আদালতের রায়

শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি, ফেসবুক-গুগলকে ৬ মিলিয়ন ডলার জরিমানা

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ২৬ মার্চ ২০২৬, ২০: ৫০
গুগলকে ১ দশমিক ৮ মিলিয়ন ও মেটাকে ৪ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে বলা হয়েছে। প্রতীকী ছবি

ফেসবুক ও ইউটিউবের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইচ্ছাকৃতভাবে এমন সব আসক্তিকর কনটেন্ট রাখা হয় যা শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বলে রায় দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালত। এ সংক্রান্ত বিষয়ে অবহেলার দায়ে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের প্যারেন্ট কোম্পানি মেটা এবং ইউটিউবের স্বত্বাধিকারী গুগলকে দোষী সাব্যস্ত করে আদালত জরিমানা হিসেবে ছয় মিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে বলেছেন।

২০ বছর বয়সী এক তরুণীর করা মামলায় বুধবার (২৫ মার্চ) যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি আদালত এ রায় দেন। এ রায়কে বিশ্লেষকরা ঐতিহাসিক আখ্যা দিয়েছেন। তারা বলছেন, একই ধরনের আরও হাজারও মামলার জন্য এ রায় নজির হয়ে থাকবে। কারণ লস অ্যাঞ্জেলেস যে রাজ্যে অবস্থিত, সেই ক্যালিফোর্নিয়ার বিভিন্ন আদালতে এমন বহু মামলা বিচারাধীন।

রায়ে মেটাকে ৪ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার ও গুগলকে ১ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে বলা হয়েছে। তবে প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা বলছেন, খালি চোখে ক্ষতিপূরণের এ অঙ্ক অনেক বড় মনে হলেও তা বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জন্য নগণ্য। কারণ তাদের বার্ষিক মূলধনি ব্যয় ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।

‘জবাবদিহির সময় এসেছে’

লস অ্যাঞ্জেলেসের এ মামলাটি ‘ক্যালি’ নামের এক ২০ বছর বয়সী তরুণীকে ঘিরে, যিনি মামলা দায়েরের সময় অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন। তার অভিযোগ, ওই সময় গুগলের ইউটিউব ও মেটার ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে ‘ইনফিনিট স্ক্রলে’র মতো আসক্তিকর অ্যালগরিদমের শিকার হয়ে তিনি আসক্ত হয়ে পড়েন।

জুরি মনে করেছে, এই দুই প্রতিষ্ঠান তাদের অ্যাপের অ্যালগরিদম নিয়ে অবহেলা করেছে এবং ইচ্ছাকৃতভাবেই আসক্তি তৈরির মতো অ্যালগরিদম প কনটেন্ট যুক্ত করেছে। শুধু তাই নয়, এর সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে তারা ব্যবহারকারীদের সতর্ক করতেও ব্যর্থ হয়েছে।

বাদীপক্ষের প্রধান আইনজীবী এক বিবৃতিতে বলেন, আজকের এই রায় পুরো প্রযুক্তি খাতের জন্য একটি বার্তা— জবাবদিহির সময় এসে গেছে।

তবে মেটা ও গুগল রায়ের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছে এবং আপিল করবে বলে জানিয়েছে।

আইনি সুরক্ষা সত্ত্বেও ধাক্কা

যুক্তরাষ্ট্রের আইনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলো তাদের প্ল্যাটফর্মে থাকা কনটেন্টের জন্য শক্তিশালী সুরক্ষা পেয়ে থাকে। তবে এই মামলায় কনটেন্ট নয়, বরং প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদমকে কেন্দ্র করে অভিযোগ আনা হয়।

বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ডি এ ডেভিডসনের প্রযুক্তি বিশ্লেষক গিল লুরিয়ার মতে, এই রায় মেটা ও গুগলের জন্য একটি ‘ধাক্কা’। তিনি বলেন, এ রায় ও এর বাস্তবায়ন হয়তো আপিল ও ভবিষ্যৎ মামলার মাধ্যমে দীর্ঘায়িত হবে। তবে শেষ পর্যন্ত কোম্পানিগুলোকে ব্যবহারকারীর সুরক্ষায় নতুন ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করতে পারে, যা তাদের প্রবৃদ্ধিকে প্রভাবিত করতে পারে।

মামলায় স্ন্যাপ ও টিকটককের বিরুদ্ধেও অভিযোগ আনা হয়েছিল। তবে বিচার শুরুর আগেই তারা বাদীর সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছায়। এ সংক্রান্ত চুক্তির শর্ত প্রকাশ করা হয়নি।

বাড়ছে সমালোচনা ও আইনি চাপ

গত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রে বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে শিশু ও কিশোরদের নিরাপত্তা নিয়ে সমালোচনা বেড়েছে। এ বিতর্ক এখন আদালত ও অঙ্গরাজ্য সরকার পর্যায় পর্যন্ত গড়িয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেস এখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত কোনো আইন পাস করতে পারেনি। তবে গত বছর অন্তত ২০টি অঙ্গরাজ্যে শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ন্যাশনাল কনফারেন্স অব স্টেট লেজিসলেচারস।

এসব আইনের মধ্যে রয়েছে— স্কুলে মোবাইল ফোন ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে বয়স যাচাই বাধ্যতামূলক করা।

অন্যদিকে, মেটা ও গুগলের সমর্থিত ট্রেড অ্যাসোসিয়েশন ‘নেটচয়েস’ বয়স যাচাইয়ের বাধ্যবাধকতা বাতিল করতে আদালতে লড়াই করছে।

রায়ের পর রিপাবলিকান সিনেটর মার্শা ব্ল্যাকবার্ন ও ডেমোক্র্যাট সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল কংগ্রেসকে শিশুদের নিরাপত্তা বিবেচনায় রেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ডিজাইনের নির্দেশনা দিয়ে আইন প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন।

সামনে আরও মামলা

প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আসক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে অনেক মামলা দায়ের রয়েছে। এর মধ্যে ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডের ফেডারেল আদালতে একটি মামলার রায় হবে আগামী গ্রীষ্মে।

এ ছাড়া জুলাইয়ে লস অ্যাঞ্জেলেসে আরেকটি অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের আদালতে একই ধরনের মামলার বিচার শুরু হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব, টিকটক ও স্ন্যাপচ্যাটের বিরুদ্ধেও অভিযোগ আনা হবে।

এর বাইরে নিউ মেক্সিকোর একটি জুরি পৃথক মামলায় মেটাকে অঙ্গরাজ্যের আইন লঙ্ঘনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেছে। ওই মামলায় অভিযোগ ছিল, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের নিরাপত্তা নিয়ে ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত এবং এসব প্ল্যাটফর্মে শিশু যৌন নির্যাতনের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।

বিচার চলাকালীন যুক্তি

বিচারে বাদীপক্ষের আইনজীবীরা যুক্তি দেন, মেটা ও গুগল ইচ্ছাকৃতভাবে আসক্তিকর অ্যালগরিদম ব্যবহার করে শিশু-কিশোরদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে মুনাফাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।

অন্যদিকে মেটার আইনজীবীরা বাদীর পারিবারিক সমস্যাকেই তার মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির কারণ হিসেবে তুলে ধরেন। ইউটিউবের পক্ষ থেকে বলা হয়, প্ল্যাটফর্মটিতে তার ব্যবহার খুব সীমিত ছিল।

জুরি সদস্যদের সামনে উপস্থাপিত নথিতে দেখা যায়, মেটা ও গুগল কীভাবে কম বয়সী ব্যবহারকারীদের আকৃষ্ট করতে কাজ করেছে। শুনানিতে মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গসহ শীর্ষ কর্মকর্তারাও সাক্ষ্য দেন।

একপর্যায়ে কিশোরীদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে— এমন সতর্কতা থাকা সত্ত্বেও ‘বিউটি ফিল্টার’ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়ে জাকারবার্গ বলেন, মানুষের অভিব্যক্তির স্বাধীনতা সীমিত করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ ছিল না।

বিশ্লেষকদের মতে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত বিষয়গুলো আপিল প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টিতে ফুসছে ৫ নদী, ৯ পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ওপরে

বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের দক্ষিণাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদীগুলোর পানি সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। শুক্রবার সকাল ৯টায় সাঙ্গু নদীর পানি বান্দরবান পয়েন্টে বিপৎসীমার ৯৫ সেন্টিমিটার এবং চট্টগ্রামের দোহাজারী পয়েন্টে ২৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। একই সময়ে মাতামুহুরী নদী বান্দরবানের লামা পয়

২ ঘণ্টা আগে

দুর্বল হয়েছে লঘুচাপ, বৃষ্টি হতে পারে আরও কয়েকদিন

আবহাওয়াবিদ কাজী জেবুন্নেছা জানিয়েছেন, আগামী ১৩ জুলাই পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টিপাত চলতে পারে। এরপর ধীরে ধীরে বৃষ্টির পরিমাণ কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

৩ ঘণ্টা আগে

চূড়ান্ত অনুমোদন পেল ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬’

গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার ১২তম বৈঠকে এই অনুমোদন দেওয়া হয়।

৮ ঘণ্টা আগে

একযোগে ১৭৯ উপসচিবকে যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতি

প্রশাসনে বড় পদোন্নতি দিয়েছে সরকার। উপসচিব পদের ১৭৯ কর্মকর্তাকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৭২ জন প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে কর্মরত, বাকি সাতজন দেশের বাইরে বিভিন্ন দূতাবাসে কর্মরত।

২০ ঘণ্টা আগে