রাজশাহীতে দাবদাহ ও পোকার উপদ্রবে ঝরছে আমের গুটি

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম

আমের রাজধানী খ্যাত রাজশাহী অঞ্চলে অব্যাহত দাবদাহ, প্রচণ্ড খরা ও পোকার উপদ্রবে আমের উপর প্রচণ্ড বিরুপ প্রভাব ফেলেছে। গত মৌসুমের চেয়ে মুকুল এসেছে ত্রিশ ভাগ কম। তারপর এমন বৈরী পরিস্থিতিতে রাজশাহীতে গাছ থেকে ঝরে পড়ছে আমের গুটি। যত্ন করেও খুব একটা সমাধান না পেয়ে ফলন বিপর্যয়ের শঙ্কায় এ অঞ্চলের চাষিরা।

চলতি মৌসুমে এমনিতেই রাজশাহীতে গাছে আম কম এসেছে। যা আছে, তা অব্যাহত দাবদাহ, প্রচণ্ড খরা ও পোকার উপদ্রবে ঝরে যাচ্ছে। এরই মধ্যে অনেক বাগানের অন্তত ৫০ শতাংশ গুটি ঝরে গেছে। আম রক্ষায় অনুমোদিত মাত্রায় ওষুধ ছিটিয়েও কাজ হচ্ছে না। ফলে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত মাত্রায় ওষুধ ছিটাতে হচ্ছে। বিরূপ এই আবহাওয়ার পরিবর্তন না হলে গাছে পাতা ছাড়া কিছুই থাকবে না।

তবে কৃষি বিভাগ ও ফল গবেষকরা বলছেন, কিছু গুটি আম ঝরে গেলেও বাকিগুলো টিকিয়ে রাখলে সংকট হবে না। তাই দাবদাহ ও খরায় আমের গুটি ঝরে পড়া রোধে গাছের গোড়ায় রাতে অথবা খুব ভোরে পানির সেচ দিতে হবে।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর- এই চার জেলায় ৯৩ হাজার ২৬৬ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। এবার সাড়ে ১২ লাখ টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। তবে এককভাবে শুধু রাজশাহীতেই ১৯ হাজার ৬০২ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। যা গত বছরের চেয়ে ২৪ হেক্টর বেশি। চলতি বছর ২ লাখ ৬০ হাজার ১৬৫ টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।

রাজশাহীর আমচাষি ও ব্যবসায়ীরা জানান, চলতি মৌসুমে বাগানের প্রায় ৭০ ভাগ গাছে মুকুল এসেছিল। সেই মুকুল থাকলে অনেক আম হতো। কিন্তু গত ২০ ও ২১ মার্চের বৃষ্টির কারণে মুকুল নষ্ট হয়ে গেছে। এখন আবার তীব্র খরায় ও পোকার উপদ্রবে মুকুল ঝরে যাচ্ছে। আমগাছে পানি ও কীটনাশক দিয়েও গুটি রক্ষা করা যাচ্ছে না। প্রতি বছরই আমের কিছু গুটি ঝরে যায়। কিন্তু চলতি মৌসুমে তীব্র দাবদাহে অনেক বাগানে ৫০ থেকে ৬০ ভাগ আমের গুটি ঝরে গেছে। এতে ব্যাপক লোকসানের শঙ্কা জেগেছে।

আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, রাজশাহীতে গত ১৭ এপ্রিল থেকে তীব্র দাবদাহ শুরু হয়েছে। সেদিন রাজশাহীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪০ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ১৮ এপ্রিল ছিল ৩৯ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ১৯ এপ্রিল সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ২০ এপ্রিল তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২১ এপ্রিল তাপমাত্রা ছিল ৪১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২২ এপ্রিল তাপমাত্রা ছিল ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২৩ এপ্রিল তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সর্বশেষ গতকাল বুধবার তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আরও কয়েকদিন এই তাপমাত্রা অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানা গেছে।

রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বিহারিপাড়া গ্রামের আসিফ ইকবালের ৩০ বিঘার বাগানে দেশি-বিদেশি ৭২ জাতের আমগাছ রয়েছে। তিনি বলেন, হপার পোকা ও আচা পোকা বাগানে আমের ক্ষতি করেছে। এ ছাড়া, আম ছিদ্রকারী পোকা উড়ে এসে হুল ফুটিয়ে চলে যাচ্ছে। সেজন্য কীটনাশক ছিটানো হচ্ছে। আবার অতিরিক্ত খরার কারণে গাছে থাকা অবস্থাতেও আমের বোঁটা শুকিয়ে কুঁচকে যাচ্ছে। যারা পরিমিত সেচ ও সঠিক মাত্রায় কীটনাশক স্প্রে করতে পারছেন তাদের গাছে আম এখনো ভালোই আছে। কিন্তু যারা করতে পারছেন না তাদের আম খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

