হোলি আর্টিজান হামলার এক দশক: বিচার ঝুলছে আপিলে, বদলেছে সরকারি অবস্থানও

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ০১ জুলাই ২০২৬, ১৫: ৪৮
হামলায় অংশ নেওয়া ৫ জঙ্গী। ছবি: সংগৃহীত

দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত জঙ্গি হামলাগুলোর একটি ছিল রাজধানীর গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে ২০১৬ সালের ১ জুলাইয়ের হামলা। দেশি-বিদেশি ২০ নাগরিক নিহত হওয়ার সেই ঘটনার ১০ বছর পূর্ণ হলেও মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে অনেক আগেই। তবে হামলার বিচার, দণ্ডপ্রাপ্তদের শাস্তি এবং জঙ্গিবাদ নিয়ে সরকারের অবস্থান—সবকিছুই গত এক দশকে বিভিন্ন পর্যায়ে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে।

হোলি আর্টিজান হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্ত শেষে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন।

দণ্ডিতরা হলেন জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন ওরফে র‌্যাশ, হাদিসুর রহমান, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, আব্দুস সবুর খান, শরিফুল ইসলাম ওরফে খালেদ এবং মামুনুর রশিদ রিপন।

তবে সেই রায় পরে পরিবর্তন করে হাই কোর্ট। ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিলের শুনানি শেষে আদালত সাতজনের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন। ফলে বর্তমানে তারা যাবজ্জীবন সাজা ভোগ করছেন।

পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর ২০২৫ সালের মে মাসে দণ্ডিত ছয় আসামি পৃথকভাবে আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল আবেদন করেন। তারা হাই কোর্টের দেওয়া আমৃত্যু কারাদণ্ড বাতিল করে খালাস চেয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত এসব আবেদনের শুনানিতে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি।

মামলার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, "আপিল বিভাগে বর্তমানে পাঁচজন মাননীয় বিচারপতি আছেন। সারা দেশের মামলার যে চাপ, প্রত্যেকের কাছেই তার মামলাটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।"

তিনি বলেন, হোলি আর্টিজান হামলার বিচার শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। তবে মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি কবে হতে পারে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাতে চাননি তিনি।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, "আমাদের সর্বোচ্চ আন্তরিকতা থাকলেও নানা বাস্তবতার কারণে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়ে বলা সম্ভব নয় যে, এত দিনের মধ্যে মামলাটির নিষ্পত্তি হবে।"

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি ছিল, হামলার মূল পরিকল্পনাকারীদের বেশির ভাগই পরবর্তী বিভিন্ন অভিযানে নিহত হয়েছে। ফলে মামলায় যাদের বিচার হয়েছে, তারা মূলত হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সহযোগিতাকারী।

১ জুলাই ২০১৬: কী ঘটেছিলো সেদিন?

২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে গুলশান-২ নম্বরের হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা চালায় পাঁচ তরুণ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, তারা নিষিদ্ধ ঘোষিত নব্য জেএমবির সদস্য ছিল। হামলার পর প্রায় ১১ ঘণ্টা জিম্মি পরিস্থিতি চলার পর সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযান শুরু হয়। অভিযানে পাঁচ হামলাকারী নিহত হয়।

সেই হামলায় নয়জন ইতালীয়, সাতজন জাপানি, একজন ভারতীয়, দুজন বাংলাদেশি এবং একজন বাংলাদেশি-আমেরিকান নাগরিক নিহত হন। অভিযানের আগেই হামলাকারীদের গুলিতে প্রাণ হারান পুলিশের দুই কর্মকর্তা।

হামলার পর বিশ্বজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ দেখা দেয়। এরপর কয়েক বছর ধরে জঙ্গিবিরোধী অভিযান জোরদার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

সময়ের সঙ্গে বদলেছে সরকারি বক্তব্য

২০২৫ সালে হোলি আর্টিজান হামলার নবম বার্ষিকীতে তৎকালীন ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার শেখ সাজ্জাত আলী বলেছিলেন, দেশে এখন কোনো জঙ্গি নেই। তার ভাষায়, "জঙ্গি থাকলে জঙ্গি নিয়ে ভাবব। আওয়ামী লীগের সময় জঙ্গি নাটক সাজিয়ে ছেলেপেলেদের মারা হয়েছে।"

