কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা নেই— দাবি নাবিল গ্রুপের

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
নাবিল গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের লোগো

গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নাবিল গ্রুপ জামায়াতকে নির্বাচনি তহবিল দিয়েছে— এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছে দেশের অন্যতম শিল্পগোষ্ঠী নাবিল গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ। প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে, কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।

আজ শনিবার (১৩ জুন) এক বিবৃতিতে গত ৯ জুন জাতীয় সংসদে দেওয়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে এ দাবি করে নাবিল গ্রুপ। বিবৃতিতে সই করেন নাবিল গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের জনসংযোগ ব্যবস্থাপক মো. বদরুদ্দোজা।

বিবৃতিতে জানানো হয়, এ বিষয়ে নাবিল গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কৃষিবিদ মো. আমিনুল ইসলাম প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি আবেদনপত্র জমা দিয়েছেন। পাশাপাশি অর্থমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছেও আবেদনপত্রের অনুলিপি পাঠানো হয়েছে। নাবিল গ্রুপ সম্পর্কে উত্থাপিত অসত্য ও ভিত্তিহীন তথ্য জাতীয় সংসদের কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার জন্য স্পিকারের কাছেও আবেদন করা হয়েছে।

সংসদে দেওয়া বক্তব্য নিয়ে আপত্তি

বিবৃতিতে বলা হয়, 'গত ৯ জুন জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি সংক্রান্ত আলোচনায় নাবিল গ্রুপ সম্পর্কে উত্থাপিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের বিভিন্ন অভিযোগ অসত্য, ভিত্তিহীন ও অতিরঞ্জিত। সংসদে উপস্থাপিত বেশ কিছু তথ্য নাবিল গ্রুপের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী, ব্যাংকিং নথি এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার রেকর্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এসব বক্তব্য জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার পাশাপাশি একটি প্রতিষ্ঠিত শিল্পগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের সুনাম ও ব্যবসায়িক স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।'

৭০০ কোটি টাকার এলসি প্রসঙ্গে ব্যাখ্যা

৭০০ কোটি টাকার এলসি সুবিধা গ্রহণ এবং পরিশোধ না করার অভিযোগের বিষয়ে নাবিল গ্রুপ বলেছে, '২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ইসলামী ব্যাংক থেকে ৭০০ কোটি টাকার এলসি সুবিধা গ্রহণের যে বক্তব্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়েছেন তা বাস্তব তথ্য ও ব্যাংকিং নথির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রকৃতপক্ষে, ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখ থেকে অদ্যাবধি নাবিল গ্রুপ দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য, শিল্পের কাঁচামাল এবং অন্যান্য ট্রেডিং পণ্য আমদানির উদ্দেশ্যে মোট ৭ হাজার ১৮১ কোটি টাকা সমমূল্যের এলসি খুলেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ব্যাংকিং বিধি-বিধান অনুসরণ করে এসব এলসির বিপরীতে অদ্যাবধি মোট ৫ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকার বিল যথাযথভাবে পরিশোধ করা হয়েছে। বর্তমানে অবশিষ্ট ১ হাজার ৪৪৮ কোটি টাকার সাইট ও অ্যাকসেপ্টেড বিলসমূহ তাদের নির্ধারিত সময় (ডিউ ডেট) অনুযায়ী নিয়মিত ও সময়মতো পরিশোধ করা হচ্ছে। এ সকল লেনদেন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক প্রথা, ব্যাংকিং নীতিমালা এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা অনুসারেই পরিচালিত হয়েছে এবং হচ্ছে।'

