বাংলাদেশে হামের পরিস্থিতি ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ১৭: ৩০
ঢাকা শিশু হাসপাতালের বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ড। ফাইল ছবি

বাংলাদেশে চলমান হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া, টিকার ঘাটতি এবং মৃত্যুর ক্রমবর্ধমান হারের ওপর ভিত্তি করে পরিস্থিতিকে জাতীয়ভাবে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে মূল্যায়ন করেছে সংস্থাটি।

গতকাল বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশে হামের বর্তমান সংক্রমণ পরিস্থিতি আগের অর্জনকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।

বাংলাদেশের দীর্ঘ স্থলসীমান্ত থাকায় এবং ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মতো আন্তর্জাতিক ট্রানজিট পয়েন্টগুলো সচল থাকায় এই সংক্রমণ প্রতিবেশী দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ার ‘উচ্চ ঝুঁকি’ দেখছে ডব্লিউএইচও। সংস্থাটি বলছে, ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে মানুষের নিরন্তর যাতায়াত সংক্রমণকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে।

এ ছাড়া মিয়ানমারে টিকা না পাওয়া শিশুর সংখ্যা বেশি হওয়ায় এবং ভারতে সম্প্রতি হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ায় সীমান্ত এলাকার ঝুঁকি ‘আঞ্চলিক পর্যায়ে উচ্চ’ হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাস থেকে দেশে হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে শুরু করেছে। গত এক মাসে (১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল) সংক্রমণের পরিসংখ্যান হলো—

সন্দেহভাজন রোগী: ১৯ হাজার ১৬১ জন।

পরীক্ষাগারে নিশ্চিত রোগী: ২ হাজার ৯৭৩ জন।

হাসপাতালে ভর্তি: ১২ হাজার ৩১৮ জন বর্তমানে চিকিৎসাধীন।

মৃত্যু: এ সময় হামের উপসর্গ নিয়ে ১৬৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ল্যাবরেটরিতে নিশ্চিত হওয়া ৩০ জন রোগীর ক্ষেত্রে মৃত্যুহার (CFR) ১.১ শতাংশ।

আক্রান্তদের অধিকাংশই শিশু

হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাবে আক্রান্ত শিশুদের ৭৯ শতাংশের বয়স ৫ বছরের নিচে। এর মধ্যে ৬৬ শতাংশের বয়স ২ বছরের কম এবং ৩৩ শতাংশের বয়স ৯ মাসের নিচে।

সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মৃত শিশুদের প্রায় সবাই টিকা না পাওয়া অথবা আংশিক টিকা পাওয়া (এক ডোজ)। ৯১ শতাংশ রোগী ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী, যা এই বয়সী শিশুদের মধ্যে বড় ধরনের রোগ প্রতিরোধ ঘাটতির প্রমাণ।

হটস্পট ঢাকা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের আট বিভাগে সংক্রমণ শনাক্ত হলেও ঢাকা বিভাগ সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত। ১৫ মার্চ থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগে ৮ হাজার ২৬৩ জন সন্দেহভাজন রোগী। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি দেখা গেছে ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, কামরাঙ্গীরচর, কড়াইল, মিরপুর এবং তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল ও বস্তি এলাকায়।

অন্যান্য বিভাগের মধ্যে রাজশাহীতে ৩ হাজার ৭৪৭, চট্টগ্রামে ২ হাজার ৫১৪ এবং খুলনা বিভাগে ১ হাজার ৫৬৮ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। দেশের প্রায় ৯১ শতাংশ জেলা এখন হামের কবলে, যা এই সংক্রমণ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

কেন এই পরিস্থিতি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ২০২৪-২৫ সালে দেশে এমআর (হাম-রুবেলা) টিকার জাতীয় পর্যায়ের ঘাটতি এই পরিস্থিতির প্রধান কারণ। ২০০০ সালে যেখানে টিকার কভারেজ ছিল ৮৯ শতাংশ, সেখানে ২০২৪-২৫ সালে তা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে।

২০২০ সালের পর থেকে দেশব্যাপী কোনো নিয়মিত সম্পূরক হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি (এসআইএ) পালিত না হওয়া এই ঝুঁকির পথ তৈরি করেছে বলে মনে করছে ডব্লিউএইচও। এ ছাড়া অপুষ্টিতে ভোগা এবং ভিটামিন এ এর ঘাটতি থাকা শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অন্ধত্ব ও মস্তিষ্কে প্রদাহের (এনসেফালাইটিস) মতো জটিলতা মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

