বাংলাদেশের বাজেট যাত্রা: আকার বেড়েছে ১০ হাজার গুণ

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
১৯৭২-৭৩ অর্থবছরের ৭৮৬ কোটি টাকা থেকে এবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাচ্ছে বাজেট। গ্রাফিক্স: রাজনীতি ডটকম

স্বাধীনতার ৫৬ বছরে বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটের আকার বেড়েছে প্রায় ১০ হাজার গুণেরও বেশি। ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরের প্রথম বাজেটের মোট আকার ছিল মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকা, যেখানে সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকায়। প্রথম বাজেটে ঘাটতি ছিল উল্লেখযোগ্য পরিমাণে, আর সর্বশেষ বাজেটে ঘাটতি নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা (জিডিপির ৩.৬ শতাংশ)।

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠনমূলক বাজেট থেকে সর্বশেষ সংকটময় সময়ের সংকোচনমূলক ও ঘাটতি-নিয়ন্ত্রিত বাজেট — এই তুলনায় ফুটে ওঠে দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর, অগ্রগতি এবং নতুন চ্যালেঞ্জ।

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেল ৩টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে শুরু হতে যাওয়া অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী বাজেট প্রস্তাবনা পেশ করবেন। দীর্ঘ ১৯ বছর পর বিএনপি সরকার বাজেট পেশ করতে যাচ্ছে এবার।

প্রথম বাজেট: যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের সংগ্রাম ও ঘাটতি

১৯৭২ সালের ৩০ জুন তাজউদ্দীন আহমদ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করেন। ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরের এই বাজেটের মোট আকার ছিল ৭৮৬ কোটি টাকা । আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ২৮৫-৫০১ কোটি টাকা। যুদ্ধে ধ্বংসপ্রায় দেশে অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ, খাদ্য নিরাপত্তা, আশ্রয় ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি ছিল প্রধান লক্ষ্য। বাজেটে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির দিকনির্দেশনা দেওয়া হয় এবং বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়। এডিপির আকার ছিল প্রায় ৩১৮ কোটি টাকা।

এই বাজেটে ঘাটতি ছিল উল্লেখযোগ্য — মোট ঘাটতি প্রায় ৪২৭ কোটি টাকার কাছাকাছি। যুদ্ধের ধ্বংসাবশেষ, অবকাঠামোর অভাব এবং রাজস্ব আয়ের সীমাবদ্ধতার কারণে ঘাটতি পূরণে বিদেশি সাহায্যের ওপর ব্যাপক নির্ভরতা ছিল।

সর্বশেষ অন্তর্বর্তী সরকারের সংকোচনমূলক বাজেট

২০২৫ সালের ২ জুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেন। ওই বাজেটে মোট ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা (৭.৯ ট্রিলিয়ন), যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ৭ হাজার কোটি টাকা কম, যা দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো হওয়া সংকোচনমূলক বাজেট। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য রাখা হয়েছিলো ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা। অপারেটিং ব্যয় ৫ লাখ ৬০ হাজার কোটি এবং উন্নয়ন ব্যয় (এডিপি) ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। সুদ পরিশোধে বরাদ্দ হয়েছে প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা।

এই বাজেটে ঘাটতি নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা, যা ছিলো জিডিপির ৩.৬ শতাংশ। পূর্ববর্তী অর্থবছরের তুলনায় ঘাটতি কমানো হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি, ঋণের সুদের বোঝা এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে এই বাজেট প্রস্তুত করা হয়েছে। বাজেটে ডিজিটাল অর্থনীতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর ব্যবস্থায় সংস্কার এবং ন্যায্যতা-ভিত্তিক সম্পদ বণ্টনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এটি ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানোত্তর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম বাজেট।

মুখোমুখি প্রথম ও সর্বশেষ বাজেট

প্রথম বাজেটের সঙ্গে সর্বশেষ বাজেটের তুলনা করলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিশাল চিত্র ফুটে ওঠে। ৭৮৬ কোটি থেকে ৭.৯ লাখ কোটি টাকায় বাজেট বৃদ্ধি পেয়েছে অভাবনীয় হারে। দেশের জিডিপি, শিল্পায়ন, রপ্তানি, রেমিট্যান্স এবং ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশ এই পরিবর্তনের মূলে। প্রথম বাজেটে ঘাটতি ছিল যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তায়, যা বিদেশি সাহায্য দিয়ে মেটানো হয়েছে। সর্বশেষ বাজেটে ঘাটতি কমিয়ে ৩.৬ শতাংশে আনা হয়েছে আর্থিক স্থিতিশীলতা ও আইএমএফের শর্ত পূরণের লক্ষ্যে।

তবে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথম বাজেটের মতো বর্তমানেও রাজস্ব আয় বাড়ানো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ঋণের বোঝা কমানো বড় সমস্যা। একদিকে প্রবৃদ্ধির গল্প, অন্যদিকে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও টেকসই ঘাটতি ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট।

রাজনীতি/আরআইআর

ad
ad

অর্থের রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ ছাড়াবে ১ বিলিয়ন ডলার: অর্থমন্ত্রী

সোমবার (২৭ জুলাই) আনোয়ারার বেলচূড়া এলাকায় বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

২ দিন আগে

ভরিতে ২,২১৬ টাকা বাড়ল সোনার দাম

নতুন দর অনুযায়ী, ভ্যাটসহ ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনা ২ হাজার ১০০ টাকা বাড়িয়ে ২ লাখ ১৩ হাজার ৪৩ টাকা, ১৮ ক্যারেটের সোনা ১ হাজার ৭৫০ টাকা বাড়িয়ে ১ লাখ ৮২ হাজার ৯৫০ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি সোনা ১ হাজার ৪৫৮ টাকা বাড়িয়ে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৪৭৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

২ দিন আগে

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত বিরতিতে বিশ্ববাজারে তেলের দামে পতন

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ সময় সোমবার (২৭ জুলাই) ভোরে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৪ দশমিক ৮৯ ডলার বা ৫ দশমিক ০৫ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৯১ দশমিক ৮৯ ডলারে। লেনদেনের শুরুতে এটি সাময়িকভাবে ৯০ ডলারের নিচেও নেমে গিয়েছিল।

২ দিন আগে

নেতিবাচক ধারার মধ্যেই ১৫ শতাংশ রপ্তানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য সরকারের

পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের ধারাবাহিক শুল্ক আরোপ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি যখন নেতিবাচক ধারায় রয়েছে, তখনও চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য রপ্তানি আয়ে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।

৩ দিন আগে