
মো. কাফি খান

বিশ্ব রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাসে যুদ্ধের প্রধান উৎস ছিল ভূমি, ধর্ম, ক্ষমতা কিংবা মতাদর্শ। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে ধীরে ধীরে আরেকটি নতুন বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে— জলসম্পদের ভূরাজনীতি। দক্ষিণ এশিয়ায় এ বাস্তবতা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গা নদীকে ঘিরে। এই দুই নদী শুধু ভৌগোলিক প্রবাহ নয়, বরং কোটি মানুষের জীবন, কৃষি, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার প্রাণরেখা।
আজকের বিশ্বে জলযুদ্ধ আর কল্পনা নয়; এটি নীরব, ধীর কিন্তু গভীরভাবে বাস্তব হয়ে ওঠা এক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা।
গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ ও কৃষিনির্ভর অঞ্চলগুলোর একটি। বাংলাদেশের প্রায় সমগ্র কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা ও খাদ্য নিরাপত্তা এই নদীব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। গঙ্গা ভারতের উত্তর ও পূর্বাঞ্চল হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। ব্রহ্মপুত্র চীনের তিব্বত অঞ্চল থেকে শুরু হয়ে ভারত হয়ে বাংলাদেশে প্রবাহিত হয়। পরে এই দুই নদী মিলিত হয়ে বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপ গঠন করে।
এই নদীগুলোকে শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ বলা ভুল হবে, এগুলো আসলে একটি আন্তঃরাষ্ট্রীয় জীবনব্যবস্থা।
ব্রহ্মপুত্রের উৎস তিব্বতে, যা চীনের নিয়ন্ত্রণে। সাম্প্রতিক দশকে চীন সেখানে একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও বাঁধ নির্মাণ করেছে। চীন এগুলোকে উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে তুলে ধরলেও আঞ্চলিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পরিবর্তন। একইভাবে ভারতও গঙ্গা ও তার উপনদীগুলোর উপর বিভিন্ন বাঁধ, ব্যারাজ এবং পানি নিয়ন্ত্রণ কাঠামো নির্মাণ করেছে।
এর ফলে একটি জটিল বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। ‘আপস্ট্রিম’ তথা উজানের দেশ পানি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। ‘ডাউনস্ট্রিম’ তথা ভাটির দেশ সেই প্রবাহের ওপর নির্ভরশীল। তথ্য স্বচ্ছতা অনেক ক্ষেত্রে সীমিত। যৌথ নদী ব্যবস্থাপনাও দুর্বল বা অসম্পূর্ণ। ফলে পানি ধীরে ধীরে একটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য ভূরাজনৈতিক সম্পদে পরিণত হচ্ছে।
এই পুরো ব্যবস্থার সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ বাংলাদেশ। কারণ দেশের ৮০ শতাংশের বেশি নদীপ্রবাহ আন্তঃরাষ্ট্রীয় উৎস থেকে আসে। কৃষি উৎপাদন সম্পূর্ণভাবে মৌসুমি পানির ওপর নির্ভরশীল। নদীভাঙন ও লবণাক্ততা এরই মধ্যে বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রবাহ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো— কখন পানি বেশি আসবে, কখন কম আসবে এবং কীভাবে আসবে— এসব বিষয়ে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ না থাকা। এটি শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, বরং একটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ইস্যু।
দক্ষিণ এশিয়ার নদী ব্যবস্থায় এখন আরেকটি বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে— মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ধরন দ্রুত অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি থেকে ভয়াবহ বন্যা হচ্ছে। আবার শুষ্ক মৌসুমে পানি ঘাটতি কৃষিতে সংকট তৈরি করছে। একই সঙ্গে হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত গলছে এবং নদীর প্রবাহের অস্থিরতা বাড়ছে।
