
সজীব রহমান

সময়ের পরিক্রমায় দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে হারিয়ে যাচ্ছেন অনেক বর্ষীয়ান ও আলোচিত রাজনীতিক। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ক্ষমতার রদবদল, দলীয় বিভাজন কিংবা সাংগঠনিক সক্ষমতা না থাকায় কোনো নেতার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা দলও হারিয়ে যেতে বসেছে। আবার রাজনীতির মূল স্রোত থেকে কোনো কোনো নেতা বয়সের ভারেও পুরোপুরি নীরব হয়ে গেছেন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে একসময় বড় প্রভাব বিস্তার করা এবং পরবর্তী সময়ে আলোচনার বাইরে চলে যাওয়া প্রবীণ ও আলোচিত ব্যক্তিত্বদের মধ্যে রয়েছেন গণফোরামের ড. কামাল হোসেন, জাতীয় পার্টির (জেপি) আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, প্রয়াত হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদসহ আরও কয়েকজন। এ পর্বে এসব বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
দেশের বর্ষীয়ান রাজনীতিকদের মধ্যে বয়সের ভার ও শারীরিক অসুস্থতায় কাবু হয়ে পড়েছেন সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা ও গণফোরামের প্রতিষ্ঠাতা ড. কামাল হোসেন। গত জানুয়ারিতে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তিও করা হয়েছিল।
৮৮ বছর বয়সী ড. কামাল হোসেন ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির প্রধান ছিলেন। রাজনৈতিক দল গণফোরাম নিয়ে লম্বা সময় চেষ্টা করেও সেই অর্থে আলোর মুখ দেখতে পারেনি। গড়ে ওঠেনি কর্মীবাহিনী। জনসমর্থন কুড়াতে না পারায় সংসদীয় রাজনীতিতেও তেমন সুবিধা করতে পারেননি এই সংবিধান বিশেষজ্ঞ। রাজনীতিসহ পেশাগত কাজ থেকেও কার্যত দূরে থাকা ড. কামাল হোসেন সবশেষ বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে গিয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর আমলের আইন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন আশির দশকে আওয়ামী লীগ থেকে ছিটকে গিয়ে ১৯৯৩ সালে গঠন করেন ‘গণফোরাম’। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে মিলে ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে’র নেতৃত্ব দিয়ে তিনি বিরোধী রাজনীতির নেতা হিসেবে সামনের সারিতে এলেও কিছু করতে পারেননি। বরং ২০১৮-এর নির্বাচনের পর ভাঙন ধরে ঐক্যফ্রন্টে।
অন্যদিকে নিজের দল গণফোরামে একের পর এক অভ্যন্তরীণ কোন্দল ড. কামালের রাজনীতিকে প্রভাবহীন করে ফেলে। বয়সের ভার ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে ২০২৩ সালের অক্টোবরের গণফোরামের সভাপতির পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর গ্রহণ করেন ড. কামাল হোসেন। বর্তমানে রাজধানীর বেইলি রোডের বাসভবনেই সময় কাটে বলে জানা গেছে।
রাজনীতিতে একেবারেই নিষ্ক্রিয় ড. কামাল হোসেনের ফের রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে মনে করছেন ঘনিষ্ঠজনরা।
দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার উত্তরসূরি ও জাতীয় পার্টির দীর্ঘদিনের শীর্ষ নেতা আনোয়ার হোসেন মঞ্জু পিরোজপুর-২ আসন থেকে সাতবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরশাদ ও আওয়ামী লীগ উভয় সরকারের আমলেই বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই রাজনীতিক ২০০১ সালে গঠন করেন জাতীয় পার্টি (জেপি)।
বিপুল সম্পদশালী এই রাজনীতিক অবশ্য নিজের দল নিয়ে খুব একটা ভালো সময় পার করতে পারেননি। ভোটের মাঠে মঞ্জুর নিজ আসনের বাইরে কোথাও ন্যূনতম সুবিধাও করতে পারেননি জেপির নেতারা।

চব্বিশের পটপরিবর্তনের রাজনৈতিক সমীকরণে নির্বাচনি এলাকা ও ক্ষমতার কেন্দ্র— উভয় স্থান থেকেই ছিটকে পড়েন আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। বর্তমানে আইনি জটিলতা ও বার্ধক্যের কারণে তার সক্রিয় রাজনীতিতে ফেরার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য।
এর মধ্যে গত বছরের সেপ্টেম্বরে ধানমন্ডি থেকে গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদ। পরে দ্রুত সময়ের মধ্যে জিম্মা জামিনে মুক্তি পান তিনি।
এদিকে সবশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথম অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও পরে সরে দাঁড়ান সাবেক মন্ত্রী মঞ্জু। পিরোজপুর-২ (কাউখালী, ভান্ডারিয়া, নেছারাবাদ) আসনে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করলেও পরে শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে নির্বাচন থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন তিনি। এরপর আর তাকে কোনো কার্যক্রমে দেখা যায়নি।
জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সহধর্মিণী ও সাবেক বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ। এরশাদের মৃত্যুর পর দেবর জি এম কাদেরের সঙ্গে দলীয় আধিপত্যের দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। জাপার সিংহভাগ নেতাকর্মী জি এম কাদেরের পক্ষে চলে যাওয়ায় মূল ধারা থেকে ছিটকে পড়েন রওশন।
অন্যদিকে অসুস্থতা পিছু ছাড়ছে না রওশন এরশাদের। ক্রমেই অসুস্থতা বাড়তে থাকায় লম্বা সময় হাসপাতালে কাটাতে হয়েছে তাকে। নিতে হয়েছে আইসিইউতেও। তবে অনেক আগে হাসপাতাল ছাড়লেও অসুস্থতাকে সঙ্গে নিয়েই এখন বাসায় কাটছে তার। বার্ধক্য, অসুস্থতা ও হুইলচেয়ার-নির্ভর জীবনের কারণে তিনি মূলত রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে নির্বাসনে রয়েছেন।
এদিকে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ‘রওশনপন্থি’ হিসেবে পরিচিত অনেকে জি এম কাদেরের বলয়ে চলে এসেছেন। এরপরও যারা তার সঙ্গে আছেন তাদের দলে খুব একটা প্রভাব নেই। সে কারণে রাজনীতির মাঠ থেকে এরশাদপত্নী রওশনের আনুষ্ঠানিক বিদায় বলা চলে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রওশন এরশাদের সঙ্গে যেমন নেতাদের যোগাযোগ নেই, দলের নেতারাও খুব একটা তার খোঁজখবর রাখছেন না। ছেলে রাহগির আল মাহি এরশাদ ওরফে সাদ এরশাদ মায়ের খোঁজখবর রাখছেন।
সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে রওশন এরশাদ ও সাদ এরশাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। একাধিকবার ফোন করলেও রিসিভ করেননি তাদের কেউ।
জাতীয় পার্টির একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আসলে ওনার (রওশন এরশাদ) সঙ্গে অনেক দিন ধরে যোগাযোগ নেই। কেমন আছেন তাও জানি না। তার ছেলের সঙ্গে কথা বললে জানতে পারবেন।’
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডির) আ স ম আব্দুর রব শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন অনেক দিন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম এই সংগঠক ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার হাজার ছাত্র-জনতার মাঝে প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন।
মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জাসদ গঠনে প্রধান ভূমিকা রাখলেও দলে বেশি দিন থাকতে পারেননি রব। পরে জেএসডি (রব) গঠন করেন এবং ১৯৯৬ সালে ঐকমত্যের সরকারে মন্ত্রী হন। ২০১৮ সালেও তিনি ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতাদের একজন ছিলেন।
সবশেষ ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসনে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) পক্ষ থেকে আ স ম রবের সহধর্মিণী তানিয়া রব প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। তবে এই আসনে রবের দল বিএনপির পক্ষ থেকে ছাড় পায়নি। বিএনপির প্রার্থী এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজানই জয়ী হন।

