
প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম

রমজান মাসের শুরুতেই দেশের কাঁচাবাজার থেকে শুরু করে মুদি দোকান, ফলের আড়ত থেকে মাছের বাজার— সবখানেই উত্তাপ ছড়াচ্ছে নিত্যপণ্যের দাম। বরাবরই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা থাকে, সিয়াম সাধনার এ মাসে অন্তত বাজার পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক থাকবে। কিন্তু বরাবরের মতোই এবারও ইফতার ও সেহরির জন্য অপরিহার্য প্রায় প্রতিটি পণ্যের দামই গত কয়েক দিনের ব্যবধানে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে— সদ্য দায়িত্ব নেওয়া নতুন সরকার কি এই বেসামাল বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে?
রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন বাজার থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল, নাটোর, পটুয়াখালী ও বাগেরহাটের মতো জেলা শহরগুলোতেও দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের নাভিশ্বাস উঠে গেছে। একদিকে ব্যবসায়ীরা সরবরাহ সংকটের অজুহাত দিচ্ছেন, অন্যদিকে ক্রেতারা দুষছেন বাজার মনিটরিংয়ের অভাব ও অসাধু সিন্ডিকেটকে।
সবজির বাজারে আগুন, এক হালি লেবুর দামে মিলছে এক ডজন ডিম!
রমজানের ইফতারে এক গ্লাস ঠান্ডা লেবুর শরবতের চাহিদা থাকে সবারই। কিন্তু বাজার পরিস্থিতি বলছে, সেই লেবুর শরবতও রীতিমতো সাধারণ মানুষের কাছে বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার প্রথম রোজার দিনসহ এর আগের কয়েকদিন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে এই লেবুর। হাজারীবাগ, কারওয়ান বাজারসহ অন্যান্য খুচরা বাজারে বড় আকারের এক হালি লেবু বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৫০ টাকায়। এমনকি মাঝারি বা কাগজি লেবুর হালি কিনতে ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা। অথচ এক ডজন ফার্মের ডিমের দাম বর্তমানে ১১০ থেকে ১২০ টাকার মধ্যে।

বিক্রেতারা লেবুর অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির পেছনে উৎপাদন ঘাটতি ও অনাবৃষ্টির অজুহাত দিচ্ছেন। তবে তা মানতে নারাজ ক্রেতারা। এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি হালি ৪০ টাকা থেকে শতক পেরিয়ে যাওয়ার পেছনে ‘কারসাজি’ ছাড়া অন্য কোনো কারণকে মেনে নিতে রাজি নন তারা।
লেবুর পাশাপাশি ইফতারের অন্যতম অনুষঙ্গ বেগুনির জন্য ব্যবহৃত বেগুনের গায়েও আগুন। কয়েকদিন আগেও যে বেগুন ৪০-৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতো, তা এখন খুচরা বাজারে ৮০ থেকে ১২০ টাকায় ঠেকেছে। কাঁচামরিচের দামও প্রতি কেজিতে বেড়েছে ২০ থেকে ৩০ টাকা, যা পটুয়াখালীর মতো অনেক জেলা শহরে ২০০ টাকা পর্যন্ত ছুঁয়েছে।
একইভাবে দেশি শসার কেজি ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা, হাইব্রিড শসার কেজি ১১০ থেকে ১৩০ টাকা, গাজরের কেজি ৬০ থেকে ৭০ টাকা ও টমেটোর কেজি ৮০ থেকে ৯০ টাকায় ঠেকেছে।
আমিষে বাড়তি চাপ, পাইকারি-খুচরায় বড় ফারাক
রমজানে আমিষের চাহিদা মেটাতে নিম্নবিত্তের ভরসা যে ব্রয়লার মুরগি, সপ্তাহের ব্যবধানে তার দামও বেড়েছে কেজিতে ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত। রাজধানীর খুচরা বাজারগুলোতে ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ২২০ টাকা কেজি দরে। ফেব্রুয়ারির শুরুতেও যে ‘সোনালি’ মুরগি ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে, তা এখন বেড়ে হয়েছে ৩২০ থেকে ৩৫০ টাকা। চট্টগ্রামের বাজারে দেশি মুরগির দাম ৬৮০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে।
