কবিতার জন্যই পুরস্কারবঞ্চিত কবি মোহন রায়হান

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২০: ৫৬
নাম ঘোষণা করা হলেও কবি মোহন রায়হানকে বাংলা একাডেমি পুরস্কার দেওয়ার জন্য মঞ্চে ডাকা হয়নি। কোলাজ: রাজনীতি ডটকম

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার বিজয়ী হিসেবে এ বছর ঘোষণা করা হয়েছিল ৯ কবি-সাহিত্যিক-গবেষকের নাম। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সে পুরস্কারের বিতরণের অনুষ্ঠান শুরু হতেই বাঁধল গোল। তালিকায় নাম থাকলেও ডাকা হলো না কবি মোহন রায়হানকে। জানা গেল, কর্নেল তাহেরকে নিয়ে লেখা তার ৪১ বছর আগের এক কবিতার জন্য তাকে এ পুরস্কার দেওয়া হবে না!

বুধবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) বাংলা একাডেমিতে এক অনুষ্ঠানে মনোনীত কবি-সাহিত্যিকদের হাতে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ওই সময় অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত থাকলেও মোহন রায়হানকে মঞ্চে ডাকা হয়নি। প্রতিবাদে মিলনায়তন থেকে বেরিয়ে যান জাতীয় কবিতা পরিষদের এই সভাপতি।।

কিছু সময় পর কবি মোহন রায়হান নিজেই ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়ে জানান, তার পুরস্কারটি বাতিল করা হয়েছে। তার লেখা ‘তাহেরের স্বপ্ন’ কবিতাকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে তার বাবা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে লেখা হিসেবে হাজির করে তাকে পুরস্কারবঞ্চিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

মোহন রায়হান লিখেছেন, ‘আপনারা অবগত আছেন, এবার ২০২৫ বাংলা একাডেমির সাহিত্য পুরস্কার (কবিতায়) আমাকে প্রদান করা হয়েছিল। এই পুরস্কার আমার একদমই প্রত্যাশা ছিল না। আমি একজনের কাছেও পুরস্কারের জন্য তদবির করিনি। পুরস্কার কমিটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমাকে নির্বাচিত করে।’

বৃহস্পতিবার পুরস্কার বিতরণী সামনে রেখে বুধবার পুরস্কারপ্রাপ্তদের ডেকে বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী এসএসএফ পুরস্কার গ্রহণের মহড়া পরিচালনা করে বলে জানান মোহন রায়হান। এমনকি বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠানের সূচনাতেও তার নাম ঘোষণা করা হয় বলে জানান তিনি।

মোহন রায়হান বলেন, “কিন্তু পুরস্কার প্রদানের সময় আমাকে আর ডাকা হয়নি। জানতে পারলাম, ৪১ বছর আগে কর্ণেল তাহেরকে নিয়ে লেখা আমার কবিতা ‘তাহেরের স্বপ্ন’ কবিতার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দিয়ে একটি মহল আমার পুরস্কার বাতিল করিয়েছে।”

জানতে চাইলে মোহন রায়হান রাজনীতি ডটকমকে বলেন, “আমি ৪১ বছর আগে কর্নেল তাহেরের ফাঁসির প্রতিবাদে ‘তাহেরের স্বপ্ন’ নামে একটি রূপক কবিতা লিখেছিলাম। সেখানে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম-ধাম ছিল না, বরং একজন পঙ্গু বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সেক্টর কমান্ডারের ফাঁসির বেদনা আমাকে ব্যথিত করেছিল বলেই আমি লিখেছিলাম।”

‘এখন হঠাৎ করে একটি স্বার্থান্বেষী মহল, যারা বিগত আমলে কোনো ভূমিকা পালন করেনি কিন্তু এখন রাতারাতি বিএনপি সেজেছে, তারা তারেক জিয়ার (প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান) কাছে গিয়ে সেই কবিতাটি নিয়ে হাজির হয়েছে। তারা তাকে বুঝিয়েছে, আমার এই কবিতা জিয়াউর রহমানের প্রতি ঘৃণা পোষণ করে, তাই তার হাত দিয়ে আমাকে পুরস্কার দেওয়া ঠিক হবে না। এর ফলে তিনি আমাকে পুরস্কার দিতে মানা করে দেন,’— বলেন কবি মোহন রায়হান।

