নেতিবাচক ধারার মধ্যেই ১৫ শতাংশ রপ্তানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য সরকারের

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ২৬ জুলাই ২০২৬, ১৮: ০২
সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। ছবি: সংগৃহীত

পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের ধারাবাহিক শুল্ক আরোপ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি যখন নেতিবাচক ধারায় রয়েছে, তখন চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য রপ্তানি আয়ে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।

বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৪ হাজার ৮০০ কোটি ডলার। সেই তুলনায় চলতি অর্থবছরে আরও ৭০০ কোটি বা ৭ বিলিয়ন ডলার বেশি আয় করে মোট ৫ হাজার ৫০০ কোটি বা ৫৫ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বিএনপি সরকার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৫ শতাংশ বেশি।

রোববার (২৬ জুলাই) সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে চলতি অর্থবছরের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা তুলে ধরেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

তিনি বলেন, “এই অর্থবছরে যেটা আমাদের রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা, সেটি হচ্ছে পণ্যের ক্ষেত্রেও ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং সেবার ক্ষেত্রেও ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। যদি আমরা সেটা অর্জন করতে পারি, তাহলে রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৬৩ দশমিক ৪০ বিলিয়ন।

“তাতে পণ্য হবে ৫৫ দশমিক ২ বিলিয়ন এবং সেবা হবে ৮ দশমিক ২ বিলিয়ন। পণ্য এবং সেবা মিলিয়ে ৬৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন হচ্ছে আমাদের এই অর্থবছরের রপ্তানির ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রা,” বলেন বাণিজ্যমন্ত্রী।

তিনি জানান, বিদায়ী অর্থবছরে সেবা খাতে রপ্তানি আয় হয়েছে ৭ বিলিয়ন ডলার।

লক্ষ্যমাত্রা থেকে ১৩ শতাংশ পিছিয়ে বিদায়ী অর্থবছর

বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে বিদায়ী অর্থবছরে রপ্তানি আয় নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ কম হয়েছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ৪ হাজার ৮২৮ কোটি ৩৯ লাখ ডলার। আর সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ৫০০ কোটি ডলার।

তবে অর্থবছরের শেষ মাস জুনে ২৫ দশমিক ৯১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি না হলে রপ্তানি আয় আরও কমে যেতে পারত। ওই মাসে রপ্তানিকারকেরা আয় করেন ৪২০ কোটি ২৭ লাখ ডলার, যেখানে আগের অর্থবছরের একই মাসে আয় ছিল ৩৩৩ কোটি ৭৯ লাখ ডলার।

এর আগে টানা আট মাস রপ্তানি কমার পর গত এপ্রিলে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও মে মাসে আবারও নিম্নমুখী হয় রপ্তানি আয়।

‘মন্দার বৃত্ত ভেঙে বেরিয়ে আসতে পারব’

এমন পরিস্থিতিতেও চলতি অর্থবছরে রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন বাণিজ্যমন্ত্রী।

তিনি বলেন, “এই যে অচল অবস্থা বা রপ্তানির ক্ষেত্রে একটা মন্দা অবস্থা, আশা করি এই অর্থবছরে সেটা কিছুটা হলেও আমরা এই বৃত্ত ভেঙে বেরিয়ে আসতে পারব।”

এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, “নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরে যদিও বিশ্বে দুইটা যুদ্ধ চলমান এবং উন্নত অনেক দেশেই ভোগের পরিমাণ কিছুটা নেতিবাচক বা প্রবৃদ্ধি শ্লথ, তারপরও গত বাজেটে আমরা বেশ কিছু উৎসাহব্যঞ্জক কিছু পদক্ষেপ নিয়েছি।”

মন্ত্রী বলেন, “আমরা আগামী দিনে ব্যবসা শুরুর বা ব্যবসা পরিচালনা করার প্রক্রিয়াগুলোর সময় ব্যাপকভাবে কমিয়ে নিয়ে আসছি এবং এই যে ব্যবসাবান্ধব একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে, সেটির অবিলম্বে একটা ফল আমরা ঘরে তুলে আনতে পারব বলে আমাদের বিশ্বাস।”

সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করা হয়, লক্ষ্যমাত্রা থেকে পিছিয়ে থেকেই বিদায়ী অর্থবছর শেষ হয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অসংখ্য কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট, মূল্যস্ফীতি এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যেও সরকার কেন রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়েছে? এটি কি ‘লোক দেখানো’?

জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, “ভালো প্রশ্ন। গত অর্থবছরে একটা বড় অনিশ্চয়তা ছিল। আপনি, মানে ‘ইউ আর রাইট’, ব্যবসা তার প্রসারের জন্য একটা স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ চায়।”

“দ্বিতীয়ত হচ্ছে, তখন একটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ছিল, সেই অনিশ্চয়তা। ‘পলিসি স্টেবিলিটি’, ‘পলিসি প্রেডিক্টিবিলিটি’, এই অনিশ্চয়তার ধাপগুলো পেরিয়ে এখন একটা নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। ‘সো, পলিসি প্রেডিক্টিবিলিটি’ এখন আরও বাড়বে,” বলেন তিনি।

মন্ত্রী বলেন, “এই সরকার ক্ষমতায় আসার পরে অর্থনীতির বাধাগুলো দূর করার, ব্যবসাবাণিজ্যের প্রসারের জন্য, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে নিয়ে প্রথম দিন থেকেই নিবিড়ভাবে কাজ করছে।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা এই বাজেটে, এই অর্থনীতির প্রসারের জন্য সুনির্দিষ্ট অনেকগুলো পদক্ষেপ নিয়েছি। আমরা বিসিকের এরিয়া বাড়ানোর জন্য অনেকগুলো জেলাতে নতুন নতুন প্রকল্প নিচ্ছি। বিদ্যামান প্লটগুলো যেন সদব্যবহার হয়, সেটার জন্য অঞ্চল ভিত্তিতে আমরা স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সাথে যোগাযোগ করছি।”

এলডিসি উত্তরণ ও এফটিএ নিয়ে আশাবাদ

বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার একটি বড় অংশ কেটে গেছে বলেও মন্তব্য করেন বাণিজ্যমন্ত্রী।

তিনি বলেন, “আমাদের আরেকটি বড় অনিশ্চয়তা ছিল যে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনটা হবে বা হবে না। সেই অনিশ্চয়তাটা দূর করে ইতোমধ্যেই এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের তিনটা ধাপের মধ্যে ইউএনসিডিপি এবং ইকোসক, এই জাতিসংঘের স্টাফ লেভেলের, টেকনিক্যাল লেভেলের এই দুইটা ধাপ আমরা ইতোমধ্যে অতিক্রম করেছি।”

“তার মানে, ক্রেতারা জানে এখন যে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন হচ্ছে, অন্তত এই ক্ষেত্রে, মার্কেট অ্যাকসেসের ক্ষেত্রে আগামী তিন বছর আমাদের পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হবে না,” বলেন তিনি।

মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) প্রসঙ্গে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, চলতি বছরেই অন্তত পাঁচটি দেশের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর সম্পন্ন হবে। আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে, যা আগামী বছর শেষ করার আশা করছে সরকার।

তিনি বলেন, “ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন আমাদের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। তারা ইতোমধ্যেই আমাদের জানিয়ে দিয়েছে, তারা এফটিএ করতে চায় এবং সেজন্য আলোচনা শুরু হবে অতি দ্রুত।”

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, “তো এই যে অনেকগুলো গ্রিন সিগন্যাল যে বাংলাদেশ একটা কাঙ্ক্ষিত ব্যবসার পার্টনার বিশ্বের জন্য, গ্লোবাল বিজনেস পার্টনার, গ্লোবাল ইকোনমিক পার্টনার, এই বার্তাটা অনেক ইম্পর্টেন্ট তাদের আস্থার জন্য। তো সেটার প্রতিফলন আগামী দিনে ইনশাআল্লাহ আপনারা দেখতে পাবেন।”

সবশেষে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন সম্ভব বলেই পুনরায় আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। বলেন, “এই জন্যই যে টার্গেটটা আমরা ধরেছি, আমার বিশ্বাস, যে যে প্রতিবন্ধকতার কথা আপনি বললেন, এগুলো কোনোটাই আমি উপেক্ষা করছি না। কিন্তু এই সমস্ত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব।”

ad
ad

অর্থের রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

উচ্চ আমদানিনির্ভর পণ্য রপ্তানিতে মুদ্রা সংরক্ষণ সুবিধা দ্বিগুণ: বাংলাদেশ ব্যাংক

উচ্চ আমদানি উপাদান রয়েছে, এমন পণ্য রপ্তানিকারকদের রপ্তানি আয় থেকে এক্সপোর্টার্স রিটেনশন কোটা (ইআরকিউ) হিসাবে বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণের সীমা দ্বিগুণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে এসব পণ্য রপ্তানিকারকরা প্রত্যাবাসিত রপ্তানি মূল্যের ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণ করতে পারবেন। আগে এই হার ছিল ৭

৩ দিন আগে

শেয়ারবাজারে বড় দরপতন, বিক্রির চাপে সূচকের পতন

সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস বৃহস্পতিবার দেশের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমেছে। এর ফলে উভয় বাজারের প্রধান মূল্যসূচকে উল্লেখযোগ্য পতন হয়েছে। একই সঙ্গে ডিএসইতে আগের কার্যদিবসে

৩ দিন আগে

আন্তর্জাতিক বাজারে আরও বাড়ল তেলের দাম

যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম ১.৪৪ ডলার বা ১.৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৮.২৭ ডলারে লেনদেন হচ্ছে। মার্কিন বাহিনী ইরানের ওপর নতুন করে হামলা চালানো এবং ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের লোহিত সাগরে তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা আরও বেড়েছে। মূ

৪ দিন আগে

ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহক সমাবেশ অনুষ্ঠিত

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির হেড অফিস কমপ্লেক্স কর্পোরেট শাখার উদ্যোগে আজ বুধবার একটি গ্রাহক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ব্যাংকের পর্ষদের দায়িত্বপ্রাপ্ত (চেয়ারম্যানের চলতি দায়িত্ব) বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেন।

৪ দিন আগে