বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী

রাজনৈতিক সংস্কার ছাড়া অর্থনীতির বিপর্যয় থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উত্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ছবি: পিআইডি

আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে যে অর্থনৈতিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে, রাজনৈতিক সংস্কার ছাড়া সে বিপর্যয় থেকে উত্তরণ সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সেই রাজনৈতিক সংস্কারকে টেকসই করার জন্য অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন ও মানবিক সাংস্কৃতিক সম্পর্ক প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদ দেশের অর্থনীতির যে বিপর্যয় তৈরি করেছে, সমাজ-সংস্কৃতির বুনন যেভাবে ধ্বংস করেছে, এতে এর পুনরুদ্ধার ও একে পুনরায় গতিশীল করা রাজনৈতিক সংস্কার ছাড়া সম্ভব নয়। একই সঙ্গে অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন, অর্থাৎ সব মানুষের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং মানবিক বিবেচনাসম্পন্ন সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠা ছাড়া এই রাজনৈতিক সংস্কার টেকসই হবে না।

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে দেওয়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী এ কথা বলেন। এ দিন বিকেল ৩টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের কার্যক্রম শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ মন্ত্রিসভার সদস্য এবং সরকারি ও বিরোধী দলগুলোর সংসদ সদস্যদের উপস্থিতিতে অর্থমন্ত্রী নতুন প্রস্তাবিত বাজেট উত্থাপন করেন সংসদে।

বিএনপি অনেক আগে থেকেই রাজনৈতিক সংস্কারের প্রশ্নকে সামনে এনেছে বলে বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু। বলেন, ‘১৯৯১-১৯৯৬ ও ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপি সরকারের দূরদর্শী ও কল্যাণমুখী অর্থনৈতিক দর্শনের কারণে অর্থনীতির মূল সূচকগুলো ইতিবাচক ধারায় ছিল। কিন্তু বিগত ফ্যাসিবাদী সরকার রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহার করে অর্থনীতিতে সীমাহীন দুর্নীতি ও লাগামহীন লুটপাটের মাধ্যমে সব প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর ও ধ্বংস করেছে।’

‘তথাকথিত উন্নয়নের স্লোগান দিয়ে মূলত লুটপাট ও অর্থ পাচারের মাধ্যমে অর্থনীতির মৌল ভিতকে দুর্বল করে দিয়েছে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যর্থতাগুলোকে ঢাকা হয়েছে মিথ্যা পরিসংখ্যান ও কথার ফুলঝুরি দিয়ে। কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র গঠনের মূল চালিকা শক্তি, অর্থাৎ অর্থনৈতিক ইঞ্জিন বিগত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ক্রমেই দুর্বল হতে হতে একেবারে ধ্বংস হয়েছে। আমরা সেই ধ্বংসস্তুপের মধ্য থেকে নতুন যাত্রার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে চাইছি,’— বলেন অর্থমন্ত্রী।

আমীর খসরু আরও বলেন, ‘বর্তমান অবস্থার পুনরুদ্ধার এবং একে উত্তরণ ও সমৃদ্ধ পুনর্গঠনের পথে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে জনগণ বিএনপির ওপর ভরসা করায় বর্তমান সরকার সেই দুঃসাহসিক চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে। সে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় রাজনীতি ও অর্থনীতির পুনর্গঠনে প্রস্তাবিত বাজেট হচ্ছে সব শ্রেণিপেশার মানুষের জন্য নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাশীল জীবন নিশ্চিতকরণে সরকারের অভিপ্রায়ের একটি প্রতিফলন।’

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ সামনে রেখে বিএনপি নির্বাচনি ইশতেহারে গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা, সুশাসন, ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সুযোগের বিস্তারের ওপর জোর দিয়ে মানবিক, গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী বাংলাদেশ গড়ে তোলার রূপরেখা উপস্থাপন করেছিল। সরকার গঠনের পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে সে লক্ষ্যে কাজ শুরু করা হলেও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতায় নতুন ও তীব্র চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে বলে বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির পাশাপাশি গোটা বিশ্বে যে নতুন রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক মেরুকরণের বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তা গোটা বিশ্বকে এবং বিশেষ করে আমাদের বড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করেছে। দেশের অর্থনীতির ভগ্নদশার পাশাপাশি বৈশ্বিক অস্থিরতায় তৈরি হওয়া নতুন ঝুঁকি মোকাবিলার প্রত্যয়কে কেন্দ্রে রেখেই আমরা এবারের বাজেটে- স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সর্বোপরি ন্যায্যতাকে মূল বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করেছি, সামষ্টিক কৌশল নির্ধারণ করেছি।’

