আর্জেন্টিনার জার্সিকে বিদায় বলে দিলেন মেসি

ক্রীড়া ডেস্ক
আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০: ৫৫
আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় বলে দিয়েছেন লিওনেল মেসি। ছবি: সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় বলে দিয়েছেন লিওনেল মেসি। ছবি: সংগৃহীত

ধরেই নেওয়া হয়েছিল, সদ্য সমাপ্ত বিশ্বকাপেই যবনিকা পতন হবে তার আন্তর্জাতিক ফুটবল ক্যারিয়ারের। গোটা টুর্নামেন্ট দলকে কাঁধে করে টেনে ফাইনাল পর্যন্ত টেনে নিয়ে এক রঙিন বিদায়ের স্বপ্নই দেখাচ্ছিলেন কোটি ভক্ত-সমর্থকদের। ফাইনালের হারে সে রঙ কিছুটা ম্লান হয়েছে। সিদ্ধান্তের ঘোষণাও হয়তো পিছিয়ে দিয়েছে।

এবারের বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচেই হ্যাটট্রিক করেছিলেন। এর মাধ্যমে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি বয়সে হ্যাটট্রিকের রেকর্ড নিজের করে নেন মেসি। ছবি: সংগৃহীত
এবারের বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচেই হ্যাটট্রিক করেছিলেন। এর মাধ্যমে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি বয়সে হ্যাটট্রিকের রেকর্ড নিজের করে নেন মেসি। ছবি: সংগৃহীত

শেষ পর্যন্ত সেই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এলো আজ সোমবার (৩১ আগস্ট)। আর্জেন্টিনার জার্সিকে বিদায় বলে দিলেন লিওনেল মেসি— যিনি এই প্রজন্ম তো বটেই, সর্বকালের সেরা ফুটবলারদেরই একজন। ৩৯ বছর বয়সে শেষ হলো জাতীয় দলের হয়ে লিও মেসির ফুটবল ক্যারিয়ার।

মেসি তার অফিশিয়াল ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকেই জানিয়েছেন এ বিদায়ের বার্তা। তিন টুকরো চিরকুটে হাতে লেখা ছিল তার বিদায়ের বার্তা। তাতে জানিয়েছেন, বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে হারের পরই তিনি সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর কিছুদিন অপেক্ষা করে আজ আনুষ্ঠানিকভাবে জানালেন আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় বলার কথা।

বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে অতিরিক্ত সময়ে ১-০ গোলে হারের পর থেকেই মেসির আন্তর্জাতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা চলছিল। শেষ পর্যন্ত সেই ম্যাচই হয়ে থাকল আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার শেষ উপস্থিতি। ২০ বছরের দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টেনে এখন থেকে জাতীয় দলের খেলা দেখবেন একজন সমর্থক হিসেবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া আবেগঘন বার্তায় মেসি লিখেছেন, ‘ফাইনালের পর থেকে অনেক সময় পেরিয়ে গেছে। অনেক ভেবেচিন্তে সবাইকে জানাতে চাই, আমি জাতীয় দল থেকে অবসর নিচ্ছি। সিদ্ধান্তটি আমাকে কষ্ট দিয়েছে, এখনো দেয়। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি, এটাই সঠিক সময়।’

আর্জেন্টিনার জার্সির প্রতি নিজের দায়বদ্ধতার কথাও তুলে ধরেছেন তিনি। মেসির ভাষায়, ‘আমি সবসময় এই জার্সির জন্য লড়েছি, সবকিছু দিয়েছি। শুধু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নয়, তারও আগে। তোমাদের আনন্দ দিতে এবং ফুটবলের মাধ্যমে আর্জেন্টাইন হওয়ার গর্ব অনুভব করাতে আমি সবসময় সবকিছু করেছি।’