এ পরিবর্তনগুলো নদীর স্বাভাবিক ঋতুভিত্তিক ভারসাম্য নষ্ট করছে। ফলে বাঁধ ও জলাধার ব্যবস্থাপনাও আরও জটিল হয়ে উঠছে। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জলবায়ু পরিবর্তন ও ভূরাজনীতি একে অন্যকে আরও তীব্র করছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় পানিবণ্টন নিয়ে কিছু চুক্তি থাকলেও সেগুলোর কাঠামো অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল। অনেক চুক্তি সীমিত সময়ের জন্য। পূর্ণাঙ্গ তথ্য শেয়ারিং সেখানে অনুপস্থিত। পরিবর্তনশীল জলবায়ু বাস্তবতা বিবেচনায় অনেক কাঠামো পুরোনো হয়ে গেছে। আবার বহু ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক চাপের ওপর নির্ভরশীল।
বিশেষ করে গঙ্গা পানি চুক্তি এবং অন্যান্য উপনদী ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজনমূলক কাঠামোর অভাব রয়েছে। ফলে প্রতিটি সংকটের সময় কূটনৈতিক চাপ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
যদি এই প্রবণতা চলতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে কয়েক ধরনের বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। প্রথমত, প্রবাহ নিয়ন্ত্রণভিত্তিক অর্থনৈতিক চাপ। উজানের দেশ পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে কৃষি ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে। দ্বিতীয়ত, বন্যা ও খরার অপ্রত্যাশিত চক্র। হঠাৎ পানি ছাড় বা আটকানোর ফলে ভাটির দেশে চরম ক্ষতি হতে পারে। তৃতীয়ত, আঞ্চলিক কূটনৈতিক উত্তেজনা। পানি ইস্যু ধীরে ধীরে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক আলোচনার অংশ হয়ে উঠতে পারে।
তবে এই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ সংঘাতমুখী হতে হবে, এমন নয়। বরং এখানে সহযোগিতার বড় সুযোগও রয়েছে। যৌথ নদী ডেটা শেয়ারিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে অনিশ্চয়তা কমবে। রিয়েল-টাইম পানিপ্রবাহ তথ্য ভাগাভাগি করলে দুর্যোগ মোকাবিলা সহজ হবে। ট্রান্সবাউন্ডারি ওয়াটার কমিশনকে আরও কার্যকর করতে হবে। শুধু চুক্তি নয়, প্রযুক্তিনির্ভর স্থায়ী প্রতিষ্ঠানও প্রয়োজন।
একই সঙ্গে আঞ্চলিক জলবায়ু পূর্বাভাস সহযোগিতা জরুরি। হিমালয় ও বর্ষা অঞ্চলের যৌথ গবেষণা ছাড়া ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলা কঠিন হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘ব্লু ডিপ্লোম্যাসি’ বা পানি-কূটনীতি। পানিকে সংঘাতের উৎস নয়, বরং সহযোগিতার ভিত্তি হিসেবে দেখতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— শুধু ভাটির দেশ হিসেবে ‘ভিক্টিম’ হয়ে না থেকে বরং আঞ্চলিক জল-কূটনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। তথ্যভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। নদী গবেষণা ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে হবে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান একই সঙ্গে ঝুঁকি এবং কৌশলগত সুযোগ। ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গা শুধু নদী নয়, এগুলো দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার পরীক্ষাগার। এখানে কোনো একক দেশ একা বিজয়ী বা পরাজিত হতে পারে না। কারণ পানি সীমান্ত মানে না। এটি প্রবাহমান, আন্তঃসংযুক্ত এবং পারস্পরিক নির্ভরশীল।
ভবিষ্যতের প্রশ্ন তাই কে কতটা শক্তিশালী, সেটি নয়; বরং প্রশ্ন হলো— কে কতটা যৌথভাবে টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা তৈরি করতে পারে?