এ পরিকল্পনা ও কৌশল বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হবে বলে আশাবাদ জানান অর্থমন্ত্রী। সেই অগ্রযাত্রায় এবারের বাজেট প্রণয়নে সরকার ১০টি খাতকে অগ্রাধিকার বিবেচনা করেছে। এগুলো হলো—

  • সবার জন্য উন্নয়ন;
  • সবার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা;
  • সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা;
  • বিনিয়োগনির্ভর, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতি;
  • বিনিয়ন্ত্রণকরণ এবং সাশ্রয়ী ও সহজ ব্যবসায়িক পরিবেশ;
  • আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা;
  • জ্বালানি নিরাপত্তা;
  • তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিকাশ;
  • জীবন, প্রকৃতি, পরিবেশ ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা; এবং
  • স্বচ্ছ, দক্ষ ও জবাবদিহিতামূলক প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা।

এগুলোর পাশাপাশি মূলধারার অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি, ক্রীড়া অর্থনীতি, সবুজ অর্থনীতি ও সুনীল অর্থনীতির মতো খাতগুলোকে জাতীয় অর্থনীতির একেবারে কেন্দ্রে নিয়ে আসা হবে বলে বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী।

বাজেট বক্তৃতায় বলা হয়েছে, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বাজেটের অগ্রাধিকার নির্ধারণ ও বাস্তবায়নে নীতিগতভাবে চারটি বিষয় প্রধান বিবেচনায় রাখা হয়েছে। এগুলো হলো— ভ্যালু ফর মানি, অর্থাৎ সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম সদ্ব্যবহার; রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট, অর্থাৎ জনগণের সম্পদ যেসব প্রকল্পে বিনিয়োজিত হচ্ছে তার কার্যকর অর্থনৈতিক সুফল মূল্যায়ন; কর্মসংস্থান তৈরি, অর্থাৎ সরকারের বিনিয়োগের সুনির্দিষ্টভাবে কর্মসংস্থান তৈরিতে ভূমিকা; এবং পরিবেশগত বিবেচনা, অর্থাৎ প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ সুরক্ষার দিকে সজাগ দৃষ্টি।

বিএনপির নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ধারাবাহিক পদক্ষেপ, অর্থনৈতিক সংস্কারের সাহসী উদ্যোগ ও জাতীয় ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের দিকে দৃঢ়ভাবে অগ্রসর হবে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘জনগণের শক্তি, সৃজনশীলতা ও উদ্যোগই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। সেই শক্তিকে বিকশিত করার মধ্য দিয়ে আমরা গণমানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে চাই, সমস্যার সমাধান করতে চাই এবং সম্মিলিত প্রয়াসে গড়ে তুলতে চাই গণআকাঙ্ক্ষার এক স্বনির্ভর ও মর্যাদাবান বাংলাদেশ।’

সমৃদ্ধ ও আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রত্যয় জানিয়ে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী আরও বলেন, ‘আমাদের প্রত্যয় এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে সুযোগের দ্বার সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে, উদ্যোগ ও উদ্ভাবন উৎসাহিত হবে, পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত হবে এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির সুফল প্রতিটি নাগরিকের কাছে পৌঁছে যাবে। অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন, বিনিয়ন্ত্রণকরণ ও জনগণের ক্ষমতার ভিত্তিতেই আমরা একটি সমৃদ্ধ ও আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ নির্মাণ করব।’

Ad
Ad
ad
ad
ad

অর্থের রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

বিএসইসির ১৭ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর, বেতন কমল ৫ জনের

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের ভিত্তিতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। গত বছর বিএসইসির তৎকালীন চেয়ারম্যানকে অবরুদ্ধ করার ঘটনায় ২৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছিল মন্ত্রণালয়। তাদের মধ্যে ২২ জনের বিষয়ে মঙ্গলবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।

৩ দিন আগে

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ৬ সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ

৩ দিন আগে

শেয়ারবাজারে মার্জিন অর্থায়নে বড় পরিবর্তন, ইক্যুইটি-ঋণের অনুপাত সর্বোচ্চ ১:১

সংশোধিত বিধানে কোনো মার্জিন অর্থায়নকারী গ্রাহকের ইক্যুইটির চেয়ে বেশি মার্জিন অর্থায়ন করতে পারবে না। অর্থাৎ গ্রাহকের ইক্যুইটি ও মার্জিন অর্থায়নের অনুপাত সর্বোচ্চ ১:১ থাকবে। পাশাপাশি কোনো মার্জিন অর্থায়নকারী তার প্রকৃত মূলধন বা নিট সম্পদের চারগুণের বেশি মার্জিন অর্থায়ন করতে পারবে না।

৩ দিন আগে

ঋণনির্ভরতা কমাতে রাজস্ব ব্যবস্থায় বড় সংস্কারের কথা জানালেন অর্থমন্ত্রী

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে রাজস্ব সম্মেলন-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

৩ দিন আগে