সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হেনস্তার শিকার রাজনীতি ডটকমের নারী সাংবাদিক

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ০৮ জুন ২০২৬, ১০: ৩০
রোববার আদালত চত্বরে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হেনস্তার শিকার হন রাজনীতি ডটকমের সংবাদ কর্মী শিউলি বাহার। তৃতীয় ছবিতে দেখা যাচ্ছে, আঘাতের ফলে স্ট্যান্ড থেকে শিউলির মোবাইল পড়ে গেছে। ছবি: ভিডিও থেকে

আদালত চত্বরে আলোচিত রামিসা হত্যাকাণ্ডের মামলার রায়ের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে শারীরিকভাবে হেনস্তার শিকার হয়েছেন রাজনীতি ডটকমের সাংবাদিক শিউলি বাহার। কোনো সংবাদমাধ‍্যমে কাজ না করলেও সাংবাদিক পরিচয়ে একজন তাকে প্রচণ্ড গতিতে কয়েক দফা ধাক্কা দেন। এ সময় তার হাতে থাকা স্ট্যান্ড থেকে মোবাইল ফোন ছিটকে পড়ে যায়।

শিউলি বাহার বলছেন, কাজের তাড়াহুড়া থাকায় তিনি ঘটনাটি শুরুতে অনুধাবনই করতে পারেননি। অন্য একজন সাংবাদিক ফোনটি পেয়ে তাকে ফিরিয়ে দেন। অন্যদিকে অভিযুক্ত জুবায়ের আলম একজন নারী সাংবাদিককে এভাবে শারীরিকভাবে হেনস্তা করার ঘটনাকেও খুব স্বাভাবিক হিসেবে বর্ণনা করছেন।

বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সাংগঠনিক সম্পাদক শাহনাজ পারভীন এলিস রাজনীতি ডটকমকে বলেন, এ ধরনের ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা উচিত। পাশাপাশি এখনো যেহেতু নারীদের কাজ করতে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে, ফলে পুরুষ সহকর্মীদেরও এ ধরনের ঘটনায় এগিয়ে আসা উচিত।

ঘটনাটি ঘটে রোববার (৭ জুন) দুপুরে। এ দিন রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন। রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা এ রায়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন।

আলোচিত এ মামলার খবর সংগ্রহ করতে আদালত চত্বরে গিয়েছিলেন রাজনীতি ডটকমের সাংবাদিক শিউলি বাহার। রামিসার বাবা যখন আদালত ভবন থেকে বেরিয়ে আদালত চত্বরে রাখা প্রিজন ভ্যান পেরিয়ে মূল ফটক দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, তখনই হেনস্তার শিকার হন তিনি।

শিউলি বাহার বলেন, ‘রামিসার বাবার ফুটেজ সংগ্রহের জন্য আমি তার সঙ্গে সঙ্গে আদালত চত্বরের মূল ফটকের দিকে যাচ্ছিলাম। আরও অনেক সাংবাদিকই সেখানে ছিলেন। এ ধরনের ঘটনায় যেমন হয়, সাংবাদিক ছাড়াও সাধারণ মানুষের প্রচণ্ড ভিড় থাকে। কিছুটা ধাক্কাধাক্কি ঘটেও। কিন্তু আজ যেটি ঘটেছে, ভিড়ের মধ্যে আমাকে বারবার ধাক্কা দিচ্ছিলেন একজন ব্যক্তি।’

তিনি বলেন, ‘কিছুক্ষণ পরে খেয়ালি করি, তিনি আমার হাতে থাকা বুম ও স্ট্যান্ড বারবার সরিয়ে ফেলতে বলছেন। আমি না সরালে দেখি তিনি প্রথমে আমাকে একাধিকবার ধাক্কা দেন, এরপর আমার হাতে থাকা স্ট্যান্ডে সজোরে ধাক্কা দেন। তার ধাক্কায় আমি অনেকটা পিছিয়ে পড়ি। আবার বুমে অফিসের নাম লেখা আছে। সেটা দেখে তিনি বারবার বলছিলেন, রাজনীতি ডটকমকে সরাও।’ পরে ওই ব্যক্তি তুই-তোকারিও করেছেন বলে জানান শিউলি।