মোহন রায়হান রাজনীতি ডটকমকে জানান, বৃহস্পতিবার সকালে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ওই কবিতার জন্য তাকে পুরস্কার দিতে না পারার কথা জানিয়ে অনুষ্ঠানস্থল থেকে চলে যাওয়ার অনুরোধ করেন। পরে পুরস্কার পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাসও দেন। পরে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী ওমর খৈয়ামও তাকে ‘অন্যভাবে’ সম্মান জানানো কিংবা বাসায় বা অফিসে গিয়ে পুরস্কার পৌঁছে দেওয়ার কথা জানান।

মোহন রায়হান বলেন, ‘কিন্তু আমি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছি, আমি তো এই পুরস্কারের জন্য কোনো তদবির করিনি। পুরস্কার হচ্ছে মানুষের ভালোবাসা। আমি কেন মিথ্যা অজুহাতে অনুষ্ঠান ছেড়ে যাব? আমি বাংলা একাডেমির জীবন সদস্য হিসেবে সেখানেই উপস্থিত থাকার সিদ্ধান্ত নিই। পরে যখন পুরস্কার দেওয়া শুরু হলো, ৯ জনের মধ্যে বাকি আটজনের নাম ঘোষণা করা হলেও আমার নাম আর নেওয়া হয়নি। তখন আমি প্রতিবাদস্বরূপ সবার সামনে দিয়ে হেঁটে অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করি।’

৪১ বছর আগে লেখা কবিতার জন্যই যে মোহন রায়হানকে পুরস্কার দেওয়া হয়নি, সে কথা স্বীকার করে নিয়েছেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। রাজনীতি ডটকমের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘ওনার (মোহন রায়হান) লেখা ও কবিতা সম্পর্কে কিছু অভিযোগ উত্থাপিত হওয়ায় সেগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষার স্বার্থে কর্তৃপক্ষ ওনার পুরষ্কারটি সাময়িকভাবে স্থগিত রেখেছেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরে এ সম্পর্কিত সব তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে (ইমিডিয়েটলি) জানানো হবে।’

একই কথা একটি গণমাধ্যমকে বলেছেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম। তিনি বলেন, ‘ওনাকে (মোহন রায়হান) নির্বাচিত করেছে বাংলা একাডেমি। কিন্তু নানা বিষয়ে ওনার বিরুদ্ধে সরকারের কাছে প্রচুর অভিযোগ এসেছে। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে সরকারকে আমলে নিতে হয়। আমরা এগুলো রেখেছি। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখে সিদ্ধান্ত দেবো।’

গত ১৭ জানুয়ারি তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন রেজাউদ্দিন স্টালিন ও মোহন রায়হানসহ কবি-সাহিত্যিকরা। ছবি: বিএনপি মিডিয়া সেল
গত ১৭ জানুয়ারি তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন রেজাউদ্দিন স্টালিন ও মোহন রায়হানসহ কবি-সাহিত্যিকরা। ছবি: বিএনপি মিডিয়া সেল

বাংলা একাডেমি বা সরকার যা-ই বলুক, মোহন রায়হান এ ঘটনায় হতাশ বলে জানিয়েছেন। এর আগে তারেক রহমান দেশে ফেরার পর গত ১৭ জানুয়ারি কবি-সাহিত্যিকদের একটি দল তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিল। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি রেজাউদ্দিন স্টালিনের নেতৃত্বে মোহন রায়হানও ছিলেন সে দলে।

ওই সাক্ষাতের প্রসঙ্গ টেনে মোহন রায়হান রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘তারেক জিয়ার সঙ্গে আমাদের যখন মতবিনিময় হয়েছিল, তখনো বলেছিলাম যে আমরা তার কাছে কিছু চাইতে আসিনি, আমরা আমাদের কলমের স্বাধীনতা ও কথা বলার অধিকার চাই। তিনিও আশ্বস্ত করেছিলেন, লেখকদের লেখনিকে কখনো বাধাগ্রস্ত হতে দেবেন না তিনি। কিন্তু আজকের এই ঘটনা আমাকে হতাশ করেছে।’

মোহন রায়হানের যে কবিতা নিয়ে এত আলোচনা

যে কবিতার জন্য মোহন রায়হান বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাননি, সেটি প্রয়াত কর্নেল তাহেরকে নিয়ে লেখা। ‘তাহেরের স্বপ্ন’ শিরোনামের সে কবিতাটির সূচনা অংশ এমন—

