শঙ্কা কাটিয়ে উদ্বোধনের অপেক্ষায় বইমেলা, অব্যবস্থাপনায় প্রস্তুতিতেই বিপর্যয়

নাজমুল ইসলাম হৃদয়
আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৫: ১৯
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে এগিয়ে চলেছে বইমেলার প্রস্তুতি, উদ্বোধন হবে বৃহস্পতিবার। ছবি: রাজনীতি ডটকম

ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি পেরিয়ে যাওয়ার পথে। স্বভাবতই বাঙালির প্রাণের মেলা ‘অমর একুশে বইমেলা’র এ বছরের আয়োজন নিয়ে ছিল শঙ্কা। শেষ পর্যন্ত সব শঙ্কা কেটে গেছে। হাতুড়ি-বাটালের শব্দে মুখরিত হয়ে উঠেছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণ, একটার পর একটা স্টলের কাজ শেষ হতে শুরু করেছে। বলতে গেলে রূপ পেতে শুরু করেছে ‘অমর একুশে বইমেলা ২০২৬’।

আগামীকাল বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ২টায় এবারের বইমেলার উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটিই হবে তার প্রথম বড় ধরনের ‘পাবলিক অ্যাপিয়ারেন্স’। দিনক্ষণ চূড়ান্ত হওয়ায় এখন বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।

মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) ও বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, বেশির ভাগ স্টলের নির্মাণকাজ এখনো চলছে। মূল কাঠামো নির্মাণ হয়ে গেলেও কাজ শেষ হতে আরও কিছু সময় লাগবে। উদ্বোধনের আগেই স্টলের কাজ শেষ করতে নির্মাণ শ্রমিকসহ প্রকাশনা সংস্থাগুলোর সংশ্লিষ্টরা দম ফেলার ফুসরত পাচ্ছেন না।

শেষ মুহূর্তে এসেও প্রস্তুতি শেষ করতে না পারার পেছনে এবারের বইমেলার আয়োজন নিয়ে অনিশ্চয়তা রেখেছে মূল ভূমিকা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় শুরুতে গত ডিসেম্বরেই বইমেলা আয়োজনের প্রাথমিক ঘোষণা দিয়েছিল তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার।

প্রকাশকরা রাজি না হওয়ায় সে পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। এরপর একবার ঈদুল ফিতরের পর মেলা নিয়ে যাওয়ার আলোচনা হয়েছিল। পরে সিদ্ধান্ত হয়, ২০ ফেব্রুয়ারি শুরু হবে বইমেলা। প্রকাশকদের মধ্যে প্রস্তুতির সময় নিয়ে আপত্তির মুখে শেষ পর্যন্ত ২৬ ফেব্রুয়ারি বইমেলা আয়োজনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে বইমেলার স্টল নির্মাণে ব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমিকরা। ছবি: রাজনীতি ডটকম
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে বইমেলার স্টল নির্মাণে ব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমিকরা। ছবি: রাজনীতি ডটকম

এদিকে স্বল্প প্রস্তুতিতেও বইমেলায় অংশ নিতে রাজি হওয়া প্রকাশকদের বিভিন্ন সংগঠনের মোর্চা প্রকাশক ঐক্য শর্ত দিয়েছিল, মেলায় কোনো প্যাভিলিয়ন থাকতে পারবে না। তাতে প্যাভিলিয়ন বরাদ্দ পাওয়া প্রকাশনা সংস্থাগুলো রাজি না হওয়ায় ফের তৈরি হয় অনিশ্চয়তা। প্রকাশক ঐক্য মেলা বর্জনের সিদ্ধান্ত জানায়। শেষ পর্যন্ত রোববার রাতে স্টল বরাদ্দের মাধ্যমে সে অনিশ্চয়তার অবসান ঘটে।

মেলা শুরু নিয়ে বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনা, স্টল বরাদ্দে সমন্বয়হীনতা আর শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কারণে এবারের মেলা শুরুর আগেই এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে বলে অভিযোগ প্রকাশকদের। তারা বলছেন, স্টল বরাদ্দের লটারির পর তালিকায় নাম না থাকা এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত স্টল বুঝে না পাওয়ার কারণে চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন অনেকে।