গরুর মাংসের দাম আগে থেকেই নাগালের বাইরে। অন্তত রোজায় সরকার নির্ধারিত দামে এ মাংস বিক্রির প্রত্যাশা ছিল সবার। কিন্তু ৮০০ টাকার নিচে গরুর মাংস বিক্রির নজির খুব একটা মিলছে না। চট্টগ্রামে ৮৫০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত কেজি দরে গরুর মাংস বিক্রির খবর পাওয়া গেছে। খাসির মাংসের দামও এক মাসের ব্যবধানে ১২০০ টাকা থেকে বেড়ে ১৩০০ টাকায় পৌঁছেছে।

বিক্রেতারা বলছেন, মুরগির বাচ্চা ও পোলট্রি খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি রমজানে চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কারণেই আমিষের দাম বাড়তি। তবে রাজধানীর কাপ্তান বাজারের মতো পাইকারি আড়ত ঘুরে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। সেখানে ব্রয়লার মুরগি ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকা কেজি এবং সোনালি মুরগি ২৯০ থেকে ৩০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। পাইকারি ও খুচরা বাজারের এই বিশাল ব্যবধান প্রমাণ করে, মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণেই সাধারণ ক্রেতাদের অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে।
গ্রাম থেকে শহর— মাছের বাজারেও ঊর্ধ্বগতি
বাগেরহাট প্রতিনিধির তথ্য বলছে, সেখানকার বারাকপুর মৎস্য আড়ত দেশের অন্যতম বড় মাছের আড়ত। রমজানের আগে সেখানেই আকার ও জাতভেদে প্রতি মণ মাছের দাম হাজার থেকে শুরু করে আট হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। মাসখানেকের ব্যবধানে ছয়-সাত হাজার টাকা মণের রুই মাছের দাম পৌঁছে গেছে ১০ হাজার টাকায়। গলদা ও বাগদা চিংড়ির দাম কেজিতে বেড়েছে ২০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত। ঢাকার খুচরা বাজারগুলোতেও তেলাপিয়া, পাঙাশ থেকে শুরু করে রুই, কাতল, পাবদা ও শিং মাছের দাম কেজিতে ৩০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দেখা গেছে।
খেজুর থেকে আপেল— সবই আকাশছোঁয়া
রমজানে ইফতারের জন্য ফলের চাহিদা বেড়ে যায়। সেই ফলের দামও ঊর্ধ্বমুখী। কারওয়ান বাজারে গত কয়েকদিনে মাল্টা ৩১০ থেকে ৩৫০ টাকা, আপেল ৩৮০ থেকে ৪০০ টাকা, লাল আঙুর ৬৫০ টাকা, কালো আঙুর ৬০০ টাকা ও সবুজ আঙুর ৪২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। ছোট আকারের ডালিম বা আনারের কেজি ঠেকেছে ৬৫০ টাকায়, নাশপাতি ৪০০ টাকায়। তরমুজও ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। দেশীয় অন্য ফলের মধ্যে পেয়ারা ১২০ টাকা কেজি এবং আনারস প্রতিটি ৪০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কলার দাম ডজনে ৩০ থেকে ৬০ টাকা বেড়েছে।
খেজুরের বাজারও অস্থির। সাধারণ মান থেকে শুরু করে উন্নত মানের আজওয়া বা মরিয়ম খেজুর— সবকিছুর দামই কেজিতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেড়েছে। মানভেদে খেজুর বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকা থেকে শুরু করে ৩০০০ টাকা পর্যন্ত।
মুদি দোকানে ইফতারের অন্যতম প্রধান উপাদান ছোলার দাম কেজিতে ৫-১০ টাকা বেড়ে ৮০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে ছোলা বিক্রি হচ্ছে ৯৫ টাকায়। রসুনের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে কেজিপ্রতি ২০০ থেকে ২৪০ টাকায় পৌঁছেছে, যা কয়েকদিন আগেও ১৫০ টাকার নিচে ছিল। দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৫৫ থেকে ৭০ টাকার মধ্যে। চিনি ও ভোজ্যতেলের বাজার কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও খোলা সয়াবিন তেলের দাম কেজিতে ৫ টাকার মতো বেড়েছে।