দক্ষিণ এশিয়া যদি এই প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে পানি একসময় বিভাজনের কারণ হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু যদি সঠিক কূটনীতি, বিজ্ঞান ও আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে এই নদীগুলোই হতে পারে একটি নতুন স্থিতিশীল দক্ষিণ এশিয়ার ভিত্তি।
লেখক: কলামিস্ট ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

বিশ্ব রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাসে যুদ্ধের প্রধান উৎস ছিল ভূমি, ধর্ম, ক্ষমতা কিংবা মতাদর্শ। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে ধীরে ধীরে আরেকটি নতুন বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে— জলসম্পদের ভূরাজনীতি। দক্ষিণ এশিয়ায় এ বাস্তবতা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গা নদীকে ঘিরে। এই দুই নদী শুধু ভৌগোলিক প্রবাহ নয়, বরং কোটি মানুষের জীবন, কৃষি, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার প্রাণরেখা।
আজকের বিশ্বে জলযুদ্ধ আর কল্পনা নয়; এটি নীরব, ধীর কিন্তু গভীরভাবে বাস্তব হয়ে ওঠা এক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা।
গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ ও কৃষিনির্ভর অঞ্চলগুলোর একটি। বাংলাদেশের প্রায় সমগ্র কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা ও খাদ্য নিরাপত্তা এই নদীব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। গঙ্গা ভারতের উত্তর ও পূর্বাঞ্চল হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। ব্রহ্মপুত্র চীনের তিব্বত অঞ্চল থেকে শুরু হয়ে ভারত হয়ে বাংলাদেশে প্রবাহিত হয়। পরে এই দুই নদী মিলিত হয়ে বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপ গঠন করে।
এই নদীগুলোকে শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ বলা ভুল হবে, এগুলো আসলে একটি আন্তঃরাষ্ট্রীয় জীবনব্যবস্থা।
ব্রহ্মপুত্রের উৎস তিব্বতে, যা চীনের নিয়ন্ত্রণে। সাম্প্রতিক দশকে চীন সেখানে একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও বাঁধ নির্মাণ করেছে। চীন এগুলোকে উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে তুলে ধরলেও আঞ্চলিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পরিবর্তন। একইভাবে ভারতও গঙ্গা ও তার উপনদীগুলোর উপর বিভিন্ন বাঁধ, ব্যারাজ এবং পানি নিয়ন্ত্রণ কাঠামো নির্মাণ করেছে।
এর ফলে একটি জটিল বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। ‘আপস্ট্রিম’ তথা উজানের দেশ পানি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। ‘ডাউনস্ট্রিম’ তথা ভাটির দেশ সেই প্রবাহের ওপর নির্ভরশীল। তথ্য স্বচ্ছতা অনেক ক্ষেত্রে সীমিত। যৌথ নদী ব্যবস্থাপনাও দুর্বল বা অসম্পূর্ণ। ফলে পানি ধীরে ধীরে একটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য ভূরাজনৈতিক সম্পদে পরিণত হচ্ছে।
এই পুরো ব্যবস্থার সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ বাংলাদেশ। কারণ দেশের ৮০ শতাংশের বেশি নদীপ্রবাহ আন্তঃরাষ্ট্রীয় উৎস থেকে আসে। কৃষি উৎপাদন সম্পূর্ণভাবে মৌসুমি পানির ওপর নির্ভরশীল। নদীভাঙন ও লবণাক্ততা এরই মধ্যে বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রবাহ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো— কখন পানি বেশি আসবে, কখন কম আসবে এবং কীভাবে আসবে— এসব বিষয়ে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ না থাকা। এটি শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, বরং একটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ইস্যু।
দক্ষিণ এশিয়ার নদী ব্যবস্থায় এখন আরেকটি বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে— মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ধরন দ্রুত অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি থেকে ভয়াবহ বন্যা হচ্ছে। আবার শুষ্ক মৌসুমে পানি ঘাটতি কৃষিতে সংকট তৈরি করছে। একই সঙ্গে হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত গলছে এবং নদীর প্রবাহের অস্থিরতা বাড়ছে।
এ পরিবর্তনগুলো নদীর স্বাভাবিক ঋতুভিত্তিক ভারসাম্য নষ্ট করছে। ফলে বাঁধ ও জলাধার ব্যবস্থাপনাও আরও জটিল হয়ে উঠছে। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জলবায়ু পরিবর্তন ও ভূরাজনীতি একে অন্যকে আরও তীব্র করছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় পানিবণ্টন নিয়ে কিছু চুক্তি থাকলেও সেগুলোর কাঠামো অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল। অনেক চুক্তি সীমিত সময়ের জন্য। পূর্ণাঙ্গ তথ্য শেয়ারিং সেখানে অনুপস্থিত। পরিবর্তনশীল জলবায়ু বাস্তবতা বিবেচনায় অনেক কাঠামো পুরোনো হয়ে গেছে। আবার বহু ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক চাপের ওপর নির্ভরশীল।