হোলি আর্টিজান হামলা সাজানো ঘটনা ছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি জানেন না, তবে বর্তমানে বাংলাদেশে জঙ্গি নেই।

অন্যদিকে, ২০২৪ সালে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের তৎকালীন প্রধান ডিআইজি আসাদুজ্জামান সতর্ক করে বলেছিলেন, বড় ধরনের হামলা ঠেকানো গেলেও জঙ্গিবাদের বীজ পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। বিভিন্ন নামে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা এখনও চলছে।

বর্তমান সরকারের সময়েও জঙ্গিবাদ নিয়ে ভিন্ন ধরনের অবস্থান দেখা গেছে। গত এপ্রিল মাসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, তিনি "জঙ্গি" শব্দটিকে স্বীকৃতি দেন না। তার ভাষ্য, দেশে বর্তমানে এ ধরনের তৎপরতা নেই; তবে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো কিছু উগ্রপন্থি বা চরমপন্থি গোষ্ঠী সক্রিয় থাকতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান অবশ্য ভিন্ন সুরে বলেছেন, বাংলাদেশে একসময় জঙ্গিবাদ ছিল এবং এখনও সেই ঝুঁকি পুরোপুরি শেষ হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় উগ্রবাদী প্রবণতার কিছু মানুষের প্রকাশ্যে সক্রিয় হওয়ার প্রবণতা বেড়েছিল বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

এদিকে হামলার ১০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এবার ঘটনাস্থলে কোনো আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা নিবেদনের কর্মসূচি থাকছে না। ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান বিভাগের উপকমিশনার এম তানভীর আহমেদ জানিয়েছেন, বিভিন্ন দূতাবাসের সমন্বয়ে ইতালি দূতাবাসে একটি স্মরণসভার আয়োজন করা হবে।

অন্যদিকে হামলা প্রতিরোধে নিহত দুই পুলিশ কর্মকর্তার স্মরণে গুলশান থানার সামনে নির্মিত ‘দীপ্ত শপথ’ ভাস্কর্যটি ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় ভেঙে ফেলা হলেও সেটি এখনও পুনর্নির্মাণ করা হয়নি। তাদের স্মরণেও এবার পৃথক কোনো কর্মসূচি থাকছে না বলে জানিয়েছে পুলিশ।

এক দশক পর হোলি আর্টিজান হামলার বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হলেও ঘটনাটি এখনও বাংলাদেশের নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম এবং জঙ্গিবাদ মোকাবিলা নিয়ে আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে রয়েছে।

রাজনীতি/আরআইআর

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

কুষ্টিয়ায় স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ মামলায় তরুণের যাবজ্জীবন

কুষ্টিয়া সদর উপজেলায় স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে করা এক মামলায় জহির রায়হান (৩২) নামে এক তরুণকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। দণ্ডপ্রাপ্ত জহির রায়হান সদর উপজেলার বাসিন্দা।

৫ ঘণ্টা আগে

নতুন ১ থানা ও ৩ উপজেলা গঠনের প্রস্তাব অনুমোদন

দেশে নতুন একটি থানা এবং তিনটি উপজেলা গঠনের প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি (নিকার)। চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানাকে বিভক্ত করে ‘হালদা’ নামে একটি নতুন থানা গঠনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

৬ ঘণ্টা আগে

সীমান্ত পাহারার চেয়েও বর্তমানে সাইবার নিরাপত্তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ: তথ্যমন্ত্রী

মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে নিরাপত্তার ধারণা গুণগতভাবে পাল্টে গেছে। কিলোমিটারের পর কিলোমিটার সীমান্ত পাহারা দেওয়ার থেকেও এখন সাইবার নিরাপত্তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

৭ ঘণ্টা আগে

শুভেন্দু-মানিক সাহাদের জন্য ১১০০ কেজি আম উপহার বাংলাদেশের

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে পাঠানো এ উপহারে রয়েছে দেশের জনপ্রিয় দুই জাতের আম—আম্রপালি ও হাঁড়িভাঙ্গা। এর মধ্যে কলকাতায় পাঠানো হয়েছে ১০০টি কার্টনে পাঁচ কেজি করে মোট ৫০০ কেজি এবং আগরতলায় পাঠানো হয়েছে ১২০টি কার্টনে পাঁচ কেজি করে মোট ৬০০ কেজি আম।

৭ ঘণ্টা আগে