জনগণ অনিশ্চয়তা ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছে : সিপিবি সভাপতি

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৩: ০৯

দেশের বর্তমান সংকট কোনো সাময়িক বা বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, এটা একটি ব্যবস্থাগত সংকট বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে সোমবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি এ মন্তব্য করেন।

সিপিবি সভাপতি বলেন, গণতন্ত্রের অবক্ষয়, আইনের শাসনের দুর্বলতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত, চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সাধারণ মানুষের জীবনমানের অবনতি, সব মিলিয়ে বাংলাদেশ আজ এক গুরুতর সন্ধিক্ষণে উপনীত হয়েছে। বর্তমান সংকট কোনো সাময়িক বা বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। এটি একটি ব্যবস্থাগত সংকট, যে ব্যবস্থায় রাষ্ট্র ক্রমে জনগণের কাছ থেকে দূরে সরে গেছে এবং সাধারণ মানুষ তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। সেই মুক্তিযুদ্ধ কেবল এই ভূখ-ের স্বাধীনতার সংগ্রাম ছিল না; মুক্তিযুদ্ধ ছিল শোষণ, বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনগণের ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান। মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল একটি গণতান্ত্রিক, সাম্যভিত্তিক ও মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে মানুষ মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে বাঁচবে। কিন্তু স্বাধীনতার দীর্ঘ পথচলায় আমাদের স্বীকার করতে হয়, এই স্বপ্ন আজও পূর্ণ হয়নি। রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো ক্রমে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক সম্পদ সীমিত একটি গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এর ফলেই স্বাধীন রাষ্ট্রে থেকেও সাধারণ মানুষ আজ নিরাপত্তাহীনতা, অনিশ্চয়তা ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছে।

এই বাস্তবতারই ধারাবাহিকতায় আমরা সাম্প্রতিক সময়েও জনগণের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের শক্তিশালী প্রকাশ প্রত্যক্ষ করেছি। দেশবাসীকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করে, গণতন্ত্র হরণ করে, দমনপীড়ন চালিয়ে অনির্বাচিত সরকারের শাসন চাপিয়ে দিয়ে এবং শোষণ ও বৈষম্যের মাধ্যমে মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে যে কর্তৃত্ববাদী ফ্যাসিস্ট দুঃশাসন কায়েম করা হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতা দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে লাগাতার সংগ্রাম চালিয়েছে।

সাজ্জাদ জহির চন্দন বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ছিল সেই ধারাবাহিক সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই গণ-অভ্যুত্থান স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিয়েছে যে, জনগণ দমনপীড়ন, বৈষম্য ও ফ্যাসিবাদী শাসনকে পরাস্ত করতে প্রয়োজনে অকাতরে জীবন উৎসর্গ করতে পারে। বুলেটের সামনে বুক পেতে দিতে মানুষ দ্বিধা করে না। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সহস্রাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। আমি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে শহীদদের স্মরণ করছি এবং এই হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করছি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষ একটি গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন সমাজ ও রাষ্ট্রের আকাক্সক্ষা প্রকাশ করেছে। কিন্তু সেই আক্ঙ্ক্ষাকে দমন করে এবং নানা কৌশলে পুরনো শোষণমূলক ব্যবস্থাকেই টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে।

সিপিবি সভাপতি আরো বলেন, গণমানুষের দিন বদলের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি উত্থাপন করেছে ‘ব্যবস্থা বদলের ইশতেহার’। এই ইশতেহার কেবল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির তালিকা নয়। এটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানসহ এ দেশের সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বারবার উচ্চারিত এবং বহু ক্ষেত্রে অব্যক্ত দাবিগুলোকে একটি গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সুস্পষ্ট রূপরেখায় রূপ দেওয়ার প্রয়াস। ইশতেহারের কেন্দ্রীয় দর্শন অত্যন্ত স্পষ্ট, আর তা হচ্ছে রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রে জনগণকে স্থাপন করা।

