মিসরে গ্রেপ্তার ৬ সাংবাদিক, ‘সন্ত্রাসবাদে’ জড়িত থাকার অভিযোগ

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
মিশরে গ্রেপ্তার ৬ সাংবাদিক (ওপরে বাঁ থেকে) মোহাম্মদ আশরাফ, ওমর হেলাল ও ইসলাম বারাকাত; (নিচে বাঁ থেকে) আবদুল্লাহ কাদরি, মোহাম্মদ মাহমুদ ও মোহাম্মদ আদেল। ছবি: সংগৃহীত
মিশরে গ্রেপ্তার ৬ সাংবাদিক (ওপরে বাঁ থেকে) মোহাম্মদ আশরাফ, ওমর হেলাল ও ইসলাম বারাকাত; (নিচে বাঁ থেকে) আবদুল্লাহ কাদরি, মোহাম্মদ মাহমুদ ও মোহাম্মদ আদেল। ছবি: সংগৃহীত

মিসরের স্বাধীন ফ্যাক্টচেকিং ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা প্ল্যাটফর্ম মিসদাশাশের ছয় সাংবাদিককে গ্রেপ্তারের কয়েক দিনের মধ্যে তাদের একজনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী সংগঠনে যোগ দেওয়া ও মিথ্যা সংবাদ ছড়ানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এ ঘটনাকে মিসরে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর নতুন করে দমন-পীড়ন হিসেবে দেখছে।

দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, আরবি শব্দ ‘মিসদাশাশ’ ব্যবহার করা হয় ‘বিশ্বাস করবেন না’ অর্থে, যেটি ফ্যাক্টচেকিং প্ল্যাটফর্মগুলোর অন্যতম মূলমন্ত্র। গত সপ্তাহে প্ল্যাটফর্মটির ছয় সাংবাদিক আবদুল্লাহ কাদরি, মোহাম্মদ আশরাফ, মোহাম্মদ আদেল, ইসলাম বারাকাত, মোহাম্মদ মাহমুদ ও ওমর হেলালকে গ্রেপ্তার করে নিরাপত্তা বাহিনী।

মিসরীয় কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে অভিযোগ করেছে, মিসদাশাশ প্ল্যাটফর্মটি লাইসেন্সবিহীন এবং নিষিদ্ধঘোষিত মুসলিম ব্রাদারহুডের হয়ে মিথ্যা সংবাদ প্রকাশ করছে। তবে প্ল্যাটফর্মটির সহপ্রতিষ্ঠাতা আবদেলরহমান মনসুর মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

রোববার মিসরীয় মানবাধিকার সংগঠন ‘ইজিপশিয়ান ইনিশিয়েটিভ ফর পারসোনাল রাইটস’ জানায়, সাংবাদিক মোহাম্মদ আশরাফের বিরুদ্ধে একটি সন্ত্রাসী সংগঠনে যোগ দেওয়া এবং মিথ্যা সংবাদ ছড়ানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। এর আগে রাতভর তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। মানবাধিকার সংগঠনটির দাবি, দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদে মূলত মিসদাশাশে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন ও অন্যান্য কনটেন্ট নিয়েই প্রশ্ন করা হয়েছে।

তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আশরাফকে ১৫ দিনের হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে বাকি পাঁচ সাংবাদিক কোথায় আছেন, সে বিষয়ে রোববার পর্যন্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

মিসদাশাশের সহপ্রতিষ্ঠাতা মনসুর মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে প্ল্যাটফর্মটির কোনো সম্পর্ক থাকার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার করা মিসরের আধুনিক ইতিহাসে সাংবাদিকতার ওপর সবচেয়ে গুরুতর হামলাগুলোর একটি।

মনসুর বলেন, আমার সহকর্মীরা সাংবাদিক হিসেবে তাদের দায়িত্বই পালন করছিলেন। কঠিন প্রশ্ন করা, তথ্য উদঘাটন করা এবং মানুষের জীবনের ওপর প্রভাব ফেলে এমন বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করা— এগুলো সাংবাদিকতারই অংশ। এ কাজের জন্য তাদের স্বীকৃতি পাওয়া উচিত। কিন্তু এর বদলে বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাদের ছয়জনকেই তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

মনসুর প্রশ্ন তোলেন, সরকার কেন ছয় সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করেছে এবং সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ছাড়া তারা কী করেছেন— এর জবাব সরকারের দেওয়া উচিত।

দ্য গার্ডিয়ান মিসরের স্টেট ইনফরমেশন সার্ভিসের কাছে এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলেও প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত কোনো জবাব পায়নি।

