বিজ্ঞান

শিশুদের হঠাৎ জ্বর হলে করণীয় কী

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম

বাচ্চাদের হঠাৎ জ্বর হলে বাবা-মায়ের মনে যেমন ভয় কাজ করে, তেমনি দুশ্চিন্তাও পেয়ে বসে পুরো পরিবারকে। ছোট একটি শরীর, তার ভেতরে উত্তপ্ত তাপমাত্রা যেন এক অজানা আশঙ্কার নাম। তবে জ্বর মানেই যে বড় কোনও অসুখ, তা সবসময় নয়। অনেক সময় এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। সহজ ভাষায় বললে, বাচ্চাদের দেহ যখন কোনো জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করে, তখনই শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। তাই হঠাৎ জ্বর হলে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হওয়াই জরুরি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানায়, ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে জ্বরের কারণ হতে পারে সাধারণ সর্দি-কাশি, ভাইরাস সংক্রমণ, টনসিল, বা মাঝে মাঝে সংক্রমণজনিত ডায়রিয়া। এমনকি টিকা নেওয়ার পরও অনেক সময় শিশুর শরীর গরম হতে দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত শিশু চিকিৎসা গবেষক ড. জেনিফার শু বলেন, “জ্বর আসলে আমাদের বন্ধু। এটি ইঙ্গিত দেয়—শরীর কিছু একটা নিয়ে কাজ করছে।” তিনি আরও বলেন, “জ্বর থাকলেও যদি শিশু খেলাধুলা করে, খায়দায় ভালোভাবে, তাহলে খুব বেশি ভয়ের কিছু থাকে না।”

তবে কোন জ্বরটা সামান্য আর কোনটা গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। শিশুর বয়স, জ্বরের তাপমাত্রা, এবং তার আচরণ—এই তিনটি বিষয় মাথায় রেখে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। দুই মাসের কম বয়সী নবজাতকের শরীরের তাপমাত্রা যদি ১০০.৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার বেশি হয়, তবে দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে। কারণ এই বয়সের শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একেবারেই দুর্বল থাকে। আবার, যদি শিশুর বয়স ছয় মাসের বেশি হয় এবং সে জ্বরের সঙ্গে খাওয়া বন্ধ করে দেয়, অসাড় হয়ে পড়ে, চোখে পানি না আসে, শুষ্ক ঠোঁট হয়, ঘন ঘন প্রস্রাব না করে—তাহলে এটিও হতে পারে মারাত্মক অসুস্থতার লক্ষণ।

আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির শিশুস্বাস্থ্য গবেষক ড. লরা মার্কাস বলেন, “শিশুর আচরণই হচ্ছে আসল বার্তা। অনেক সময় দেখা যায়, জ্বর ১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইট, কিন্তু সে খাচ্ছে, খেলছে, চোখে উজ্জ্বলতা আছে—তখন বিষয়টি স্বস্তিদায়ক। আবার জ্বর ১০১ হলেও যদি শিশুটি কাঁদছে, খাচ্ছে না, চোখ বন্ধ করে রাখছে—তখন অবিলম্বে সতর্ক হতে হবে।”

শিশুর জ্বর হলে প্রথমে ঘরে থাকা থার্মোমিটার দিয়ে মেপে নিতে হবে তার তাপমাত্রা। পায়ুপথে মাপলে তাপমাত্রা কিছুটা বেশি পাওয়া যায়, আর মুখ বা কানে মাপলে কম। দুই বছরের নিচে শিশুদের ক্ষেত্রে পায়ুপথে মাপাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য। শরীরের তাপমাত্রা যদি ১০০.৪–১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইটের মধ্যে থাকে, তাহলে ঘরোয়া কিছু উপায়ে অপেক্ষা করে দেখা যেতে পারে। শিশু যদি স্বাভাবিক আচরণ করে, তবে ঠান্ডা পানি দিয়ে শরীর মুছে দেওয়া, হালকা জামাকাপড় পরানো, ঘরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখা এসবেই উপকার মিলতে পারে।

তবে অনেক মা-বাবা দ্রুত জ্বর কমাতে ওষুধ দিতে আগ্রহী হন। কিন্তু চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কখনও শিশুদের জ্বরের ওষুধ দেওয়া উচিত নয়। প্যারাসিটামল বা আইবুপ্রোফেন জাতীয় ওষুধ দিলেও বয়স অনুযায়ী মাত্রা না জানলে তা ক্ষতি করতে পারে। ব্রিটেনের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (NHS) বলছে, “শিশুর ওজন, বয়স এবং পূর্বের চিকিৎসা ইতিহাস বিবেচনায় ওষুধ দেওয়া উচিত। ভুল মাত্রায় ওষুধ শিশুর যকৃতের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।”

জ্বরের সময় শিশুকে যতটা সম্ভব তরল খাওয়াতে হবে। বুকের দুধপানকারী শিশুর ক্ষেত্রে বারবার দুধ খাওয়ানো জরুরি। একটু বড় শিশু হলে তাকে স্যুপ, ওআরএস, ফলের রস, বা সাদা ভাতের মাড় দেওয়া যেতে পারে। পানি কম খেলে শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে, যা জ্বরের সময় মারাত্মক হতে পারে। শিশু যদি প্রস্রাব বন্ধ করে দেয় বা তার মুখ ও ঠোঁট শুষ্ক হয়ে পড়ে, তাহলে বুঝতে হবে সে ডিহাইড্রেশনে ভুগছে।

অনেক সময় দেখা যায়, শিশুদের জ্বরের সঙ্গে খিঁচুনি হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানে একে “ফেব্রাইল সিজার” বলা হয়। এটি সাধারণত ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের হয় এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভয় পাওয়ার কিছু থাকে না। তবে প্রথমবার হলে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। আমেরিকার শিশু নিউরোলজিস্ট ড. অ্যালেক্স জ্যাকসন বলেন, “ফেব্রাইল সিজার শিশুর জন্য ভয়ংকর শোনালেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি দীর্ঘস্থায়ী হয় না বা মস্তিষ্কে ক্ষতি করে না। কিন্তু খিঁচুনি পাঁচ মিনিটের বেশি স্থায়ী হলে, জ্ঞান না ফিরে এলে বা শিশুর শ্বাস বন্ধ হয়ে গেলে জরুরি চিকিৎসা দরকার।”

জ্বরের পেছনের কারণটা জানা খুব জরুরি। সর্দি-কাশিজনিত ভাইরাস জ্বর সাধারণত ৩-৫ দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। কিন্তু যদি জ্বরের সঙ্গে চামড়ায় ফুসকুড়ি ওঠে, গলা ফুলে যায়, কাশি দীর্ঘস্থায়ী হয়, হাড়-গাঁটে ব্যথা হয় বা পায়খানা পাতলা হয়, তাহলে এটি ভাইরাস ছাড়াও অন্য সংক্রমণের লক্ষণ হতে পারে। তাই জ্বর তিন দিন পার হলেও না কমলে চিকিৎসকের শরণ নেওয়া জরুরি।

শিশুর জ্বর হলে মা-বাবার উচিত ধৈর্য ধরে তাকে মানসিকভাবে স্বস্তি দেওয়া। অনেক সময় জ্বরের কারণে শিশুর মন খারাপ থাকে, চিৎকার করে বা ঘুমাতে চায় না। এই সময় তাকে কোলে নেওয়া, গল্প বলা, আদর করা এগুলো তার জন্য ওষুধের মতো কাজ করে। জ্বর কমে গেলে শিশুর খাওয়া-দাওয়া স্বাভাবিক হয়ে যায়, কিন্তু তার রুটিন ধীরে ধীরে ফিরিয়ে আনাই ভালো।

সবশেষে, শিশুর বারবার জ্বর হলে তার রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়েও ভাবতে হয়। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, নিয়মিত টিকা, পুষ্টিকর খাবার আর পর্যাপ্ত ঘুম—এসবই শিশুকে স্বাস্থ্যবান রাখতে সাহায্য করে। শিশু চিকিৎসা বিষয়ক অস্ট্রেলিয়ান গবেষক ড. রোজ ল্যামবার্ট বলেন, “বাচ্চাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা প্রাকৃতিকভাবেই গড়ে ওঠে ছোটখাটো ভাইরাসের সংস্পর্শে। তাই সব ভাইরাস থেকে তাকে আলাদা করে রাখা নয়, বরং তাকে সুস্থ রাখার পরিবেশ তৈরি করাই হলো বুদ্ধিমানের কাজ।”

সব বাবা-মায়েরই চাওয়া—তাঁর সন্তান যেন হাসিখুশি থাকে, সুস্থ থাকে। তাই জ্বর এলে ভয় না পেয়ে সচেতন পদক্ষেপই শিশুর সুস্থতার মূল চাবিকাঠি। স্বাস্থ্যবিধি, ঘরোয়া যত্ন আর প্রয়োজনে চিকিৎসা—এই তিন পথেই পাওয়া যাবে আশার আলো।

Ad
Ad
ad
ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অভিযোগ মনগড়া নয়, বলছে দুদক

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগ মনগড়া নয় বলে জানিয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সচিব সাইদুর রহমান খান।

৩ ঘণ্টা আগে

হামের উপসর্গে আরও ৬ জনের মৃত্যু, প্রাণহানি বেড়ে ১০৩৬

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গত ১৫ মার্চ থেকে হামে আক্রান্ত ও হামের উপসর্গ নিয়ে অসুস্থ রোগীদের তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করছে। সেই হিসাব অনুযায়ী, এ সময়ের মধ্যে নিশ্চিত হামে ১০০ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে ৯৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ছয় মাসে প্রাণ গেছে ১ হাজার ৩৬ জনের। দেশের ইতিহাসে হামে এত মৃত্যুর ঘটনা আগে ঘ

৩ ঘণ্টা আগে

এয়ারবাস কেনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিতের আশ্বাস বিমানমন্ত্রীর

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহর সম্প্রসারণে এয়ারবাস কেনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। তিনি বলেন, যেকোনো ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে। উচ্চপর্যায়ের আলোচনা কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে

৩ ঘণ্টা আগে

সম্পদের হিসাব না দেওয়ায় এস কে সুরের স্ত্রীর ২ বছরের কারাদণ্ড

মামলার নথি ও দুদক সূত্রে জানা গেছে, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে সুপর্ণা সুর, তার স্বামী এস কে সুর এবং তাদের ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিদের নামে বা বেনামে অর্জিত সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, দায়-দেনা, আয়ের উৎস ও তা অর্জনের বিস্তারিত বিবরণ দাখিলের জন্য সুপর্ণাকে নোটিশ দেওয়া হয়।

৩ ঘণ্টা আগে
Advertisement