আইনের খসড়া

গুমে মৃত্যু হলে সর্বোচ্চ সাজা ফাঁসি, তদন্তে পুলিশ-বিচার বিশেষ আদালতে

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
গুম। প্রতীকী ছবি

গুমের শিকার কোনো ব্যক্তির মৃত্যু হলে বা গুমের পর লাশ পাওয়া গেলে কিংবা ঘটনার পাঁচ বছর পরও তাকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব না হলে দায়ী ব্যক্তির সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড রেখে আইনের খসড়া তৈরি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিকল্প সাজা হিসেবে যাবজ্জীবন অথবা কমপক্ষে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং পাশাপাশি সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে এ খসড়ায়।

‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’ নামে এই খসড়ায় গুমের ঘটনার তদন্ত পুলিশের কাছে ন্যস্ত করার কথা বলা হয়েছে। তবে পুলিশ অভিযোগ না নিলে ভুক্তভোগীর পক্ষে যে কেউ ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে উপস্থিত হয়ে নালিশি মামলা করতে পারবেন। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এ-সংক্রান্ত যে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল, তাতে এ ধরনের ঘটনায় তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে।

‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’ শীর্ষক খসড়ায় সাধারণভাবে গুমের অপরাধে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন অথবা কমপক্ষে তিন বছরের কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে। অভিযোগ পাওয়ার পর ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত ও অভিযোগ গঠনের পর ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে গুমের বিচার শেষ করতে হবে।

মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে বিলটির খসড়া প্রকাশ করা হয়েছে। বিলে বলা হয়েছে, মানবাধিকার, মানবিক মর্যাদা, ব্যক্তি-স্বাধীনতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা রাষ্ট্রের অন্যতম অঙ্গীকার। গুম এসব অধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন। ব্যাপক বা পরিকল্পিতভাবে সংঘটিত গুমকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের অধীনে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিচারের সুযোগও রাখা হয়েছে।

খসড়া এ আইনে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বা রাষ্ট্রের অনুমোদন, সমর্থন কিংবা সম্মতিতে কাজ করা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মাধ্যমে কাউকে গ্রেপ্তার, আটক, অপহরণ বা অন্যভাবে স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করার ঘটনাকে গুমের আওতায় আনা হয়েছে। বলা হয়েছে, আটকের পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির স্বাধীনতা হরণের বিষয়টি অস্বীকার করা, তার অবস্থান বা পরিণতি গোপন রাখা এবং এর ফলে তাকে আইনের সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করা হলে সেটি গুমের অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পর সংবিধানের ৩৩(২) অনুচ্ছেদে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা হলে হাজির করার আগ পর্যন্ত তার অবস্থান গোপন রাখা হলেও সেটিকে গুম হিসেবে বিবেচনা করা হবে না বলে উল্লেখ করা হয়েছে আইনের খসড়ায়।

বিলের সাধারণ শাস্তির ধারায় বলা হয়েছে, গুমের জন্য দায়ী ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন অথবা কমপক্ষে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া যাবে। এর সঙ্গে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড আরোপ করা যাবে।

অন্যদিকে গুমের কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মৃত্যু হলে বা তার লাশ পাওয়া গেলে সাজা হবে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড। এমনকি গুমের পাঁচ বছর পরও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব না হলেও সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত সাজার বিধান রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডও আরোপ করা যাবে।

এ ছাড়া গুমের আলামত, সাক্ষ্য-প্রমাণ বা নথি নষ্ট, গোপন, বিকৃত কিংবা পরিবর্তন করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড হবে। গোপন আটককেন্দ্র নির্মাণ, স্থাপন বা ব্যবহার করলেও একই শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। গুমের চেষ্টা, আদেশ, নির্দেশ, সহায়তা, প্ররোচনা বা অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের ক্ষেত্রেও মূল অপরাধের জন্য নির্ধারিত সাজা প্রযোজ্য হবে।

আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, জরুরি অবস্থা কিংবা অন্য কোনো বিশেষ পরিস্থিতিকে গুমের পক্ষে যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। সরকারি বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশ বা নির্দেশ পালন করার যুক্তিও গ্রহণযোগ্য হবে না।

এদিকে সশস্ত্র বাহিনীর কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কমান্ডার বা দলনেতার অধীন ব্যক্তিরা গুমে জড়িত হলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দায় নির্ধারণের বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিজে অপরাধে অংশ নিলে, আদেশ বা অনুমোদন দিলে কিংবা গুম-সংক্রান্ত পরিকল্পনায় যুক্ত থাকলে মূল অপরাধের শাস্তি পাবেন। অধীনদের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ থাকা সত্ত্বেও গুম প্রতিরোধে ব্যবস্থা না নিলে বা অপরাধের তথ্য জেনেও ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করলে তিনিও দায়ী হবেন।

খসড়ায় বলা হয়েছে, ভুক্তভোগী নিজে, ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী, সাক্ষী অথবা ঘটনা সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য জানা যেকোনো ব্যক্তি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) কাছে অভিযোগ দিতে পারবেন। থানা যদি অভিযোগ না নেয়, অভিযোগকারী সরাসরি এখতিয়ারসম্পন্ন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নালিশি মামলা করতে পারবেন।

সরকারি কর্মকর্তা বা বাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা নেওয়া কিংবা বিচার শুরু করতে সরকারের পূর্বানুমোদন লাগবে না। সরকারি দায়িত্ব পালনের সঙ্গে অভিযোগের সম্পর্ক রয়েছে— এমন যুক্তিতেও অনুমতির বাধ্যবাধকতা থাকবে না।

গুমের মামলায় তদন্ত কর্মকর্তাকে দায়িত্ব পাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করে সাক্ষ্য-প্রমাণসহ প্রতিবেদন দিতে হবে বলে বিধান রাখা হয়েছে। তবে এর বাইরে যৌক্তিক কারণে ম্যাজিস্ট্রেট তদন্তর জন্য আরও সর্বোচ্চ ৩০ দিন সময় বাড়াতে পারবেন। বর্ধিত সময়েও তদন্ত শেষ না হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।

গুমের মামলার বিচার কেবল এখতিয়ারসম্পন্ন দায়রা জজ আদালতে হবে। অভিযোগ গঠনের পর ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার শেষ করতে হবে। নির্ধারিত সময়ে বিচার শেষ না হলে আদালত কারণ উল্লেখ করে আরও ৩০ কার্যদিবস সময় নিতে পারবেন। সে কারণ লিখিতভাবে সুপ্রিম কোর্টে প্রতিবেদন আকারে পাঠাতে হবে।

বিচার শেষে আদালতের কাছে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হলে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক অভিযোগের ক্ষেত্রে বিচারক অভিযোগকারীকে শাস্তি দিতে পারবেন। ক্ষতিগ্রস্ত অভিযুক্তকেও যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। প্রয়োজনে মিথ্যা অভিযোগকারীকে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিতে পারবেন বিচারক।

খসড়া আইনে বলা হয়েছে, আদালত অর্থদণ্ডকে ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণ হিসেবে গণ্য করতে পারবেন। অর্থদণ্ড বা ক্ষতিপূরণের টাকা দণ্ডিত ব্যক্তির স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ থেকে আদায় করা যাবে। অন্য দাবির তুলনায় ক্ষতিপূরণের দাবি অগ্রাধিকার পাবে। সম্পদ থেকে টাকা আদায় করা সম্ভব না হলে রাষ্ট্রকে ভুক্তভোগী বা তার পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করেও ক্ষতিপূরণের অর্থ সংগ্রহের নির্দেশ দিতে পারবেন আদালত।

খসড়ায় বলা হয়েছে, এ আইনের অধীন অপরাধগুলো আমলযোগ্য, জামিন-অযোগ্য ও আপস-অযোগ্য হবে। অভিযোগকারীকে শুনানির সুযোগ না দিয়ে এবং অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য হওয়ার যৌক্তিক কারণ নেই— এ বিষয়ে আদালত সন্তুষ্ট না হলে কাউকে জামিন দেওয়া যাবে না। তবে অভিযুক্ত নারী, শিশু অথবা গুরুতর অসুস্থ হলে এবং জামিন দিলে ন্যায়বিচার ব্যাহত হবে না বলে আদালত মনে করলে জামিন দেওয়া যেতে পারে।

এর বাইরে সরকারের তত্ত্বাবধানে গুম-সংক্রান্ত একটি তথ্যভাণ্ডার তৈরির প্রস্তাবও রয়েছে আইনের খসড়ায়। বলা হয়েছে, ব্যাপক বা পরিকল্পিত গুমের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও করা যাবে।

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

সংসদ ভবনে গণপূর্ত কার্যালয়ে আগুন, তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ

ভারপ্রাপ্ত স্পিকার আগুন লাগার কারণ অনুসন্ধান, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়নের জন্য তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন।

৬ ঘণ্টা আগে

বাংলাদেশের কাছে টনপ্রতি ১০ ডলার কমে ইউরিয়া সার বিক্রির আগ্রহ রাশিয়ার

বাংলাদেশের কাছে অন্যান্য দেশ থেকে আমদানি করা ইউরিয়া সারের তুলনায় প্রতি মেট্রিক টন ১০ ডলার কম দামে বিক্রির আগ্রহ প্রকাশ করেছে রাশিয়া। দেশটি সরকারি পর্যায়ে (জিটুজি) বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) কাছে প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া সার সরবরাহে আগ্রহের কথা জানিয়েছে।

৭ ঘণ্টা আগে

আম্মার ও শিবিরের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থী মারধরের অভিযোগ, তদন্তে রাবি প্রশাসন

সোমবার রাতেই প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. রেজাউল করিমকে আহ্বায়ক করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। মঙ্গলবার সকালে কমিটির সদস্যরা কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি ও রাকসু ভবন পরিদর্শন করে আলামত সংগ্রহ করেন।

৮ ঘণ্টা আগে

নিবন্ধিত নিউজপোর্টালের সম্পাদকদের সংগঠন ‘অনলাইন এডিটরস ফোরাম’ গঠন, নেতৃত্বে পিন্টু-ইফতেখার

সংগঠনটির নয় সদস্যের আহ্বায়ক কমিটির আহ্বায়ক নির্বাচিত হয়েছেন রাজনীতি ডটকমের সম্পাদক ও প্রকাশক শরিফুজ্জামান পিন্টু। সদস্যসচিব মনোনীত হয়েছেন ঢাকা স্ট্রিমের সম্পাদক ও প্রকাশক গোলাম ইফতেখার মাহমুদ।

৮ ঘণ্টা আগে