একদিকে শারীরিক অসুস্থতা অন্যদিকে দীর্ঘদিনেও দলের সাংগঠনিক ভিত মজবুত করতে না পারায় মূল ধারার রাজনীতিতে অনেকটা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছেন আ স ম আবদুর রব। বর্তমানে বয়সের ভার ও নানা জটিলতায় ভুগছেন এই প্রবীণ নেতা। মাঝে মধ্যে দল থেকে দুয়েকটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া ছাড়া রাজনীতিতে তিনি পুরোপুরি অনুপস্থিত।
আ স ম আবদুর রবের শারীরিক অবস্থা ও দলের সামগ্রিক বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে তানিয়া রব বলেন, ‘তিনি অনেক দিন ধরেই নানা অসুস্থতায় ভুগছেন। ডিপেন্ডেন্ট হয়ে গেছেন, একা একা চলতে পারেন না। চিকিৎসা চলছে। এমন অবস্থায় বাসায় রেখে চিকিৎসা দিচ্ছি।’
দলের বিষয়ে তানিয়া রব বলেন, ‘যেভাবে দল চালানো দরকার, আমি একা সেভাবে পারছি না। তবে জেলায় জেলায় সমন্বয় টিম করা হয়েছে। কাউন্সিলের জন্য প্রতিটি এলাকায় নতুন নেতৃত্ব তৈরি, সাংগঠনিক পুনর্গঠনের কাজ করা হচ্ছে।’
দেশের রাজনীতিতে পরিচিতমুখ অধ্যাপক আবু সাইয়িদ। ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম তরুণ সদস্য ছিলেন তিনি। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জিতে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তথ্য প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তবে আলোচিত এক-এগারোর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় ‘সংস্কারপন্থি’ হিসেবে আওয়ামী লীগের মূল ধারা থেকে ছিটকে পড়েন।
এরপর প্রায় এক দশক ধরে রাজনীতির মাঠের বাইরেই ছিলেন আবু সাইয়িদ। পরে ২০১৮ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বিরোধীদলীয় রাজনীতিকে চাঙ্গা করলে গণফোরামে যোগ দেন তিনি। ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রার্থীও হন ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে। তবে ভোটে জিততে পারেননি। রাজনীতিতেও আর আগের মতো অবস্থান ধরে রাখতে পারেননি।

দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার পর আবু সাইয়িদ ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দেন। একজন প্রবীণ নেতা ও সংবিধান প্রণয়নকারী হিসেবে তার এই দলবদল রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ আলোচনার জন্ম দেয়। তবে এ পর্যায়ে এসে এ সিদ্ধান্তও তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে কোনো রদবদল আনতে পারেনি।
বিএনপিতে যোগ দিলেও বর্তমানে বিএনপিতে আবু সাইয়িদের অবস্থান মূলত একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ পরিচয়েই সীমাবদ্ধ। নিজ এলাকা পাবনার স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণ ও বয়সের কারণে দলের মাঠপর্যায়ের সিদ্ধান্তেও তার খুব একটা সক্রিয় ভূমিকা নেই। ফলে মাঠের রাজনীতির প্রধান নিয়ন্ত্রক হওয়ার চেয়ে তিনি এখন কেবলই একজন ‘অলংকারিক’ প্রবীণ নেতার পরিচয় বহন করছেন।
তিন মেয়াদে সভাপতির দায়িত্ব পালন করা মনজুরুল আহসান খানকে দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে উপদেষ্টার পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পর সদস্যপদও বাতিল করে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। দুই বছর আগে তিনি নিজেও দল থেকে পদত্যাগ করেন। পরে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হলে দলের কর্মসূচিতে মাঝে মাঝে উপস্থিত থাকলেও এই বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ রাজনীতিতে অনেকটা নিষ্ক্রিয় বলা যায়।
পাকিস্তান আমলে ষাটের দশক থেকেই বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত মনজুরুল আহসান খান ১৯৯৯ সালের কংগ্রেসে প্রথমবারের মতো সিপিবি সভাপতি নির্বাচিত হন। তিন মেয়াদে টানা ১৩ বছর সে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০১২ সালের কংগ্রেসে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম সভাপতি নির্বাচিত হলে মনজুরুল আহসানকে দলের উপদেষ্টা নির্বাচিত করা হয়।
সিপিবির উপদেষ্টা হিসেবে দলের বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকতেন মনজুরুল আহসান। ২০২১ সালে একটি দৈনিক পত্রিকায় লিখিত প্রবন্ধে ও আরেকটি দৈনিকে দেওয়া সাক্ষাৎকার দিয়ে আলোচনায় আসেন তিনি। ওই সময় ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ)। সেই সরকার নিয়ে তার দেওয়া বক্তব্য ‘দলের দৃষ্টিভঙ্গি, মূল্যায়ন ও রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক’ হওয়ায় তাকে ছয় মাসের জন্য উপদেষ্টার দায়িত্ব থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত নেয় সিপিবি।
২০২৪ সালে আরেকটি দৈনিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পার্টির সমালোচনা করে ফের আলোচনায় আসেন মনজুরুল আহসান খান। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, সিপিবির তখনকার নেতৃত্ব অতীতে কোনো আন্দোলন করেনি, তখনো করছিল না। খুবই কম কর্মসূচি গ্রহণ করা, কর্মসূচি ডেকে জমায়েত করতে না পারার মতো অভিযোগ করেন তিনি। ওই নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে মনজুরুল বলেন, সম্মেলন করে ওই নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়া হবে।