নতুন সরকারের অঙ্গীকার
রোজা শুরুর মাত্র একদিন আগে যাত্রা শুরু করেছে নতুন সরকার। এর আগেই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি মানুষকে ভোগান্তির সীমায় নিয়ে গেছে। এ অবস্থায় বুধবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সচিবালয়ে প্রথম অফিস করার পরই রাতে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন তারেক রহমান। সেখানে তিনি সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
তারেক রহমান বলেন, রমজানের পবিত্রতা রক্ষায় এই মাসকে যেন ব্যবসার মুনাফার মাসে পরিণত করা না হয় এবং দ্রব্যমূল্য যেন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে না যায়, সে ব্যাপারে ব্যবসায়ীদের সতর্ক থাকতে হবে। হাজারও প্রাণের বিনিময়ে একটি মাফিয়া সিন্ডিকেটের পতন ঘটিয়ে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে। তাই বিএনপি সরকার অনাচার ও অনিয়মের সব সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে বদ্ধপরিকর।
ক্ষুদ্র থেকে বড়— সব ধরনের ব্যবসায়ীদের প্রতি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি সহজ ও স্পষ্ট উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, সরকার ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের স্বার্থ রক্ষা করতে চায়। এই সরকার জনগণের সরকার এবং সাধারণ মানুষই ভোটের মাধ্যমে এই শক্তি জুগিয়েছে।
বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বা ক্রেতা-বিক্রেতার স্বার্থ রক্ষায় সরকারের পক্ষ থেকে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন, সে বিষয়ে যেকোনো পরামর্শ বা অভিযোগ শুনতে তার সরকার সব সময় প্রস্তুত বলেও জানান তারেক রহমান।
রমজানের প্রথম দিনই রাজধানীতে স্বল্পমূল্যে আমিষ বিক্রির উদ্যোগ শুরু করেছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। রমজানে অন্তত ১০ লাখ নিম্ন আয়ের পরিবারের কাছে সুলভ মূল্যে দুধ, ডিম ও মাংস পৌঁছে দিতে ঢাকার ২৫টি স্থানে ভ্রাম্যমাণ ট্রাকের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি কার্যক্রম শুরু করেছে তারা। সেখানে ড্রেসড ব্রয়লার মুরগি ২৪৫ টাকা কেজি, গরুর মাংস ৬৫০ টাকা কেজি ও ফার্মের ডিম ৯৬ টাকা ডজন (৮ টাকা পিস) দরে বিক্রি হচ্ছে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, রমজান উপলক্ষে তাদের নিয়মিত মনিটরিং টিমের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। কোনো ব্যবসায়ী যেন কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত মুনাফা লুটতে না পারে, সে জন্য সারা দেশে একযোগে অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। বরিশাল, চট্টগ্রাম, বাগেরহাটসহ বিভিন্ন জেলায় জেলা প্রশাসনের তরফ থেকে নিয়মিত বাজার তদারকি করা হচ্ছে।
ক্রেতাদের অভিযোগ, ম্যাজিস্ট্রেট বাজারে এলেই কেবল মূল্যতালিকা টাঙানো হয় এবং দাম কমানো হয়, তারা চলে গেলেই আবার সেই পুরনো চিত্র ফিরে আসে।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন মনে করেন, রমজান মাস ইবাদতের সময় হলেও এক শ্রেণির ব্যবসায়ীর কাছে এটি অতি মুনাফা লাভের মাসে পরিণত হয়েছে।