রাজশাহীর বেশির ভাগ আম বাগান চারঘাট ও বাঘা উপজেলায়। বাঘা উপজেলার সাদি এন্টারপ্রাইজ কয়েক বছর ধরে বিদেশে আম রপ্তানি করছে। এই প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী আসাফুদ্দৌলা বলেন, ‘এবার বেশির ভাগ গাছে কোনো আম নেই। চাষিরা গাছের কোনো পরিচর্যা করছেন না। ফলে যেসব গাছে কিছু আম আছে সেখানেও পোকার উপদ্রব দেখা যাচ্ছে। এখন বাগানে মাছি পোকা, লেদা পোকানাশক বিষ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না।’

গোদাগাড়ী উপজেলার আমচাষি তৌহিদুর রহমান পারভেজ বলেন, ‘প্রচণ্ড দাবদাহে আম শুকিয়ে কালো রং ধারণ করছে। এ ছাড়া, পোকা ছিদ্র করায় আম শুকিয়ে ঝরে পড়ছে। এতে আমের ফলন নিয়ে শঙ্কায় আছি। অনুমোদিত মাত্রার বাইরে ওষুধ ব্যবহার করিনি। শ্রমিকদের আগেই বলেছিলাম শুধু অনুমোদিত মাত্রায় ওষুধ দিয়ে পোকার আক্রমণ থেকে আম বাঁচানো যাবে না। শেষ পর্যন্ত তা-ই হয়েছে। আমার বাগানের সব আম পোকায় শেষ করে দিয়েছে।’

রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় এবার এমনিতেই আমের মুকুল কম ছিল। তার ওপর মুকুলে ফুল ফোটার সময়ে গত ২০ ও ২১ মার্চ বৃষ্টি হয়ে আমের অনেক মুকুল নষ্ট হয়ে গেছে। যেগুলো টিকে ছিল সেগুলো তীব্র তাপপ্রবাহে ঝরে পড়ছে। তাই ঝরে পড়া রোধে আমগাছের গোড়ায় পানি দিতে হবে।’

রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) শারমিন সুলতানা বলেন, ‘রাজশাহীতে বৃষ্টির অভাবে ও প্রচণ্ড খরার কারণে আমের মুকুল ঝরে পড়ছে। খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় খুবই সতর্কতার সঙ্গে গাছ পরিচর্যা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে গাছের গোড়ায় অল্প পরিমাণ পানি ও পরবর্তীতে ইউরিয়া ও পটাশ সার দিতে হবে। এ ছাড়া, আমের গুটি রক্ষায় বরিক অ্যাসিডও স্প্রে করতে হবে। আমের মৌসুমে গাছে যে পরিমাণ মুকুল আসে তা শতভাগ থাকবে না এটাই প্রকৃতির নিয়ম। তবে এই বছর মুকুল কিছুটা কম এসেছে। তবুও এখন পর্যন্ত গাছে যে পরিমাণ মুকুল বা গুটি আছে সেগুলো বড় হলে আমের সংকট হবে না।

Ad
Ad
ad
ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে ‘তামাদি’ মওকুফের সুযোগ পাবেন না: প্রসিকিউশন

প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামিম বলেন, যারা পলাতক থাকে, তারা ফিরে এসে সবসময় একটা কথা বলে— তিনি প্রসিডিং সম্পর্কে জানতেন না। তারা বলতে পারেন, ‘যেহেতু আমার অগোচরে (বিচার) হয়েছে, অতএব আমি এই তামাদি মওকুফ চাই।’ শেখ হাসিনাসহ অন্য আসামিরা এ অজুহাত দিতে পারবেন না। কারণ তারা এ মামলা সম্পর্কে জানেন এবং

১৩ ঘণ্টা আগে

বিভ্রান্তকারীরা বিভ্রান্ত করতে এলে সমুচিত জবাব দিতে হবে: প্রধানমন্ত্রী

রোববার (১৬ আগস্ট) সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে কিশোরগঞ্জ পুরাতন স্টেডিয়ামে ফ্যামিল কার্ড বিতরণ এবং মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিত ও অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ের ব্যক্তিদের মধ্যে সম্মানি ভাতা প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

১৫ ঘণ্টা আগে

সরকারের বেসরকারিভাবে জ্বালানি আমদানির সিদ্ধান্তে শ্রমিক নেতাদের আস্থা

সমাবেশে শ্রমিক নেতারা বলেন, জ্বালানি খাতে শ্রমিকদের বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা কমানোর উদ্যোগ, দ্বিপক্ষীয় চুক্তি নিয়ে গড়িমসি এবং শ্রমিক সংগঠনের কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে চুক্তিভিত্তিকভাবে কাজ করা অভিজ্ঞ শ্রমিকদের নতুন নিয়োগে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবিও জানান তারা।

১৬ ঘণ্টা আগে

জ্বালানি সমস্যার সমাধানে অন্তত ২ বছর লাগবে: অর্থমন্ত্রী

চলমান জ্বালানি সমস্যার সমাধানে কমপক্ষে দুই বছর সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ নিয়ে সমস্যা হচ্ছে। ছয় মাস কিংবা এক বছরে এর সমাধান হবে না। ন্যূনতম দুই বছর লাগবে।

১৮ ঘণ্টা আগে