কমিউনিস্ট পার্টি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে-অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান ও কর্মসংস্থান কোনো দয়া বা অনুকম্পার বিষয় নয়; এগুলো মানুষের মৌলিক অধিকার। তাই আমরা অঙ্গীকার করছি, এই অধিকারগুলোকে সংবিধানে মৌলিক অধিকার হিসেবে সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করা হবে এবং সেগুলো বাস্তবায়নের দায় রাষ্ট্রকে নিতে হবে।

আজ দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। এই সংকট কেবল বাজারের স্বাভাবিক ওঠানামার ফল নয়; বরং অনিয়ন্ত্রিত বাজারব্যবস্থা, সিন্ডিকেট ও মজুতদারির প্রত্যক্ষ পরিণতি। এই প্রেক্ষাপটে সিপিবি প্রস্তাব করছে সর্বজনীন ও স্বচ্ছ খাদ্য রেশনিং ব্যবস্থা, যাতে প্রত্যেক নাগরিক ন্যায্য মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য পায় এবং বাজার মানুষের বিরুদ্ধে অস্ত্র হয়ে উঠতে না পারে।

একইসঙ্গে আমরা উৎপাদক-ভোক্তা সমবায় ব্যবস্থার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি। এই ব্যবস্থা কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থ রক্ষা করবে, ভোক্তাদের জন্য সাশ্রয়ী বাজার নিশ্চিত করবে এবং মধ্যস্বত্বভোগী লুটতরাজের অবসান ঘটাবে। এটি মুক্তিযুদ্ধের সাম্য ও ন্যায়ের দর্শনের একটি বাস্তব অর্থনৈতিক রূপ।

তিনি আরো বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের একটি প্রধান দাবি ছিল মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান ও নিরাপদ জীবনের। সেই দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সিপিবি ঘোষণা করছে জাতীয় কর্মসংস্থান কর্মসূচির, যার মাধ্যমে প্রতি পরিবারে অন্তত একজনের সম্মানজনক কাজ নিশ্চিত করা হবে। এটি ভাতা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সৃষ্ট কাজ, যাতে মানুষ আত্মসম্মান নিয়ে বাঁচতে পারে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা-এই দুটি ক্ষেত্রেও মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন এবং জনগণের সাম্প্রতিক আন্দোলনের আকাক্সক্ষা আজও অপূর্ণ। তাই সিপিবি অঙ্গীকার করছে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত সর্বজনীন স্বাস্থ্যব্যবস্থার এবং মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা ব্যবস্থার, যাতে কেউ অসুস্থতা বা দারিদ্র্যের কারণে তার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়।

ad
ad

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

ছাত্র ইউনিয়ন থেকে মেঘমল্লার বসুসহ ২ নেতার পদত্যাগ, ১ জনকে অব্যাহতি

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মেঘমল্লার বসু ও মাঈন আহমেদের দাখিল করা পদত্যাগপত্র কেন্দ্রীয় সংসদে গৃহীত হয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ায় একই সঙ্গে দুটি রাজনৈতিক সংগঠনের দায়িত্ব পালন করলে সাংগঠনিক মতদ্বৈধতা বা স্বার্থের দ্বন্দ্ব (কনফ্লিক্

২ দিন আগে

সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগই যথেষ্ট নয়, গ্রেপ্তার দাবি মামুনুল হকের

বিবৃতিতে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক ও মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ বলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন (চুপ্পু)-এর পদত্যাগ অনেক আগেই হওয়া উচিত ছিল।

৩ দিন আগে

বিএনপি পরিকল্পনামাফিক রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগ করিয়েছে: নাহিদ ইসলাম

নাহিদ ইসলাম বলেন, শারীরিক অসুস্থতার অজুহাতে সাহাবুদ্দিনকে সেফ এক্সিট দেওয়া যাবে না। তিনি যাতে বিদেশে পালিয়ে যেতে না পারেন, সে জন্য সরকারকে সজাগ থাকতে হবে এবং অনতিবিলম্বে তাকে গ্রেপ্তার করতে হবে।

৩ দিন আগে

সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে বিচারের দাবি এনসিপির

৩ দিন আগে