এমন বক্তব্যর পর দলের ভেতরে ও বাইরে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। পরে ২০২৪ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি মনজুরুল আহসান খানকে উপদেষ্টার পদ থেকে স্থায়ীভাবে অব্যাহতি দেয় সিপিবি। শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকায় তার সদস্য পদও বাতিল করা হয়। মাস চারেক পর ওই বছরের ৩ জুলাই দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বরাবার চিঠি দিয়ে সিপিবি থেকে পদত্যাগ করেন তিনি।
ওই চিঠিতেও মনজুরুল আহসান খান ‘লুটপাটতন্ত্র, দুঃশাসনের বিরুদ্ধে বাম-গণতান্ত্রিক বিকল্প গড়ার জন্য কংগ্রেসে গৃহীত সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের থেকে বিচ্যুত হয়ে বিশ্বাসঘাতকতামূলকভাবে সুবিধাবাদী ও সংস্কারবাদী লাইন অনুসরণে’র অভিযোগ করেন সিপিবি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে। ‘গণতান্ত্রিক-কেন্দ্রীকতার নীতি অগ্রাহ্য করে গায়ের জোরে, আধিপত্যবাদী কায়দায় ও হুকুমধারীর রেজিমেন্টেশনের পদ্ধতিতে’ পার্টি চালানোর অভিযোগ তুলে পদত্যাগ করেন তিনি। সিপিবি সূত্র জানিয়েছে, পরে তার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে।
জানতে চাইলে সিপিবি সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘মনজুরুল আহসান খানের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। মাঝে মাঝে দলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দেন তিনি। তবে বয়সের কারণে অনেক কিছু মনে রাখতে পারেন না।’
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) আরেক সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমও রাজনৈতিক পাদপ্রদীপের বাইরে রয়েছেন। নানা ধরনের শারীরিক জটিলতাতেও ভুগছেন তিনি। বর্তমানে তিনি ভারতে চিকিৎসাধীন।
ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত পড়েন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম স্বাধীনতার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) প্রথম নির্বাচিত সহসভাপতি (ভিপি)। ছাত্রজীবন শেষে বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর সমিতি গড়ে তোলেন তিনি। পরে যুক্ত হন সিপিবির রাজনীতিতে। সিপিবির ১৯৯৩ সালের কংগ্রেসে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তিনি, সে পদে দায়িত্ব পালন করেন ২০১২ সাল পর্যন্ত একটানা ১৯ বছর। ওই বছর অনুষ্ঠিত পার্টির দশম কংগ্রেসে সভাপতি নির্বাচিত হন, দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন ২০২২ সাল পর্যন্ত।

সিপিবির নেতৃত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর পরও দলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন সেলিম। বিভিন্ন সভা-সমাবেশ-সেমিনারে যোগ দিতেন তিনি। শারীরিক অসুস্থতার আক্রান্ত হয়ে গত ৭ জুন হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় তাকে। নিউমোনিয়াজনিত শ্বাসকষ্ট ও ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতার কারণে তাকে ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে গত ২৫ জুন তাকে নেওয়া হয় ভারতের চেন্নাইয়ে। চিকিৎসা নিয়ে দেশে ফেরার পর আবারও সেখানে নিতে হয়েছে তাকে।
সিপিবি সভাপতি সাজ্জাদ জহির চন্দন রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমকে গত পরশু উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতের চেন্নাইয়ে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে সেখানেই চিকিৎসাধীন তিনি।’
দেশের বাম রাজনীতিতে আরেক পরিচিতমুখ কমরেড খালেকুজ্জামান। বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) প্রতিষ্ঠাতা তিনি। জনগণের অধিকার-লড়াইয়ের সংগ্রামে দীর্ঘদিন রাজপথে আন্দোলন করলেও ভোটের রাজনীতিতে কখনোই সুবিধা করতে পারেননি খালেকুজ্জামান ও তার দল। দলের নেতৃত্ব থেকে সরে যাওয়ার পর এখন সভা-সেমিনারে অংশগ্রহণের মধ্যেই নিজের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রেখেছেন তিনি।
ষাটের দশকের ছাত্রনেতা খালেকুজ্জামান ভূঁইয়া ১৯৮০ সালে গড়ে তোলেন বাসদ। পরবর্তী চার দশকে দলটি চারবার ভাঙনের শিকার হয়। তবে কমরেড খালেকুজ্জামান মূল বাসদকে ধরে রেখেছিলেন। ২০২২ সালের ৪ মার্চ দলের প্রথম কংগ্রেসে নেতৃত্ব ছাড়েন তিনি, বজলুর রশীদ ফিরোজ ও রাজেকুজ্জামান রতনের নেতৃত্বে নতুন কমিটি নির্বাচিত হয় বাসদের।

এই বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদের ৮০তম জন্মদিন ছিল গত ২৮ এপ্রিল। এ উপলক্ষ্যে গত ৯ মে এক সংবর্ধনা ও শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠান আয়োজন করে বাসদ। বজলুর রশীদ ফিরোজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সিপিবির সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান, গণফোরাম সভাপতি সুব্রত চৌধুরী, বাসদের সহসাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
বাসদের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে সরে যাওয়ার পরও দলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে থাকেন কমরেড খালেকুজ্জামান। এ ছাড়া জাতীয় প্রেস ক্লাবসহ বিভিন্ন স্থানে আয়োজিত সভা-সেমিনারেও নিয়মিত বক্তা হিসেবে উপস্থিত থাকেন তিনি। মূলত এসব কার্যক্রমের মাধ্যমেই রাজনীতিতে সম্পৃক্ততা ধরে রেখেছেন তিনি।
মুক্তিযুদ্ধকালীন ছাত্রনেতা ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) অন্যতম শীর্ষ সংগঠক শরীফ নুরুল আম্বিয়া। ২০১৬ সালে ইনুর নেতৃত্বাধীন জাসদ ভেঙে আলাদা ‘জাসদ (আম্বিয়া)’ গঠন করেন। মাঠের রাজনীতিতে কর্মী-সমর্থক না থাকা এবং জোটগত রাজনীতিতে স্থান না পাওয়ায় তার দলটি বড় অস্তিত্ব সংকটে পড়ে। রাজনীতিতে তিনি এখন নিষ্ক্রিয় বললেই চলে।
বাম রাজনীতির সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আম্বিয়ার নেতৃত্বাধীন জাসদ মূলত কাগজ-কলম আর কেন্দ্রীয় নেতাদের বিবৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। মাঠপর্যায়ে শক্তিশালী কোনো কর্মী-সমর্থক বা জনভিত্তি না থাকায় তার নেতৃত্বাধীন এই রাজনৈতিক দল কখনোই স্বতন্ত্রভাবে বড় কোনো রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি।

