নতুন সিইওর হাতে নতুন যুগের শুরু, প্রথম ফোল্ডেবল আইফোন অ্যাপলের

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ফোল্ডেবল স্মার্টফোনের বাজারে প্রবেশ করল অ্যাপল। ‘সারপ্রাইজ অ্যান্ড শাইন’ ইভেন্টে কোম্পানি উন্মোচন করেছে তাদের প্রথম ভাঁজযোগ্য আইফোন, যার নাম দেওয়া হয়েছে আইফোন ডুয়ো। একই সঙ্গে নতুন আইফোন ১৮ প্রো ও আইফোন ১৮ প্রো ম্যাক্স, অ্যাপল ওয়াচ সিরিজ ১২, অ্যাপল ওয়াচ আলট্রা ৪ ও এয়ারপড ৫-এর ঘোষণাও এসেছে একই অনুষ্ঠানে।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার কুপারটিনোয় অ্যাপল সদর দপ্তর অ্যাপল পার্কের স্টিভ জবস থিয়েটারে অনুষ্ঠিত হয় ‘সারপ্রাইজ অ্যান্ড শাইন’ ইভেন্ট।
তবে অ্যাপলের বাৎসরিক এ আয়োজন এবার কেবল নতুন পণ্যের ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি ছিল অ্যাপলের নতুন নেতৃত্বের একরকম অভিষেক অনুষ্ঠানও। কারণ সপ্তাহখানেক আগেই প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর জন টার্নাস এই প্রথমবারের মতো অ্যাপলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিক আয়োজনের মঞ্চে দাঁড়ালেন।
টার্নাস ২০২১ সাল থেকে অ্যাপলের হার্ডওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন। তার প্রথম বড় আয়োজনেই এমন একটি পণ্য উন্মোচন হলো, যেটিকে অ্যাপল নিজেদের আইফোন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি হিসেবে তুলে ধরছে।

এলো আইফোন ডুয়ো
‘সারপ্রাইজ অ্যান্ড শাইন’ ইভেন্টের সবচেয়ে বড় ঘোষণা ছিল আইফোন ডুয়ো, যা অ্যাপলের প্রথম ফোল্ডেবল আইফোন। বইয়ের মতো ভাঁজ করা যায়— এমন নকশার ফোনটির ডিসপ্লে খোলা অবস্থায় ৭.৬ ইঞ্চি, ভাঁজ করা অবস্থায় সামনে থেকে ৫.৪ ইঞ্চি।
অ্যাপলের দাবি, খোলা অবস্থায় এটি তাদের তৈরি সবচেয়ে পাতলা আইফোন। ভাঁজ করা অবস্থায় ফোনটি অনেকটা পাসপোর্টের আকারের।
ফোল্ডেবল এই ফোনের বড় আকর্ষণ বড় পর্দায় একসঙ্গে একাধিক কাজ করার সুবিধা। ভিডিও দেখা, বার্তা পাঠানো কিংবা একাধিক অ্যাপ পাশাপাশি ব্যবহারের মতো কাজে বড় ডিসপ্লেটি কাজে লাগবে। আইফোন ডুয়োর জন্য আইওএস২৭-কেও নতুন করে সাজিয়েছে অ্যাপল, যেন ভাঁজ খোলা ও বন্ধ করার সঙ্গে স্ক্রিনের ব্যবহারও বদলে যায়।

ফোনটিতে রয়েছে এ২০প্রো চিপ, উন্নত ক্যামেরা, বিশেষভাবে তৈরি হিঞ্জ ও তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। অ্যাপল জানিয়েছে, দুই অংশে বিভক্ত ব্যাটারি ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
আইফোন ডুয়োর দাম শুরু হবে ১,৯৯৯ ডলার থেকে। প্রি-অর্ডার শুরু হবে ১৬ অক্টোবর, আর বাজারে পাওয়া যাবে ২৩ অক্টোবর থেকে।
ফোল্ডেবল ফোনের বাজারে অবশ্য অ্যাপল অনেক পরে এসেছে। স্যামসাং, হুয়াওয়ে ও শাওমির মতো প্রতিষ্ঠান কয়েক বছর ধরে এ ধরনের ফোন তৈরি করছে। চীনে বিশেষ করে হুয়াওয়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। ফলে আইফোন ডুয়োকে শুধু নতুন পণ্য নয়, বরং প্রতিষ্ঠিত প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে অ্যাপলের বড় পরীক্ষা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

আইফোন ১৮ প্রো ও প্রো-ম্যাক্স
ফোল্ডেবল আইফোনের পাশাপাশি এসেছে আইফোনের নতুন সংস্করণ আইফোন ১৮ প্রো ও আইফোন ১৮ প্রো-ম্যাক্সের ঘোষণাও দিয়েছে অ্যাপল। দুই মডেলেই রয়েছে এ২০প্রো চিপ, উন্নত ব্যাটারি ও নতুন ৪৮ মেগাপিক্সেলের ফিউশন মেইন ক্যামেরা। প্রথমবারের মতো ক্যামেরায় ভ্যারিয়েবল অ্যাপারচার যুক্ত হয়েছে। ফলে আলোর পরিস্থিতি অনুযায়ী ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যাপারচার পরিবর্তন করতে পারবে। ডায়নামিক আইল্যান্ডও আগের চেয়ে ছোট করা হয়েছে।
আইফোন ১৮ প্রো বিক্রি শুরু হবে ১,১৯৯ ডলার থেকে। আর আইফোন ১৮ প্রো-ম্যাক্সের দাম শুরু ১,২৯৯ ডলার থেকে। এ দুটি পণ্যের প্রি-অর্ডার শুরু ১২ সেপ্টেম্বর, বাজারে পাওয়া যাবে ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে।

অ্যাপল ওয়াচ সিরিজ ১২ ও আলট্রা ৪
অ্যাপল ওয়াচের নতুন মডেলও ঘোষণা করা হয়েছে বুধবারের ইভেন্ট থেকে। অ্যাপল জানিয়েছে, নতুন প্রজন্মের অ্যাপল ওয়াচেও স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নতুন মডেল অ্যাপল ওয়াচ সিরিজ ১২-এ রয়েছে নতুন হেলথ সেন্সিং সিস্টেম, আরও ঘন ঘন হার্ট রেট ও হার্ট রেট ভ্যারিয়েবিলিটি (এইচআরভি) মাপার সুবিধা এবং নতুন ‘রেডিনেস’ স্কোর। নতুন এস১১ চিপও ব্যবহার করা হয়েছে। দাম শুরু ৩৯৯ ডলার থেকে, বাজারে পাওয়া যাবে ১৮ সেপ্টেম্বর।
অন্যদিকে অ্যাপল ওয়াচ আলট্রা ৪-এও নতুন হেলথ সেন্সিং সিস্টেম, উন্নত হার্ট রেট ও এইচআরভি মাপার সুবিধা এবং রেডিনেস স্কোর রয়েছে। ব্যাটারি একবার চার্জে আউটডোর ওয়ার্কআউট ট্র্যাকিংয়ে ৪৫ ঘণ্টা পর্যন্ত চলবে বলে জানিয়েছে অ্যাপল।

এয়ারপড৫
একই ইভেন্টে এয়ারপড সিরিজের নতুন পণ্য এয়ারপড৫ আনার ঘোষণাও দিয়েছে অ্যাপল। নতুন এই ওপেন-ইয়ার ইয়ারবাডে অ্যাকটিভ নয়েজ ক্যানসেলেশন (এএনসি), উন্নত সাউন্ড কোয়ালিটি, সিরি এআই ও লাইভ ট্রান্সলেশন সুবিধা যুক্ত হয়েছে।
অ্যাপলের দাবি, এয়ারপড৫ আগের এয়ারপড৪-এর এএনসি সংস্করণের তুলনায় বাইরের শব্দ সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ বেশি কমাতে পারে।
এয়ারপড৫-এর দাম শুরু ১২৯ ডলার থেকে। ওয়্যারলেস চার্জিং কেসসহ দাম ১৪৯ ডলার। প্রি-অর্ডার শুরু হয়েছে এবং বাজারে পাওয়া যাবে ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে।

টিম কুকের পর টার্নাসের প্রথম পরীক্ষা
‘সারপ্রাইজ অ্যান্ড শাইন’ অ্যাপলের নেতৃত্ব পরিবর্তনের পর নতুন যুগের প্রথম বড় প্রদর্শনীও। টিম কুকের দীর্ঘ নেতৃত্বে অ্যাপল বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর একটি হয়ে উঠলেও নতুন কোনো বড় পণ্যশ্রেণি তৈরিতে কোম্পানিটির গতি নিয়ে প্রশ্ন ছিল। সে জায়গায় জন টার্নাসের প্রথম বড় মঞ্চেই ফোল্ডেবল আইফোনের আত্মপ্রকাশ প্রতীকীভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ফোল্ডেবল বাজারে অ্যাপলের প্রবেশ দেরিতে হলেও কোম্পানিটি সেই সময়টাকে সুবিধা হিসেবে কাজে লাগাতে চাইছে। অন্য নির্মাতাদের কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা থেকে হিঞ্জ, স্ক্রিনের ভাঁজের দাগ, স্থায়িত্ব ও সফটওয়্যার সমন্বয়ের সমস্যাগুলো বুঝে পণ্য তৈরি করেছে অ্যাপল। দেখার বিষয়, আইফোন ডুয়ো অ্যাপলের প্রথম ফোল্ডেবল আইফোন হিসেবেই আলোচনায় থাকবে, নাকি ফোল্ডেবল ফোনের বাজারকেই নতুন করে বড় করে তুলতে পারবে।
তথ্যসূত্র: অ্যাপলের ওয়েবসাইট, দ্য ভার্জ, ইয়াহু ফাইন্যান্স

