যিনি আবু তাহের কর্নেল

যিনি ফাঁসিমঞ্চে হাসলেন

তিনি এখন লজ্জায়

কালো হন, প্রতিদিন আমার স্বপ্নের মধ্যে।

গতকাল ভোররাতে আমাকে সে

নিয়ে গেল দেশের একটি সেনাবাসে

ইশারায় খুব আস্তে আস্তে তাঁর ক্র্যাচে

হেঁটে হেঁটে সারি সারি জোয়ানের

কবরের পাশে দাঁড়ালেন।

অনেকের গলায় ফাঁসির চিহ্ন

কারো বুক গুলিবিদ্ধ, কারো দেহ থেঁতলানো,

তারা প্রত্যেকেই হঠাৎ জেগে উঠল

অভিবাদন জানাল পেশাগত কায়দায়;

তাহের তাদের প্রত্যেকের সাথে করমর্দন ক’রে,

আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন, আমি বিপুল উৎসাহে

আনন্দে তাদের প্রতি হাত এগিয়ে দিলাম

কিন্তু তারা প্রত্যেকে আমাকে প্রত্যাখ্যান ক’রল;

ঘৃণায় তাদের চোখ মুখ ভুরু নাক কুঞ্চিত হল।

অপমানে আমি চিৎকার ক’রতে গেলে

তাহের আমার মুখ চেপে ধরলেন;

সরে আসলেন আমাকে নিয়ে।....

বাংলা একাডেমি পুরস্কার নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। গত বছরও এ পুরস্কার নিয়ে অনেক জল ঘোলা হয়েছে। সেবার শুরুতে ১০ জনের নামের তালিকা পুরস্কারপ্রাপ্ত হিসেবে ঘোষণা করা হলেও বহু নাটকীয়তার পর শেষ পর্যন্ত তিনজনকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়।

গত বছর কবিতায় মাসুদ খান; নাটক ও নাট্যসাহিত্যে শুভাশিস সিনহা; প্রবন্ধ/গদ্যে সলিমুল্লাহ খান; অনুবাদে জি এইচ হাবীব; গবেষণায় মুহম্মদ শাহজাহান মিয়া; বিজ্ঞানে রেজাউর রহমান এবং ফোকলোরে সৈয়দ জামিল আহমেদ এ পুরস্কার পান।

এ তালিকায় মুক্তিযুদ্ধে মোহাম্মদ হাননান, শিশুসাহিত্যে ফারুক নওয়াজ ও কথাসাহিত্যে সেলিম মোরশেদ পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন। পুরস্কারের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের এক সপ্তাহ পর নতুন করে তালিকা প্রকাশ করা হয়, যেখানে বাদ দেওয়া হয় এই তিনজনকে।

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

পুরস্কার নিলেও অর্থ নেবেন না, নীতিমালার সংস্কার চাইলেন মোহন রায়হান

সংবাদ সম্মেলনে মোহন রায়হান বলেছেন, তিনি পুরস্কারটি গ্রহণ করলেও এর অর্থ গ্রহণ করবেন না। পুরস্কারের অর্থ তিনি সামর্থ্যহীন কবি, লেখক বা সাংস্কৃতিক কর্মীদের কল্যাণে প্রদান করার আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারের নীতিমালারও আমূল সংস্কার দাবি করেছেন।

৩ ঘণ্টা আগে

ঢাকায় ভূমিকম্প মোকাবিলায় ১ লাখ স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুতের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

ত্রাণমন্ত্রী বলেন, ঢাকা অত্যন্ত জনবহুল ও অপরিকল্পিত নগরী। বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে এখানে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করা বড় চ্যালেঞ্জ। তাই প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন, যেন দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঢাকায় ১ লাখ দক্ষ ও প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত রাখা হয়। যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে তারা যেন তাৎক্ষণিক সাড়া দিতে পার

৪ ঘণ্টা আগে

শাহজালাল বিমানবন্দরে মধ্যপ্রাচ্যের ৫৪ ফ্লাইট বাতিল

বিমানবন্দর সূত্র জানায়, ফ্লাইট বাতিলের ফলে অন্তত ১০ হাজার যাত্রী ভোগান্তিতে পড়েছেন, যাদের বড় অংশই প্রবাসী। যাত্রীদের অনেকের থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করেছে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, আবার অনেকে বাড়ি ফিরে গেছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এয়ারলাইন্সগুলো যাত্রীদের মুঠোফোনে অবহিত করবে।

৪ ঘণ্টা আগে

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনার বৈঠক: সীমান্ত ও নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা

৪ ঘণ্টা আগে