শুরুতে অবশ্য জাসদ (আম্বিয়া) আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটের শরিক হিসেবে কিছুটা দৃশ্যমান ছিল। পরে ২০২২ সালের দিকে তারা সেই জোটও ত্যাগ করে। এরপর ২০২৩ সালে নির্বাচন কমিশন থেকে ‘মোটরগাড়ি’ প্রতীকে নিবন্ধন পায় দলটি।
দল নিয়ে ১৪-দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে আসার পর সমমনা কিছু বাম ধারার রাজনৈতিক দলের সঙ্গে মিলে যৌথ কর্মকাণ্ড বা যুগপৎ আন্দোলনের চেষ্টা চালিয়েছিলেন শরীফ নুরুল আম্বিয়া। তবে এসব কর্মকাণ্ড জাতীয় রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে বার্ধক্য ও মাঠের রাজনীতির জোয়ার না থাকায় শরীফ নুরুল আম্বিয়া সক্রিয় রাজনীতি থেকে প্রায় ছিটকে পড়েছেন।
সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদের সাবেক স্ত্রী বিদিশা সিদ্দিক ২০০৪-০৫ সালের দিকে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে দেশ জুড়ে সাড়া ফেলেন। এরশাদের মৃত্যুর পর জাতীয় পার্টি পুনর্গঠনের কাজ শুরু করার কথাও বলেন। তাতে সুবিধা করতে না পেরে এরশাদপুত্র এরিককে সামনে রেখে ‘এরশাদ ট্রাস্ট’ নিজের আয়ত্তে নেওয়ার চেষ্টা করেন বিদিশা।
এরপরও একাধিকবার রাজনীতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন বিদিশা। কিন্তু জাতীয় পার্টির ভেতরে-বাইরে কোনো সুবিধা করতে পারেননি আলোচিত এই মুখ। এরশাদ ট্রাস্টের ইস্যু নিয়ে জাতীয় পার্টির নেতারাও চটে আছেন তার ওপর।

এদিকে দীর্ঘদিন প্রচারমাধ্যমের চোখ থেকে পুরোপুরি আড়ালেই ছিলেন বিদিশা। ব্যক্তিগত ব্যবসা ও ট্রাস্টের কার্যক্রম ছাড়া মূলধারার রাজনীতিতে তার আর কোনো উপস্থিতি নেই। সম্প্রতি যোগাযোগ করা হলে জানিয়েছিলেন, রাজনীতিতে সময় দেওয়ার সুযোগ নেই।
এর মধ্যেই বিদিশা নতুন করে আলোচনায় এসেছেন আইনি জটিলতার সূত্রে। ২০০৮ সালে ফ্ল্যাট বিক্রির নামে টাকা নিয়েও ফ্ল্যাট বুঝিয়ে না দিয়ে টাকা আত্মসাতের অভিযোগে এক ব্যবসায়ী মামলা করেছিলেন তার নামে। এ বছরের ২০ মে সেই মামলায় আদালত তাকে দুই বছরের কারাদণ্ড সাজা দিয়েছিলেন। গত ২৫ আগস্ট সেই মামলাতেই তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সপ্তাহদুয়েক পরে হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে শেষ পর্যন্ত কারামুক্ত হয়েছেন বিদিশা।
২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে শাহবাগে গড়ে ওঠা ‘গণজাগরণ মঞ্চের’ মুখপাত্র হিসেবে দেশ জুড়ে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন চিকিৎসক ডা. ইমরান এইচ সরকার। রাজপথের সেই আন্দোলনের সুবাদে তিনি জাতীয় রাজনীতিতেও পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। পরে মঞ্চের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, রাজনৈতিক বিরোধ আর ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুড়িগ্রাম-৪ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে পরাজিত হওয়ার পর ধীরে ধীরে প্রকাশ্য রাজনীতি ও রাজপথের দৃশ্যপট থেকে ছিটকে পড়েন ইমরান।
ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও অতীতে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছেন ইমরান এইচ সরকার। ২০১৬ সালে তিনি তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের কন্যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক নাদিয়া নন্দিতা ইসলামের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। সেই সংসার দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, দুই বছরের মাথায় তাদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে, যা সে সময় গণমাধ্যমে বেশ আলোচিত হয়েছিল।

এদিকে গণজাগরণ মঞ্চ দিয়ে আলোচনায় আসা ইমরান ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুড়িগ্রাম-৪ আসনে মোটরগাড়ি মার্কায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। কিন্তু সেই নির্বাচনে পেয়েছিলেন মাত্র দুই হাজার ৭৭৫ ভোট। এই আসনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী জাকির হোসেন এক লাখ ৬২ হাজার ৬৩৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। বিএনপির প্রার্থী আজিজুর রহমান সে নির্বাচনে পেয়েছিলেন ৫৫ হাজার ৯৬০ ভোট।
ওই নির্বাচনের পর থেকেই মূলত রাজনীতির মাঠ থেকে হারিয়ে যান ইমরান এইচ সরকার। তিনি দেশে না বিদেশে অবস্থান করছেন, সে বিষয়েও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। রাজনীতির মাঠে না থাকলেও মাঝে কিছুদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় ছিলেন তিনি। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের পর অনিয়মিতভাবে কিছু পোস্ট দিয়েছেন নিজের প্রোফাইলে, যেগুলো আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) পক্ষে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এখন অনেকটাই অনিয়মিত তিনি।
একটি সূত্র বলছে, বর্তমানে চিকিৎসা পেশায় মনোযোগ দিয়েছেন ইমরান। তবে কোথায় প্র্যাকটিস করছেন, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