এ ঘটনার একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। সেসব ভিডিওতেও দেখা যায়, ঘটনাস্থলে শিউলি বাহার ছাড়া আর কোনো নারী সাংবাদিক ছিলেন না। সেখানে সাদা ট্রাউজার ও সাদা টি-শার্ট পরিহিত এক ব্যক্তি শিউলিকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লার কাছ থেকে সরিয়ে দিতে চেষ্টা করছেন। তিনি শিউলির বুমে আঘাত করলে সেই স্ট্যান্ড থেকে শিউলির মোবাইল ফোনটিও নিচে পড়ে যায়।

শিউলি বলেন, ‘আমার স্ট্যান্ড থেকে যে মোবাইল ফোনটি পড়ে গেছে, সেটিও আমি খেয়াল করিনি। আমাদের আরেক সাংবাদিক ভাইয়ের হাতে গিয়ে মোবাইলটি পড়েছে। তিনি হাতে ব্যথাও পেয়েছেন। তিনি আমাকে ফোনটি ফেরত দেন। সব মিলিয়ে ঘটনাটিতে শারীরিকভাবে তো বটেই, মানসিকভাবেও প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছি। তিনি নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়েছেন। একজন সাংবাদিক হয়ে আরেক সাংবাদিককে কেন এভাবে আঘাত করতে হবে, সেটি বুঝতে পারছি না।’

জুবায়ের আলম। ছবি: ফেসবুক পেজ থেকে
জুবায়ের আলম। ছবি: ফেসবুক পেজ থেকে

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শিউলিকে হেনস্তাকারী তরুণের নাম জুবায়ের আলম। তিনি সোনালী নিউজের কর্মী হিসেবে পরিচিত। এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সোনালী নিউজ কর্তৃপক্ষ রাতে রাজনীতি ডটকমকে জানিয়েছেন, বিভিন্ন অভিযোগে জুবায়েরকে মাস দুয়েক আগে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

জানতে চাইলে জুবায়ের আলম রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘অ্যাসাইনমেন্ট গেলে এ রকম একটু ধাক্কাধাক্কি হয়ই। এগুলো এমন কিছু না। উনি রামিসার বাবার ফুটেজ আগে নিয়েছেন। আবার ওখানেও নিতে গেছেন। এ কারণে তাকে বলা হচ্ছিল অন্যদের একটু জায়গা দিতে। উনি না শোনার কারণে একটু সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। একে এমন বড় ঘটনা মনে করার কোনো কারণ নেই।’

জানতে চাইলে জুবায়ের নিজেও স্বীকার করে নেন, তিনি আর সোনালী নিউজে কাজ করছেন না। এই মুহূর্তে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও যুক্ত নন তিনি। তাহলে কেন তিনি সেখানে গিয়েছিলেন— সে প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেননি। পরে তিনি হোয়াটসঅ্যাপে এই প্রতিবেদককে তার নিজের ফেসবুক পেজের লিংক পাঠান, যেখানে কিছু ভিডিও আপলোড ও শেয়ার করেছেন তিনি।

ওই ফেসবুক পেজ থেকে গত মাসে বাণিজ্য প্রতিদিন ও বাংলা টিভির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ছবিসহ শুভেচ্ছাও জানিয়েছেন জুবায়ের। এসব পোস্টে তিনি নিজেকে সোনালী নিউজের স্টাফ রিপোর্টার ও রিপোর্টার পরিচয় দিয়েছেন।

এ ঘটনা নিয়ে রাজনীতি ডটকমের বার্তা সম্পাদক তরিকুর রহমান সজীব বলেন, ‘অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক একটি ঘটনা ঘটেছে আমাদের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টারের সঙ্গে। আমরা পুরো ঘটনাটি দেখেছি। বিশেষ করে একজন নারী সাংবাদিকের সঙ্গে এমন আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে ঘটনাটি নিয়ে পরবর্তী কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়, সেটি পর্যালোচনা করে দেখছি।’

বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সাংগঠনিক সম্পাদক শাহনাজ পারভীন এলিস রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘কর্মস্থলে নারী সাংবাদিকদের হেনস্তার ঘটনা আমরা অনেক আগে থেকেই ঘটতে দেখছি। এসব ঘটনা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। শিউলি বাহারের ঘটনাটি আরও বেশি দুর্ভাগ্যজনক এ কারণে যে এখানে তাকে হেনস্তার সঙ্গে যে ব্যক্তিটি জড়িত, তিনি নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিলেও কোনো গণমাধ্যমে কাজ করেন না। মোজো বা ইউটিউবার যারা আছেন, তাদের কেউ কেউ যে কোনো ধরনের শৃঙ্খলা ধার ধারেন না, এ ঘটনায় সেটি স্পষ্ট। একজন নারী সংবাদ কর্মীর সঙ্গে কীভাবে ব্যবহার করা উচিত, সেটি সম্পর্কেও তাদের ন্যূনতম ধারণা নেই।’

এ ধরনের ঘটনায় আইনি ব্যবস্থার দিকে যাওয়ার তাগিদ দিয়ে শাহনাজ পারভীন বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনার জন্য আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই। ফলে ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা উচিত। তাহলে নারীদের হেনস্তা করতে যাওয়ার সময় আরও দুইবার ভাবতে হবে।’

পুরুষ সহকর্মী যারা আছেন তাদের দায়বদ্ধতার দিকেও মনোযোগ আকর্ষণ করলেন বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের এই সাংগঠনিক সম্পাদক। তিনি বলেন, ‘শিউলির পাশে পুরুষ সহকর্মী যারা ছিলেন, তাদের এগিয়ে গিয়ে ঘটনাটি প্রতিহত করা উচিত ছিল। আমাদের দেশে নারীদের যে এখনো দুর্বল মনে করা হয়, তাদের পদে পদে বাধা দেওয়া হয়, সেটি তো পুরুষ সহকর্মীরা ভালো করেই জানেন। আমরাও কর্মস্থলে পুরুষ সহকর্মীদের এমন সমর্থন-সহায়তা পেয়েছি। শুধু নারী হিসেবে বিবেচনা না করলেও সহকর্মী হিসেবেই সবাইকে সবার পাশে দাঁড়ানো উচিত।’

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব আবদুস সাদেকের প্রয়াণ

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, খ্যাতিমান হকি খেলোয়াড় ও সংগঠক আবদুস সাদেক আর নেই। আজ শনিবার সকাল ৮টায় রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর।

৩ ঘণ্টা আগে

বিভিন্ন ধর্মের অভিন্ন নৈতিক শিক্ষা [পর্ব ২]

জৈন ধর্ম মানুষের মুক্তির জন্য নৈতিকতার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব আরোপ করেছে। এই ধর্ম অনুযায়ী, বন্দি অবস্থা থেকে আত্মার মুক্তির উপায় তিনটি— সম্যগ দর্শন বা সত্যের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা, সম্যগজ্ঞান বা সংশয়শূন্য ও ভ্রমমুক্ত বিশদ জ্ঞান এবং সম্যগ চারিত্র বা হিত আচরণে প্রবৃত্ত হওয়া এবং অহিতকর আচরণ থেকে সম্প

৭ ঘণ্টা আগে

নিজের নামে স্কুলের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব, না করলেন প্রতিমন্ত্রী

স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের দুই ছেল এবং আত্মীয়ের নামের সঙ্গে মিল রেখে বগুড়ার মোকামতলা উপজেলায় নবগঠিত কয়েকটি ইউনিয়নের নামকরণের অভিযোগের পর এবার তার নামে একটি স্কুলের নামকরণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে শিক্ষা সচিবের কাছে পাঠানো এক পত্রে এই প্রস্তাব নাকচ করেছেন তিনি।

১৬ ঘণ্টা আগে

পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদককে গ্রেপ্তারে প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের দুঃখপ্রকাশ

‘দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিন’ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক রেজানুর ইসলামকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় দুঃখপ্রকাশ করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ পারস্পরিক আলোচনা ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিষয়টির শান্তিপূর্ণ সমাধানে পৌঁছা

১৭ ঘণ্টা আগে