বিদায়ী বার্তায় সতীর্থ, কোচ, স্টাফ, পরিবার ও সমর্থকদের ধন্যবাদ জানিয়ে মেসি বলেন, জাতীয় দলের সঙ্গে তার পথচলার স্মৃতিগুলো তিনি আজীবন বয়ে বেড়াবেন। একই সঙ্গে তরুণদের জন্য জায়গা করে দেওয়ার সময় এসেছে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।

‘আমি এই দলের অংশ হতে ভালোবেসেছি, ভালোবাসি এবং সবসময় ভালোবাসব। আমি আমার সবটুকু দিয়েছি। এখন আর দেওয়ার মতো কিছু নেই। সামনে দারুণ কিছু তরুণ খেলোয়াড় আসছে, যারা এই দলে থাকার যোগ্য,’— লিখেছেন মেসি।

২ দশকের যাত্রার ইতি

ফুটবল দেবতার আশীর্বাদে ধন্য যারা, তাদের শীর্ষস্থানে রয়েছে মেসির নাম। ২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার সিনিয়র দলে অভিষেক। এরপর কেটে গেছে দুই দশকেরও বেশি সময়। এই সময়ে তিনি শুধু আর্জেন্টিনার নয়, হয়ে উঠেছেন আন্তর্জাতিক ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়।

২০২২ সালে কাতারে বিশ্বকাপ হাতে সতীর্থদের সঙ্গে লিওনেল মেসি। ছবি: সংগৃহীত
২০২২ সালে কাতারে বিশ্বকাপ হাতে সতীর্থদের সঙ্গে লিওনেল মেসি। ছবি: সংগৃহীত

যে সময়টিতে মেসির আবির্ভাব, তার আগের ৫/৭ বছর ধরেই আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে ছিল ‘নতুন ম্যারাডোনা’র ছড়াছড়ি। তরুণ ও সম্ভাবনাময় প্রায় সব তারকাকেই তখন ‘ম্যারাডোনা হয়ে ওঠা’র চাপের মুখে পড়তে হয়েছে। কিন্তু ম্যারাডোনা হয়ে ওঠা তো সবার পক্ষে সম্ভব না, সেটি হয়ওনি।

এমন বহু ‘নতুন ম্যারাডোনা’র পর এলেন মেসি। তবে পূর্বসূরিদের মতো তিনি ম্যারাডোনা হয়ে ওঠার চাপে নত হয়ে যাননি, বরং তার অসাধারণ বাঁ পায়ের কারিকুরি, ম্যাজিক্যাল ড্রিবলিং, অবিশ্বাস্য সব পাস এবং অসামান্য ফুটবল মস্তিষ্কের প্রয়োগে ক্রমেই হয়ে উঠেছেন ফুটবলের এক অনস্বীকার্য আইকন। একটা পর্যায়ে আর ম্যারাডোনার নাম ধরে রাখতে হয়নি তার নামের সঙ্গে, বরং লিওনেল মেসি নিজেই পরিণত হয়েছে এক নতুন ফুটবল অভিধায়।

২০০৫ সাল থেকে গত বিশ্বকাপ পর্যন্ত জাতীয় দলের হয়ে মেসি খেলেছেন ২০৭ ম্যাচ, করেছেন ১২৫ গোল। দুটিই আর্জেন্টিনার ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ২০২৬ বিশ্বকাপ পর্যন্ত তিনি খেলেছেন ছয়টি বিশ্বকাপ— ২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ ও ২০২৬। ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া বিরল খেলোয়াড়দের একজন তিনি। বিশ্বকাপে তার গোল ২১টি, আর অ্যাসিস্ট ১২টি। বিশ্বকাপের ইতিহাসের গোলসংখ্যায় তার সামনে কেবল ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপে।

তবে মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় গল্পটি শুধু পরিসংখ্যানে নয়, বরং অপেক্ষা ও প্রত্যাবর্তনের গল্পে।

দীর্ঘদিন জাতীয় দলের হয়ে বড় কোনো শিরোপা জিততে না পারায় মেসিকে ঘিরে ছিল প্রবল সমালোচনা। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হারের পর ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালেও চিলির কাছে হারে আর্জেন্টিনা। দলকে শিরোপা না দিতে পারার হতাশা ঘিরে তাকে। সেই সঙ্গে চতুর্পাশ থেকে তীব্র সমালোচনার তীর বিদ্ধ করতে থাকে।

এমন অবস্থায় একপর্যায়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকেই অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন মেসি। তবে সে ঘোষণায় অটল থাকতে পারেননি তিনি। ফিরে আসেন ফের জাতীয় দলের জার্সি গায়ে। ফিরে আসার পরও অবশ্য সাফল্য মিলতে সময় লেগেছে বহু দিন।

২০১৮ সালের বিশ্বকাপ ছিল আর্জেন্টিনা ও মেসির জন্য চূড়ান্ত হতাশার। দ্বিতীয় রাউন্ড থেকেই ছিটতে পড়তে হয়। তখন মনে হচ্ছিল, মেসির বুঝি আন্তর্জাতিক শিরোপা অধরাই থেকে যাবে। কারণ তখনই মেসির বয়স ৩৫। ফলে ২০২৬ বিশ্বকাপ মেসি খেলবেন, তা ধারণাতে ছিল না অনেকেরই।

কিন্তু তিনি যে মেসি। সব ধারণাকে ভুল প্রমাণ করতেই একের পর এক শিরোপার কাছ থেকে ফিরে এসে মচকেছেন, কিন্তু ভাঙেননি। তার ফলও মিলতে শুরু করল কিছুদিন পরই।

২০২১ সালে ব্রাজিলকে হারিয়ে কোপা আমেরিকা জয়ের মাধ্যমে শুরু হয় মেসির আন্তর্জাতিক সাফল্যের স্বর্ণযুগ। পরের বছর ইতালিকে হারিয়ে ফিনালিসিমা জয়। এরপর ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে হারিয়ে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেন মেসি। সেই বিশ্বকাপেই তিনি জেতেন গোল্ডেন বল। এর আগে ২০১৪ বিশ্বকাপে শিরোপার দেখা না মিললেও গোল্ডেন বল পেয়েছিলেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে একাধিক গোল্ডেন বল পাওয়া একমাত্র ফুটবলার তিনিই।

বিশ্বকাপের পরও জয়যাত্রা থামেনি আর্জেন্টিনা ও মেসির। ২০২৪ সালে আবারও কোপা আমেরিকার শিরোপা জেতে আর্জেন্টিনা। ফলে যে মেসিকে একসময় জাতীয় দলের হয়ে শিরোপা জিততে না পারার জন্য সমালোচিত হতে হয়েছিল, তিনিই শেষ পর্যন্ত দেশের হয়ে বিশ্বকাপ, দুটি কোপা আমেরিকা ও ফিনালিসিমাসহ একাধিক বড় শিরোপা জিতে বিদায় নিলেন। সঙ্গে থাকল দলকে বিশ্বকাপেরই আরও দুটি ফাইনালে তোলার কৃতিত্ব।

২০২৬ বিশ্বকাপেও ইতিহাসের আরেকটি অধ্যায় লিখেছেন তিনি। স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালে হেরে শিরোপা হাতছাড়া হলেও টুর্নামেন্টটি ছিল তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ বড় মঞ্চ। ফাইনালে হারের পরও মেসি সতীর্থদের প্রশংসা করে বলেছিলেন, ফল যা-ই হোক, এই দল এমন এক ইতিহাস লিখেছে, যা কখনো মুছে যাবে না।

২০০৬ বিশ্বকাপে মেসি। সেবার খুব অল্প সময় মাঠে থাকলেও বিশ্বকে জানান দিয়েছিলেন, ফুটবল জগতকে শাসন করতে আসছেন একজন। ছবি: সংগৃহীত
২০০৬ বিশ্বকাপে মেসি। সেবার খুব অল্প সময় মাঠে থাকলেও বিশ্বকে জানান দিয়েছিলেন, ফুটবল জগতকে শাসন করতে আসছেন একজন। ছবি: সংগৃহীত