বিশেষ করে গঙ্গা পানি চুক্তি এবং অন্যান্য উপনদী ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজনমূলক কাঠামোর অভাব রয়েছে। ফলে প্রতিটি সংকটের সময় কূটনৈতিক চাপ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
যদি এই প্রবণতা চলতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে কয়েক ধরনের বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। প্রথমত, প্রবাহ নিয়ন্ত্রণভিত্তিক অর্থনৈতিক চাপ। উজানের দেশ পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে কৃষি ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে। দ্বিতীয়ত, বন্যা ও খরার অপ্রত্যাশিত চক্র। হঠাৎ পানি ছাড় বা আটকানোর ফলে ভাটির দেশে চরম ক্ষতি হতে পারে। তৃতীয়ত, আঞ্চলিক কূটনৈতিক উত্তেজনা। পানি ইস্যু ধীরে ধীরে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক আলোচনার অংশ হয়ে উঠতে পারে।
তবে এই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ সংঘাতমুখী হতে হবে, এমন নয়। বরং এখানে সহযোগিতার বড় সুযোগও রয়েছে। যৌথ নদী ডেটা শেয়ারিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে অনিশ্চয়তা কমবে। রিয়েল-টাইম পানিপ্রবাহ তথ্য ভাগাভাগি করলে দুর্যোগ মোকাবিলা সহজ হবে। ট্রান্সবাউন্ডারি ওয়াটার কমিশনকে আরও কার্যকর করতে হবে। শুধু চুক্তি নয়, প্রযুক্তিনির্ভর স্থায়ী প্রতিষ্ঠানও প্রয়োজন।
একই সঙ্গে আঞ্চলিক জলবায়ু পূর্বাভাস সহযোগিতা জরুরি। হিমালয় ও বর্ষা অঞ্চলের যৌথ গবেষণা ছাড়া ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলা কঠিন হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘ব্লু ডিপ্লোম্যাসি’ বা পানি-কূটনীতি। পানিকে সংঘাতের উৎস নয়, বরং সহযোগিতার ভিত্তি হিসেবে দেখতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— শুধু ভাটির দেশ হিসেবে ‘ভিক্টিম’ হয়ে না থেকে বরং আঞ্চলিক জল-কূটনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। তথ্যভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। নদী গবেষণা ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে হবে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান একই সঙ্গে ঝুঁকি এবং কৌশলগত সুযোগ। ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গা শুধু নদী নয়, এগুলো দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার পরীক্ষাগার। এখানে কোনো একক দেশ একা বিজয়ী বা পরাজিত হতে পারে না। কারণ পানি সীমান্ত মানে না। এটি প্রবাহমান, আন্তঃসংযুক্ত এবং পারস্পরিক নির্ভরশীল।
ভবিষ্যতের প্রশ্ন তাই কে কতটা শক্তিশালী, সেটি নয়; বরং প্রশ্ন হলো— কে কতটা যৌথভাবে টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা তৈরি করতে পারে?
দক্ষিণ এশিয়া যদি এই প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে পানি একসময় বিভাজনের কারণ হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু যদি সঠিক কূটনীতি, বিজ্ঞান ও আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে এই নদীগুলোই হতে পারে একটি নতুন স্থিতিশীল দক্ষিণ এশিয়ার ভিত্তি।
লেখক: কলামিস্ট ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

ফিফা বিশ্বকাপ, অলিম্পিক গেমসের মতো, প্রায়শই ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও মানবিক সাফল্যের উৎসব হিসাবে উপস্থাপিত হয়। কিন্তু জৌলুস আর আড়ম্বরের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও তাৎপর্যপূর্ণ এক বাস্তবতা: মেগা-ক্রীড়া ইভেন্টগুলো আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
৯ দিন আগে
প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতি মানুষের জীবনকে সহজ, দ্রুত এবং বিশ্বসংযুক্ত করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর এই বিশ্ব নতুন কিছু সামাজিক, মানসিক ও শিক্ষাগত সংকটও তৈরি করেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্ফোরণমূলক বিস্তার শিশু, কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের বিকাশ, শিক্ষাগ্রহণ, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা এ
১১ দিন আগে
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরকে ঘিরে বেইজিংয়ের কূটনৈতিক তৎপরতা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করছে যে বাংলাদেশকে এখন আর কেবল একটি উন্নয়ন সহযোগী দেশ হিসেবে দেখা হচ্ছে না, বরং দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার উদীয়মান ভূরাজনৈতিক সমীকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
১১ দিন আগে
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আসসালামু আলাইকুম। এই চিঠি আপনার কাছে পৌঁছাবে কি না, জানি না। কিন্তু আমি জানি, বাংলাদেশের মাটি, নদী, মাঠ, জনপদ, শহর, বন্দর, শ্রমিক কলোনি, চরাঞ্চল, পাহাড়, চা বাগান এবং বস্তির মধ্যে যে দীর্ঘশ্বাস প্রতিদিন ঘুরে বেড়ায়, তার ভাষা একদিন না একদিন রাষ্ট্রের দরজায় কড়া নাড়বেই।
১২ দিন আগে