
বিশেষ প্রতিনিধি, রাজনীতি ডটকম

গুঞ্জনটা ছিল শুরু থেকেই। বিকল্প কিছু নাম থাকলেও বারবারই আলোচনায় ঘুরে ফিরে এসেছে তারই নাম। গুঞ্জন আর জল্পনাই শেষ পর্যন্ত সত্যি হলো। রাষ্ট্রপতি পদে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকেই বেছে নিলো বিএনপি।
২০১১ সাল থেকে দলের মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করে যাওয়া পোড় খাওয়া এ রাজনীতিবিদই একটা সময় মাঠের রাজনীতিতে বিএনপিকে নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন। শত প্রতিকূলতার মুখেও হামলা-মামলা উপেক্ষা করে রাজনীতির মাঠে ছিলেন অবিচল।
৭৮ বছর বয়সে এসে এই রাজনীতিক দলের প্রতি তার নিবেদনের স্বীকৃতি হিসেবে পেলেন রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন। সংসদে ক্ষমতাসীন বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় তিনিই হতে যাচ্ছেন দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি— সেটি নিশ্চিতই বলা যায়।
বিএনপি নেতারা ছাড়াও অন্যান্য রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি পদে যোগ্য প্রার্থীই মনে করছেন। সুশীল সমাজসহ সাধারণ মানুষের মধ্যেও তার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নাতীত। সবার মুখে এক কথা— পরিচ্ছন্ন ইমেজের অধিকারী মির্জা ফখরুল ইসলাম দলীয় রাজনীতির পাশাপাশি দেশের রাজনীতিতে যে অবদান রেখেছেন, সেটিই তাকে রাষ্ট্রপতি পদে সবার পছন্দের প্রার্থীতে পরিণত করেছে।
বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী, অন্যান্য রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের সঙ্গে আলাপে মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনীত করার কয়েকটি কারণ উঠে এসেছে। এর মধ্যে একদিকে যেমন রয়েছে তার ক্লিন ইমেজ আর রাজনীতিবিদ হিসেবে দীর্ঘ অবদানের বিষয়টি, তেমনি রয়েছে কৌশলগত দিকও।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হয়েছিলেন ২০০৯ সালে, দলের পঞ্চম জাতীয় সম্মেলনে। ২০১১ সালে দলটির তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলওয়ার হোসেন মৃত্যুবরণ করলে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল। পরে দীর্ঘ পাঁচ বছর পর ২০১৬ সালে দলের ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনে ‘ভারমুক্ত’ করা হয় তাকে। এরপর গত সাড়ে ১০ বছর ধরে তিনিই বিএনপি মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।
বিএনপি নেতারা বলছেন, ২০১৬ সালে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হলেও কার্যত ২০১১ সাল থেকেই বিএনপির সেকেন্ড-ইন-কমান্ড মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ওই সময় থেকেই তিনি দলের মুখপাত্রের দায়িত্বও পালন করে আসছেন। এরপর ২০১৮ সালে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় তখনকার বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাবরণ করলে কার্যত মাঠে বিএনপির নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন মির্জা ফখরুলই।
নেতাকর্মীরা বলছেন, আওয়ামী লীগের টানা তিন মেয়াদের শাসনামলে মির্জা ফখরুল ইসলামের নামে শতাধিক মামলা হয়েছে। বারবার কারাবরণ করতে হয়েছে তাকে। তা সত্ত্বেও দলের হাল ছাড়েননি তিনি। বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমান তখন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে লন্ডন থেকে দল চালালেও মাঠের রাজনীতিতে মির্জা ফখরুলই বিএনপিকে সামলে রেখেছেন।
বিএনপির পাবনা জেলা কমিটির একজন নেতা বলেন, বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে খবর এসেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে বারবার মির্জা ফখরুলকে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে, রাজনীতি ছাড়তে বলা হয়েছে, বিএনপিকে স্যাবোট্যাজ করতে বলা হয়েছে। গুজব ছড়ানো হয়েছে, মির্জা ফখরুল সরকারের টাকা খেয়ে বিএনপির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। কিন্তু তিনি কোনো টোপ বা প্রলোভনে পা দেননি।
ওই বিএনপি নেতা বলেন, মির্জা ফখরুল নিজেই বলেছেন, এবারই শেষবারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচন করেছেন, এবারের পরই রাজনীতি থেকে অবসর নেবেন তিনি। ফলে তার মতো একজন পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনয়ন না দেওয়াটাই হয়তো অন্যায় হতো। বিএনপির একজন কর্মী হয়েও বলছি, বাংলাদেশ না হয়ে অন্য কোনো দেশ হলে হয়তো তার মতো রাজনীতিবিদ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বই পেতেন।
নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার মতেও মির্জা ফখরুল একজন যোগ্য প্রার্থী রাষ্ট্রপতি পদে। রাজনীতি ডটকমকে তিনি বলেন, ‘যাদের নাম আলোচনায় আছে, তাদের মধ্যে মির্জা ফখরুলই বেস্ট বলে মনে হয়। তবে তিনি শ্রেষ্ঠ কি না, এটি বলা যায় না। আলোচিতদের মধ্যে নিঃসন্দেহে মির্জা ফখরুল যোগ্যতায় এগিয়ে।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. আব্দুল লতিফ মাসুম রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘মির্জা ফখরুল ইসলামের রাষ্ট্রপতি হওয়ার যৌক্তিকতা অনুভব করি। গত ১৭ বছর দলের দুঃসময়ে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। ফলে পুরস্কৃত করার বিষয়টা থাকতেই পারে।’
১৯৭২ সালে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষা ক্যাডারের অধীনে ঢাকা কলেজে অর্থনীতির প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন মির্জা ফখরুল। পরে আরও বেশকিছু সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন, দায়িত্ব পালন করেন প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়েও। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিবও ছিলেন তিনি। হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতায় আসার পর এ এ বারী পদত্যাগ করলে তিনি প্রশাসন ছেড়ে ফের শিক্ষকতায় ফিরে যান।
এর আগেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থী থাকা অবস্থাতেই ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিলেন মির্জা ফখরুল। তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (পরে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন) এসএম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের ঢাবি শাখার সভাপতি।
কর্মজীবনে ঢোকার পর রাজনীতিতে ছেদ পড়েছিল মির্জা ফখরুলের। পরে ১৯৮৬ সালে শিক্ষকতা বিদায় জানিয়ে ফের রাজনীতিতে ফেরেন তিনি, ১৯৮৮ সালের ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ওই দশকের শেষ দিকে এরশাদবিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন বিএনপিতে যোগ দেন তিনি। ১৯৯২ সালে নির্বাচিত হন ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি।
দলীয় নেতাকর্মী, সাধারণ মানুষ ও বিশ্লেষকদের অভিমত, এই দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একজন স্বচ্ছ ভাবমূর্তির রাজনীতিবিদ হিসেবে নিজেকে সফলভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। গত কয়েক দশকে যখন রাজনীতিতে বিরোধী দলগুলোকে কুৎসিৎ ভাষায় আক্রমণের মাধ্যমে রাজনৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় বেড়েছে, তার মধ্যেও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি কখনোই নিজের রাজনৈতিক অবস্থানকে ভাষা বা আচরণ দিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ দেননি।
এর বাইরে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়েও নিজের সচেতন অবস্থান সবসময় পরিস্ফূট করেছেন মির্জা ফখরুল। এসব কারণেই রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক নেই— এমন মানুষের মধ্যেও তার একটি স্বতন্ত্র গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে। সুশীল সমাজের মধ্যেও রয়েছে ইতিবাচক রাজনীতির ধারক-বাহক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত তিনি।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘মির্জা ফখরুল ইসলামের অত্যন্ত ইতিবাচক পাবলিক ইমেজ রয়েছে। দলীয় পরিচয়ের বাইরেও সুশীল সমাজে তিনি অনেকটাই গ্রহণযোগ্য।’
বিএনপির চরম দুঃসময়ে মাঠের রাজনীতিতে দলের হাল শক্ত করে ধরে রেখেছিলেন মির্জা ফখরুল। ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনার শাসনামলের শেষের দিকে যখন বিএনপি চরমভাবে নির্যাতনের শিকার, তখন তার ভূমিকা দেশের রাজনীতিকে সহিংস হয়ে ওঠা থেকে রক্ষা করেছিল বলে মনে করেন বিএনপির নেতাকর্মীরাই। বিশেষ করে খালেদা জিয়া সাজাপ্রাপ্ত হয়ে যখন কারাগারে যান, তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তার ভূমিকা প্রশংসিত হয়েছে সব মহলে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মির্জা ফখরুল বারবারই নিজের রাজনৈতিক প্রজ্ঞার প্রতিফল দেখিয়েছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী দিনের রাজনীতিতে তার এই প্রজ্ঞার প্রয়োগ প্রয়োজনীয়ই কেবল নয়, অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠতে পারে।
চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কার নিয়ে বিস্তর আলাপ হয়েছে। জুলাই সনদ অনুযায়ী এখনো সংবিধান সংশোধন না হলেও কাঠামো সংস্কারের অনেক বিষয়ই বাস্তবায়ন হওয়ার পথে রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম আলোচিত ইস্যু হিসেবে রয়ে গেছে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য। সেক্ষেত্রে এখন রাষ্ট্রপতি পদের ক্ষমতা ও ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্র যতটা সীমিত, ভবিষ্যতে হয়তো তত সীমিত থাকবে না।
এদিকে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ফেরাও অবশ্যম্ভাবী। সেটি হলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হবে বলেই ধরে নেওয়া যায়। সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ভূমিকাটি ওই সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, তা বলাই বাহুল্য।
ওই ধরনের পরিস্থিতিতে মির্জা ফখরুল ইসলামের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ক্ষমতাসীন বিএনপির জন্য কাজে লাগবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, রাষ্ট্রপতি হিসেবে অনেক সময়ই দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার যে বিষয়টি, সেখানেও মির্জা ফখরুল হয়ে উঠতে পারেন অনুসরণীয়।
অধ্যাপক আব্দুল লতিফ মাসুম রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমতায়িত করার আলোচনা আছে। সেটি কিছুটা হলেও যদি প্রতিষ্ঠিত হয়, স্বাভাবিকভাবেই বিএনপির দায়িত্বশীল কাউকে সেখানে বসানোর চেষ্টা থাকবে। আবার আগামী নির্বাচনটা যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হবে, সেটা বেশ অনুমেয়। এ ক্ষেত্রে দায়িত্ব বাড়বে। এ দিক থেকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যথার্থ লোক।’
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হিসেবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়ার পর বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যেও দেখা গেছে উচ্ছ্বাস। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দলে যেভাবে দীর্ঘদিন ধরে অবদান রেখেছেন, রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেশের জন্যও তিনি একই রকম অবদান রাখবেন বলেই আশাবাদ জানিয়েছেন তারা।

গুঞ্জনটা ছিল শুরু থেকেই। বিকল্প কিছু নাম থাকলেও বারবারই আলোচনায় ঘুরে ফিরে এসেছে তারই নাম। গুঞ্জন আর জল্পনাই শেষ পর্যন্ত সত্যি হলো। রাষ্ট্রপতি পদে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকেই বেছে নিলো বিএনপি।
২০১১ সাল থেকে দলের মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করে যাওয়া পোড় খাওয়া এ রাজনীতিবিদই একটা সময় মাঠের রাজনীতিতে বিএনপিকে নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন। শত প্রতিকূলতার মুখেও হামলা-মামলা উপেক্ষা করে রাজনীতির মাঠে ছিলেন অবিচল।
৭৮ বছর বয়সে এসে এই রাজনীতিক দলের প্রতি তার নিবেদনের স্বীকৃতি হিসেবে পেলেন রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন। সংসদে ক্ষমতাসীন বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় তিনিই হতে যাচ্ছেন দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি— সেটি নিশ্চিতই বলা যায়।
বিএনপি নেতারা ছাড়াও অন্যান্য রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি পদে যোগ্য প্রার্থীই মনে করছেন। সুশীল সমাজসহ সাধারণ মানুষের মধ্যেও তার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নাতীত। সবার মুখে এক কথা— পরিচ্ছন্ন ইমেজের অধিকারী মির্জা ফখরুল ইসলাম দলীয় রাজনীতির পাশাপাশি দেশের রাজনীতিতে যে অবদান রেখেছেন, সেটিই তাকে রাষ্ট্রপতি পদে সবার পছন্দের প্রার্থীতে পরিণত করেছে।
বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী, অন্যান্য রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের সঙ্গে আলাপে মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনীত করার কয়েকটি কারণ উঠে এসেছে। এর মধ্যে একদিকে যেমন রয়েছে তার ক্লিন ইমেজ আর রাজনীতিবিদ হিসেবে দীর্ঘ অবদানের বিষয়টি, তেমনি রয়েছে কৌশলগত দিকও।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হয়েছিলেন ২০০৯ সালে, দলের পঞ্চম জাতীয় সম্মেলনে। ২০১১ সালে দলটির তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলওয়ার হোসেন মৃত্যুবরণ করলে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল। পরে দীর্ঘ পাঁচ বছর পর ২০১৬ সালে দলের ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনে ‘ভারমুক্ত’ করা হয় তাকে। এরপর গত সাড়ে ১০ বছর ধরে তিনিই বিএনপি মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।
বিএনপি নেতারা বলছেন, ২০১৬ সালে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হলেও কার্যত ২০১১ সাল থেকেই বিএনপির সেকেন্ড-ইন-কমান্ড মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ওই সময় থেকেই তিনি দলের মুখপাত্রের দায়িত্বও পালন করে আসছেন। এরপর ২০১৮ সালে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় তখনকার বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাবরণ করলে কার্যত মাঠে বিএনপির নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন মির্জা ফখরুলই।
নেতাকর্মীরা বলছেন, আওয়ামী লীগের টানা তিন মেয়াদের শাসনামলে মির্জা ফখরুল ইসলামের নামে শতাধিক মামলা হয়েছে। বারবার কারাবরণ করতে হয়েছে তাকে। তা সত্ত্বেও দলের হাল ছাড়েননি তিনি। বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমান তখন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে লন্ডন থেকে দল চালালেও মাঠের রাজনীতিতে মির্জা ফখরুলই বিএনপিকে সামলে রেখেছেন।
বিএনপির পাবনা জেলা কমিটির একজন নেতা বলেন, বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে খবর এসেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে বারবার মির্জা ফখরুলকে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে, রাজনীতি ছাড়তে বলা হয়েছে, বিএনপিকে স্যাবোট্যাজ করতে বলা হয়েছে। গুজব ছড়ানো হয়েছে, মির্জা ফখরুল সরকারের টাকা খেয়ে বিএনপির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। কিন্তু তিনি কোনো টোপ বা প্রলোভনে পা দেননি।
ওই বিএনপি নেতা বলেন, মির্জা ফখরুল নিজেই বলেছেন, এবারই শেষবারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচন করেছেন, এবারের পরই রাজনীতি থেকে অবসর নেবেন তিনি। ফলে তার মতো একজন পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনয়ন না দেওয়াটাই হয়তো অন্যায় হতো। বিএনপির একজন কর্মী হয়েও বলছি, বাংলাদেশ না হয়ে অন্য কোনো দেশ হলে হয়তো তার মতো রাজনীতিবিদ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বই পেতেন।
নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার মতেও মির্জা ফখরুল একজন যোগ্য প্রার্থী রাষ্ট্রপতি পদে। রাজনীতি ডটকমকে তিনি বলেন, ‘যাদের নাম আলোচনায় আছে, তাদের মধ্যে মির্জা ফখরুলই বেস্ট বলে মনে হয়। তবে তিনি শ্রেষ্ঠ কি না, এটি বলা যায় না। আলোচিতদের মধ্যে নিঃসন্দেহে মির্জা ফখরুল যোগ্যতায় এগিয়ে।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. আব্দুল লতিফ মাসুম রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘মির্জা ফখরুল ইসলামের রাষ্ট্রপতি হওয়ার যৌক্তিকতা অনুভব করি। গত ১৭ বছর দলের দুঃসময়ে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। ফলে পুরস্কৃত করার বিষয়টা থাকতেই পারে।’
১৯৭২ সালে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষা ক্যাডারের অধীনে ঢাকা কলেজে অর্থনীতির প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন মির্জা ফখরুল। পরে আরও বেশকিছু সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন, দায়িত্ব পালন করেন প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়েও। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিবও ছিলেন তিনি। হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতায় আসার পর এ এ বারী পদত্যাগ করলে তিনি প্রশাসন ছেড়ে ফের শিক্ষকতায় ফিরে যান।
এর আগেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থী থাকা অবস্থাতেই ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিলেন মির্জা ফখরুল। তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (পরে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন) এসএম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের ঢাবি শাখার সভাপতি।
কর্মজীবনে ঢোকার পর রাজনীতিতে ছেদ পড়েছিল মির্জা ফখরুলের। পরে ১৯৮৬ সালে শিক্ষকতা বিদায় জানিয়ে ফের রাজনীতিতে ফেরেন তিনি, ১৯৮৮ সালের ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ওই দশকের শেষ দিকে এরশাদবিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন বিএনপিতে যোগ দেন তিনি। ১৯৯২ সালে নির্বাচিত হন ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি।
দলীয় নেতাকর্মী, সাধারণ মানুষ ও বিশ্লেষকদের অভিমত, এই দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একজন স্বচ্ছ ভাবমূর্তির রাজনীতিবিদ হিসেবে নিজেকে সফলভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। গত কয়েক দশকে যখন রাজনীতিতে বিরোধী দলগুলোকে কুৎসিৎ ভাষায় আক্রমণের মাধ্যমে রাজনৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় বেড়েছে, তার মধ্যেও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি কখনোই নিজের রাজনৈতিক অবস্থানকে ভাষা বা আচরণ দিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ দেননি।
এর বাইরে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়েও নিজের সচেতন অবস্থান সবসময় পরিস্ফূট করেছেন মির্জা ফখরুল। এসব কারণেই রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক নেই— এমন মানুষের মধ্যেও তার একটি স্বতন্ত্র গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে। সুশীল সমাজের মধ্যেও রয়েছে ইতিবাচক রাজনীতির ধারক-বাহক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত তিনি।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘মির্জা ফখরুল ইসলামের অত্যন্ত ইতিবাচক পাবলিক ইমেজ রয়েছে। দলীয় পরিচয়ের বাইরেও সুশীল সমাজে তিনি অনেকটাই গ্রহণযোগ্য।’
বিএনপির চরম দুঃসময়ে মাঠের রাজনীতিতে দলের হাল শক্ত করে ধরে রেখেছিলেন মির্জা ফখরুল। ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনার শাসনামলের শেষের দিকে যখন বিএনপি চরমভাবে নির্যাতনের শিকার, তখন তার ভূমিকা দেশের রাজনীতিকে সহিংস হয়ে ওঠা থেকে রক্ষা করেছিল বলে মনে করেন বিএনপির নেতাকর্মীরাই। বিশেষ করে খালেদা জিয়া সাজাপ্রাপ্ত হয়ে যখন কারাগারে যান, তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তার ভূমিকা প্রশংসিত হয়েছে সব মহলে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মির্জা ফখরুল বারবারই নিজের রাজনৈতিক প্রজ্ঞার প্রতিফল দেখিয়েছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী দিনের রাজনীতিতে তার এই প্রজ্ঞার প্রয়োগ প্রয়োজনীয়ই কেবল নয়, অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠতে পারে।
চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কার নিয়ে বিস্তর আলাপ হয়েছে। জুলাই সনদ অনুযায়ী এখনো সংবিধান সংশোধন না হলেও কাঠামো সংস্কারের অনেক বিষয়ই বাস্তবায়ন হওয়ার পথে রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম আলোচিত ইস্যু হিসেবে রয়ে গেছে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য। সেক্ষেত্রে এখন রাষ্ট্রপতি পদের ক্ষমতা ও ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্র যতটা সীমিত, ভবিষ্যতে হয়তো তত সীমিত থাকবে না।
এদিকে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ফেরাও অবশ্যম্ভাবী। সেটি হলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হবে বলেই ধরে নেওয়া যায়। সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ভূমিকাটি ওই সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, তা বলাই বাহুল্য।
ওই ধরনের পরিস্থিতিতে মির্জা ফখরুল ইসলামের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ক্ষমতাসীন বিএনপির জন্য কাজে লাগবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, রাষ্ট্রপতি হিসেবে অনেক সময়ই দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার যে বিষয়টি, সেখানেও মির্জা ফখরুল হয়ে উঠতে পারেন অনুসরণীয়।
অধ্যাপক আব্দুল লতিফ মাসুম রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমতায়িত করার আলোচনা আছে। সেটি কিছুটা হলেও যদি প্রতিষ্ঠিত হয়, স্বাভাবিকভাবেই বিএনপির দায়িত্বশীল কাউকে সেখানে বসানোর চেষ্টা থাকবে। আবার আগামী নির্বাচনটা যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হবে, সেটা বেশ অনুমেয়। এ ক্ষেত্রে দায়িত্ব বাড়বে। এ দিক থেকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যথার্থ লোক।’
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হিসেবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়ার পর বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যেও দেখা গেছে উচ্ছ্বাস। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দলে যেভাবে দীর্ঘদিন ধরে অবদান রেখেছেন, রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেশের জন্যও তিনি একই রকম অবদান রাখবেন বলেই আশাবাদ জানিয়েছেন তারা।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব ও স্থায়ী কমিটির পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে দলের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে তিনি এ সিদ্ধান্তের কথা জানান।
৬ ঘণ্টা আগে
বৃহস্পতিবার (১২ আগস্ট) দুপুরে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে মির্জা ফখরুল ইসলামকে দলের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী ঘোষণা করেন তারেক রহমান। দুপুর সাড়ে ১২টায় এ বৈঠক শুরু হয়।
৭ ঘণ্টা আগে
রাষ্ট্রপতি পদে এলডিপি প্রেসিডেন্ট কর্নেল (অব.) অলি আহমদের মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। জামায়াত নেতা এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে এ মনোনয়নপত্র জমা দেয়।
৭ ঘণ্টা আগে
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে কার নাম চূড়ান্ত করা হবে, তা নিয়ে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা চলছে। আজকের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা রয়েছে।
১০ ঘণ্টা আগে