এআইকে ‘দমিয়ে’ রাখার বিপক্ষে ট্রাম্প, বৈশ্বিক কাঠামোর পক্ষে গুতেরেস-প্রযুক্তি নেতারা

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (বাঁয়ে) এবং জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস (ডানে)। ছবি: সংগৃহীত
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (বাঁয়ে) এবং জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস (ডানে)। ছবি: সংগৃহীত

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) উন্নয়নে লাগাম টানার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার দাবি, শিল্পবিপ্লবের চেয়েও বড় পরিবর্তন আনতে পারে— এমন প্রযুক্তির বিকাশ থামিয়ে দেওয়া যাবে না। তবে ট্রাম্পের অবস্থানের বিপরীতে দাঁড়িয়ে এআইয়ের ঝুঁকি মোকাবিলায় বৈশ্বিক সহযোগিতা, নিরাপত্তা মানদণ্ড ও আন্তর্জাতিক কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।

কেবল গুতেরেস নয়, বিশ্বের শীর্ষ এআই কোম্পানিগুলোর নির্বাহীরাও এআইয়ের উন্নয়নের গতিকে লাগামছাড়া হতে দিতে রাজি নন। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে এক বিশেষ বৈঠকে তারা বলেন, এ প্রযুক্তির ঝুঁকি কোনো দেশ বা কোম্পানির একার পক্ষে সামলানো সম্ভব নয়। তারাও গুতেরেসের মতো মনে করছেন, এর জন্য প্রয়োজন বৈশ্বিক সহযোগিতা ও অভিন্ন নিরাপত্তা কাঠামো।

গত মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প বলেন, এআই উন্নয়নকে ‘দমিয়ে’ রাখবে না যুক্তরাষ্ট্র। বরং এ খাতে চীনের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের যে অগ্রগতি রয়েছে, তা ধরে রাখার অঙ্গীকার করেন তিনি।

‘আমরা এটিকে নিয়ন্ত্রণে আনব না, বরং উৎসাহিত করব। শিল্পবিপ্লবের চেয়েও বড় হতে পারে এমন কোনো কিছুর বিকাশ আমি থামিয়ে দেবো না,’— বলেন ট্রাম্প। এআইকে তিনি ‘সুপারইন্টেলিজেন্স’ বলেও উল্লেখ করেন।

ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠা এআই ব্যবস্থার নিরাপত্তাঝুঁকি নিয়ে পরদিন বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) প্রথমবারের মতো উচ্চপর্যায়ের বিশেষ বৈঠক আয়োজন করে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। সেখানেই অংশ নেন শীর্ষ এআই কোম্পানিগুলোর প্রধান নির্বাহীরা

ওই বৈঠকেই এআই নিয়ে সতর্কবার্তা দেন ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান, অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই এবং হাগিং ফেসের প্রধান নির্বাহী ক্লেমঁ দেলাংগে। বৈঠকে বক্তব্য দেন এআই বিশেষজ্ঞ ও জাতিসংঘের স্বাধীন বৈজ্ঞানিক প্যানেলের সহসভাপতি ইয়োশুয়া বেঙ্গিও।

‘সানফ্রান্সিসকোর ল্যাবে সিদ্ধান্ত নয়’

অল্টম্যান বলেন, এআই নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো কেবল প্রযুক্তি কোম্পানির হাতে থাকা উচিত নয়। জনগণের কাছে জবাবদিহি করা সরকার ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই এসব সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

‘এআই যদি গণতান্ত্রিক হয়, তাহলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো শুধু সানফ্রান্সিসকোর ল্যাবে নেওয়া যাবে না। জনগণের কাছে জবাবদিহি করা সরকার এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসব সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হতে হবে,’— বলেন তিনি।

অল্টম্যান এআইয়ের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, দ্রুত ও নির্ভুলভাবে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনা জানানোর ব্যবস্থা এবং সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নিরাপত্তা তথ্য ভাগাভাগির নিরাপদ চ্যানেল তৈরির আহ্বান জানান।

তবে এআইয়ের সম্ভাবনাও তুলে ধরেন তিনি। অল্টম্যানের ভাষায়, বিশ্ব এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে এআই হয় নতুন জ্ঞান ও সৃজনশীলতার দ্বার খুলতে পারে, নয়তো ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। তাই অন্ধ আশাবাদ কিংবা অতিরিক্ত আতঙ্ক— দুটির কোনোটিতেই না গিয়ে সতর্কতার সঙ্গে এগোনোর কথা বলেন অল্টম্যান।

‘মানবতার জন্য ঝুঁকি হতে পারে’

অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী আমোদেই আরও সরাসরি সতর্ক করেন এআই নিয়ে। তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, এআইকে ভুলভাবে পরিচালনা করা হলে এটি পুরো মানবতার জন্য ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।’

আমোদেই বলেন, এআইয়ের বর্তমান অগ্রগতির গতি অব্যাহত থাকলে মাত্র এক থেকে দুই বছরের মধ্যে একটি ডেটা সেন্টারের ভেতর ‘প্রতিভাবান মানুষের একটি দেশের’ সমতুল্য সক্ষমতা তৈরি হতে পারে। এই সক্ষমতার সম্ভাব্য সুফলের পাশাপাশি জীবাণু অস্ত্র তৈরিতে এআইয়ের অপব্যবহার এবং উন্নত এআই ব্যবস্থার ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকির কথা বলেন তিনি।