বাংলাদেশ সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি ও প্রকাশক ঐক্যের অন্যতম সদস্য ইকবাল হোসেন সানু এ পরিস্থিতির জন্য সরাসরি একাডেমি কর্তৃপক্ষকে দায়ী করেছেন। রাজনীতি ডটকমের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “অমর একুশে বইমেলা শুরুর আগ মুহূর্তে বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষের চরম অব্যবস্থাপনায় আমরা দিশেহারা বোধ করছি। গত ২২ ফেব্রুয়ারি লটারি হওয়ার পর দেখা যাচ্ছে অনেক প্রকাশকের নামই তালিকায় নেই, যা কর্তৃপক্ষ এখন ‘ভুল’ বলে দাবি করছে।”

মঙ্গলবার বিকেলে কথা হচ্ছিল ইকবাল হোসেন সানুর সঙ্গে। তিনি আরও বলেন, ‘মেলার উদ্বোধনের বাকি মাত্র এক দিন, অথচ এখনো অনেক প্রকাশক তাদের স্টল বুঝে পাননি। এমনকি আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া আমাকেও আজ (২৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেল পর্যন্ত দুই ইউনিটের স্টলটি বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। প্রশ্ন হলো— এক দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ স্টল নির্মাণ করা কি আদৌ সম্ভব?’

মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা গেছে, বই মেলার অধিকাংশ স্টলে হাতুড়ি-বাটালের শব্দ থামেনি। ৭৪৪ নম্বর স্টলে কর্মরত নির্মাণ শ্রমিক মোহাম্মদ ফরিদ জানালেন, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা প্রায় অসম্ভব।

তিনি বলেন, ‘মেলা পরিচালনা কর্তৃপক্ষের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে আগে নির্মিত অনেক কাঠামো ভেঙে আবার নতুন করে কাজ করতে হয়েছে। কর্তৃপক্ষের এ ঘন ঘন সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ফলেই মূলত কাজে এত ধীরগতি ও দেরি। শুধু আমাদের স্টল নয়, মেলার প্রায় প্রতিটি স্টলেরই এখন একই করুণ দশা।’

আগেভাগে কাজ শুরু করার সুযোগ পাওয়ায় কিছু স্টলের নির্মাণকাজ প্রায় শেষের দিকে। ছবি: রাজনীতি ডটকম
আগেভাগে কাজ শুরু করার সুযোগ পাওয়ায় কিছু স্টলের নির্মাণকাজ প্রায় শেষের দিকে। ছবি: রাজনীতি ডটকম

একই সুরে কথা বলেন আরেক নির্মাণ শ্রমিক দিলীপ বিশ্বাস। তিনি জানান, গত আট দিন ধরে কাজ করার পর বাংলাএকাডেমি কর্তৃপক্ষের নির্দেশে আগের কাঠামো ভেঙে ফেলতে হয়েছে। ফলে নতুন করে কাজ শুরু করতে গিয়ে সময় বেশি লাগছে। দিলীপের ভাষ্য, ২৬ ফেব্রুয়ারি মেলা শুরু হয়ে গেলেও সব স্টলের কাজ শেষ হতে ২৮ ফেব্রুয়ারি বা ১ মার্চ পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।

বইমেলার স্টল নির্মাণে দেরি হওয়া নিয়ে প্রকাশকদের অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ আজম রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘স্টল নির্মাণ নিয়ে যে পরিস্থিতি, তা নতুন কিছু নয়। প্রতি বছরই মেলার শুরুর প্রথম দুই-তিন দিন অনেক স্টলে কাজ চলতে থাকে।’

তবে এ বছর স্টল বরাদ্দ দেওয়ার প্রক্রিয়া নানা কারণে বিলম্বিত হয়েছে বলে স্বীকার করে নেন মহাপরিচালক। মেলার প্রস্তুতি ও সিদ্ধান্ত নিয়ে ১৮ ও ১৯ তারিখে মন্ত্রী পর্যায়ের সংবাদ সম্মেলনে সবকিছু বিস্তারিত জানানো হয়েছে জানিয়ে ডিজি বলেন, পত্রপত্রিকায় সেসব বিষয় প্রকাশিত হয়েছে। ফলে সব অভিযোগকে সত্য না ধরে নিয়ে মেলার বাস্তব পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতেও মেলার আয়োজন সুন্দর হবে বলে আশ্বস্ত করে অধ্যাপক আজম বলেন, ‘অনেক স্টলের কাজই শেষ হয়ে এসেছে। বাকি স্টলগুলোর কাজও আজ বা কালকের মধ্যেই পুরোপুরি সম্পন্ন হয়ে যাবে। আশা করছি বইমেলা ভালো হবে।’