ব্যাংক দায় নিয়ে ‘ভুল তথ্য’ প্রচারের অভিযোগ

বিবৃতিতে বলা হয়, 'নাবিল গ্রুপের মোট ব্যাংক দায় ১৬ হাজার কোটি টাকা বলে যে তথ্য প্রচারিত হয়েছে, সেই তথ্যও অসত্য এবং ভিত্তিহীন। নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত গ্রুপটির মোট ব্যাংক দায়ের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা। অন্যদিকে ২০২৪ সালের আগস্টে এই দায়ের পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে নাবিল গ্রুপ তার ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ২ হাজার কোটিরও বেশি হ্রাস করেছে, যা গ্রুপটির আর্থিক শৃঙ্খলা, দায়বদ্ধতা এবং ঋণ পরিশোধ সক্ষমতার সুস্পষ্ট প্রতিফলন। নাবিল গ্রুপ কখনো কোনো ব্যাংক ঋণের খেলাপি হয়নি এবং সকল ব্যাংকিং কার্যক্রম বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা ও প্রচলিত ব্যাংকিং বিধিমালা অনুসরণ করেই সম্পন্ন করছে।'

নির্বাচনি তহবিলে অর্থ দেওয়ার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান

নির্বাচনি তহবিলে অর্থ প্রদানের অভিযোগও সরাসরি নাকচ করেছে নাবিল গ্রুপ। বিবৃতিতে বলা হয়, 'সংসদে নাবিল গ্রুপের অর্থ কোনো এক রাজনৈতিক দলের নির্বাচনি তহবিলে ব্যবহৃত হয়েছে এমন ইঙ্গিতেরও প্রতিবাদ করছে নাবিল গ্রুপ। দেশের শীর্ষ স্থানীয় শিল্পগ্রুপটি একটি সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা নেই।'

একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে, 'নাবিল গ্রুপ বা তার সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ঋণ আত্মসাৎ, অর্থ পাচার কিংবা প্রতারণা সংক্রান্ত কোনো প্রমাণিত অভিযোগ নেই। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ পরিবারের সদস্যরা বাংলাদেশেই অবস্থান করছেন এবং দেশের বাইরে তাদের কোনো অবৈধ বা গোপন সম্পদ নেই‌।'

নাবিল গ্রুপের ‘বিনীত উপস্থাপন’

বিবৃতিতে নিজেদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম, অর্থনৈতিক অবদান ও সামাজিক দায়বদ্ধতার বিভিন্ন তথ্যও তুলে ধরে নাবিল গ্রুপ। তাদের ভাষ্য, 'নাবিল গ্রুপ গত দুই দশক ধরে কৃষি, শিল্প, খাদ্যপণ্য, পরিবহন, আমদানি-রপ্তানি এবং ভোগ্যপণ্য খাতে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, টানা দুই বছর দেশের শীর্ষ পাঁচ ভোগ্যপণ্য আমদানিকারকের অন্যতম নাবিল গ্রুপ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তাদের মোট আমদানির পরিমাণ ছিল ১.২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।'

এ ছাড়া গ্রুপটির দাবি, 'নাবিল গ্রুপে প্রত্যক্ষভাবে ২৫ হাজারের বেশি মানুষ কর্মরত এবং পরোক্ষভাবে দুই লাখের বেশি মানুষের জীবিকা এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। আমাদের বিশাল স্থায়ী বিনিয়োগ বাংলাদেশের প্রতি দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকারের প্রমাণ। আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে দেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকা উত্তরাঞ্চলে জন্য কাজ করছে নাবিল গ্রুপ। বিপুল কর্মসংস্থান ও জীবনমান উন্নয়নে ৮০ শতাংশ বিনিয়োগই উত্তরাঞ্চলে।'

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়, 'আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও নাবিল গ্রুপ এবং নাবিল গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার পরিবার পরিজন, আত্মীয় স্বজন দেশেই অবস্থান করছেন। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন কার্যকর ভূমিকা রেখে চলেছেন। নাবিল গ্রুপের এমডি, স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে, পিতা-মাতাসহ পরিবারের সকল সদস্য রাজশাহীতে অবস্থান করে। ছেলে-মেয়েরাও রাজশাহীতেই পড়ালেখা করে। বিদেশে তাদের কারও কোনো সম্পদ নেই।'

ঋণখেলাপি না হওয়ার বিষয়টিও জোর দিয়ে উল্লেখ করে প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, 'নাবিল গ্রুপ কখনো কোনো ব্যাংকে ঋণখেলাপি হয়নি। আমাদের ব্যাংকিং সম্পর্ক পারস্পরিক আস্থা, স্বচ্ছতা ও পেশাগত শৃঙ্খলার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। নাবিল গ্রুপ ঋণ নিয়ে কোনো টিভি চ্যানেল করেনি।'

সামাজিক ও ক্রীড়া খাতে অবদানের কথাও তুলে ধরা হয়েছে বিবৃতিতে। নাবিল গ্রুপ বলেছে, 'নাবিল গ্রুপ নিয়মিত বিভিন্ন অনুদান দিয়ে সমাজের দুঃস্থ, অসহায় ও নিম্ন আয়ের মানুষকে সাহায্য করার পাশাপাশি তাদের জীবনমান উন্নয়নে অবদান রেখে চলেছে। গ্রুপের ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে দেড় হাজারের বেশি বিধবা ও দুস্থ নারীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি ক্রীড়াক্ষেত্রেও অবদান রাখছে নাবিল গ্রুপ। এ বছর বাংলাদশ প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগে নাবিল গ্রুপের মালিকানাধীন রাজশাহী ওয়ারিয়র্স এবং বাংলাদেশ উইমেন্স প্রিমিয়ার ফুটবল লিগে নাবিল গ্রুপের মালিকানাধীন রাজশাহী স্টারস এফসি চ্যম্পিয়ন হয়েছে। রাজশাহী স্টারস এফসি প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের একমাত্র দল হিসাবে এশিয়ান উইম্যান্স ফুটবল ক্লাবে খেলায় অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছে।'

নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান

বিবৃতির শেষাংশে নাবিল গ্রুপ বলেছে, 'কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপনের ক্ষেত্রে অনুমান, গুজব কিংবা রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; বরং তথ্য, নথি ও প্রমাণই হওয়া উচিত চূড়ান্ত মানদণ্ড। যথাযথ তথ্য যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সংসদীয় বক্তব্যের মাধ্যমে মানহানির অভিযোগ করা হলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়, সামগ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিবেশের জন্যও ক্ষতিকর।'

এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক অথবা অন্য কোনো স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে একটি স্বচ্ছ, তথ্যভিত্তিক ও নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়ে নাবিল গ্রুপ উল্লেখ করেছে, 'আমরা বিশ্বাস করি, যেকোনো মিথ্যা অভিযোগের সর্বোত্তম জবাব হলো সঠিক তথ্য ও স্বচ্ছতা। নাবিল গ্রুপ সরকারের সকল উন্নয়ন ও ইতিবাচক উদ্যোগের সহযোগী হিসাবে দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ।'

ad
ad

অর্থের রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

ইসলামী ব্যাংক নিয়ে ৭ দাবির সঙ্গে ‘একমত’ গভর্নর, দাবি গ্রাহক ফোরামের

ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের আহ্বায়ক নুর উন নবী দাবি করেছেন, ইসলামী ব্যাংক নিয়ে তাদের সাত দফা দাবির সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান একমত পোষণ করেছেন। তবে বাংলাদেশের ব্যাংকের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

৩ দিন আগে

ব্যাংক খাতে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ ১১ লাখ কোটি টাকা, মোট বিতরণের ৬০%

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সাল শেষে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের পরিমাণ আগের বছরের চেয়ে প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়ে ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৫৯০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে; যা আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের আকারের চেয়েও বেশি। এটি ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণ করা ঋণের ৫৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ।

৩ দিন আগে

একনেকে ৭ হাজার কোটি টাকার ৫ প্রকল্প অনুমোদন

জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় মোট ৭ হাজার ৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয়ে পাঁচটি প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে তিনটি নতুন এবং দুটি সংশোধিত প্রকল্প।

৪ দিন আগে

আন্তর্জাতিক বাজারে ফের বাড়ছে জ্বালানি তেলের দাম

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক শান্তি চুক্তি নিয়ে বিস্তারিত তথ্যের অভাব এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হতে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সময় লাগতে পারে এমন আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও বাড়তে শুরু করেছে জ্বালানি তেলের দাম।

৪ দিন আগে