ঝুঁকি মোকাবিলায় এআই ব্যবহার করে জীবাণু অস্ত্র তৈরির ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, মডেলের ঝুঁকি যাচাই ও মূল্যায়নের অভিন্ন মানদণ্ড, যাচাইব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা উদ্বেগ জানানোর একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী।

‘এআই দিয়েই এআইয়ের হামলা ঠেকিয়েছি’

হাগিং ফেসের প্রধান নির্বাহী দেলাংগে এআইয়ের ঝুঁকি ও সম্ভাবনার একটি বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরেন। তিনি জানান, চলতি গ্রীষ্মে ওপেনএআইয়ের এআই এজেন্ট তাদের প্ল্যাটফর্মে হামলা চালিয়েছিল। ওই হামলার পর এআই ব্যবহার করেই তারা নিজেদের সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করেন।

‘আমরা এআইয়ের মাধ্যমে আক্রান্ত হয়েছিলাম। তবে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমরা এআই দিয়েই নিজেদের রক্ষা করেছি,’— বলেন দেলাংগে।

তার মতে, সমস্যাটা শুধু শক্তিশালী এআই নয়, বরং শক্তিশালী এআইয়ের ক্ষমতা কার হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, সেটিই বড় প্রশ্ন। হামলাকারী ও প্রতিরোধকারীদের মধ্যে, কয়েকটি কোম্পানি ও বিশ্বের বাকি অংশের মধ্যে এবং কয়েকটি দেশ ও বাকি বিশ্বের মধ্যে ক্ষমতার অসমতা তৈরি হলে ঝুঁকি আরও বাড়বে বলে সতর্ক করেন তিনি।

এ কারণে এআইয়ের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনা পর্যবেক্ষণ ও জানানোর জন্য শক্তিশালী বৈশ্বিক মানদণ্ড এবং এআই এজেন্টের কার্যক্রমের রেকর্ড বা ‘এজেন্ট ট্রেস’ ভাগাভাগির ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান দেলাংগে।

‘কেউ একা এই ঝুঁকি সামলাতে পারবে না’

এআই বিশেষজ্ঞ ইয়োশুয়া বেঙ্গিও বলেন, উন্নত এআই ব্যবস্থার কারণে তিন ধরনের বৈশ্বিক হুমকি তৈরি হচ্ছে— বিপর্যয়কর অপব্যবহার, ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন ও এআইয়ের ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ হারানো।

তার মতে, সন্ত্রাসীদের হাতে এআইয়ের অপব্যবহার থেকে শুরু করে এমন এআই তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এসব ঝুঁকি কোনো দেশ একা মোকাবিলা করতে পারবে না।

বেঙ্গিও বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সহযোগিতাই বিশ্বের প্রয়োজন’ এবং কোনো ব্যক্তি, কোম্পানি বা দেশের এমন এআই ব্যবস্থা তৈরি করা উচিত নয়, যা ব্যাপক মাত্রায় ক্ষতি করতে পারে।

গুতেরেসও চান বৈশ্বিক নজরদারি

এআই নিয়ে প্রযুক্তি নেতাদের এই অবস্থান জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সাম্প্রতিক আহ্বানের সঙ্গেও মিলে যাচ্ছে।

মঙ্গলবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে নিজের শেষ ভাষণে গুতেরেস দ্রুত অগ্রসরমান এআইয়ের জন্য জরুরি বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার আহ্বান জানান। তিনি বহুপাক্ষিক এআই ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো এবং স্বাধীন নজরদারির প্রস্তাব করেন।

গুতেরেস বলেন, এআইয়ের বিকাশ বন্ধ করা নয়, বরং এর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। কারণ প্রযুক্তির অগ্রগতির গতি যদি নিরাপত্তা ও জবাবদিহির ব্যবস্থার চেয়ে এগিয়ে যায়, তাহলে এর প্রভাব শুধু একটি দেশ বা কোম্পানির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

ফলে নিউইয়র্কে মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে এআই নিয়ে দুটি ভিন্ন সুর স্পষ্ট হয়েছে। ট্রাম্প বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র এআইয়ের বিকাশে লাগাম দেবে না এবং চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেতৃত্ব ধরে রাখবে।

অন্যদিকে জাতিসংঘের মহাসচিব ও প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ব্যক্তিরা বলছেন, এই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে একক দেশ বা কোম্পানির সিদ্ধান্ত যথেষ্ট নয়, ঝুঁকি সামলাতে প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, অভিন্ন নিরাপত্তা মানদণ্ড ও জবাবদিহির কাঠামো।

এ পরিস্থিতিতে এআই নিয়ে গবেষণা ও এআইয়ের উন্নয়ন কোন পথে হাঁটবে, তা ভবিষ্যতের পৃথিবীর গতিপথও অনেকটাই নির্ধারণ করে দেবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement