পর্যায়ে। ফলে চিকিৎসার সফলতার হারও কমে যায়।

তার মতে, ক্যান্সার মোকাবিলায় প্রাথমিক প্রতিরোধের পাশাপাশি ‘আর্লি ডায়াগনোসিস’ বা দ্রুত রোগ শনাক্তকরণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশে জনসংখ্যার তুলনায় ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা কম হলেও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণের ঘাটতি বলে উল্লেখ করেন ডা. সুমন।

তিনি বলেন, ক্যান্সার চিকিৎসা এখন প্রযুক্তিনির্ভর। তাই চিকিৎসকদের দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ ও কারিকুলামে আরও যুগোপযোগী পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।

হাসপাতালের সেবার উন্নয়নের বিষয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে দুটি রেডিওথেরাপি মেশিন দিয়ে তিন শিফটে রাত ১২টা পর্যন্ত চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া কেমোথেরাপিতেও সন্ধ্যাকালীন শিফট চালু করা হয়েছে। ফলে একই জনবল দিয়ে আগের তুলনায় প্রতিদিন প্রায় ৩০০ জন রোগী রেডিওথেরাপি ও কেমোথেরাপি সেবা পাচ্ছেন।

তিনি জানান, দীর্ঘদিন অচল থাকা একটি ইকো মেশিন ও একটি অ্যানেসথেসিয়া মেশিনও চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি নতুন জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

ডা. সুমন বলেন, বর্তমানে হাসপাতালের প্রায় ৯৮ শতাংশ ওষুধ রোগীদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকারের অতিরিক্ত ৩০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দে প্রয়োজনীয় ওষুধ সংগ্রহ করা সম্ভব হওয়ায় এটি নিশ্চিত করা গেছে।

তবে রেডিওথেরাপির সংকট এখনও বড় চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তিনি বলেন, শুধু জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালেই বর্তমানে সাড়ে ৬ হাজার রোগী চিকিৎসার অপেক্ষায় রয়েছেন। একজন রোগীর রেডিওথেরাপি সম্পন্ন করতে চার থেকে ছয় সপ্তাহ সময় লাগে। ফলে প্রতিনিয়ত নতুন রোগী যুক্ত হওয়ায় অপেক্ষমাণ রোগীর সংখ্যা দ্রুত কমানো সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি বলেন, এ সংকট নিরসনে সাভারের ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিকেল ফিজিক্স (আইএনএমপি)-এর সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। এর ফলে রোগীরা সেখানেও চিকিৎসা নিতে পারবেন। একই সঙ্গে জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতালের চিকিৎসকরাও সেখানে গিয়ে সেবা দেবেন।

তিনি আরও বলেন, সরকারের অর্থায়নে নতুন একটি রেডিওথেরাপি মেশিন কেনা হয়েছে, যা আগামী ছয় মাসের মধ্যে চালু হওয়ার আশা করা হচ্ছে। তার ভাষায়, ক্যান্সার চিকিৎসা সম্প্রসারণে এটিও সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।

সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে এনআইসিআরএইচ পরিচালক বলেন, ২০২৮ সালের মধ্যে আট বিভাগীয় শহরে ক্যান্সার, কার্ডিওলজি ও ডায়ালাইসিস সেবা নিয়ে সমন্বিত প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে। প্রকল্পটি শেষ হলে প্রতিটি বিভাগীয় শহরে দু’টি করে রেডিওথেরাপি মেশিন, কেমোথেরাপি সেন্টার এবং আধুনিক চিকিৎসাসেবা চালু হবে। অধিকাংশ স্থানে অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হয়েছে। বর্তমানে যন্ত্রপাতি সংগ্রহের কাজ চলছে।

তিনি জানান, জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতালের ৫০০ শয্যাকে ১ হাজার ২০০ শয্যায় উন্নীত করার প্রস্তাব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প বাস্তবায়নের আগেই বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে শয্যাসংখ্যা ৭০০-তে উন্নীত করার পৃথক প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় পরিচালন ব্যয় বরাদ্দ পেলে অতিরিক্ত ভবন বা জনবল ছাড়াই আরও ২০০ শয্যা চালু করা সম্ভব হবে বলে।

ক্যান্সার রোগীদের সরকারি সহায়তার বিষয়ে ডা. সুমন বলেন, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক সহায়তা ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ টাকা করা হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ১ হাজার ৭০০ রোগীর আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়েছে। বরাদ্দের কোনো অর্থ ফেরত যায়নি।

সচেতনতাকেই ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার উল্লেখ করে তিনি বলেন, চিকিৎসা, টিকা, ওষুধ ও অবকাঠামো নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে সরকার। কিন্তু জনগণ সচেতন না হলে ক্যান্সারের ক্রমবর্ধমান চাপ কমানো কঠিন হবে।

একই সঙ্গে খাদ্যে ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারকারীদেরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যারা এসব করছেন তারাও একই সমাজের মানুষ। শেষ পর্যন্ত তারাও এসব রোগের ঝুঁকি থেকে মুক্ত নন।

ডা. মোস্তফা আজিজ সুমনের মতে, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, টিকাদান কর্মসূচির সম্প্রসারণ, জাতীয় ক্যান্সার স্ক্রিনিং চালু, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর চিকিৎসা এবং অবকাঠামো সম্প্রসারণের সমন্বিত উদ্যোগই দেশে ক্যান্সারের ক্রমবর্ধমান চাপ মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করবে সরকার: জ্বালানিমন্ত্রী

তিনি বলেন, গ্রামে মাসে ৭৫ ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার হয় না। এ কারণে যারা মাসে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তাদের জন্য বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়নি। প্রান্তিক মানুষ যাতে কষ্ট না পান, সে বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়েছে।

১৯ ঘণ্টা আগে

উত্তরাঞ্চলের ৭ জেলায় বন্যার শঙ্কা

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান গণমাধ্যমকে জানান, আগামী সপ্তাহের মধ্যবর্তী সময়ে (১৯ থেকে ২৩ জুলাই) উজানের ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের কারণে দেশের উত্তরাঞ্চলের প্রধান নদীগুলোর পানি দ্রুত বাড়তে পারে। বিশেষ করে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদের পানি বৃদ্ধি পেয়ে লাল

১ দিন আগে

বঙ্গোপসাগরে সুস্পষ্ট লঘুচাপ: সমুদ্র বন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত

দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার প্রভাবে বরগুনার প্রধান তিন নদী—পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বরের পানি স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে প্রায় দুই থেকে তিন ফুট বৃদ্ধি পেয়েছে। পানির তোড়ে বরগুনার বড়ইতলা ও পুরকাটা ফেরিঘাটের গ্যাংওয়ে সড়ক সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে।

১ দিন আগে

বন্যাদুর্গতদের সহায়তায় সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ অব্যাহত: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দেশের যেসব এলাকা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেসব এলাকায় সরকারের পক্ষ থেকে জরিপ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। জরিপ শেষে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বেড়িবাঁধসহ বিভিন্ন অবকাঠামোর পুনর্বাসন এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে তারা দ্রুত

১ দিন আগে