মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজ

প্রতিমন্ত্রীর অভিপ্রায়ে নারী সভাপতি চেয়ে চাকরি হারাতে যাচ্ছেন অধ্যক্ষ

নাজমুল ইসলাম হৃদয়
আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২৬, ১৪: ০৬
মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজের একটি শ্রেণিকক্ষ। ফাইল ছবি

রাজধানীর মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি হিসেবে একজন নারীকে মনোনয়নের জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে আনুষ্ঠানিক সুপারিশ করেছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সেই সুপারিশ গ্রহণ না করে আগের সভাপতিকেই বহাল রাখে।

এর কিছুদিনের মধ্যেই কলেজটিতে প্রশাসনিক অস্থিরতা শুরু হয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিমন্ত্রীর সুপারিশপত্র পাঠানো কলেজের অধ্যক্ষ মো. আমিনুল হকের বিরুদ্ধে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) তদন্ত প্রতিবেদনকে ভিত্তি করে ধারাবাহিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

এরই মধ‍্যে পদাধিকারবলে সদস‍্যসচিব অধ‍্যক্ষকে না জানিয়ে কলেজের বাইরে গভর্নিং বডির সভা ডেকে তাকে একমাসের বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। এখন অধ‍্যক্ষকে স্থায়ীভাবে অপসারণের প্রস্তুতি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া ডিআইএর তদন্ত প্রতিবেদন এবং এক ছাত্রীকে যৌন হয়রানির দায়ে অভিযুক্ত শিক্ষককে সুরক্ষার অভিযোগ ঘিরে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছেন কলেজের অধ্যক্ষ মো. আমিনুল হক এবং গভর্নিং বডির সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. আক্তারুজ্জামান।

এ ঘটনাপ্রবাহ ঘিরে কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীদের একাংশের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে— ডিআইএর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নেওয়া পদক্ষেপগুলো নিয়ম অনুযায়ী হয়েছে, নাকি প্রশাসনিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বের অংশ হিসেবে তদন্ত প্রতিবেদন ব্যবহার করা হচ্ছে?

এই প্রতিবেদকের হাতে থাকা নথি অনুযায়ী, গত ২১ এপ্রিল প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি হিসেবে নারী উদ‍্যোক্তা ও শিক্ষানুরাগী সায়রা নূর আবদালের নাম প্রস্তাব করেন। সায়রা বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর পুত্রবধূ এবং একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিক।

চিঠিতে প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন, নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুষ্ঠু ও কার্যকর পরিচালনার স্বার্থে একজন শিক্ষানুরাগী নারীকে সভাপতি হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া প্রয়োজন।

নিয়ম অনুযায়ী অধ্যক্ষ মো. আমিনুল হক সেই সুপারিশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েছিলেন। তবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিমন্ত্রীর সুপারিশ অনুসরণ করেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের জারি করা আদেশে মো. আখতারুজ্জামানকেই গভর্নিং বডির সভাপতি হিসেবে বহাল রাখা হয়। পাশাপাশি অধ্যাপক ড. আনোয়ারা হোসেনকে বিদ্যোৎসাহী সদস্য হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়।

কোন বিবেচনায় প্রতিমন্ত্রীর সুপারিশ গ্রহণ করা হয়নি, সে বিষয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তপত্রে কোনো ব্যাখ্যা নেই। জানতে চাইলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

একদিকে ডিআইএর তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসা আর্থিক অনিয়ম, অবৈধ নিয়োগ ও স্বেচ্ছাচারিতাকে চলমান পরিস্থিতির কারণ হিসেবে তুলে ধরছেন পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি। অন্যদিকে অধ্যক্ষের দাবি, গভর্নিং বডি থেকে বর্তমান সভাপতিকে সরানোর জন্য সংসদ সদস্যের দেওয়া ডিও লেটার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে জমা দেওয়া এবং যৌন হয়রানির দায়ে বরখাস্ত শিক্ষককে সভাপতি কর্তৃক পুনর্বাসন করার প্রতিবাদ করায় সম্পূর্ণ বিধিবহির্ভূতভাবে তাকে পদচ্যুত করার চক্রান্ত চলছে।

