যেভাবে ‘আপসহীন নেত্রী’ হয়ে উঠলেন খালেদা জিয়া

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
বিভিন্ন মুহূর্তে খালেদা জিয়া। ছবি: সংগৃহীত

১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি। বাংলাদেশের রাজনীতির দৃশ্যপটে এক শান্ত কিন্তু দৃঢ় পদচারণা শুরু হয়। গৃহবধূর পরিচয় পেছনে ফেলে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শ ধারণ করে সেদিন আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে যোগ দেন খালেদা জিয়া, পূরণ করেন জিয়াউর রহমানের মৃত্যুতে এ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হওয়া শূন্যতা।

তৎকালীন সেনাশাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে শুরু হয় খালেদা জিয়ার দীর্ঘ ও বন্ধুর পথচলা। সে সময় রাজপথ ছিল উত্তাল, আর শাসকগোষ্ঠীর দমন-পীড়ন ছিল চরমে। কিন্তু মাঠের রাজনীতিতে নতুন হয়েও খালেদা জিয়া বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি নতি স্বীকার করার মানুষ নন।

১৯৮৩ সালের ২৮ নভেম্বর, ১৯৮৪ সালের ৩ মে ও ১৯৮৭ সালের ১১ নভেম্বর— এরশাদ সরকারের আমলে তিন তিনবার গ্রেপ্তার হতে হয়েছে খালেদা জিয়াকে। কোনো গ্রেপ্তারই দমাতে পারেনি তাকে, বরং কারাগারের দেয়াল তাকে জনগণের কাছে আরও শক্তিশালী নেতায় পরিণত করেছে।

Khaleda-Zia-03-Photo-Collage-30-12-2025

আশির দশকের সেই উত্তাল দিনগুলোতে খালেদা জিয়া ‘আপসহীন নেত্রী’ হয়ে ওঠেন মূলত ১৯৮৬ সালের সংসদ নির্বাচন ঘিরে। যখন দেশের অন্যতম প্রধান দলসহ অনেক রাজনৈতিক পক্ষ এরশাদের অধীনে নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে সম্মতি দিয়েছিল, তখন খালেদা জিয়া একাই ছিলেন অনড়।

তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, কোনো স্বৈরাচারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিয়ে তাকে বৈধতা দেবে না বিএনপি। লোকমুখে তখন খালেদা জিয়ার একটি কথাই ছড়িয়ে পড়েছিল— ‘স্বৈরাচারের সঙ্গে কোনো আপস নেই।’

লোভ কিংবা ক্ষমতার হাতছানি টলাতে পারেনি খালেদা জিয়াকে। নির্বাচনে না যাওয়ার সেই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত তাকে রাজনৈতিকভাবে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায় এবং সাধারণ মানুষের মনে তাকে এক পাহাড়সম দৃঢ় ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। সেই থেকেই খালেদা জিয়া দলীয় নেতাকর্মী তো বটেই, আপামর জনসাধারণের কাছেই তিনি হয়ে ওঠেন ‘আপসহীন নেত্রী’।

তবে খালেদা জিয়ার ‘আপসহীন’ যাত্রার শেষ সেখানেই নয়। সময়ের চাকা ঘুরে ২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেন নামে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমল। তখন খালেদা জিয়ার আপসহীনতার দ্বিতীয় অগ্নিপরীক্ষা শুরু। ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা বাস্তবায়নে তখন সেই সরকার মরিয়া। ‘মাইনাস টু’য়ের দুই নেত্রী খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হলো কারাগারে। বাঘা বাঘা নেতা সমঝোতা করে দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। শেখ হাসিনা পর্যন্ত চাপের মুখে দেশ ছাড়তে বাধ্য হলেন।

Khaleda-Zia-02-Photo-Collage-30-12-2025

খালেদা জিয়ার ওপরও প্রচণ্ড চাপ ছিল দেশত্যাগের। প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বিদেশের মাটিতে বিলাসী জীবনের, বদলে চাওয়া হয়েছিল রাজনীতি থেকে প্রস্থান। কিন্তু সেদিন দেশ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান তিনি।