উল্লেখ্য, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়। উপসর্গ দেখা দিলেই (জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া, শরীরে ফুসকুড়ি) দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার এবং শিশুকে টিকার পূর্ণ ডোজ নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ

পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংস্থাটি বেশ কিছু জরুরি পরামর্শ দিয়েছে—

  • সব এলাকায় অন্তত ৯৫ শতাংশ টিকার কভারেজ নিশ্চিত করা
  • বিদেশ থেকে আসা বা যাতায়াতকারীদের ওপর সীমান্ত নজরদারি জোরদার করা
  • আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় অবিলম্বে ভিটামিন এ ক্যাপসুল সরবরাহ নিশ্চিত করা
  • হাসপাতালে হাম রোগীদের জন্য আলাদা কক্ষ বা আইসোলেশন নিশ্চিত করে সংক্রমণ ঠেকানো
  • স্বাস্থ্যকর্মী, পরিবহন ও পর্যটন খাতের কর্মীদের জরুরি ভিত্তিতে টিকা দেওয়া
  • যাদের টিকা নেওয়ার প্রমাণ নেই, তাদের দ্রুত টিকার আওতায় আনা
  • প্রয়োজনীয় সিরিঞ্জ, কিট ও সরঞ্জামের পর্যাপ্ত মজুত রাখা
  • সন্দেহভাজন রোগীর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে টিকা দেওয়া
  • সাপ্তাহিক পরিস্থিতি প্রতিবেদন তৈরি করে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া
  • জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা

বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে গত ৩০ মার্চ দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি অনুমোদন করেছে জাতীয় টিকাদান কারিগরি উপদেষ্টা কমিটি (এনআইটিএজি)। ৫ এপ্রিল থেকে ১৮ জেলায় এবং ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের জন্য এই কর্মসূচি শুরু হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, মায়ের বুকের দুধ কম পাওয়ায় পুষ্টিহীনতায় ভুগছে শিশুরা। এতে হামের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। অপুষ্টির কারণেও হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে শারীরিক জটিলতা বাড়ছে। তবে সবার প্রচেষ্টায় হাম নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনা সম্ভব হচ্ছে।

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

ঈদের ছুটি শেষে অফিস খুলছে সোমবার

ঈদুল আজহা উদযাপিত হয় গত ২৮ মে। এর আগে ২৬ ও ২৭ মে এবং পরে ২৯ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত সরকারি ছুটি ছিল। ২৩ মে (শনিবার) সাপ্তাহিক ছুটির দিনে অফিস খোলা থাকলেও পরে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তে ২৫ মে অতিরিক্ত ছুটি ঘোষণা করা হয়, যার ফলে টানা সাত দিনের ছুটি নিশ্চিত হয়।

১৬ ঘণ্টা আগে

আদ-দ্বীনে বেকারি পাওয়া গেছে, বিষয়টি শক্তভাবে দেখা হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিচতলায় বেকারির সন্ধান পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেছেন, ‘হাজার হাজার শিক্ষার্থীর জন্য বেকারিতে খাবার তৈরি হতো। সেখান থেকে কোনো গ্যাস বের হয়েছে কিনা সেটি দেখা হবে। দুইজন ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলা

১৭ ঘণ্টা আগে

হামের উপসর্গে আরও ৮ শিশুর মৃত্যু

অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, এ নিয়ে হাম ও হামের উপসর্গে মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৫৮৩ জন। এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে ৯০ জনের শরীরে। অন্যদিকে শরীরে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৪৯৩ জন।

১৯ ঘণ্টা আগে

আদ-দ্বীন হাসপাতালে ৬ শিশুর মৃত্যু: তদন্তের মেয়াদ বাড়ল ৪ দিন

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) জাহিদ রায়হান গণমাধ্যমকে বলেন, যেসব শিশু মারা গেছে, তাদের মায়েদের সঙ্গে কথা বলার জন্য আরও সময় প্রয়োজন। এ কারণে কমিটিকে আরও চার দিন সময় দিয়ে ৩ জুন পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

১ দিন আগে