সময়ের পরিক্রমায় দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে হারিয়ে যাচ্ছেন অনেক বর্ষীয়ান ও আলোচিত রাজনীতিক। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ক্ষমতার রদবদল, দলীয় বিভাজন কিংবা সাংগঠনিক সক্ষমতা না থাকায় কোনো নেতার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা দলও হারিয়ে যেতে বসেছে। আবার রাজনীতির মূল স্রোত থেকে কোনো কোনো নেতা বয়সের ভারেও পুরোপুরি নীরব হয়ে গেছেন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে একসময় বড় প্রভাব বিস্তার করা এবং পরবর্তী সময়ে আলোচনার বাইরে চলে যাওয়া প্রবীণ ও আলোচিত ব্যক্তিত্বদের মধ্যে রয়েছেন গণফোরামের ড. কামাল হোসেন, জাতীয় পার্টির (জেপি) আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, প্রয়াত হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদসহ আরও কয়েকজন। এ পর্বে এসব বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
দেশের বর্ষীয়ান রাজনীতিকদের মধ্যে বয়সের ভার ও শারীরিক অসুস্থতায় কাবু হয়ে পড়েছেন সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা ও গণফোরামের প্রতিষ্ঠাতা ড. কামাল হোসেন। গত জানুয়ারিতে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তিও করা হয়েছিল।
৮৮ বছর বয়সী ড. কামাল হোসেন ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির প্রধান ছিলেন। রাজনৈতিক দল গণফোরাম নিয়ে লম্বা সময় চেষ্টা করেও সেই অর্থে আলোর মুখ দেখতে পারেনি। গড়ে ওঠেনি কর্মীবাহিনী। জনসমর্থন কুড়াতে না পারায় সংসদীয় রাজনীতিতেও তেমন সুবিধা করতে পারেননি এই সংবিধান বিশেষজ্ঞ। রাজনীতিসহ পেশাগত কাজ থেকেও কার্যত দূরে থাকা ড. কামাল হোসেন সবশেষ বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে গিয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর আমলের আইন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন আশির দশকে আওয়ামী লীগ থেকে ছিটকে গিয়ে ১৯৯৩ সালে গঠন করেন ‘গণফোরাম’। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে মিলে ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে’র নেতৃত্ব দিয়ে তিনি বিরোধী রাজনীতির নেতা হিসেবে সামনের সারিতে এলেও কিছু করতে পারেননি। বরং ২০১৮-এর নির্বাচনের পর ভাঙন ধরে ঐক্যফ্রন্টে।
অন্যদিকে নিজের দল গণফোরামে একের পর এক অভ্যন্তরীণ কোন্দল ড. কামালের রাজনীতিকে প্রভাবহীন করে ফেলে। বয়সের ভার ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে ২০২৩ সালের অক্টোবরের গণফোরামের সভাপতির পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর গ্রহণ করেন ড. কামাল হোসেন। বর্তমানে রাজধানীর বেইলি রোডের বাসভবনেই সময় কাটে বলে জানা গেছে।
রাজনীতিতে একেবারেই নিষ্ক্রিয় ড. কামাল হোসেনের ফের রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে মনে করছেন ঘনিষ্ঠজনরা।
দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার উত্তরসূরি ও জাতীয় পার্টির দীর্ঘদিনের শীর্ষ নেতা আনোয়ার হোসেন মঞ্জু পিরোজপুর-২ আসন থেকে সাতবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরশাদ ও আওয়ামী লীগ উভয় সরকারের আমলেই বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই রাজনীতিক ২০০১ সালে গঠন করেন জাতীয় পার্টি (জেপি)।
বিপুল সম্পদশালী এই রাজনীতিক অবশ্য নিজের দল নিয়ে খুব একটা ভালো সময় পার করতে পারেননি। ভোটের মাঠে মঞ্জুর নিজ আসনের বাইরে কোথাও ন্যূনতম সুবিধাও করতে পারেননি জেপির নেতারা।

চব্বিশের পটপরিবর্তনের রাজনৈতিক সমীকরণে নির্বাচনি এলাকা ও ক্ষমতার কেন্দ্র— উভয় স্থান থেকেই ছিটকে পড়েন আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। বর্তমানে আইনি জটিলতা ও বার্ধক্যের কারণে তার সক্রিয় রাজনীতিতে ফেরার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য।
এর মধ্যে গত বছরের সেপ্টেম্বরে ধানমন্ডি থেকে গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদ। পরে দ্রুত সময়ের মধ্যে জিম্মা জামিনে মুক্তি পান তিনি।
এদিকে সবশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথম অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও পরে সরে দাঁড়ান সাবেক মন্ত্রী মঞ্জু। পিরোজপুর-২ (কাউখালী, ভান্ডারিয়া, নেছারাবাদ) আসনে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করলেও পরে শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে নির্বাচন থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন তিনি। এরপর আর তাকে কোনো কার্যক্রমে দেখা যায়নি।
জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সহধর্মিণী ও সাবেক বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ। এরশাদের মৃত্যুর পর দেবর জি এম কাদেরের সঙ্গে দলীয় আধিপত্যের দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। জাপার সিংহভাগ নেতাকর্মী জি এম কাদেরের পক্ষে চলে যাওয়ায় মূল ধারা থেকে ছিটকে পড়েন রওশন।
অন্যদিকে অসুস্থতা পিছু ছাড়ছে না রওশন এরশাদের। ক্রমেই অসুস্থতা বাড়তে থাকায় লম্বা সময় হাসপাতালে কাটাতে হয়েছে তাকে। নিতে হয়েছে আইসিইউতেও। তবে অনেক আগে হাসপাতাল ছাড়লেও অসুস্থতাকে সঙ্গে নিয়েই এখন বাসায় কাটছে তার। বার্ধক্য, অসুস্থতা ও হুইলচেয়ার-নির্ভর জীবনের কারণে তিনি মূলত রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে নির্বাসনে রয়েছেন।
এদিকে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ‘রওশনপন্থি’ হিসেবে পরিচিত অনেকে জি এম কাদেরের বলয়ে চলে এসেছেন। এরপরও যারা তার সঙ্গে আছেন তাদের দলে খুব একটা প্রভাব নেই। সে কারণে রাজনীতির মাঠ থেকে এরশাদপত্নী রওশনের আনুষ্ঠানিক বিদায় বলা চলে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রওশন এরশাদের সঙ্গে যেমন নেতাদের যোগাযোগ নেই, দলের নেতারাও খুব একটা তার খোঁজখবর রাখছেন না। ছেলে রাহগির আল মাহি এরশাদ ওরফে সাদ এরশাদ মায়ের খোঁজখবর রাখছেন।
সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে রওশন এরশাদ ও সাদ এরশাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। একাধিকবার ফোন করলেও রিসিভ করেননি তাদের কেউ।
জাতীয় পার্টির একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আসলে ওনার (রওশন এরশাদ) সঙ্গে অনেক দিন ধরে যোগাযোগ নেই। কেমন আছেন তাও জানি না। তার ছেলের সঙ্গে কথা বললে জানতে পারবেন।’
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডির) আ স ম আব্দুর রব শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন অনেক দিন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম এই সংগঠক ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার হাজার ছাত্র-জনতার মাঝে প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন।
মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জাসদ গঠনে প্রধান ভূমিকা রাখলেও দলে বেশি দিন থাকতে পারেননি রব। পরে জেএসডি (রব) গঠন করেন এবং ১৯৯৬ সালে ঐকমত্যের সরকারে মন্ত্রী হন। ২০১৮ সালেও তিনি ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতাদের একজন ছিলেন।
সবশেষ ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসনে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) পক্ষ থেকে আ স ম রবের সহধর্মিণী তানিয়া রব প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। তবে এই আসনে রবের দল বিএনপির পক্ষ থেকে ছাড় পায়নি। বিএনপির প্রার্থী এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজানই জয়ী হন।

