খাদ্যবর্জ্য থেকে কম্পোস্ট, মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের ঝুঁকিতে কৃষিজমি: গবেষণা

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার একটি ল্যান্ডফিল। ছবি: সংগৃহীত

খাদ্যবর্জ্য ল্যান্ডফিলে না ফেলে কম্পোস্ট বা অন্যান্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য ব্যবস্থায় নেওয়া জলবায়ু ও পরিবেশের জন্য বড় ধরনের সুফল বয়ে আনতে পারে। তবে এসব উদ্যোগে প্লাস্টিক দূষণের ঝুঁকিকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দিলে কৃষিজমি ও পরিবেশে বিপুল পরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিক ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকেরা।

যুক্তরাষ্ট্রের ভার্মন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, খাদ্যবর্জ্য ল্যান্ডফিলে না পাঠিয়ে বিকল্প ব্যবস্থায় নেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট জলবায়ু প্রভাব ৮৯ থেকে ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। একই সঙ্গে পানিতে অতিরিক্ত পুষ্টি উপাদান জমে শৈবাল বৃদ্ধির মতো ‘ইউট্রোফিকেশন’ সমস্যাও কমানো সম্ভব।

তবে এর বিপরীতে নতুন একটি ঝুঁকির বিষয় সামনে এনেছেন গবেষকেরা— খাদ্যবর্জ্যের সঙ্গে থাকা প্লাস্টিক ও মাইক্রোপ্লাস্টিক।

দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক সাময়িকী ন্যাচার ফুডে। গবেষকেরা জীবনচক্র বিশ্লেষণ ব্যবহার করে খাদ্যবর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন পদ্ধতির জলবায়ু প্রভাব, পানিদূষণ ও প্লাস্টিক দূষণের তুলনা করেছেন।

ল্যান্ডফিল থেকে সরালেই সব সমস্যা মিটবে না

বিশ্বে প্রতিবছর উৎপাদিত মোট খাদ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নষ্ট বা অপচয় হয় বলে জাতিসংঘের তথ্য উল্লেখ করেছেন গবেষকেরা। যুক্তরাষ্ট্রে খাদ্যবর্জ্যের প্রায় ৪০ শতাংশ ল্যান্ডফিলে যায়। সেখানে এই বর্জ্য থেকে বছরে প্রায় তিন কোটি মেট্রিক টন কার্বন ডাই-অক্সাইডের সমপরিমাণ গ্রিনহাউজ গ্যাস তৈরি হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, এই খাদ্যবর্জ্য ল্যান্ডফিল থেকে সরিয়ে কম্পোস্টিং বা অ্যানেরোবিক ডাইজেশনের মতো বিকল্প ব্যবস্থায় নেওয়া হলে জলবায়ুর ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। কিন্তু খাদ্যবর্জ্যের সঙ্গে থাকা প্লাস্টিক পুরোপুরি আলাদা করা না গেলে সেই বর্জ্য থেকে তৈরি কম্পোস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক থেকে যেতে পারে। গবেষকদের হিসাব, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর প্রায় ২০ হাজার টন মাইক্রোপ্লাস্টিক কৃষিজমিতে পৌঁছাতে পারে।

গবেষকদের দাবি, জাতীয় পর্যায়ে খাদ্যবর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন পদ্ধতির ‘প্লাস্টিক দূষণ ফুটপ্রিন্ট’ নিয়ে এ ধরনের বিশ্লেষণ আগে করা হয়নি।

গবেষণা বলছে, খাদ্যবর্জ্য অনেক সময় প্লাস্টিক বা অন্য প্যাকেজিংয়ের ভেতরেই নষ্ট হয়ে যায়। ফলে খাদ্যবর্জ্য পুনর্ব্যবহারের আগে সেটি প্যাকেজিং থেকে আলাদা করতে হয়। এর জন্য কিছু ব্যবস্থায় মেকানিক্যাল ডিপ্যাকার ব্যবহার করা হয়। এতে প্যাকেজিং আলাদা হয়ে ল্যান্ডফিলে যেতে পারে, আর খাদ্যবর্জ্য কম্পোস্টিং বা অ্যানেরোবিক ডাইজেশনের মতো কাজে ব্যবহার করা হয়।

কিন্তু গবেষকেরা মডেলিং করে দেখেছেন, প্লাস্টিক আলাদা করার প্রযুক্তি ৯৯ শতাংশ কার্যকর হলেও খাদ্যবর্জ্য ল্যান্ডফিল থেকে সরিয়ে নেওয়ার ফলে কৃষিজমিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ অনেক গুণ বেড়ে যেতে পারে।

