মারা গেলেন গ্লোরিয়া স্টেইনেম, নারীবাদের এক যুগের অবসান

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১: ৩৯
মাঝখানে সিঁথি করা লম্বা ও স্বর্ণাভ চুল আর বড় অ্যাভিয়েটর চশমা— ২০১৭ সালে ৮৩ বর বয়সেও চিরচেনা রূপে উইমেন’স মার্চে অংশ নেন গ্লোরিয়া স্টেইনেম। ছবি: সংগৃহীত

আমেরিকার নারীবাদী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ, লেখক, সাংবাদিক ও সমাজকর্মী গ্লোরিয়া স্টেইনেম মারা গেছেন। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে নারী-পুরুষের সমতা, নারীর নাগরিক অধিকার ও প্রজনন অধিকার নিয়ে আন্দোলন করা এই কিংবদন্তি নারীবাদীর বয়স হয়েছিল ৯২ বছর।

দীর্ঘ ছয় দশকের সক্রিয়তায় স্টেইনেম শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নারী আন্দোলনের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক হয়ে ওঠেননি, বরং বিশ্ব জুড়ে কয়েক প্রজন্মের নারীর জন্য অনুপ্রেরণার নাম হয়ে উঠেছিলেন। তিনি ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে নারীবাদী আন্দোলনের ‘সেকেন্ড ওয়েভে’র অন্যতম রূপকার।

বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কের নিজ বাড়িতে তার মৃত্যু হয়। পরদিন বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) তার ফাউন্ডেশন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ খবর জানিয়েছে।

১৯৩৪ সালের ২৫ মার্চ ওহাইওর টোলেডোতে জন্ম গ্লোরিয়া মেরি স্টেইনেমের। বাবা ছিলেন ভ্রাম্যমাণ পুরোনো জিনিসের ব্যবসায়ী। পরিবারের ঘন ঘন স্থান পরিবর্তনের কারণে ছোটবেলায় নিয়মিত স্কুলে পড়ার সুযোগও হয়নি। ১১ বছর বয়সে বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হলে মানসিক সংকটে থাকা মায়ের দেখাশোনার বড় দায়িত্ব এসে পড়ে তার ওপর।

এ অভিজ্ঞতা তার সামাজিক অবিচার, পরিবার ও বিয়ে সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। পরে তিনি বলেছিলেন, ছোটবেলাতেই তাকে ‘একজন খুব বড় সন্তান’ তথা তার মায়ের ছোট অভিভাবক হতে হয়েছিল। তাই অন্য কারও দেখাশোনার দায়িত্বে আবদ্ধ হতে তিনি চাননি।

স্মিথ কলেজ থেকে পড়ালেখা শেষ করে সাংবাদিকতা শুরু করেন স্টেইনেম। ১৯৬৩ সালে মাত্র ১১ দিনের জন্য নিউইয়র্কের একটি প্লেবয় ক্লাবে ‘বানি’ হিসেবে কাজ করেন। উদ্দেশ্য ছিল অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ‘শো’ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত দুই পর্বের ‘আ বানি’স টেল’ প্রতিবেদনে প্লেবয় ক্লাবে কর্মরত নারীদের কম মজুরি ও যৌন বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরেন তিনি। প্রতিবেদনটি তাকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয় এবং পরে টেলিভিশন চলচ্চিত্রেও রূপ নেয়।

১৯৬৮ সালে নিউইয়র্ক ম্যাগাজিন প্রতিষ্ঠায় যুক্ত ছিলেন স্টেইনেম। সেখানে ‘আফটার ব্ল্যাক পাওয়ার, উইমেন’স লিবারেশন’ শিরোনামের প্রবন্ধ তাকে দ্রুতই নারীবাদী আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠে পরিণত করে।

তবে ১৯৬৯ সালে নিউইয়র্কের একটি গির্জায় গর্ভপাত নিয়ে আয়োজিত এক আলোচনায় অংশ নেওয়ার পরই তিনি নিজের জীবনকে সক্রিয় নারীবাদী আন্দোলনের সঙ্গে পুরোপুরি যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেন। ২২ বছর বয়সে লন্ডনে অবৈধভাবে গর্ভপাত করানোর নিজের অভিজ্ঞতাও পরে প্রকাশ্যে জানান তিনি।

১৯৭১ সালে স্টেইনেম অন্য কয়েকজন নারীবাদী নেত্রীর সঙ্গে ‘মিস ম্যাগাজিন’ প্রতিষ্ঠা করেন। সে সময় নারীদের জন্য প্রকাশিত অধিকাংশ ম্যাগাজিনের প্রধান বিষয় ছিল সৌন্দর্য, রান্নাবান্না ও স্বামীকে কীভাবে খুশি রাখা যায়— এমন সব বিষয়। এর বিপরীতে স্টেইনেমের ম্যাগাজিনের পাতায় উঠে আসে গর্ভপাত, যৌন বৈষম্য, সমান মজুরি, পারিবারিক সহিংসতা ও নারীর অধিকার।

প্রকাশনার প্রথম দিকের একটি সংখ্যায় স্টেইনেমসহ ৫২ জন নারীর নাম প্রকাশ করা হয়, যারা গর্ভপাত করিয়েছিলেন। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে গর্ভপাত বৈধ করার দাবিকে প্রকাশ্যে সামনে আনা হয়। এর দুই বছর পর ১৯৭৩ সালে ঐতিহাসিক ‘রো ভার্সেস ওয়েড’ মামলার রায়ে যুক্তরাষ্ট্রে নারীর গর্ভপাতের সাংবিধানিক অধিকার স্বীকৃত হয়, যে অধিকার প্রায় পাঁচ দশক বহাল ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রে নারীবাদী আন্দোলনের দ্বিতীয় ঢেউয়ের অন্যতম রূপকার ছিলেন স্টেইনেম। ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রে নারীবাদী আন্দোলনের দ্বিতীয় ঢেউয়ের অন্যতম রূপকার ছিলেন স্টেইনেম। ছবি: সংগৃহীত

১৯৭১ সালেই সাবেক কংগ্রেস সদস্য বেলা আবজুগ ও শার্লি চিশলম এবং লেখক বেটি ফ্রিডানের সঙ্গে ‘ন্যাশনাল উইমেন’স পলিটিক্যাল ককাস’ প্রতিষ্ঠা করেন স্টেইনেম। ফ্রিডানের ১৯৬৩ সালের বই ‘দ্য ফেমিনিন মিস্টিক’ যুক্তরাষ্ট্রে দ্বিতীয় ঢেউয়ের নারীবাদী আন্দোলনের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল।

স্টেইনেম পরবর্তী সময়ে কোয়ালিশন অব লেবার ইউনিয়ন উইমেন, উইমেন’স মিডিয়া সেন্টার, ভোটারস ফর চয়েজ ও মিস ফাউন্ডেশন ফর উইমেনের মতো বিভিন্ন সংগঠন প্রতিষ্ঠা বা গঠনে ভূমিকা রাখেন।

‘নারীবাদ মানে পছন্দের স্বাধীনতা’

স্টেইনেমের নারীবাদ শুধু নারীর কর্মক্ষেত্রের সমতা বা রাজনৈতিক অধিকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং বিয়ে, মাতৃত্ব, শরীর ও নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারকেও তিনি নারীর স্বাধীনতার কেন্দ্রে রাখতেন। তিনি বলতেন, ‘ঘরের বাইরে নারীরা সমান হবে না, যতক্ষণ না ঘরের ভেতর পুরুষরাও সমান হয়।’

নিজের কোনো সন্তান ছিল না স্টেইনেমের। ৬৬ বছর বয়সে তিনি বিয়ে করেন দক্ষিণ আফ্রিকান ব্যবসায়ী ও পরিবেশবাদী ডেভিড বেলকে, যিনি অভিনেতা ক্রিশ্চিয়ান বেলের বাবা। বিয়ের সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করতে স্টেইনেম বলেছিলেন, নারীবাদ সব সময়ই বলে এসেছে— জীবনের প্রতিটি সময়ে নিজের জন্য যা সঠিক, তা বেছে নেওয়ার স্বাধীনতাই গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৩ সালে মস্তিষ্কের ক্যানসারে মারা যান ডেভিড বেল।

স্টেইনেম নিজেকে বলতেন ‘সামাজিক পরিবর্তনের উদ্যোক্তা’। নারীদের গল্প শোনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেছিলেন, তাদের গল্প না শুনে নারীর ক্ষমতায়ন সম্ভব নয়।

বর্ণবাদ ও বৈষম্যের প্রশ্নেও তার অবস্থান ছিল স্পষ্ট। নারীবাদকে সব বর্ণের নারীর আন্দোলন হিসেবে দেখতেন তিনি। এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, বৈষম্যের অভিজ্ঞতা থাকলে মানুষ অন্যের বৈষম্যও বুঝতে শেখে এবং কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের কাছ থেকেই তিনি নারীবাদ সম্পর্কে অনেক কিছু শিখেছেন।

নারীবাদ ইস্যুতে গ্লোরিয়া স্টেইনেমের তুলে দেওয়া প্রশ্নগুলো আজও বিশ্বব্যাপী নারীবাদী আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়ে গেছে। ছবি: সংগৃহীত
নারীবাদ ইস্যুতে গ্লোরিয়া স্টেইনেমের তুলে দেওয়া প্রশ্নগুলো আজও বিশ্বব্যাপী নারীবাদী আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়ে গেছে। ছবি: সংগৃহীত

রাজনীতি, বই ও উত্তরাধিকার

স্টেইনেম আশির দশকেও সক্রিয় ছিলেন। তিনি ‘ম্যারিলিন: নরমা জিন’, ‘রেভ্যুলেশন ফ্রম উইদিন: আ বুক অব সেলফ-এস্টিম’সহ বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন। নারী নির্যাতন, শিশু নির্যাতনসহ নানা সামাজিক ইস্যুতে প্রামাণ্যচিত্র ও টেলিভিশন কাজেও যুক্ত ছিলেন।

স্টেইনেমের জীবন নিয়ে তৈরি হয়েছে চলচ্চিত্র, মঞ্চনাটক ও প্রামাণ্যচিত্র। ২০২০ সালে পরিচালক জুলি টেইমর নির্মাণ করেন ‘দ্য গ্লোরিয়াস’, যা স্টেইনেমের ২০১৫ সালের আত্মজীবনী ‘মাই লাইফ অন দ্য রোড’ অবলম্বনে তৈরি। তার জীবন নিয়ে ২০১৮ সালে ‘গ্লোরিয়া: আ লাইফ’ নাটক ও ২০১১ সালে এইচবিওর ‘গ্লোরিয়া: ইন হার ওন ওয়ার্ডস’ প্রামাণ্যচিত্রও নির্মিত হয়।

২০১৩ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাকে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম পদকে ভূষিত করেন।

চলতি সেপ্টেম্বরেই ‘অ্যান আনএক্সপেক্টেড লাইফ’ নামে স্টেইনেমের নতুন একটি স্মৃতিকথা প্রকাশের কথা রয়েছে। মৃত্যুর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে প্রকাশের অপেক্ষায় থাকা বইটিতে জীবনের দীর্ঘ পথচলা, নারীবাদী আন্দোলনের উত্থান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি তার আশাবাদ উঠে এসেছে। এমনকি তিনি শতবর্ষ পর্যন্ত বাঁচার পরিকল্পনার কথাও লিখেছিলেন।

চলচ্চিত্র ও থিয়েটার পরিচালক জুলি টেইমর একসময় স্টেইনেমকে বর্ণনা করেছিলেন ‘অনিচ্ছুক মুখপাত্র থেকে ইতিবাচক পরিবর্তনের আলোকবর্তিকা’ হয়ে ওঠা এক অনন্য আমেরিকান নেতা হিসেবে।

লেখক ক্যারোলিন হেইলব্রুন ১৯৯৫ সালে লিখেছিলেন স্টেইনেমের জীবনী ‘এডুকেশন অব আ ওম্যান: দ্য লাইফ অব গ্লোরিয়া স্টেইনেম’। হেইলব্রুন তাকে আখ্যা দিয়েছিলেন ‘নারী সৌন্দর্যের প্রতিমূর্তি এবং নারী বিপ্লবের সারসত্তা’ হিসেবে।

গ্লোরিয়া স্টেইনেমের মৃত্যু তাই কেবল একজন লেখক বা অধিকার কর্মীর বিদায় নয়, এটি যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় ঢেউয়ের নারীবাদী আন্দোলনের জীবন্ত ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি। তবে নারীর নিজের শরীর, জীবন, কাজ ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারের মতো যে প্রশ্নগুলো স্টেইনেম সামনে এনেছিলেন, সেগুলো এখনো বিশ্ব জুড়ে নারীবাদী আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়ে গেছে।

সূত্র: রয়টার্স, এপি

Ad
Ad
ad
ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

প্রতারণার শিকার— কম্বোডিয়া থেকে ফিরলেন ৩৮ বাংলাদেশি

ফেরত আসা কর্মীরা তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তার পাশাপাশি তাদের অভিযোগ যথাযথভাবে তদন্ত করে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

৪ ঘণ্টা আগে

ভালভে ত্রুটি, রূপপুর থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহের সময় আরও পেছাল

সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, ‘বিষয়টি না লুকিয়ে বলতে চাই— এই ভালভ কেন কাজ করছে না, তা খতিয়ে দেখতে রাশিয়া থেকে বিশেষজ্ঞ দল আসছে। যেখানে সমস্যা আছে, সেখানেই সমাধান হবে। প্রয়োজন হলে ২ নম্বর ইউনিটের ভালভ ১ নম্বর ইউনিটে প্রতিস্থাপন (রিপ্লেস) করব। অথবা তাদের সম্ভাব্য কম সময়ে সেটি ঠিক

৫ ঘণ্টা আগে

৪১ ব্যাংকের সিএসআরের টাকা ‘আত্মসাৎ’, শেখ হাসিনার নামে মামলা

দেশের ৪১টি ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টে’র নামে ২৭৬ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা ‘সংগ্রহ ও আত্মসাতে’র অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

৭ ঘণ্টা আগে

বিক্রমপুর-নেভি মুসলিম-রসের হাড়ির মিষ্টি তৈরি বেনামি প্রতিষ্ঠানে-নোংরা পরিবেশে

প্রতিষ্ঠানটি বিএসটিআইয়ের মান সনদ লাইসেন্স না নিয়েই বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি উৎপাদন, বিক্রি ও বাজারজাত করে প্রতারণা করছিল।

৭ ঘণ্টা আগে
Advertisement