এ শতাব্দীর সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পে কাঁপছে কলম্বিয়া, নিহত বেড়ে ১৩২

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
কলম্বিয়ায় ভূমিকম্পের পর উদ্ধার অভিযান। ছবি: সংগৃহীত

কলম্বিয়ায় শক্তিশালী ৭.৪ মাত্রার ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৩২ জনে দাঁড়িয়েছে। আহত হয়েছেন ৪৮০ জনের বেশি। ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও বহু মানুষ আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

কলম্বিয়ার ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা জানিয়েছে, চলতি একবিংশ শতাব্দীতে এটিই কলম্বিয়ায় সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প।

বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, স্থানীয় সময় সোমবার (১০ আগস্ট) সকাল ৭টা ৩৪ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৬টা ৩৪ মিনিট) ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। কলম্বিয়ার ভূতাত্ত্বিক সংস্থা জানিয়েছে, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় চোকো প্রদেশে, ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১০৩ কিলোমিটার গভীরে। এর কম্পন পশ্চিম কলম্বিয়ার কয়েক শ কিলোমিটার জুড়ে অনুভূত হয়।

ভূমিকম্পের কেন্দ্রের কাছের সান হোসে দেল পালমার গ্রামে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হলেও সেখানে কোনো প্রাণহানি বা আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় মেয়র লিওন ফাবিও মারিন মোনকাদা। তবে গ্রামটির সঙ্গে বাইরের যোগাযোগের সড়কগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের খবর এসেছে কলম্বিয়ার কফি উৎপাদনকারী অঞ্চলের শহর পেরেইরা থেকে। ভূমিকম্পের কেন্দ্র থেকে প্রায় ৫৫ কিলোমিটার দূরের শহরটির মহানগর এলাকায় অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন।

স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পেরেইরায় অন্তত ৬৫টি ভবন ধসে পড়েছে। এর মধ্যে ১৫টি ভবনের ধ্বংসস্তূপে মানুষ আটকে থাকার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন কেটে চলছে উদ্ধার অভিযান। ছবি: সংগৃহীত
ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন কেটে চলছে উদ্ধার অভিযান। ছবি: সংগৃহীত

শহরের প্রধান চত্বর প্লাজা বলিভারে একটি ভবন ধসে পড়ার দৃশ্যও ক্যামেরায় ধরা পড়েছে। বিবিসি যাচাই করা ভিডিওতে দেখা যায়, ভবনটি ধসে পড়ার পর পুরো চত্বর ধুলা ও ধ্বংসাবশেষে ঢেকে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শহরের কিছু এলাকায় মঙ্গলবার ভোর ৫টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করা হয়েছে।

পেরেইরার পাশাপাশি দক্ষিণে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার দূরের কালি শহরেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সেখানে অন্তত ৩২টি ভবন ধসে পড়েছে।

কেঁপেছে মানিজালেস, কুইবদো, মেডেলিনও

ভূমিকম্পে মানিজালেস শহরেও অন্তত দুজন নিহত হয়েছেন। শহরের বিভিন্ন ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে এবং দেয়াল থেকে ইট ও প্লাস্টার খসে পড়েছে।

মানিজালেসের একটি হোটেলে অবস্থান করছিলেন অ্যাঞ্জেলিকা আভিলা। ভূমিকম্পের মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি জানান, দেয়ালে ফাটল দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবাই চিৎকার শুরু করেন। পাশের ভবনগুলো থেকে ধুলা বের হতে এবং দেয়াল থেকে ইট খসে পড়তে দেখেন তিনি।

চোকো ও ভাল্যে দেল কাউকা অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকাতেও প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। মানিজালেস, কুইবদো ও মেডেলিন থেকেও মৃত্যুর খবর এসেছে।

দেশটির রাজধানী বোগোতায়ও শক্তিশালী কম্পন অনুভূত হয়েছে। সেখানে গাছ ও ট্রাফিক লাইট প্রচণ্ডভাবে দুলতে দেখা গেলেও এখন পর্যন্ত বড় ধরনের অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। কিছু ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত বিমানবন্দর, ব্যাহত যোগাযোগ

ভূমিকম্পে পেরেইরা, মানিজালেস, কুইবদো, আর্মেনিয়া, কার্তাগো ও বুয়েনাভেনতুরার আঞ্চলিক বিমানবন্দরগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ।

দুর্গম চোকো অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমও কঠিন হয়ে পড়েছে। উদ্ধারকারীরা ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা জানিয়েছেন, ভূমিকম্পে দেড় হাজারের বেশি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উদ্ধার অভিযান ও ত্রাণ তৎপরতা দ্রুত পরিচালনার জন্য তিনি জাতীয় দুর্যোগ পরিস্থিতি ঘোষণা করেছেন। এর ফলে সরকার জরুরি ভিত্তিতে বাজেট পুনর্বিন্যাসসহ বিশেষ ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারবে।