গবেষণার প্রধান লেখক কেট পোর্টারফিল্ড ব্যাখ্যা করে বলেছেন, মানুষ যেমন সবসময় নিখুঁতভাবে বর্জ্য আলাদা করতে পারে না, যন্ত্রও তেমনি শতভাগ কার্যকর নয়। আর আধুনিক খাদ্যব্যবস্থায় বিপুল পরিমাণ খাদ্য প্লাস্টিক দিয়ে প্যাকেটজাত হওয়ায় খাদ্যবর্জ্যকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য ব্যবস্থায় নেওয়ার প্রতিটি ধাপেই প্লাস্টিক দূষণের সম্ভাবনা থাকে।

খাদ্য নিরাপত্তা বনাম প্লাস্টিকের জটিল সমীকরণ

তবে গবেষকেরা প্লাস্টিক প্যাকেজিংকে সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় বলছেন না। বরং খাদ্য অপচয় কমানোর ক্ষেত্রেও প্যাকেজিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন তারা।

খাদ্যবর্জ্য নিয়ে কাজ করা সামাজিক উদ্যোগ সাসেক্স সারপ্লাসের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক ফিল হলটাম বলেন, প্লাস্টিক প্যাকেজিং অনেক ক্ষেত্রে তাজা খাবারের মেয়াদ বাড়াতে প্রয়োজনীয়। বিশেষ করে ক্ষুদ্র কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ক্ষেত্রে সঠিক প্যাকেজিং খাদ্য নষ্ট হওয়া কমাতে পারে।

এখানেই পরিবেশগত দ্বন্দ্বটি স্পষ্ট— একদিকে খাদ্য অপচয় কমাতে হবে, অন্যদিকে অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিক ব্যবহারও কমাতে হবে। গবেষকদের মতে, তাই খাদ্যবর্জ্য ব্যবস্থাপনার নীতি তৈরির শুরু থেকেই প্লাস্টিক দূষণের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

ভোক্তার ‘নিখুঁত খাবার’ চাওয়ার কারণেও বাড়ছে অপচয়

খাদ্যবর্জ্য তৈরির পেছনে শুধু প্যাকেজিং বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা দায়ী নয়। মানুষের খাদ্য নির্বাচনের অভ্যাসও বড় ভূমিকা রাখে। শেফ, লেখক ও পরিবেশকর্মী ম্যাক্স লা মান্না বলেন, বাজারে কোন সবজি বা ফল জায়গা পাবে, তার ওপর ভোক্তাদের ‘নিখুঁত দেখতে’ খাবারের চাহিদার প্রভাব রয়েছে।

আকারে একটু বাঁকা, দাগযুক্ত বা দেখতে কিছুটা ভিন্ন শসা কিংবা অন্য সবজি অনেক সময় দোকানের তাকেই পৌঁছায় না। ফলে দেখতে নিখুঁত খাবারের প্রতি অতিরিক্ত গুরুত্ব খাদ্য অপচয় বাড়াতে পারে। তার বক্তব্যের সারকথা হলো— ‘নিখুঁত’ খাবারের ধারণাকে ভালো খাবারের পথে বাধা হতে দেওয়া হচ্ছে।

স্কুল-হাসপাতাল ও ‘উইশ রিসাইক্লিং’য়ের চ্যালেঞ্জ

খাদ্যবর্জ্য কমানোর নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্কুল, হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও জটিলতা রয়েছে। গবেষণার সহলেখক এরিক রয় বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কিছু কঠোর নিয়ম প্রয়োজন হয়। কিন্তু ভালো উদ্দেশ্যে তৈরি কিছু নিয়ম কখনো কখনো অতিরিক্ত প্যাকেজিংযুক্ত খাবার থেকে বেরিয়ে আসার পথে বাধা তৈরি করতে পারে।

তবে এখানে খাদ্য নিরাপত্তাকে কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যাবে না। ফলে ভবিষ্যতের খাদ্যবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এমন ব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে খাদ্য নিরাপত্তা, খাদ্য অপচয় কমানো ও প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ— তিনটি লক্ষ্য একসঙ্গে বিবেচনা করা হবে।