খালেদা জিয়া তখন বলেছিলেন, ‘বিদেশে আমার কোনো জায়গা নেই, আমার জন্ম এই দেশে, মরণও হবে এই দেশে।’ নিজের দুই ছেলের ওপর নির্যাতন এবং কারাবরণ নিশ্চিত জেনেও তিনি এক চুল নড়েননি। বিদেশের নিরাপদ জীবনের চেয়ে দেশের কারাগারকে বেছে নিয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন, কেন তিনি আপসহীন নেত্রী।

এরপর শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমল ছিল খালেদা জিয়ার জন্য এক দীর্ঘ লড়াইয়ের কাল। একের পর এক মামলা, বছরের পর বছর আদালতে হাজিরা এবং অবশেষে কারাদণ্ড— কোনো কিছুই তাকে দেশত্যাগে বাধ্য করতে পারেনি।

বিশেষ করে ২০১৭ সালে যখন তিনি চিকিৎসার জন্য লন্ডনে অবস্থান করছিলেন, তখন সরকারি মহল থেকে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়েছিল— মামলায় দণ্ডিত হওয়ার ভয়ে পালিয়েছেন খালেদা জিয়া। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনসভায় দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘পালাইছে’।

Khaleda-Zia-04-Photo-Collage-30-12-2025

কিন্তু শারীরিক অসুস্থতা এবং নিশ্চিত কারাবরণ জেনেও খালেদা জিয়া ফিরে এসেছিলেন বাংলার মাটিতে। জেলখানায় নির্জন প্রকোষ্ঠে বছরের পর বছর কাটানো কিংবা গৃহবন্দিত্ব বরণ করে নেওয়াকেও তিনি শ্রেয় মনে করেছেন, কিন্তু আপস করে বিদেশের মাটিতে আশ্রয় নেননি।

ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে নিশ্চিত বিপদ জেনেও দেশ না ছাড়ার এই জেদই খালেদা জিয়াকে কোটি মানুষের কাছে করে তুলেছে এক চিরকালীন ‘আপসহীন নেত্রী’।

আওয়ামী লীগের আমলে কারাবন্দি খালেদা জিয়ার পরিবার ও দল বারবার তাকে দেশের বাইরে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানোর আবেদন করে বিফল হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে লন্ডনে গিয়ে চিকিৎসা নিয়ে আবার দেশে ফিরেছেন। আবার চিকিৎসার জন্য তাকে লন্ডনে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল বিএনপি। কিন্তু মেডিকেল বোর্ডের সবুজ সংকেত মেলেনি।

শেষ পর্যন্ত রাজধানীর ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের শয্যাতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন খালেদা জিয়া। ‘বিদেশে আমার কোনো জায়গা নেই, আমার জন্ম এই দেশে, মরণও হবে এই দেশে’— মৃত্যুকালেও নিজের সেই উক্তির প্রমাণই হয়তো রেখে গেলেন খালেদা জিয়া।

ad
ad

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে জামায়াত

এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।

১ দিন আগে

ইরানের ওপর যৌথ হামলা 'নতুন দস্যুবৃত্তি': ওয়ার্কার্স পার্টি

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের তেল সম্পদ নিয়ন্ত্রণ ও সামরিক আধিপত্যের নীতি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পথ প্রশস্ত করছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন পার্টির নেতারা। একই সাথে, মার্কিন ঘাঁটির জায়গা দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোর 'স্বার্থপর ও সুবিধাবাদী আচরণ' গ্রহণযোগ্য নয় বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

৩ দিন আগে

খামেনি হত্যার প্রতিবাদে বিকেলে জামায়াতের বিক্ষোভ মিছিল

আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল কর্তৃক চালানো হামলায় খামেনিসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে এবং বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র ইরানের প্রতি সংহতি জানিয়ে এই বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছে। কর্মসূচিতে জামায়াতের কেন্দ্রীয় ও মহানগর নেতারা উপস্থিত থাকবেন।

৩ দিন আগে

খামেনির নিহতের ঘটনায় জামায়াত আমিরের শোক

সাথে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভয়াবহ যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জামায়াত আমির।

৩ দিন আগে