শুক্রবার দায়িত্ব নেওয়া নতুন প্রেসিডেন্টের জন্য এটিই তার সরকারের প্রথম বড় জাতীয় সংকট।

প্রতিবেশী দেশেও অনুভূত কম্পন

কলম্বিয়ার বাইরে ভেনেজুয়েলা, ইকুয়েডর ও পানামাতেও ভূমিকম্পের কম্পন অনুভূত হয়েছে। তবে এসব দেশে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের হিসাবে, প্রায় ১৫ লাখ মানুষ এমন এলাকায় ছিলেন যেখানে ভূমিকম্পের কম্পনের মাত্রা ৭-এর কাছাকাছি ছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গভীর ভূমিকম্প সাধারণত ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি সংঘটিত ভূমিকম্পের তুলনায় কম ক্ষতিকর হতে পারে। তবে গভীর ভূমিকম্পও বিপুল শক্তি নির্গত করতে পারে, যা দুর্বল ভবন ও অবকাঠামোর জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রস্তাব

ভূমিকম্পের পর কলম্বিয়ার পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং কলম্বিয়ার জনগণকে সহায়তা দিতে প্রস্তুত।

ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেইয়েন জানিয়েছেন, উদ্ধার তৎপরতায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপার্নিকাস স্যাটেলাইট ব্যবস্থাও ব্যবহার করা হচ্ছে।

এ ছাড়া এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নায়িব বুকেলে কলম্বিয়ার জনগণের প্রতি সংহতি জানিয়ে উদ্ধারকাজে জনবল ও সরঞ্জাম পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছেন।

এদিকে ধসে পড়া ভবনের নিচে আরও মানুষ আটকে থাকার আশঙ্কায় উদ্ধার অভিযান জোরদার করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধারকারী দল পৌঁছানোর পর প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির আরও স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যাবে বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা। ফলে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Ad
Ad
ad
ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

১৫ দিন ধরে মালয়েশিয়ার মর্গে বাংলাদেশির মরদেহ, স্বজনের খোঁজ নেই

কুয়ালালামপুরে তিনি যে বাংলাদেশি মালিকের প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন, তারাও হন্যে হয়ে চেষ্টা করছেন কুয়ালালামপুর কিংবা বাংলাদেশের কোথাও তার কোনো স্বজনকে খুঁজে পাওয়া যায় কি না। তাতেও লাভ হয়নি। ফলে মৃত্যুর ১৫ দিন পেরিয়ে গেলেও হাসপাতালের হিমঘর থেকে মুক্তি মিলছে না দীন মোহাম্মদের।

২ দিন আগে

হরমুজ খুলতে যুক্তরাষ্ট্রের 'আচরণ সংশোধন'সহ কঠোর শর্ত ইরানের

বিবৃতিতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রকে আর কখনো ইরানকে হুমকি দেওয়া চলবে না। ইরান ও অঞ্চলটিতে তাদের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে ওয়াশিংটনকে। পাশাপাশি ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপ করা নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, অঞ্চল থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী সরিয়ে নেওয়া, যুদ্ধে ইরানের ক্ষয়ক্ষতির

২ দিন আগে

যুক্তরাষ্ট্রে দাবানল নেভাতে গিয়ে হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত, পাইলটসহ নিহত ২

দাবানল নিয়ন্ত্রণ অভিযানের উপ-প্রধান টাইলার হেক্ট জানান, দুর্ঘটনার পর কর্মীরা কিছু সময়ের জন্য কাজ বন্ধ রেখে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন। পরবর্তীতে পুনরায় কাজ শুরু হয়। তিনি বলেন, “এই দুর্ঘটনা আমাদের কাজের পদ্ধতি বদলে দেবে না। আমরা আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ চালিয়ে যাব এবং মাটিতে থাকা দমকলকর্মীদের সহায়তায় বিমান

২ দিন আগে

ব্রাজিলে হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে নিহত ৪

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে মেয়র এদুয়ার্দো নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তিনি জানান, ঘটনার পরপরই তিনি ব্রাজিলের ন্যাশনাল সিভিল এভিয়েশন এজেন্সির (এএনএসি) সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এবং আকাশে চলাচলকারী সকল হেলিকপ্টারের ওপর নজরদারি বাড়িয়ে যাত্রীদের সুরক্ষা নিশ্চিত কর

২ দিন আগে