গভর্নিং বডির সভা, বিধি লঙ্ঘন ও পালটাপালটি যুক্তি

নথিপত্র অনুযায়ী, গত ২৫ জুলাই কলেজের গভর্নিং বডি এক জরুরি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে অধ্যক্ষ মো. আমিনুল হককে এক মাসের বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়। পাশাপাশি তাকে ১১টি বিষয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে ১০ কর্মদিবসের মধ্যে জবাব দিতে নির্দেশ দেয় গভর্নিং বডি।

একই দিনে উপাধ্যক্ষ ফারহানা ইয়াসমিনকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত এই কলেজের গভর্নিং বডির সভাটি কলেজ ক্যাম্পাসে না হয়ে অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সমিতি ভবনে।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা সংক্রান্ত সংবিধির ১৮ নম্বর ধারা অনুযায়ী, গভর্নিং বডির সভাপতির সঙ্গে আলোচনা করে সদস্য-সচিব (অধ্যক্ষ) সভার তারিখ নির্ধারণ ও আহ্বান করবেন। সদস্যসচিব একাধিকবার লিখিত অনুরোধ সত্ত্বেও সভা আহ্বানে ব্যর্থ হলে তবেই সভাপতি নিজে সভা ডাকার আইনি এখতিয়ার রাখেন। এ ছাড়া সংবিধির ১৯ ও ২১ ধারা অনুযায়ী সাধারণ সভার জন্য সাত দিন এবং জরুরি সভার জন্য অন্তত ২৪ ঘণ্টার লিখিত নোটিশ দেওয়ার বাধ্যতামূলক নিয়ম রয়েছে।

সম্প্রতি মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজ পরিদর্শনে গিয়েছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। ছবি: রাজনীতি ডচকম
সম্প্রতি মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজ পরিদর্শনে গিয়েছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। ছবি: রাজনীতি ডচকম

সভা ডাকার প্রক্রিয়ার চরম বিরোধিতা করে অধ্যক্ষ মো. আমিনুল হক রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘বিধিমালা স্পষ্ট লঙ্ঘন করে সদস্যসচিব হিসেবে আমাকে না জানিয়েই ২৪ জুলাই রাত ১০টায় হোয়াটসঅ্যাপে সভার চিঠি পাঠানো হয়। ২৫ তারিখ বিকেল ৩টায় আইনজীবী ভবনে সভা করে আমাকে এক মাসের বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়। আমাকে না জানিয়ে সভার এজেন্ডা দেওয়া হয়েছে ডিআইএর তদন্ত প্রতিবেদনের পর্যালোচনা। সভার স্থান ও আহ্বানের ক্ষেত্রে গভর্নিং বডির ১৭ ও ১৮ নম্বর আইনি বিধির একটিও মানা হয়নি।’

অধ্যক্ষের এ অভিযোগ পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. আক্তারুজ্জামান রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘উনাকে আমি একাধিকবার গভর্নিং বডির মিটিং ডাকতে বলেছি, উনি মিটিং ডাকেন না। নোটিশের মাধ্যমে তাকে বারবার বলা হয়েছে— একবার ২১ তারিখে, আবার ২৩ তারিখেও নোটিশ দিয়ে মিটিং ডাকতে বলেছি। উনি কথা না শোনায় সভাপতি হিসেবে ইমার্জেন্সি মিটিং ডেকে উনাকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠাতে বাধ্য হয়েছি।’

সভাপতির এই দাবি অস্বীকার করেন অধ্যক্ষ আমিনুল হক। বলেন, ‘আমাকে কোনো আনুষ্ঠানিক লিখিত তাগিদ দেওয়া হয়নি। মূলত ডিআইএর পরিপত্রের যে সময়সীমা আমাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য দেওয়া হয়েছিল, সেই সময় শেষ হওয়ার আগেই কোনো সুযোগ না দিয়ে মব তৈরি করে গায়ের জোরে আমাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।’

ডিআইএর অডিট রিপোর্ট ও ব্রডশিট জবাবের আইনি সুযোগ

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) ২৬ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন গত ২০ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এতে অধ্যক্ষের পূর্ব অভিজ্ঞতার সনদপত্রের অসঙ্গতি এবং বিভিন্ন পাবলিক ও অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার সম্মানি থেকে উৎসে কর (১২ লাখ ৭৮ হাজার টাকা) সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ার তথ্য তুলে ধরা হয়।

তবে ডিআইএর গত ২৯ মার্চ তারিখের পরিপত্র অনুযায়ী, তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধানকে ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে সরাসরি ও ই-মেইলে ব্রডশিট জবাব (প্রমাণসহ ব্যাখ্যা) দাখিলের আইনি সুযোগ দিতে হয়।

ব্রডশিট জবাবের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া প্রসঙ্গে সভাপতি আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘ডিআইএর প্রতিবেদনে একের পর এক অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর গভর্নিং বডি ইনস্ট্যান্ট কোনো ব্যবস্থা না নিলে আমাকে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করত যে প্রিন্সিপালের সাথে আমার কী দহররম-মহররম সম্পর্ক আছে?’

‘নানক সাহেবের আমলে ১৭ লাখ টাকার গাড়ি ৩৮ লাখ টাকা দিয়ে কেনা হয়েছে। তেলের কোনো লগ বই মেইনটেইন করা হতো না। কলেজের প্রথা ভেঙে গাড়ি ক্যাম্পাসের গ্যারেজে না রেখে উনি নিজের বাসায় রাখতেন। নানকের প্রভাব খাটিয়ে পাঁচ সদস্যের নিয়োগ কমিটির তালিকার বাইরে গিয়ে বেআইনিভাবে উনি নিয়োগ পেয়েছিলেন,’— বলেন কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি আক্তারুজ্জামান।

সভাপতি আরও যোগ করেন, ‘আনোয়ার ও কেরামত নামের দুজন বৈধ এমপিওভুক্ত কর্মচারীকে নানক সাহেবের সময়ে জোরপূর্বক বের করে দিয়ে উনি নতুন চারজন কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছেন। এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখার জন্যই পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করে তাকে ছুটিতে পাঠানো হয়েছে।’

এসব অভিযোগ সাফ অস্বীকার করেছেন অধ্যক্ষ আমিনুল হক। তিনি বলেন, ‘আমার প্রথম চাকরি ১৯৯৫ সালে। শাহ আলী মহিলা কলেজে ১৫ বছর আগে উপাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। তাহলে আমার নিয়োগ কীভাবে রাজনৈতিক হয়? ফুলপুর কলেজ থেকে কেন্দ্রীয় কলেজে স্থানান্তরের সময় অভিজ্ঞতার যে সামান্য টেকনিক্যাল বিষয়টি ডিআইএ লিখেছে, ব্রডশিট জবাব দিলেই আমি পুরোপুরি দায়মুক্ত হব।’

অধ্যক্ষের দাবি, প্রথম দফায় ২২টি অভিযোগের ১৭টিই প্রমাণিত বলা হলেও পরে পুনর্তদন্তের আবেদনের পর দ্বিতীয় তদন্তে মাত্র দুই-তিনটি বিষয় আংশিক প্রমাণিত হয়। গভর্নিং বডির সভাপতি অডিট রিপোর্টের বাহানা দিয়ে তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের আইনি সুযোগটুকুও দেননি।

অধ্যক্ষ আমিনুল হক আরও বলেন, ‘গাড়ি কেনা বা সম্মানি বণ্টনের সিদ্ধান্ত অধ্যক্ষ একা নেন না, গভর্নিং বডি ও ক্রয় কমিটির অনুমোদনেই তা হয়েছে। আক্তারুজ্জামান সাহেব দেড় বছর ধরে আমার সাথে ভালো সম্পর্ক নিয়ে কাজ করলেন, তখন দুর্নীতি চোখে পড়ল না, যেই মুহূর্তে ডিও লেটার জমা দেওয়া হলো, তখনই উনি আমার দুর্নীতি আবিষ্কার করলেন!’

যৌন হয়রানির দায়ে অভিযুক্ত শিক্ষক ও সুরক্ষার পালটাপালটি দাবি

মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজের এই প্রশাসনিক উত্তেজনার গভীরে রয়েছে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে ওঠা নৈতিক স্খলন ও যৌন হয়রানির অভিযোগ। ডিআইএর তদন্ত প্রতিবেদনে বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে, ওই বিভাগের শিক্ষক মো. হুমায়ুন কবীর একাদশ শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে প্রলোভন দেখিয়ে অনৈতিক সম্পর্কে জড়ান। পরে বাধ্য হয়ে কাজি অফিসে গিয়ে কোর্ট ম্যারেজ ও খোলা তালাকের ‘নাটক’ সাজান। শৃঙ্খলা কমিটির সুপারিশে তৎকালীন গভর্নিং বডি তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছিল।

ওই শিক্ষককে কেন্দ্র করে সভাপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে অধ্যক্ষ আমিনুল হক বলেন, ‘শিক্ষার্থীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করায় হুমায়ুন কবীরকে আমরা আইনি প্রক্রিয়ায় বরখাস্ত করেছিলাম। ৫ আগস্টের পর আক্তারুজ্জামান সাহেবের সঙ্গে ওই শিক্ষক সখ্য গড়ে তোলেন। আখতারুজ্জামান ওই শিক্ষককে বেআইনিভাবে কলেজে ফিরিয়ে আনেন। আমি ছাত্রীদের সুরক্ষার জন্য প্রতিবাদ করেছিলাম এবং তাকে শাস্তি দিয়েছিলাম বলেই সভাপতি ও ওই শিক্ষক এক হয়ে আমার বিরুদ্ধে এই চক্রান্তে নেমেছেন।’

মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজে অভিভাবক সমাবেশ। ছবি: সংগৃহীত
মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজে অভিভাবক সমাবেশ। ছবি: সংগৃহীত

অধ্যক্ষের এই অভিযোগের জবাব দিয়ে সভাপতি অ্যাডভোকেট আক্তারুজ্জামান বলেন, “আমি যখন কলেজে আসি, প্রিন্সিপাল সাহেবই হুমায়ুন কবীরসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে তথ্য দেন। আমি পাঁচ সদস্যের কমিটি করে দিয়েছিলাম। যৌন হয়রানির আসল ঘটনায় প্রতীয়মান দোষী ছিলেন ‘উজ্জ্বল’ নামের এক শিক্ষক, যাকে ৫ আগস্টের আগেই আমরা কলেজ থেকে অব্যাহতি দিয়েছি। হুমায়ুন কবীরের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে আমরা মার্সি (ক্ষমা) করে পুনর্বহাল রেখেছিলাম।”

তবে ডিআইএর নথিতে হুমায়ুন কবীরের সই জালিয়াতি এবং বিবাহ-তালাকের নথিপত্র ও জবানবন্দির স্পষ্ট উল্লেখ থাকায় সভাপতির ‘মার্সি’ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে শিক্ষক সমাজের একাংশের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে।

সভাপতি পরিবর্তনের ডিও লেটার নিয়েই বিরোধ?

ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পরিচালনা পর্ষদের শীর্ষ পদ টিকিয়ে রাখা বা দখলের দ্বন্দ্ব থেকেই মূলত এই প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার সূত্রপাত।

ঢাকা-১৩ আসনের স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ গত ২৯ এপ্রিল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে পাঠানো এক ডিও পত্রে অ্যাপেক্স জুট মিলসের চেয়ারম্যান সাহার নূর আবদালকে সভাপতি হিসেবে মনোনয়নের আদেশ দেন। ৩০ এপ্রিল অধ্যক্ষ আমিনুল হক সেই ডিও পত্রটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠান। তবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ববি হাজ্জাজের সুপারিশ উপেক্ষা করে ১৯ মে মো. আক্তারুজ্জামানকেই সভাপতি পদে বহাল রাখে।

অধ্যক্ষ আমিনুল হক এ ঘটনাকে মূল ‘দ্বন্দ্বের বীজ’ আখ্যা দিয়ে রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘ববি হাজ্জাজ স্যার যখন জানলেন মহিলা কলেজে ছাত্রীরা বারবার নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, তখন উনি একজন নারী শিক্ষাবিদকে সভাপতি করার জন্য ডিও লেটার দেন। সদস্যসচিব হিসেবে ওই ডিও লেটার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে জমা দেওয়া আমার আইনি দায়িত্ব ছিল। আমি জমা দেওয়ার পরেই আক্তারুজ্জামান স্যার ধরে নিয়েছেন, আমি তাকে সরানোর চক্রান্ত করছি।’

