সূর্যের আলোয় বাড়ছে মাইক্রোপ্লাস্টিক থেকে ক্ষতিকর রাসায়নিক নিঃসরণ

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
ছবি: সংগৃহীত

পানিতে প্লাস্টিক দূষণ বলতে সাধারণত ভাসমান বোতল বা চোখে দেখা যায় এমন ছোট প্লাস্টিক কণাকেই বোঝানো হয়। তবে এর চেয়েও বড় এক সমস্যা রয়ে গেছে আড়ালে। নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, সূর্যের আলোতে পানিতে অদৃশ্য ক্ষতিকর রাসায়নিকের ‘মেঘ’ ছড়িয়ে দিচ্ছে মাইক্রোপ্লাস্টিক, যা নদী, হ্রদ ও সমুদ্রে ব্যাপকভাবে দূষণ বাড়াচ্ছে।

বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী নিউ কনটামিন্যান্টস–এ প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক থেকে নিঃসৃত দ্রবীভূত জৈব রাসায়নিক পদার্থ (মাইক্রোপ্লাস্টিক-ডেরাইভড ডিসলভড অর্গানিক ম্যাটার বা MPs DOM) সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পানিতে জমা হয়ে দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে। সূর্যের আলো এই রাসায়নিক নিঃসরণকে উল্লেখযোগ্যভাবে ত্বরান্বিত করে।

সূর্যের আলোয় বাড়ে রাসায়নিক নিঃসরণ

গবেষণায় দেখা গেছে, নদী বা সমুদ্রে প্রবেশের পর মাইক্রোপ্লাস্টিক দীর্ঘ সময় ধরে পানির সংস্পর্শে থাকে। সূর্যের আলো প্লাস্টিকের উপরিতলের রাসায়নিক বন্ধন ভেঙে দেয়। ফলে ধীরে ধীরে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অণু পানিতে বেরিয়ে আসে। বিজ্ঞানীরা এই প্রক্রিয়াকে ‘ডেরিভেশন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা হঠাৎ ভেঙে পড়ার বদলে ধীরগতির নিঃসরণকে বোঝায়।

গবেষণায় প্রকৃতিতে বহুল ব্যবহৃত চার ধরনের প্লাস্টিক পরীক্ষা করা হয়— পলিথিন ও পলিথিন টেরেফথালেট (পিইটি) সাধারণ পেট্রোলিয়ামভিত্তিক প্লাস্টিক, আর পলিল্যাকটিক অ্যাসিড ও পলিবিউটিলিন অ্যাডিপেট কো-টেরেফথ্যালেট হলো বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক।

বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিকেও ঝুঁকি

গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, সব ধরনের প্লাস্টিকই সময়ের সঙ্গে পানিতে দ্রবীভূত জৈব কার্বন নিঃসরণ করে। তবে সূর্যের অতিবেগুনি (ইউভি) রশ্মিতে এই নিঃসরণ সবচেয়ে বেশি হয়। অন্ধকার পরিবেশের তুলনায় আলোতে রাসায়নিক নিঃসরণ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। সহজে ভেঙে যাওয়ার কারণে বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক থেকে তুলনামূলকভাবে বেশি কার্বন নিঃসৃত হয়।

বিভিন্ন মডেল বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, রাসায়নিক নিঃসরণের গতি সময়ের সঙ্গে কমে না; বরং তা স্থির থাকে। অর্থাৎ পানিতে রাসায়নিক জমলেও নিঃসরণ থেমে যায় না। প্লাস্টিকের উপরিতলে তৈরি হওয়া পাতলা পানির স্তর রাসায়নিকের গতি নিয়ন্ত্রণ করে— একে ‘ফিল্ম ডিফিউশন’ বলা হয়। এতে বোঝা যায়, পানিতে রাসায়নিকের ঘনত্বের চেয়ে প্লাস্টিকের ধরন ও সূর্যালোকের প্রভাবই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

জটিল রাসায়নিক মিশ্রণ

উন্নত বিশ্লেষণ পদ্ধতিতে দেখা গেছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক থেকে নির্গত রাসায়নিকের মিশ্রণ অত্যন্ত জটিল। এর মধ্যে প্লাস্টিক তৈরির সময় যোগ করা অ্যাডিটিভ, পলিমারের ক্ষুদ্র উপাদান এবং আলোতে ভাঙনের ফলে তৈরি নতুন যৌগ রয়েছে। বিশেষ করে রিং-আকৃতির গঠনযুক্ত প্লাস্টিক থেকে বেশি জটিল রাসায়নিক নির্গত হয়।