একদিকে শারীরিক অসুস্থতা অন্যদিকে দীর্ঘদিনেও দলের সাংগঠনিক ভিত মজবুত করতে না পারায় মূল ধারার রাজনীতিতে অনেকটা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছেন আ স ম আবদুর রব। বর্তমানে বয়সের ভার ও নানা জটিলতায় ভুগছেন এই প্রবীণ নেতা। মাঝে মধ্যে দল থেকে দুয়েকটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া ছাড়া রাজনীতিতে তিনি পুরোপুরি অনুপস্থিত।
আ স ম আবদুর রবের শারীরিক অবস্থা ও দলের সামগ্রিক বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে তানিয়া রব বলেন, ‘তিনি অনেক দিন ধরেই নানা অসুস্থতায় ভুগছেন। ডিপেন্ডেন্ট হয়ে গেছেন, একা একা চলতে পারেন না। চিকিৎসা চলছে। এমন অবস্থায় বাসায় রেখে চিকিৎসা দিচ্ছি।’
দলের বিষয়ে তানিয়া রব বলেন, ‘যেভাবে দল চালানো দরকার, আমি একা সেভাবে পারছি না। তবে জেলায় জেলায় সমন্বয় টিম করা হয়েছে। কাউন্সিলের জন্য প্রতিটি এলাকায় নতুন নেতৃত্ব তৈরি, সাংগঠনিক পুনর্গঠনের কাজ করা হচ্ছে।’
দেশের রাজনীতিতে পরিচিতমুখ অধ্যাপক আবু সাইয়িদ। ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম তরুণ সদস্য ছিলেন তিনি। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জিতে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তথ্য প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তবে আলোচিত এক-এগারোর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় ‘সংস্কারপন্থি’ হিসেবে আওয়ামী লীগের মূল ধারা থেকে ছিটকে পড়েন।
এরপর প্রায় এক দশক ধরে রাজনীতির মাঠের বাইরেই ছিলেন আবু সাইয়িদ। পরে ২০১৮ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বিরোধীদলীয় রাজনীতিকে চাঙ্গা করলে গণফোরামে যোগ দেন তিনি। ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রার্থীও হন ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে। তবে ভোটে জিততে পারেননি। রাজনীতিতেও আর আগের মতো অবস্থান ধরে রাখতে পারেননি।

দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার পর আবু সাইয়িদ ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দেন। একজন প্রবীণ নেতা ও সংবিধান প্রণয়নকারী হিসেবে তার এই দলবদল রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ আলোচনার জন্ম দেয়। তবে এ পর্যায়ে এসে এ সিদ্ধান্তও তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে কোনো রদবদল আনতে পারেনি।
বিএনপিতে যোগ দিলেও বর্তমানে বিএনপিতে আবু সাইয়িদের অবস্থান মূলত একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ পরিচয়েই সীমাবদ্ধ। নিজ এলাকা পাবনার স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণ ও বয়সের কারণে দলের মাঠপর্যায়ের সিদ্ধান্তেও তার খুব একটা সক্রিয় ভূমিকা নেই। ফলে মাঠের রাজনীতির প্রধান নিয়ন্ত্রক হওয়ার চেয়ে তিনি এখন কেবলই একজন ‘অলংকারিক’ প্রবীণ নেতার পরিচয় বহন করছেন।
তিন মেয়াদে সভাপতির দায়িত্ব পালন করা মনজুরুল আহসান খানকে দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে উপদেষ্টার পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পর সদস্যপদও বাতিল করে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। দুই বছর আগে তিনি নিজেও দল থেকে পদত্যাগ করেন। পরে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হলে দলের কর্মসূচিতে মাঝে মাঝে উপস্থিত থাকলেও এই বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ রাজনীতিতে অনেকটা নিষ্ক্রিয় বলা যায়।
পাকিস্তান আমলে ষাটের দশক থেকেই বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত মনজুরুল আহসান খান ১৯৯৯ সালের কংগ্রেসে প্রথমবারের মতো সিপিবি সভাপতি নির্বাচিত হন। তিন মেয়াদে টানা ১৩ বছর সে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০১২ সালের কংগ্রেসে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম সভাপতি নির্বাচিত হলে মনজুরুল আহসানকে দলের উপদেষ্টা নির্বাচিত করা হয়।
সিপিবির উপদেষ্টা হিসেবে দলের বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকতেন মনজুরুল আহসান। ২০২১ সালে একটি দৈনিক পত্রিকায় লিখিত প্রবন্ধে ও আরেকটি দৈনিকে দেওয়া সাক্ষাৎকার দিয়ে আলোচনায় আসেন তিনি। ওই সময় ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ)। সেই সরকার নিয়ে তার দেওয়া বক্তব্য ‘দলের দৃষ্টিভঙ্গি, মূল্যায়ন ও রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক’ হওয়ায় তাকে ছয় মাসের জন্য উপদেষ্টার দায়িত্ব থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত নেয় সিপিবি।
২০২৪ সালে আরেকটি দৈনিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পার্টির সমালোচনা করে ফের আলোচনায় আসেন মনজুরুল আহসান খান। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, সিপিবির তখনকার নেতৃত্ব অতীতে কোনো আন্দোলন করেনি, তখনো করছিল না। খুবই কম কর্মসূচি গ্রহণ করা, কর্মসূচি ডেকে জমায়েত করতে না পারার মতো অভিযোগ করেন তিনি। ওই নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে মনজুরুল বলেন, সম্মেলন করে ওই নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়া হবে।