রাজনীতি ডটকমকে তিনি বলেন, বাজারে পণ্যের কোনো প্রকৃত সংকট না থাকলেও অসাধু ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেট নানা অজুহাতে ও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। এ কারণেই মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে ২০ টাকার লেবু ১২০ টাকা কিংবা ৬০ টাকার পেঁয়াজ ১০০ টাকার ওপরে উঠে যাচ্ছে। বাজার তদারকি বা প্রশাসন যদি এ ক্ষেত্রে কঠোর ভূমিকা না রাখে তবে এই চক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে।
তবে শুধু সরকারকে দোষারোপ না করে সাধারণ জনগণকেও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান নাজের হোসাইন। তিনি বলেন, দাম বাড়লে অতি উৎসাহী হয়ে বেশি পণ্য কেনার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। কোনো পণ্যের দাম বেড়ে গেলে হন্যে হয়ে তা না কিনে বরং কেনা কমিয়ে দেওয়া এবং পুরো মাসের বাজার একসঙ্গে না করে তিন দিন বা এক সপ্তাহের জন্য করলে সাপ্লাই চেইনে কোনো সংকট তৈরি হবে না।
রমজানের শুরুতেই বাজারের এই বেসামাল অবস্থা নতুন সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন দেখার বিষয়— প্রতিশ্রুত সিন্ডিকেটবিরোধী অবস্থান ও মনিটরিং কার্যক্রম বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, আর সাধারণ মানুষ কতটা স্বস্তি পায়।

রমজান মাসের শুরুতেই দেশের কাঁচাবাজার থেকে শুরু করে মুদি দোকান, ফলের আড়ত থেকে মাছের বাজার— সবখানেই উত্তাপ ছড়াচ্ছে নিত্যপণ্যের দাম। বরাবরই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা থাকে, সিয়াম সাধনার এ মাসে অন্তত বাজার পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক থাকবে। কিন্তু বরাবরের মতোই এবারও ইফতার ও সেহরির জন্য অপরিহার্য প্রায় প্রতিটি পণ্যের দামই গত কয়েক দিনের ব্যবধানে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে— সদ্য দায়িত্ব নেওয়া নতুন সরকার কি এই বেসামাল বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে?
রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন বাজার থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল, নাটোর, পটুয়াখালী ও বাগেরহাটের মতো জেলা শহরগুলোতেও দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের নাভিশ্বাস উঠে গেছে। একদিকে ব্যবসায়ীরা সরবরাহ সংকটের অজুহাত দিচ্ছেন, অন্যদিকে ক্রেতারা দুষছেন বাজার মনিটরিংয়ের অভাব ও অসাধু সিন্ডিকেটকে।
সবজির বাজারে আগুন, এক হালি লেবুর দামে মিলছে এক ডজন ডিম!
রমজানের ইফতারে এক গ্লাস ঠান্ডা লেবুর শরবতের চাহিদা থাকে সবারই। কিন্তু বাজার পরিস্থিতি বলছে, সেই লেবুর শরবতও রীতিমতো সাধারণ মানুষের কাছে বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার প্রথম রোজার দিনসহ এর আগের কয়েকদিন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে এই লেবুর। হাজারীবাগ, কারওয়ান বাজারসহ অন্যান্য খুচরা বাজারে বড় আকারের এক হালি লেবু বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৫০ টাকায়। এমনকি মাঝারি বা কাগজি লেবুর হালি কিনতে ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা। অথচ এক ডজন ফার্মের ডিমের দাম বর্তমানে ১১০ থেকে ১২০ টাকার মধ্যে।

বিক্রেতারা লেবুর অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির পেছনে উৎপাদন ঘাটতি ও অনাবৃষ্টির অজুহাত দিচ্ছেন। তবে তা মানতে নারাজ ক্রেতারা। এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি হালি ৪০ টাকা থেকে শতক পেরিয়ে যাওয়ার পেছনে ‘কারসাজি’ ছাড়া অন্য কোনো কারণকে মেনে নিতে রাজি নন তারা।
লেবুর পাশাপাশি ইফতারের অন্যতম অনুষঙ্গ বেগুনির জন্য ব্যবহৃত বেগুনের গায়েও আগুন। কয়েকদিন আগেও যে বেগুন ৪০-৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতো, তা এখন খুচরা বাজারে ৮০ থেকে ১২০ টাকায় ঠেকেছে। কাঁচামরিচের দামও প্রতি কেজিতে বেড়েছে ২০ থেকে ৩০ টাকা, যা পটুয়াখালীর মতো অনেক জেলা শহরে ২০০ টাকা পর্যন্ত ছুঁয়েছে।
একইভাবে দেশি শসার কেজি ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা, হাইব্রিড শসার কেজি ১১০ থেকে ১৩০ টাকা, গাজরের কেজি ৬০ থেকে ৭০ টাকা ও টমেটোর কেজি ৮০ থেকে ৯০ টাকায় ঠেকেছে।
আমিষে বাড়তি চাপ, পাইকারি-খুচরায় বড় ফারাক
রমজানে আমিষের চাহিদা মেটাতে নিম্নবিত্তের ভরসা যে ব্রয়লার মুরগি, সপ্তাহের ব্যবধানে তার দামও বেড়েছে কেজিতে ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত। রাজধানীর খুচরা বাজারগুলোতে ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ২২০ টাকা কেজি দরে। ফেব্রুয়ারির শুরুতেও যে ‘সোনালি’ মুরগি ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে, তা এখন বেড়ে হয়েছে ৩২০ থেকে ৩৫০ টাকা। চট্টগ্রামের বাজারে দেশি মুরগির দাম ৬৮০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে।
গরুর মাংসের দাম আগে থেকেই নাগালের বাইরে। অন্তত রোজায় সরকার নির্ধারিত দামে এ মাংস বিক্রির প্রত্যাশা ছিল সবার। কিন্তু ৮০০ টাকার নিচে গরুর মাংস বিক্রির নজির খুব একটা মিলছে না। চট্টগ্রামে ৮৫০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত কেজি দরে গরুর মাংস বিক্রির খবর পাওয়া গেছে। খাসির মাংসের দামও এক মাসের ব্যবধানে ১২০০ টাকা থেকে বেড়ে ১৩০০ টাকায় পৌঁছেছে।

বিক্রেতারা বলছেন, মুরগির বাচ্চা ও পোলট্রি খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি রমজানে চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কারণেই আমিষের দাম বাড়তি। তবে রাজধানীর কাপ্তান বাজারের মতো পাইকারি আড়ত ঘুরে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। সেখানে ব্রয়লার মুরগি ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকা কেজি এবং সোনালি মুরগি ২৯০ থেকে ৩০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। পাইকারি ও খুচরা বাজারের এই বিশাল ব্যবধান প্রমাণ করে, মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণেই সাধারণ ক্রেতাদের অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে।
গ্রাম থেকে শহর— মাছের বাজারেও ঊর্ধ্বগতি
বাগেরহাট প্রতিনিধির তথ্য বলছে, সেখানকার বারাকপুর মৎস্য আড়ত দেশের অন্যতম বড় মাছের আড়ত। রমজানের আগে সেখানেই আকার ও জাতভেদে প্রতি মণ মাছের দাম হাজার থেকে শুরু করে আট হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। মাসখানেকের ব্যবধানে ছয়-সাত হাজার টাকা মণের রুই মাছের দাম পৌঁছে গেছে ১০ হাজার টাকায়। গলদা ও বাগদা চিংড়ির দাম কেজিতে বেড়েছে ২০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত। ঢাকার খুচরা বাজারগুলোতেও তেলাপিয়া, পাঙাশ থেকে শুরু করে রুই, কাতল, পাবদা ও শিং মাছের দাম কেজিতে ৩০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দেখা গেছে।
খেজুর থেকে আপেল— সবই আকাশছোঁয়া