এর আগে দেড় বছর তার সঙ্গে আখতারুজ্জামানের অত্যন্ত চমৎকার সম্পর্ক ছিল বলে জানান অধ্যক্ষ আমিনুল। বলেন, ‘ডিও লেটার জমা দেওয়ার পর থেকেই উনি বরখাস্ত হওয়া শিক্ষককে সঙ্গে নিয়ে আমাকে সরানোর ফন্দি আঁটছেন।’

ডিআইএর কাছে নিজের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে অধ্যক্ষ গত ২৯ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া আবেদনে বলেন, ব্রডশিট জবাবের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত গভর্নিং বডির সভার এই অবৈধ সিদ্ধান্ত বাতিল করে তাকে পদে বহাল রাখা হোক।

অন্যদিকে এমপির ডিও লেটার বা সভাপতি পদ আঁকড়ে রাখার অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে সভাপতি অ্যাডভোকেট আক্তারুজ্জামান বলেন, “ববি হাজ্জাজ সাহেব যখন আমাকে বললেন ‘একটু মহিলা সভাপতি দিলে ভালো হয়’, আমি সঙ্গে সঙ্গে বলেছিলাম, ‘অ্যাজ ইউ লাইক বেস্ট’। আমার এখানে কোনো কায়েমি স্বার্থ নেই।”

সভাপতি আক্তারুজ্জামান বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত। কিছুদিন আগে তিনি ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলও ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি সুপ্রিম কোর্টে আইন পেশা নিয়ে ব্যস্ত থাকি। এমনকি প্রিন্সিপাল সাহেব নিজেও আমাকে চেঞ্জ করার ব্যাপারে তেমন আগ্রহী ছিলেন না। উনি এখন দুর্নীতি থেকে বাঁচতে ডিও লেটারের দোহাই দিয়ে মূল ঘটনা ভিন্ন খাতে মোড় দেওয়ার চেষ্টা করছেন।’

শিক্ষাঙ্গনে অনিশ্চয়তা

বর্তমানে মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজে এইচএসসি পরীক্ষা চলছে, যেখানে অধ্যক্ষ মো. আমিনুল হক মূল কেন্দ্র সচিবের দায়িত্বে ছিলেন। পরীক্ষা চলাকালীন বিধি লঙ্ঘন করে ক্যাম্পাসের বাইরে সভা ডেকে অধ্যক্ষকে অপসারণ করায় পরীক্ষা পরিচালনা এবং প্রশাসনিক স্থবিরতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেন শিক্ষকরা।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবিধি লঙ্ঘন, ডিআইএর ব্রডশিট জবাবের আইনি সুযোগ না দেওয়া এবং কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব দাখিলের আগেই বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানোর এই ঘটনাটি এখন শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে।

সার্বিক বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আইন ও বিধি অনুযায়ী চলবে। ডিআইএর তদন্ত প্রতিবেদন আমরা পেয়েছি এবং আমাদের একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি সেই প্রতিবেদনটি রিভিউ করছে। রিভিউ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এবং আমাদের পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করা যাচ্ছে না।’

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

বিরোধী দলের ভাষা শেখ হাসিনার মতো: মির্জা ফখরুল

সোমবার (৩ আগস্ট) জাতীয় প্রেসক্লাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

৫ ঘণ্টা আগে

হামের চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে ৮৯% পরিবারকে ঋণ নিতে হয়েছে: জরিপ

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (বিডিআরসিএস) এবং ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজ (আইএফআরসি) যৌথভাবে এই জরিপটি পরিচালনা করেছে। আজ সোমবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জরিপের ফল প্রকাশ করা হয়।

৬ ঘণ্টা আগে

স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে এখনো সরকারের সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই: ইসি সচিব

সোমবার (৩ আগস্ট) দুপুরে নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব তথ্য জানান ইসি সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ।

৬ ঘণ্টা আগে

প্রতিবাদের মুখে বিলবোর্ড থেকে যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিতদের ছবি সরাল রাবি প্রশাসন

বিলবোর্ডটিতে যুদ্ধাপরাধের মামলায় দণ্ডিত জামায়াতে ইসলামীর নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মীর কাসেম আলী, মতিউর রহমান নিজামী, আব্দুল কাদের মোল্লা ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ছবি ছিল। এ ছাড়া বিএনপির নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছবিও সেখানে রাখা হয়েছিল।

৭ ঘণ্টা আগে