সূর্যের আলোতে প্লাস্টিকের উপরিতলে অক্সিজেনসমৃদ্ধ যৌগ যেমন অ্যালকোহল, অ্যাসিড, ইথার ও কার্বনাইল যৌগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে ফথালেটের মতো ক্ষতিকর অ্যাডিটিভ সহজেই পানিতে মিশে যায়।

প্রাকৃতিক জৈব পদার্থের সঙ্গে পার্থক্য

ফ্লুরোসেন্স বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক থেকে নির্গত জৈব পদার্থ প্রাকৃতিক উৎসের জৈব পদার্থের চেয়ে ভিন্ন আচরণ করে। ভূমি বা মাটিজাত উপাদানের চেয়ে অণুজীব উৎসের রাসায়নিকের সঙ্গে এগুলোর বেশি সাদৃশ্য দেখা যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এদের রাসায়নিক গঠন দ্রুত পরিবর্তিত হয়, যেখানে নদীর প্রাকৃতিক জৈব পদার্থ তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকে।

খাদ্যশৃঙ্খল ও পানিশোধনে ঝুঁকি

ক্ষুদ্র দ্রবীভূত রাসায়নিক সহজেই অণুজীবের খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে। কিছু যৌগ অণুজীবের বৃদ্ধি বাড়ালেও কিছু আবার তা দমন করে, ফলে পানির কার্বন চক্র ও অক্সিজেনের ভারসাম্যে প্রভাব পড়ে। এসব রাসায়নিক তামা, ক্যাডমিয়াম ও সিসার মতো ভারী ধাতুর সঙ্গে বিক্রিয়া করে তাদের বিষাক্ততা পরিবর্তন করতে পারে।

গবেষকরা সতর্ক করেছেন, পানিশোধন প্রক্রিয়ায়ও এসব রাসায়নিক থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত উপজাত তৈরি হতে পারে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

গবেষকদের সতর্কবার্তা

চীনের নর্থইস্ট নরমাল ইউনিভার্সিটির গবেষক শিটিং লিউ বলেন, ‘পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রভাব মূল্যায়নে এর সম্পূর্ণ জীবনচক্রকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন— বিশেষ করে এসব কণা থেকে নিঃসৃত অদৃশ্য দ্রবীভূত রাসায়নিকের বিষয়টি।’

গবেষকদের মতে, প্লাস্টিক বর্জ্যের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ না করা হলে সূর্যের আলোতে এই রাসায়নিক দূষণ চলতেই থাকবে। মাইক্রোপ্লাস্টিক থেকে নিঃসৃত রাসায়নিকের আচরণ নিরূপণে ভবিষ্যতে মেশিন লার্নিং প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

সূত্র: আর্থ ডটকম।

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

নিজের নামে স্কুলের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব, না করলেন প্রতিমন্ত্রী

স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের দুই ছেল এবং আত্মীয়ের নামের সঙ্গে মিল রেখে বগুড়ার মোকামতলা উপজেলায় নবগঠিত কয়েকটি ইউনিয়নের নামকরণের অভিযোগের পর এবার তার নামে একটি স্কুলের নামকরণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে শিক্ষা সচিবের কাছে পাঠানো এক পত্রে এই প্রস্তাব নাকচ করেছেন তিনি।

১৪ ঘণ্টা আগে

পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদককে গ্রেপ্তারে প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের দুঃখপ্রকাশ

‘দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিন’ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক রেজানুর ইসলামকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় দুঃখপ্রকাশ করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ পারস্পরিক আলোচনা ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিষয়টির শান্তিপূর্ণ সমাধানে পৌঁছা

১৫ ঘণ্টা আগে

প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সংবাদ করায় মামলা— পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক কারাগারে

এর আগে গত ১৫ জুন বগুড়া প্রেস ক্লাবের কোষাধ্যক্ষ এবং ‘দ্য নিউ নেশন’ পত্রিকার উত্তরাঞ্চলীয় প্রতিনিধি তানভীর আলম রিমন ‘দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিন’ পত্রিকার সম্পাদক-প্রকাশকসহ ছয় জনের বিরুদ্ধে এই মামলা করেন। পরে বগুড়ার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মেহেদী হাসান বিবাদীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং সদর থ

১৫ ঘণ্টা আগে

প্রতিমন্ত্রীর ছেলের নামে ইউনিয়ন, বদলে দেওয়ার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের দুই ছেলের নামের সঙ্গে মিল রেখে বগুড়ার মোকামতলা উপজেলার নবগঠিত ‘সীমান্ত’ ও ‘দিগন্ত’ ইউনিয়নের নাম পরিবর্তন করা হচ্ছে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন বগুড়ার জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান।

১৬ ঘণ্টা আগে