রমজানে ইফতারের জন্য ফলের চাহিদা বেড়ে যায়। সেই ফলের দামও ঊর্ধ্বমুখী। কারওয়ান বাজারে গত কয়েকদিনে মাল্টা ৩১০ থেকে ৩৫০ টাকা, আপেল ৩৮০ থেকে ৪০০ টাকা, লাল আঙুর ৬৫০ টাকা, কালো আঙুর ৬০০ টাকা ও সবুজ আঙুর ৪২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। ছোট আকারের ডালিম বা আনারের কেজি ঠেকেছে ৬৫০ টাকায়, নাশপাতি ৪০০ টাকায়। তরমুজও ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। দেশীয় অন্য ফলের মধ্যে পেয়ারা ১২০ টাকা কেজি এবং আনারস প্রতিটি ৪০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কলার দাম ডজনে ৩০ থেকে ৬০ টাকা বেড়েছে।
খেজুরের বাজারও অস্থির। সাধারণ মান থেকে শুরু করে উন্নত মানের আজওয়া বা মরিয়ম খেজুর— সবকিছুর দামই কেজিতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেড়েছে। মানভেদে খেজুর বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকা থেকে শুরু করে ৩০০০ টাকা পর্যন্ত।
মুদি দোকানে ইফতারের অন্যতম প্রধান উপাদান ছোলার দাম কেজিতে ৫-১০ টাকা বেড়ে ৮০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে ছোলা বিক্রি হচ্ছে ৯৫ টাকায়। রসুনের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে কেজিপ্রতি ২০০ থেকে ২৪০ টাকায় পৌঁছেছে, যা কয়েকদিন আগেও ১৫০ টাকার নিচে ছিল। দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৫৫ থেকে ৭০ টাকার মধ্যে। চিনি ও ভোজ্যতেলের বাজার কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও খোলা সয়াবিন তেলের দাম কেজিতে ৫ টাকার মতো বেড়েছে।
নতুন সরকারের অঙ্গীকার
রোজা শুরুর মাত্র একদিন আগে যাত্রা শুরু করেছে নতুন সরকার। এর আগেই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি মানুষকে ভোগান্তির সীমায় নিয়ে গেছে। এ অবস্থায় বুধবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সচিবালয়ে প্রথম অফিস করার পরই রাতে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন তারেক রহমান। সেখানে তিনি সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
তারেক রহমান বলেন, রমজানের পবিত্রতা রক্ষায় এই মাসকে যেন ব্যবসার মুনাফার মাসে পরিণত করা না হয় এবং দ্রব্যমূল্য যেন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে না যায়, সে ব্যাপারে ব্যবসায়ীদের সতর্ক থাকতে হবে। হাজারও প্রাণের বিনিময়ে একটি মাফিয়া সিন্ডিকেটের পতন ঘটিয়ে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে। তাই বিএনপি সরকার অনাচার ও অনিয়মের সব সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে বদ্ধপরিকর।
ক্ষুদ্র থেকে বড়— সব ধরনের ব্যবসায়ীদের প্রতি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি সহজ ও স্পষ্ট উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, সরকার ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের স্বার্থ রক্ষা করতে চায়। এই সরকার জনগণের সরকার এবং সাধারণ মানুষই ভোটের মাধ্যমে এই শক্তি জুগিয়েছে।
বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বা ক্রেতা-বিক্রেতার স্বার্থ রক্ষায় সরকারের পক্ষ থেকে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন, সে বিষয়ে যেকোনো পরামর্শ বা অভিযোগ শুনতে তার সরকার সব সময় প্রস্তুত বলেও জানান তারেক রহমান।
