ভোটার তালিকা বিক্রি হচ্ছে ফেসবুকে, ঝুঁকিতে নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
ভোটার তালিকা বিক্রির এমন বিজ্ঞাপন বেশকিছু অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়িয়ে পড়েছে ফেসবুকে। ছবি: ডিসমিসল্যাব

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে গত ১২ ফেব্রুয়ারি। এ উপলক্ষ্যে ২০২৫ সালের ১৮ নভেম্বর চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছিল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচন সামনে রেখে এ তালিকা দেওয়া হয়েছিল প্রার্থীদের কাছে। সেই ভোটার তালিকা এখন বিক্রি হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তালিকায় ভোটারের নাম, জন্ম তারিখ, ঠিকানা ও ভোটার নাম্বারসহ একাধিক ব্যক্তিগত তথ্য উল্লেখ আছে।

ফ্যাক্টচেক ও মিডিয়া গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডিসমিস ল্যাবের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন তথ্য। তবে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, বাণিজ্যিকভাবে ভোটার তালিকার কপি বিক্রির অনুমতি বা কাউকে দেওয়ার এখতিয়ার নেই।

গত ২৮ মে ‘মোহাম্মদ মাজহারুল হাফিজ’ নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে একটি গ্রুপে ভোটার তালিকা বিক্রির পোস্ট করা হয়। ক্যাপশনে লেখা হয়, ‘আসনভিত্তিক ভোটার তালিকা ৩০/- টাকা। সারা দেশের ভোটার তালিকা মাত্র ৪০/- টাকা।’

‘মোহাম্মদ আরিফ হোসান’ নামের আরেকটি অ্যাকাউন্ট থেকে ভিন্ন একটি গ্রুপে নির্বাচন কমিশনের লোগো সম্বলিত ফটোকার্ড পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়, ‘আসনভিত্তিক ভোটার তালিকা ৪০/- টাকা। সারা দেশের ভোটার তালিকা মাত্র ৬০/- টাকা।’

‘নাজিম হোসাইন’ নামের আরেকটি অ্যাকাউন্ট থেকে মুন্সীগঞ্জ জেলার একটি এলাকার ভোটার লিস্টের প্রথম পাতার ছবিও পোস্ট করা হয় একই ক্যাপশনে।

পরে প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড লিখে সার্চ দিলে ডিসমিসল্যাব পাঁচ শতাধিক পোস্ট খুঁজে পায়, যেগুলোতে ভোটার তালিকা বিক্রি করতে চাওয়া হয়েছে। অধিকাংশ পোস্টই করা হয়েছে বিভিন্ন গ্রুপে অন্তত ১৫টি ভিন্ন ভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকে। পোস্টগুলোতে ভোটার লিস্টের দামের তারতম্য থাকলেও ক্যাপশন একইরকম।

কেবল বিভিন্ন গ্রুপে পোস্ট করেই নয়, পেজ থেকে অ্যাড চালিয়েও বিক্রি করা হচ্ছে ভোটার তালিকা। ফেসবুক অ্যাড লাইব্রেরিতে প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড সার্চ করে ডিসমিসল্যাব অন্তত পাঁচটি সচল ফেসবুক অ্যাড খুঁজে পেয়েছে। এসব অ্যাডে নির্দিষ্ট আসনসহ সারা দেশের ভোটার তালিকা বিক্রির প্রচার চালানো হচ্ছে।

বিজ্ঞাপনগুলোর ক্যাপশনে জানানো হয়, ভোটার তালিকা ফোল্ডারে পিডিএফ ফাইল আকারে সাজানো রয়েছে, যা গুগল ড্রাইভের মাধ্যমে দেওয়া হবে। এলাকাভিত্তিক ভোটার তালিকার জন্য দিতে হবে ৯৯ টাকা ও সারা দেশের ভোটার তালিকা পেতে দিতে হবে ২৫০ টাকা। অর্ডার করতে পেজে মেসেজ করতে বলা হয়।

অনুসন্ধানের স্বার্থে ডিসমিসল্যাব সারা দেশের ভোটার তালিকা চেয়ে পেজটিতে মেসেজ করে। একটি বিকাশ নাম্বার দিয়ে সেখানে ২৫০ টাকা ‘সেন্ড মানি’ করতে বলা হয়। টাকা পাঠানোর পরই পেজটি থেকে একটি গুগল ড্রাইভের লিংক শেয়ার করা হয়।

লিংকে প্রবেশ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের আটটি বিভাগের নামে ফোল্ডার তৈরি করা। প্রতিটি ফোল্ডারের মধ্যে সেই বিভাগের সব আসনের ভোটার তালিকা বিভিন্ন এলাকাভেদে ফোল্ডার করে সাজানো। ডিসমিসল্যাব কয়েকটি এলাকার ভোটার তালিকা পর্যবেক্ষণ করেছে। তালিকাগুলোতে উল্লিখিত তারিখ অনুযায়ী এগুলো ২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রকাশ করা হয়েছে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৮ নভেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছিল ইসি।

পরে যাচাইয়ে ডিসমিসল্যাবে কর্মরত কয়েকজনের পরিচিতের সঙ্গে তালিকায় থাকা কয়েকটি ভোটার তথ্য মিলিয়ে দেখা হয়। তথ্যগুলো হুবহু মিলে যায়। এতে তালিকাগুলোতে সঠিক তথ্য রয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া যায়। ভোটার তালিকায় ব্যক্তির নাম, ভোটার নাম্বার, পিতার নাম, মায়ের নাম, জন্ম তারিখ, পেশা ও স্থায়ী ঠিকানার মতো ব্যক্তিগত তথ্য উল্লেখ রয়েছে।

কেবল ফেসবুকেই নয়, ভোটার তালিকা ছড়াতে দেখা গেছে টেলিগ্রামেও। ফেসবুকে একটি পোস্টের কমেন্টে একটি টেলিগ্রাম লিংক দিয়ে জানানো হয়— টাকার বিনিময়ে নয়, ফ্রিতেই মিলবে ভোটার তালিকা। গ্রুপটিতে জয়েন করে দেখা যায়, বিভিন্ন আসন ও এলাকার ভোটার তালিকা গ্রুপটিতে দেওয়া হচ্ছে। খুব শিগগিরই ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে বলেও জানানো হয় গ্রুপটি থেকে।

নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য এভাবে সামাজিক মাধ্যমে বিক্রি বা প্রদান করার এখতিয়ার কেউ রাখে কি না— জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের জনসংযোগ বিভাগের পরিচালক মো. রুহুল আমিন মল্লিক বলেন, ‘আমরা ভোটার তালিকা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রত্যেক প্রার্থীকে পিডিএফ আকারে দিয়েছিলাম। সেখানে ভোটারদের ছবি নেই। কোনো প্রার্থী এটি কোনো গ্রুপকে বা কাউকে দিয়ে বা বিক্রি করে থাকতে পারে। কিন্তু আমাদের এখান থেকে এ রকম বিক্রি করার মতো কোনো অনুমতি নাই।’

রুহুল আমিন মল্লিক আরও বলেন, ‘আমার অনুমান, ভোটার তালিকা ছাপানোর জন্য কোনো কম্পিউটারের দোকানে প্রার্থীরা গেছে। তখন কম্পিউটারের দোকানদাররা এটা কপি করে রেখে দিয়েছে।’

ডিসমিসল্যাব যে বিক্রেতার কাছ থেকে ভোটার তালিকা সংগ্রহ করেছে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তিনি নিজেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে এটি সংগ্রহ করেছিলেন। প্রমাণ হিসেবে তিনি ওই ব্যক্তির সঙ্গে কথোপকথনের কয়েকটি স্ক্রিনশট ও একটি স্ক্রিনরেকর্ড দেন। সেখানে থাকা নম্বরেও যোগাযোগ করার চেষ্টা করে ডিসমিসল্যাব। তবে নম্বরটিতে কল করলে জানা যায়, সেটি এখন আর ব্যবহার হচ্ছে না। ওই নম্বর দিয়ে খোলা হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্টও খুঁজে পাওয়া যায়নি।

ব্যক্তিগত তথ্য এভাবে সামাজিক মাধ্যমে বিনিময়ের ফলে তা নাগরিকদের সুরক্ষায় কোনো হুমকি তৈরি করছে কি না— জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. বি এম মইনুল হোসেন ডিসমিসল্যাবকে বলেন, ‘ফাঁস হওয়া তথ্যের সাহায্যে অপরাধীরা ভুয়া আইডি কার্ড তৈরি করে বিভিন্ন পরিষেবার জন্য চেষ্টা চালাতে পারে, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জালিয়াতি করা থেকে শুরু করে কারও অনলাইন অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ পর্যন্ত নিয়ে নিতে পারে। এমনকি এ তথ্যের অপব্যবহার করে অন্যের নামে সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যাকাউন্ট খুলে বিভিন্ন সাইবার অপরাধও করা সম্ভব। অর্থাৎ নাগরিকরা মারাত্মক আর্থিক, মানসিক এবং আইনি ঝুঁকির সম্মুখীন হতে পারেন।’

নাগরিকদের এসব ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কী করা উচিত— এ প্রশ্নের উত্তরে অধ্যাপক মইনুল বলেন, ‘যেসব প্রতিষ্ঠান নাগরিকদের সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য (এনআইডি, ভোটার তালিকা, জন্মনিবন্ধন বা শিক্ষাগত তথ্য) সংগ্রহ করে, তাদের তথ্য সংগ্রহের সঙ্গে সঙ্গে এর সুরক্ষার দিকেও নজর রাখা ও বাজেট বরাদ্দ দেওয়া প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে তথ্য সুরক্ষার ব্যবস্থা করা হচ্ছে কি না, সেটিও নিয়মিত অডিট করা প্রয়োজন।’

নির্বাচনের সময় প্রার্থীদের যখন ভোটার তালিকা দেওয়া হয় এবং তারা যখন সেটি ফটোকপি করতে যান, সেখান থেকে তথ্য ফাঁস হতে পারে। এ ধরনের বাস্তব পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করা উচিত— এমন প্রশ্নের উত্তরে ড. মইনুল বলেন, ‘এসব ক্ষেত্রে নাগরিকদের পুরো ব্যক্তিগত তথ্য না দিয়ে একেবারে যতটুকু না হলেই নয়, সে তথ্য দেওয়া যেতে পারে এবং সেটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করার নির্দেশনা দেওয়া যেতে পারে। অপরিহার্য কারণে যদি কিছু তথ্য দিতেই হয় এবং সেখান থেকে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ডেটা সংগ্রহ করে বিক্রির বা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, তবে তাদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।’

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

শেখ হাসিনাকে ফেরাতে তৎপরতা, শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে চবি

জুলাই আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পক্ষে দেশের ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ জন শিক্ষকের গোপন তৎপরতা চালানোর খবরের প্রেক্ষাপটে চবি প্রশাসন এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই শিক্ষকদের তালিকায় চবির ৯ শিক্ষকের নাম পাও

১৫ ঘণ্টা আগে

সাকিবসহ ১৫ জনের নামে ২৫৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ-পাচারের মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে

গত ২৭ জুলাই এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দিতে বলেছিলেন ঢাকা জ্যেষ্ঠ মহানগর বিশেষ জজ শাহজাহান কবির। সে দিন দুদক প্রতিবেদন জমা দিতে না পারলে বিচারক আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন জমার পরবর্তী দিন নির্ধারণ করে দেন।

১৬ ঘণ্টা আগে

সার্কভুক্ত দেশের শিক্ষার্থীদের ফুল-ফান্ডেড স্কলারশিপ দেবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

সার্কভুক্ত দেশগুলোর শিক্ষার্থীদের জন্য ফুল-ফান্ডেড স্কলারশিপ চালুর ঘোষণা দিয়েছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভাইস চ্যান্সেলর) অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ। তিনি বলেছেন, বিশেষ করে নেপালের শিক্ষার্থীদের জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পূর্ণ বিনা খরচে উচ্চশিক্ষার সুযোগ উন্মুক্ত করা হবে।

১৮ ঘণ্টা আগে

প্রথম শ্রেণিতে ভর্তিতে লটারি, অন্য সব শ্রেণিতে পরীক্ষা: শিক্ষা মন্ত্রণালয়

আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তিতে কোনো পরীক্ষা হবে না। এক্ষেত্রে লটারির মাধ্যমে ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। তবে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হবে।

১৮ ঘণ্টা আগে