এদিকে কিছুটা আশার আলো দেখা গেছে সেসব স্টলে, যারা আগেভাগে কাজ শুরু করার সুযোগ পেয়েছিলেন। আমরাবতী প্রকাশনীর স্টল নির্মাণে ব্যস্ত মো. শিপন আহমেদ রাজনীতি ডটকমকে বলেন, ‘আমাদের কাজ প্রায় শেষের দিকে। আমরা কাজ করার জন্য পর্যাপ্ত সময় পেয়েছি। ২৬ তারিখে আমাদের আর কোনো বাকি কাজ থাকবে না।’ তবে শিপনদের মতো সুযোগ সব প্রকাশনীর ভাগ্যে জোটেনি।

আরেক শ্রমিক গোলাম রাব্বি জানালেন, যেসব প্রকাশনীর একাধিক স্টল বা দুই-তিন ইউনিটের কাজ রয়েছে, তাদের জন্য সময়মতো নির্মাণকাজ শেষ করা বড় চ্যালেঞ্জ। অনেকেরই কাজ শেষ করতে দেরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

মেলা নিয়ে এ ‘লেজেগোবরে’ পরিস্থিতির কারণে প্রকাশকরা আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তবে কাঠামো ভাঙার কারণে ক্ষতি বিবেচনায় নিয়ে এ বছর স্টল ভাড়া না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ, যা কিছুটা ইতিবাচক বলে মনে করছেন শ্রমিক ও প্রকাশকরা।

তা সত্ত্বেও পাঠকদের কাছে মেলার আকর্ষণ ধরে রাখা এবং উদ্বোধনের পর প্রথম কয়েক দিন স্টলগুলো পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েই গেছে। বিশেষ করে মেলার নির্ধারিত সময় এবার ১৫ মার্চ। অর্থাৎ মেলা চলবে মাত্র ১৮ দিন। এখন স্টলের সব কাজ শেষ করতেই মেলার ৩/৪ দিন চলে গেলে পাঠকরাও বইমেলার স্বাদ থেকে বঞ্চিত হবেন— এমন শঙ্কা নিয়েই কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন প্রকাশকরা।

Ad
Ad
ad
ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

পরিবার ভেবেছিল মৃত, ২৫ বছর পর স্বজনদের কাছে ফরিদ

ফরিদের ছোট ভাই স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম সৈয়দ আলম বলেন, “আমরা ধরে নিয়েছিলাম, ফরিদ ভাই আর বেঁচে নেই। কিন্তু এত বছর পর তাকে ফিরে পেয়ে আমরা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না। কক্সবাজারে আমাদের বৃদ্ধ মা বড় ছেলের অপেক্ষায় আছেন। আমরা গরিব মানুষ। জানি না কী হবে। তবে আমরা আমাদের ভাইকে নিয়ে থাকব।”

১ দিন আগে

মন্ত্রিসভায় যোগ হচ্ছেন আরও চারজন, আসছে রদবদলও

সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সাচিং প্রু জেরীকে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়কমন্ত্রী এবং মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকনকে ধর্মবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। এ বিষয়ে যেকোনো সময় প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে।

১ দিন আগে

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দিলেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেতা

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা নির্বাচনী কর্তা ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের তত্ত্বাবধানে ভোট গ্রহণ চলছে। দুপুর ২টা থেকে শুরু হওয়া ভোট গ্রহণ চলবে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। এরপরই ভোট গণনা করে ফল ঘোষণা করা হবে।

২ দিন আগে

৫১ লাখ মানুষকে কলেরার টিকা দেবে সরকার, শুরু ২২ আগস্ট

বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সকালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নগর ভবন অডিটোরিয়ামে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।

২ দিন আগে