রমজানের প্রথম দিনই রাজধানীতে স্বল্পমূল্যে আমিষ বিক্রির উদ্যোগ শুরু করেছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। রমজানে অন্তত ১০ লাখ নিম্ন আয়ের পরিবারের কাছে সুলভ মূল্যে দুধ, ডিম ও মাংস পৌঁছে দিতে ঢাকার ২৫টি স্থানে ভ্রাম্যমাণ ট্রাকের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি কার্যক্রম শুরু করেছে তারা। সেখানে ড্রেসড ব্রয়লার মুরগি ২৪৫ টাকা কেজি, গরুর মাংস ৬৫০ টাকা কেজি ও ফার্মের ডিম ৯৬ টাকা ডজন (৮ টাকা পিস) দরে বিক্রি হচ্ছে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, রমজান উপলক্ষে তাদের নিয়মিত মনিটরিং টিমের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। কোনো ব্যবসায়ী যেন কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত মুনাফা লুটতে না পারে, সে জন্য সারা দেশে একযোগে অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। বরিশাল, চট্টগ্রাম, বাগেরহাটসহ বিভিন্ন জেলায় জেলা প্রশাসনের তরফ থেকে নিয়মিত বাজার তদারকি করা হচ্ছে।
ক্রেতাদের অভিযোগ, ম্যাজিস্ট্রেট বাজারে এলেই কেবল মূল্যতালিকা টাঙানো হয় এবং দাম কমানো হয়, তারা চলে গেলেই আবার সেই পুরনো চিত্র ফিরে আসে।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন মনে করেন, রমজান মাস ইবাদতের সময় হলেও এক শ্রেণির ব্যবসায়ীর কাছে এটি অতি মুনাফা লাভের মাসে পরিণত হয়েছে।
রাজনীতি ডটকমকে তিনি বলেন, বাজারে পণ্যের কোনো প্রকৃত সংকট না থাকলেও অসাধু ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেট নানা অজুহাতে ও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। এ কারণেই মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে ২০ টাকার লেবু ১২০ টাকা কিংবা ৬০ টাকার পেঁয়াজ ১০০ টাকার ওপরে উঠে যাচ্ছে। বাজার তদারকি বা প্রশাসন যদি এ ক্ষেত্রে কঠোর ভূমিকা না রাখে তবে এই চক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে।
তবে শুধু সরকারকে দোষারোপ না করে সাধারণ জনগণকেও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান নাজের হোসাইন। তিনি বলেন, দাম বাড়লে অতি উৎসাহী হয়ে বেশি পণ্য কেনার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। কোনো পণ্যের দাম বেড়ে গেলে হন্যে হয়ে তা না কিনে বরং কেনা কমিয়ে দেওয়া এবং পুরো মাসের বাজার একসঙ্গে না করে তিন দিন বা এক সপ্তাহের জন্য করলে সাপ্লাই চেইনে কোনো সংকট তৈরি হবে না।
রমজানের শুরুতেই বাজারের এই বেসামাল অবস্থা নতুন সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন দেখার বিষয়— প্রতিশ্রুত সিন্ডিকেটবিরোধী অবস্থান ও মনিটরিং কার্যক্রম বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, আর সাধারণ মানুষ কতটা স্বস্তি পায়।

শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, ‘বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি হবে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সবার সঙ্গে বন্ধুত্বের ভিত্তিতে। কোনো বিশেষ দেশের প্রতি অতি নির্ভরশীলতা নয়, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমমর্যাদার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া হবে।’
৪ ঘণ্টা আগে
নকল দূরীকরণের সফল অভিযানের মতো এবার মাদক, সন্ত্রাস-কিশোর গ্যাং ও ইভটিজিংমুক্ত শিক্ষাঙ্গন গড়ার ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। শিক্ষাঙ্গনে সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে বলে জানান তিনি।
৫ ঘণ্টা আগে
বিএনপির মিডিয়া সেলের পক্ষ থেকে এক বার্তায় জানানো হয়েছে, দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন তিনি।
৬ ঘণ্টা আগে
প্রায় ১৫ হাজার পুলিশ সদস্যের পাশাপাশি র্যাবের বোম্ব ডিস্পোজাল ইউনিট, ডগ স্কোয়াড এবং সিসিটিভি নজরদারির মাধ্যমে পুরো এলাকাকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেওয়া হয়েছে।
৭ ঘণ্টা আগে