এমন বক্তব্যর পর দলের ভেতরে ও বাইরে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। পরে ২০২৪ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি মনজুরুল আহসান খানকে উপদেষ্টার পদ থেকে স্থায়ীভাবে অব্যাহতি দেয় সিপিবি। শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকায় তার সদস্য পদও বাতিল করা হয়। মাস চারেক পর ওই বছরের ৩ জুলাই দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বরাবার চিঠি দিয়ে সিপিবি থেকে পদত্যাগ করেন তিনি।
ওই চিঠিতেও মনজুরুল আহসান খান ‘লুটপাটতন্ত্র, দুঃশাসনের বিরুদ্ধে বাম-গণতান্ত্রিক বিকল্প গড়ার জন্য কংগ্রেসে গৃহীত সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের থেকে বিচ্যুত হয়ে বিশ্বাসঘাতকতামূলকভাবে সুবিধাবাদী ও সংস্কারবাদী লাইন অনুসরণে’র অভিযোগ করেন সিপিবি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে। ‘গণতান্ত্রিক-কেন্দ্রীকতার নীতি অগ্রাহ্য করে গায়ের জোরে, আধিপত্যবাদী কায়দায় ও হুকুমধারীর রেজিমেন্টেশনের পদ্ধতিতে’ পার্টি চালানোর অভিযোগ তুলে পদত্যাগ করেন তিনি। সিপিবি সূত্র জানিয়েছে, পরে তার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে।
জানতে চাইলে সিপিবি সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘মনজুরুল আহসান খানের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। মাঝে মাঝে দলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দেন তিনি। তবে বয়সের কারণে অনেক কিছু মনে রাখতে পারেন না।’
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) আরেক সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমও রাজনৈতিক পাদপ্রদীপের বাইরে রয়েছেন। নানা ধরনের শারীরিক জটিলতাতেও ভুগছেন তিনি। বর্তমানে তিনি ভারতে চিকিৎসাধীন।
ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত পড়েন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম স্বাধীনতার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) প্রথম নির্বাচিত সহসভাপতি (ভিপি)। ছাত্রজীবন শেষে বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর সমিতি গড়ে তোলেন তিনি। পরে যুক্ত হন সিপিবির রাজনীতিতে। সিপিবির ১৯৯৩ সালের কংগ্রেসে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তিনি, সে পদে দায়িত্ব পালন করেন ২০১২ সাল পর্যন্ত একটানা ১৯ বছর। ওই বছর অনুষ্ঠিত পার্টির দশম কংগ্রেসে সভাপতি নির্বাচিত হন, দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন ২০২২ সাল পর্যন্ত।

সিপিবির নেতৃত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর পরও দলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন সেলিম। বিভিন্ন সভা-সমাবেশ-সেমিনারে যোগ দিতেন তিনি। শারীরিক অসুস্থতার আক্রান্ত হয়ে গত ৭ জুন হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় তাকে। নিউমোনিয়াজনিত শ্বাসকষ্ট ও ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতার কারণে তাকে ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে গত ২৫ জুন তাকে নেওয়া হয় ভারতের চেন্নাইয়ে। চিকিৎসা নিয়ে দেশে ফেরার পর আবারও সেখানে নিতে হয়েছে তাকে।
সিপিবি সভাপতি সাজ্জাদ জহির চন্দন রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমকে গত পরশু উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতের চেন্নাইয়ে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে সেখানেই চিকিৎসাধীন তিনি।’
দেশের বাম রাজনীতিতে আরেক পরিচিতমুখ কমরেড খালেকুজ্জামান। বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) প্রতিষ্ঠাতা তিনি। জনগণের অধিকার-লড়াইয়ের সংগ্রামে দীর্ঘদিন রাজপথে আন্দোলন করলেও ভোটের রাজনীতিতে কখনোই সুবিধা করতে পারেননি খালেকুজ্জামান ও তার দল। দলের নেতৃত্ব থেকে সরে যাওয়ার পর এখন সভা-সেমিনারে অংশগ্রহণের মধ্যেই নিজের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রেখেছেন তিনি।
ষাটের দশকের ছাত্রনেতা খালেকুজ্জামান ভূঁইয়া ১৯৮০ সালে গড়ে তোলেন বাসদ। পরবর্তী চার দশকে দলটি চারবার ভাঙনের শিকার হয়। তবে কমরেড খালেকুজ্জামান মূল বাসদকে ধরে রেখেছিলেন। ২০২২ সালের ৪ মার্চ দলের প্রথম কংগ্রেসে নেতৃত্ব ছাড়েন তিনি, বজলুর রশীদ ফিরোজ ও রাজেকুজ্জামান রতনের নেতৃত্বে নতুন কমিটি নির্বাচিত হয় বাসদের।

এই বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদের ৮০তম জন্মদিন ছিল গত ২৮ এপ্রিল। এ উপলক্ষ্যে গত ৯ মে এক সংবর্ধনা ও শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠান আয়োজন করে বাসদ। বজলুর রশীদ ফিরোজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সিপিবির সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান, গণফোরাম সভাপতি সুব্রত চৌধুরী, বাসদের সহসাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
বাসদের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে সরে যাওয়ার পরও দলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে থাকেন কমরেড খালেকুজ্জামান। এ ছাড়া জাতীয় প্রেস ক্লাবসহ বিভিন্ন স্থানে আয়োজিত সভা-সেমিনারেও নিয়মিত বক্তা হিসেবে উপস্থিত থাকেন তিনি। মূলত এসব কার্যক্রমের মাধ্যমেই রাজনীতিতে সম্পৃক্ততা ধরে রেখেছেন তিনি।
মুক্তিযুদ্ধকালীন ছাত্রনেতা ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) অন্যতম শীর্ষ সংগঠক শরীফ নুরুল আম্বিয়া। ২০১৬ সালে ইনুর নেতৃত্বাধীন জাসদ ভেঙে আলাদা ‘জাসদ (আম্বিয়া)’ গঠন করেন। মাঠের রাজনীতিতে কর্মী-সমর্থক না থাকা এবং জোটগত রাজনীতিতে স্থান না পাওয়ায় তার দলটি বড় অস্তিত্ব সংকটে পড়ে। রাজনীতিতে তিনি এখন নিষ্ক্রিয় বললেই চলে।
বাম রাজনীতির সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আম্বিয়ার নেতৃত্বাধীন জাসদ মূলত কাগজ-কলম আর কেন্দ্রীয় নেতাদের বিবৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। মাঠপর্যায়ে শক্তিশালী কোনো কর্মী-সমর্থক বা জনভিত্তি না থাকায় তার নেতৃত্বাধীন এই রাজনৈতিক দল কখনোই স্বতন্ত্রভাবে বড় কোনো রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি।