সাংবাদিকদের অবস্থান জানতে বিক্ষোভ

গ্রেপ্তার সাংবাদিকদের মুক্তির দাবিতে শনিবার কায়রোয় মিসরীয় সাংবাদিক ইউনিয়নের (ইজেএস) কার্যালয়ের বাইরে কয়েক ডজন সাংবাদিক অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। সাংবাদিকরা জানান, মিসদাশাশের কর্মীদের মুক্তি না দেওয়া পর্যন্ত তারা কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন।

মিসরীয় সাংবাদিক ইউনিয়ন জানিয়েছে, এ ঘটনায় সোমবার তারা জরুরি বৈঠক করবে। সাংবাদিকদের মুক্তি এবং তাদের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য জানাতে ইউনিয়নের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পাবলিক প্রসিকিউটরের কাছে আবেদনও করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক ও মিসরীয় মানবাধিকার সংগঠনগুলোরও তীব্র প্রতিক্রিয়া এসেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টসসহ ৮০টির বেশি অধিকার সংগঠন সাংবাদিকদের গ্রেপ্তারের নিন্দা জানিয়েছে। তারা একে মতপ্রকাশ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে মিসদাশাশের সব কর্মীকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা নিয়ে প্রশ্ন

মিসদাশাশের সাংবাদিকদের গ্রেপ্তারের ঘটনাটি এমন একসময় ঘটল, যখন মিসরের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিও নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

গ্রেপ্তারের মাত্র এক সপ্তাহ আগে মিসরকে দেওয়া ৩২০ মিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তার ক্ষেত্রে মানবাধিকারসংক্রান্ত শর্ত প্রত্যাহার করে নেয় যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের পর মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তায় কায়রোর ‘সহায়ক ভূমিকা’র কথা উল্লেখ করে ওয়াশিংটন ওই সিদ্ধান্ত নেয়।

যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবছর মিসরকে প্রায় ১৩০ কোটি ডলার সহায়তা দেয়। এর একটি অংশ মিসর সরকারের মানবাধিকার ও গণতন্ত্রসংক্রান্ত কিছু শর্ত পূরণের ওপর নির্ভরশীল। ২০১৩ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর মিসরের মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতির কারণে যুক্তরাষ্ট্র একাধিকবার সহায়তার কিছু অংশ আটকে রেখেছিল। তবে সামগ্রিকভাবে কায়রোকে মার্কিন অর্থসহায়তা অব্যাহত থেকেছে।

এ বছর ওয়াশিংটন মানবাধিকারসংক্রান্ত শর্ত পুরোপুরি প্রত্যাহার করেছে। রয়টার্সের প্রকাশ করা মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের একটি স্মারকে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-মিসর সম্পর্ক এবং মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার অগ্রাধিকারের জন্য এ সিদ্ধান্ত ‘অপরিহার্য’ ছিল।

এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে সাংবাদিকদের গ্রেপ্তারের কোনো সরাসরি সম্পর্ক আছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত নন বলে জানিয়েছেন মনসুর। তবে তিনি বলেন, বহু বছর ধরে মানবাধিকারসংক্রান্ত শর্তে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ছাড় দেওয়ার নীতি এবং অন্যান্য দেশের মিসরের মানবাধিকার পরিস্থিতি উপেক্ষা করার প্রবণতা এ ধরনের লঙ্ঘন আরও সহজে ঘটার সুযোগ তৈরি করে।

সিসির আমলে সংকুচিত সংবাদমাধ্যম

মিসরের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে রয়েছে। মানবাধিকার পর্যবেক্ষক সংস্থা ফ্রিডম হাউজের অভিযোগ, মিসরের নিরাপত্তা বাহিনী দায়মুক্তির সঙ্গে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে জড়িত।

২০১৩ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি ক্ষমতায় আসেন। এরপর দেশটিতে নাগরিক স্বাধীনতা সংকুচিত হয়েছে এবং রাজনৈতিক বিরোধিতার ওপর কঠোর দমন-পীড়ন চালানো হয়েছে বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ।

মুসলিম ব্রাদারহুডকে ২০১৩ সালে মিসর সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে। এর আগে সংগঠনটির গুরুত্বপূর্ণ নেতা মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। সেই সময় থেকেই সংগঠনটির বিরুদ্ধে ব্যাপক দমন অভিযান চালিয়ে আসছে মিসরীয় কর্তৃপক্ষ।

মিসরে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপরও কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে ১৮০ দেশের মধ্যে মিসরের অবস্থান ১৬৯তম। দেশটিতে মিসদাশাশের মতো স্বাধীন সাংবাদিকতা ও অনুসন্ধানী প্ল্যাটফর্মের সংখ্যা খুবই কম। মিসরীয় সাংবাদিক ইউনিয়নের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশটির কারাগারে প্রায় ২৬ জন সাংবাদিক আটক আছেন।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement