সালমান শাহ হত্যা মামলা: ৫ দিনের রিমান্ডে অভিনেতা ডন

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০২৬, ১৫: ৪৯

চিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য অভিনেতা ও খলনায়ক আশরাফুল হক ডনকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আজ বৃহস্পতিবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা এ আদেশ দেন বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউশন পুলিশের এসআই শাহ আলম।

এর আগে গত ২০ আগস্ট মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি পুলিশের ঢাকা মেট্রো দক্ষিণের ইন্সপেক্টর মজিবুর রহমান ডনকে সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন। তিনটি কারণ দেখিয়ে করা ওই আবেদনের শুনানির জন্য আজ বৃহস্পতিবার দিন ধার্য করেছিলেন আদালত।

এ দিন শুনানির সময় ডনকে আদালতে হাজির করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুকী রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। ডনের পক্ষে ঢাকা বারের সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ ও অ্যাডভোকেট ফরিদুল ইসলাম রিমান্ড বাতিল করে জামিনের আবেদন করেন। প্রয়োজনে কারাফটকে জিজ্ঞাসাবাদেরও আবেদন করেন তারা। শুনানি শেষে আদালত ডনের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

রিমান্ডের আবেদনে সিআইডি তিনটি কারণ উল্লেখ করেছে। এতে বলা হয়, মামলার ঘটনা আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর। ভুক্তভোগী জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহ। তার মা মামলার পর থেকে অর্থাৎ ১৯৯৬ সাল থেকেই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি করে আসছেন। নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে তিনি বিভিন্ন পত্রিকাসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তৎপর রয়েছেন। এ অবস্থায় সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে ডনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে মামলার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের সম্ভাবনা রয়েছে।

রিমান্ড আবেদনের দ্বিতীয় কারণ হিসেবে ডনকে ‘অত্যন্ত সুকৌশলী ও ধূর্ত প্রকৃতির’ বলে বর্ণনা করেছে সিআইডি। সংস্থাটি বলছে, তাকে পুলিশ হেফাজতে এনে নিবিড়ভাবে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে মামলার ঘটনায় জড়িত অপরাপর সহযোগী আসামিদের অবস্থান শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে। মামলার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন এবং নিবিড় তদন্তের স্বার্থে তাকে পুলিশ রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।

তৃতীয় কারণ হিসেবে সিআইডি বলেছে, ডনের বিরুদ্ধে বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও তিনি বিভিন্ন কৌশলে কী কারণে এবং কার ইন্ধনে বিদেশে পালিয়ে যাচ্ছিলেন, সে বিষয়ে তথ্য উদঘাটন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মামলার প্রকৃত রহস্য জানতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার।

গত ৯ আগস্ট হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ডনকে গ্রেপ্তার করে ইমিগ্রেশন পুলিশ। পরে তাকে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওইদিনই তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। ১২ আগস্ট জামিনের আবেদন করা হলেও আদালত তা নাকচ করে দেন।

এদিকে চিত্রনায়ক চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন ওরফে সালমান শাহকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগে তার স্ত্রী সামিরা হকসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে করা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আগামী ৩০ আগস্টের মধ্যে জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

সামিরা ছাড়া মামলার অন্য আসামিরা হলেন— সামিরার মা লতিফা হক লিও, চলচ্চিত্রের খলনায়ক আশরাফুল হক ডন, শিল্পপতি ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, ডেবিট, জাভেদ, ফারুক, মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের রুবি, আব্দুস ছাত্তার, সাজু ও রেজভি আহমেদ ফরহাদ। এ ছাড়া মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও অনেককে আসামি করা হয়েছে।

গত বছরের ২০ অক্টোবর সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে তার ভাই মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম মামলাটি করেন।

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার ইস্কাটনের ফ্ল্যাটে মারা যান চিত্রনায়ক সালমান শাহ (চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন)। সে সময় বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে তার জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে।

ছেলের মৃত্যুর পর প্রথমে একটি অপমৃত্যুর মামলা করেন সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী। কিন্তু পরে ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে— এমন অভিযোগে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই ওই অভিযোগকে হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন করেন তিনি।

তখন অপমৃত্যু মামলার সঙ্গে হত্যার অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করতে সিআইডিকে নির্দেশ দিয়েছিল আদালত। ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে সিআইডি জানায়, সালমান শাহ ‘আত্মহত্যা’ করেছেন।

সিআইডির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে কমরউদ্দিন চৌধুরী রিভিশন মামলা করেন। ২০০৩ সালের ১৯ মে আদালত মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠান।

এর দীর্ঘ ১১ বছর পর ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট সেই প্রতিবেদন দাখিল করেন মহানগর হাকিম ইমদাদুল হক। ওই প্রতিবেদনেও হত্যার অভিযোগ নাকচ করা হয়।

কিন্তু সালমানের মা নীলা চৌধুরী মামলাটি চালিয়ে যান। ২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে ‘নারাজি’ দেন।

১১ জনের নাম উল্লেখ করে নীলা চৌধুরী দাবি করেন, তারা তার ছেলেকে হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন।

এরপর মামলাটি তদন্ত করে র‌্যাব। রাষ্ট্রপক্ষ আপত্তি তুললে ২০১৬ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বিশেষ জজ-৬-এর বিচারক ইমরুল কায়েশ র‌্যাবকে মামলাটি আর তদন্ত না করার আদেশ দেন।

এরপর তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। চার বছর তদন্তের পর ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি তারা চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়।

সেখানেও বলা হয়, ঘটনার সময় উপস্থিত ও ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ৫৪ সাক্ষীর জবানবন্দি বিশ্লেষণ এবং জব্দ আলামত পর্যালোচনা করে হত্যার অভিযোগের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, চিত্রনায়িকা শাবনূরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে পারিবারিক কলহ এবং স্ত্রী সামিরার কারণে মা নীলা চৌধুরীকে ছেড়ে থাকার মানসিক যন্ত্রণায় ‘অভিমানী’ সালমান আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন।

ওই প্রতিবেদনেও অসন্তুষ্টি জানিয়ে ছেলের মৃত্যু কীভাবে হয়েছিল, তা জানতে আরও তদন্তের দাবি জানান নীলা চৌধুরী। এর মধ্যে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মামুনুর রশীদ ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর পিবিআইয়ের প্রতিবেদন আমলে নিয়ে আসামিদের অব্যাহতির আদেশ দেন।

এরপর আবার সালমানের পরিবারের পক্ষ থেকে মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন দায়েরের আবেদন করা হয়। ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করেন।

এ বিষয়ে সালমানের বাবা কমরউদ্দিনের অভিযোগ এবং ঘটনায় জড়িত রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদের জবানবন্দি সংযুক্ত করে হত্যা মামলা করার নির্দেশ দিয়ে অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের আদেশ দেওয়া হয়।

২০২০ সালে পিবিআই যখন মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়, তখন ডন বলেছিলেন, ‘আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন। অবশেষে কলিজার বন্ধুকে হত্যার মিথ্যা অভিযোগ থেকে মুক্ত হলাম।’

তিনি আরও বলেছিলেন, ‘২৪টা বছর বুকের ভেতর বন্ধু হত্যার মিথ্যা অপবাদ নিয়ে আমাকে ঘুরতে হয়েছে। আমার যে ক্ষতি হয়েছে তার পূরণ কিছুতেই হবে না। আমি ধৈর্য ধরে ছিলাম। সত্য কোনো দিন মিথ্যা হয় না। মিথ্যাকেও কোনো দিন জোর করে সত্যি বানানো যায় না।’

ওই বক্তব্য দেওয়ার ছয় বছর পর সালমান শাহ হত্যা মামলাতেই গ্রেপ্তার হলেন ডন।

গত ২০ মে ‘হত্যার’ প্রকৃত কারণ উদঘাটনে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে সালমানের দেহাবশেষ কবর থেকে উত্তোলনের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। ২৪ মে দেহাবশেষ উত্তোলন করে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি ও আবার ময়নাতদন্ত করার অনুমতি দেওয়া হয়।

তবে বাদীপক্ষ লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল চেয়ে আবেদন করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালত আবেদনটি নথিভুক্ত করেন।

গত ২২ জুন সালমানের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ণয়ে কবর থেকে তার দেহাবশেষ উত্তোলন প্রক্রিয়ায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়া হয়। সিলেট জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কার্যালয়ের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিংকি সাহা এ বিষয়ে একটি অফিস আদেশ জারি করেন। ওই আদেশের অনুলিপি সম্প্রতি ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠানো হলে তা নথিভুক্ত করা হয়।

Ad
Ad
ad
ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

নেপালে ভয়াবহ বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানি, রাষ্ট্রপতির গভীর শোক প্রকাশ

ভয়াবহ পাহাড়ি ঢলে নেপাল ও তিব্বতে এখন পর্যন্ত প্রাণহানি বেড়ে ১৬৫ এবং ৮২৬ জন বলে জানিয়েছে নেপালের দুর্যোগ সংস্থা।পানির তোড়ে কয়েক সেকেন্ডে তলিয়ে যাচ্ছে বহুতল ভবন, ভসে যাচ্ছে চলন্ত গাড়ি, ধসে যাচ্ছে বাড়িঘর। তিব্বত-নেপাল সীমান্তের কাছে একটি সিসিটিভিতে ধরা পড়েছে নজিরবিহীন এই দৃশ্য। উদ্ধার অভিযানে সহায়তার জ

৫ ঘণ্টা আগে

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে ৬ জনকে পুশইনের চেষ্টা, বিজিবির বাধা

১৬ বিজিবি জানায়, ১২ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের শমসের নগর বিএসএফ ক্যাম্পের সদস্যরা ছয়জন পুরুষকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পুশইনের চেষ্টা করেন। খবর পেয়ে রামদাসপুর বিওপির টহল দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে ওই ছয়জনকে ভারতীয় সীমান্তের শূন্য লাইনের অভ্যন্তরে অবস্থানরত অবস্থায় শনাক্ত করে।

৫ ঘণ্টা আগে

সালাহউদ্দিন আহমদকে গুমের মামলায় জিয়াউলকে ট্রাইব্যুনালে হাজির

২০১৫ সালের ১০ মার্চ রাতে রাজধানীর উত্তরার একটি বাসা থেকে সালাহউদ্দিন আহমদকে গোয়েন্দা পুলিশ পরিচয়ে কিছু লোক তুলে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ করেন তার স্ত্রী হাসিনা আহমদ। সে সময় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছিলেন সালাহউদ্দিন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ১১ আগস্ট সালাহউদ্দিন আহমদ দ

৬ ঘণ্টা আগে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন আজ শুরু হচ্ছে

জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন, শুরু হতে যাওয়া তৃতীয় অধিবেশনটি ৫, ৭ বা ১০ দিনের সংক্ষিপ্ত অধিবেশন হতে পারে। তবে প্রয়োজন হলে এর মেয়াদ বাড়ানো হবে।

৬ ঘণ্টা আগে