শুরুতে অবশ্য জাসদ (আম্বিয়া) আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটের শরিক হিসেবে কিছুটা দৃশ্যমান ছিল। পরে ২০২২ সালের দিকে তারা সেই জোটও ত্যাগ করে। এরপর ২০২৩ সালে নির্বাচন কমিশন থেকে ‘মোটরগাড়ি’ প্রতীকে নিবন্ধন পায় দলটি।
দল নিয়ে ১৪-দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে আসার পর সমমনা কিছু বাম ধারার রাজনৈতিক দলের সঙ্গে মিলে যৌথ কর্মকাণ্ড বা যুগপৎ আন্দোলনের চেষ্টা চালিয়েছিলেন শরীফ নুরুল আম্বিয়া। তবে এসব কর্মকাণ্ড জাতীয় রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে বার্ধক্য ও মাঠের রাজনীতির জোয়ার না থাকায় শরীফ নুরুল আম্বিয়া সক্রিয় রাজনীতি থেকে প্রায় ছিটকে পড়েছেন।
সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদের সাবেক স্ত্রী বিদিশা সিদ্দিক ২০০৪-০৫ সালের দিকে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে দেশ জুড়ে সাড়া ফেলেন। এরশাদের মৃত্যুর পর জাতীয় পার্টি পুনর্গঠনের কাজ শুরু করার কথাও বলেন। তাতে সুবিধা করতে না পেরে এরশাদপুত্র এরিককে সামনে রেখে ‘এরশাদ ট্রাস্ট’ নিজের আয়ত্তে নেওয়ার চেষ্টা করেন বিদিশা।
এরপরও একাধিকবার রাজনীতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন বিদিশা। কিন্তু জাতীয় পার্টির ভেতরে-বাইরে কোনো সুবিধা করতে পারেননি আলোচিত এই মুখ। এরশাদ ট্রাস্টের ইস্যু নিয়ে জাতীয় পার্টির নেতারাও চটে আছেন তার ওপর।

এদিকে দীর্ঘদিন প্রচারমাধ্যমের চোখ থেকে পুরোপুরি আড়ালেই ছিলেন বিদিশা। ব্যক্তিগত ব্যবসা ও ট্রাস্টের কার্যক্রম ছাড়া মূলধারার রাজনীতিতে তার আর কোনো উপস্থিতি নেই। সম্প্রতি যোগাযোগ করা হলে জানিয়েছিলেন, রাজনীতিতে সময় দেওয়ার সুযোগ নেই।
এর মধ্যেই বিদিশা নতুন করে আলোচনায় এসেছেন আইনি জটিলতার সূত্রে। ২০০৮ সালে ফ্ল্যাট বিক্রির নামে টাকা নিয়েও ফ্ল্যাট বুঝিয়ে না দিয়ে টাকা আত্মসাতের অভিযোগে এক ব্যবসায়ী মামলা করেছিলেন তার নামে। এ বছরের ২০ মে সেই মামলায় আদালত তাকে দুই বছরের কারাদণ্ড সাজা দিয়েছিলেন। গত ২৫ আগস্ট সেই মামলাতেই তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সপ্তাহদুয়েক পরে হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে শেষ পর্যন্ত কারামুক্ত হয়েছেন বিদিশা।
২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে শাহবাগে গড়ে ওঠা ‘গণজাগরণ মঞ্চের’ মুখপাত্র হিসেবে দেশ জুড়ে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন চিকিৎসক ডা. ইমরান এইচ সরকার। রাজপথের সেই আন্দোলনের সুবাদে তিনি জাতীয় রাজনীতিতেও পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। পরে মঞ্চের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, রাজনৈতিক বিরোধ আর ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুড়িগ্রাম-৪ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে পরাজিত হওয়ার পর ধীরে ধীরে প্রকাশ্য রাজনীতি ও রাজপথের দৃশ্যপট থেকে ছিটকে পড়েন ইমরান।
ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও অতীতে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছেন ইমরান এইচ সরকার। ২০১৬ সালে তিনি তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের কন্যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক নাদিয়া নন্দিতা ইসলামের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। সেই সংসার দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, দুই বছরের মাথায় তাদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে, যা সে সময় গণমাধ্যমে বেশ আলোচিত হয়েছিল।

এদিকে গণজাগরণ মঞ্চ দিয়ে আলোচনায় আসা ইমরান ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুড়িগ্রাম-৪ আসনে মোটরগাড়ি মার্কায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। কিন্তু সেই নির্বাচনে পেয়েছিলেন মাত্র দুই হাজার ৭৭৫ ভোট। এই আসনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী জাকির হোসেন এক লাখ ৬২ হাজার ৬৩৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। বিএনপির প্রার্থী আজিজুর রহমান সে নির্বাচনে পেয়েছিলেন ৫৫ হাজার ৯৬০ ভোট।
ওই নির্বাচনের পর থেকেই মূলত রাজনীতির মাঠ থেকে হারিয়ে যান ইমরান এইচ সরকার। তিনি দেশে না বিদেশে অবস্থান করছেন, সে বিষয়েও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। রাজনীতির মাঠে না থাকলেও মাঝে কিছুদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় ছিলেন তিনি। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের পর অনিয়মিতভাবে কিছু পোস্ট দিয়েছেন নিজের প্রোফাইলে, যেগুলো আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) পক্ষে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এখন অনেকটাই অনিয়মিত তিনি।
একটি সূত্র বলছে, বর্তমানে চিকিৎসা পেশায় মনোযোগ দিয়েছেন ইমরান। তবে কোথায় প্র্যাকটিস করছেন, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

বাণীতে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, জনগণের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই তাদের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। তিনি বলেন, ‘একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠা করাই এই মুহূর্তে জনগণের প্রতি সরকারের অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকার পূরণে ‘সবার আগে বাংলাদেশ- সবার জন্য বাংলাদেশ’ এই প্রত্যয়ে সরকার নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে।
১ দিন আগে
তার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে দুদকের চলমান কার্যক্রম নিয়ে তিনি বলেন, “খোঁজ নিয়ে আমি স্পষ্টভাবে জানতে পেরেছি কয়েকজন খুবই উচ্চ পর্যায়ের নেতা, তারা বিভিন্ন সময় বিশেষ করে সরকারে থাকা অবস্থায় আমার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে তারা অসন্তুষ্ট হয়েছেন এবং সেই প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যই এই পুরো প্রক্রিয়া চলমান আ
২ দিন আগে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক নেতৃবৃন্দ। একই সঙ্গে সংগ্রহশালা থেকে অবিলম্বে ছবিটি সরিয়ে ফেলার দাবি জানিয়েছেন তারা।
২ দিন আগে
সম্প্রতি এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারীর ‘ছাগলকাণ্ড’ থেকে শুরু করে প্রায় ৮০ বছর আগে মহাত্মা গান্ধীর ছাগল চুরির ঘটনা— রাজনৈতিক ইতিহাসের নানা অধ্যায়েই জড়িয়ে আছে ‘ছাগল’।
২ দিন আগে