গবেষকেরা সাধারণ মানুষের ভুল বর্জ্য আলাদা করার অভ্যাসের দিকেও নজর দিয়েছেন। এর একটি পরিচিত নাম ‘উইশ রিসাইক্লিং’। এর অর্থ, কোনো বস্তু পুনর্ব্যবহারযোগ্য কি না নিশ্চিত না হয়েও সেটিকে রিসাইক্লিংয়ের বিনে ফেলে দেওয়া, এই আশায় যে কোনোভাবে সেটি পুনর্ব্যবহার করা হবে।

রয় বলেন, এ ধরনের অভ্যাস শেষ পর্যন্ত পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়ায় দূষণ বাড়াতে পারে। তার পরামর্শ, পুরোনো কিন্তু কার্যকর পরিবেশবান্ধব অভ্যাসগুলোতে ফিরে যেতে হবে, যেমন— সম্ভব হলে বেশি পরিমাণে একসঙ্গে কেনা, বর্জ্য যথাসম্ভব সঠিকভাবে আলাদা করা এবং কোনো বস্তু পুনর্ব্যবহারযোগ্য কি না নিশ্চিত না হলে ভুলভাবে রিসাইক্লিংয়ের ধারায় না পাঠানো।

বাংলাদেশের জন্যও বার্তা

গবেষণাটি যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্যবর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর ভিত্তি করে করা হলেও এর শিক্ষা বাংলাদেশের মতো দ্রুত নগরায়ন ও বাড়তে থাকা খাদ্যবর্জ্য সমস্যার দেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে একদিকে খাদ্য অপচয় কমানো ও জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট বা জৈব সার তৈরির প্রয়োজন বাড়ছে, অন্যদিকে খাদ্যবর্জ্যের সঙ্গে প্লাস্টিক প্যাকেট, পলিথিন ও অন্যান্য প্যাকেজিং মিশে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। এসব উপাদান যথাযথভাবে আলাদা না করে জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট তৈরি করা হলে মাইক্রোপ্লাস্টিক কৃষিজমিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

জনস্বাস্থ্যের দিক থেকে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মাইক্রোপ্লাস্টিক মাটি, পানি ও খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করতে পারে। মানবস্বাস্থ্যে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে গবেষণা এখনো চলমান এবং সব ঝুঁকি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। তাই ‘প্রতিরোধমূলক সতর্কতা’ নীতিতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্লাস্টিক আলাদা করাকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো— খাদ্যবর্জ্যকে ল্যান্ডফিল থেকে সরিয়ে নেওয়া নিঃসন্দেহে জলবায়ুর জন্য বড় সুফল দিতে পারে, কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় প্লাস্টিককে সঙ্গে নিয়ে গেলে একটি পরিবেশগত সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে আরেকটি সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই ভবিষ্যতের খাদ্যবর্জ্য ব্যবস্থাপনা শুধু ‘বর্জ্য কোথায় যাবে’— এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ না রেখে, ‘বর্জ্যের সঙ্গে কী যাচ্ছে’— সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

বিদ্যুৎ উৎপাদনে অর্থনীতি-পরিবেশ-জনস্বার্থকে গুরুত্বের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

রোববার (৯ আগস্ট) কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ীতে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন মাতারবাড়ী আল্ট্রা-সুপারক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শনের সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এসব নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী।

৩ ঘণ্টা আগে

ঢাবিতে ছাত্রীদের হল-প্রবেশে বৈষম্য দূর করার দাবি শিক্ষক নেটওয়ার্কের

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের অভিযোগ, নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে ছাত্রীদের জন্য রাত ১০টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত যে ‘সান্ধ্য আইন’ চালু রয়েছে, তা অনেক ক্ষেত্রে হয়রানির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দূরপাল্লার যাত্রা শেষে রাতে হলে ফিরলে গেটে অপেক্ষা করা, জরুরি প্রয়োজনে বাইরে যাওয়া কিংবা চিকিৎসার প্রয়োজনে বের হওয়ার

৪ ঘণ্টা আগে

দেশে ভোটার বেড়ে ১২ কোটি ৮৬ লাখ

রোববার (৯ আগস্ট) দুপুরে আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ।

৪ ঘণ্টা আগে

৪০ ঘণ্টা পর রোম থেকে ঢাকায় ফিরল বিমানের সেই ফ্লাইট

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জনসংযোগ কর্মকর্তা বোসরা ইসলাম বলেন, “আলহামদুলিল্লাহ, রোম ফ্লাইট ১২টা ৩০ মিনিটে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেছে সেইফলি।”

৪ ঘণ্টা আগে