বিদায়ের মুহূর্তেও বাবাকে স্মরণ

অবসরের সিদ্ধান্তটি মেসি বিশ্বকাপ ফাইনালের মাত্র দুই দিন পরই নিয়েছিলেন। তবে সেটি প্রকাশ্যে জানাননি। কারণ, তার বাবা ও দীর্ঘদিনের পরামর্শদাতা হোর্হে মেসি আগস্টে ৬৮ বছর বয়সে মারা যান। বাবার মৃত্যুর পর মেসি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও গভীরভাবে ভাবেন এবং সিদ্ধান্তে আরও দৃঢ় হন।

বিদায়ী বার্তায় পরিবারকে ধন্যবাদ জানিয়ে মেসি বলেন, তার সুন্দর অথচ কঠিন এই যাত্রায় পরিবার সবসময় পাশে ছিল।

‘এই ২০ বছরে তোমাদের ভালোবাসার জন্য ধন্যবাদ। মাঠের ভেতর থেকে তোমাদের সমর্থনের যে শব্দ শুনতাম, সেটি আমি মিস করব। এখন থেকে আমি তোমাদেরই একজন— বাইরে থেকে সবসময় আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করব, ভালো সময়ে যেমন, খারাপ সময়ে তার চেয়েও বেশি।’

শেষে তিনি লিখেছেন, ‘আমাকে আর্জেন্টাইন বানানোর জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। ভামোস আর্জেন্টিনা!’

জাতীয় দলের অধ্যায় শেষ, ফুটবল নয়

আর্জেন্টিনার জার্সি তুলে রাখলেও এখনই ফুটবল ছাড়ছেন না মেসি। ক্লাব ফুটবলে তিনি খেলা চালিয়ে যাবেন যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারের দল ইন্টার মায়ামির হয়ে। আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোর আগের দিনও ক্লাবের হয়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেছেন তিনি— মন্ট্রিয়লের বিপক্ষে ৭-১ গোলের জয়ে করেছেন চার গোল ও একটি অ্যাসিস্ট।

বার্সেলোনার হয়ে শুরু হওয়া তার ক্লাব ক্যারিয়ার তাকে এনে দিয়েছে অসংখ্য রেকর্ড ও ট্রফি। আটবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী মেসি বিশ্ব ফুটবলের সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে নিজের জায়গা বহু আগেই নিশ্চিত করেছেন।

আর্জেন্টিনাকে আনন্দে ভাসার এমন বহু উপলক্ষ্য এনে দিয়েছেন মেসি। ছবি: সংগৃহীত
আর্জেন্টিনাকে আনন্দে ভাসার এমন বহু উপলক্ষ্য এনে দিয়েছেন মেসি। ছবি: সংগৃহীত

তবে আর্জেন্টিনার হয়ে তার শেষ অধ্যায়টি হয়তো আরও বেশি আবেগের। যে জার্সি পরে তিনি একসময় অশ্রুসিক্ত হয়ে ফাইনাল হেরেছেন, সেই জার্সিতেই পরে পেয়েছেন বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দ। যে জাতীয় দলকে ঘিরে একসময় তার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল, শেষ পর্যন্ত সেই দলকেই তিনি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করে, দুটি কোপা আমেরিকা জিতিয়ে এবং ১২৫ গোলের রেকর্ড রেখে বিদায় নিলেন।

মেসি চলে গেলেন আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে। কিন্তু আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সির সঙ্গে তার নাম, তার কান্না, তার জাদু আর সেই বিশ্বকাপ হাতে তোলার মুহূর্ত— ফুটবল ইতিহাসে থেকে যাবে চিরকাল।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement
আর্জেন্টিনার জার্সিকে বিদায় বলে দিলেন মেসি