হুমায়ূন আহমেদ—একটি প্রজন্মের অনুভূতি

বিল্লাল বিন কাশেম

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু লেখকের আবির্ভাব ঘটেছে, যারা কেবল বই লেখেন না— একটি প্রজন্মের অনুভূতি, স্বপ্ন, ভালোবাসা, বিষাদ ও জীবনের ভাষা নির্মাণ করেন। হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন তেমনই এক বিরল প্রতিভা। তিনি ছিলেন একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা, গীতিকার, শিক্ষক ও সর্বোপরি মানুষের মনের ভাষা বুঝতে পারা এক অসাধারণ শিল্পী।

আজ তার মহাপ্রয়াণ দিবসে আমরা কেবল একজন লেখককে স্মরণ করছি না, আমরা স্মরণ করছি এমন এক আলোকবর্তিকাকে, যিনি বাংলা সাহিত্যকে সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন। তিনি প্রমাণ করেছিলেন— সহজ ভাষাও গভীর হতে পারে, নীরবতাও অনেক কথা বলতে পারে, আর ছোট ছোট সুখ-দুঃখও সাহিত্যের মহৎ বিষয় হতে পারে।

বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা জীবনানন্দ দাশের মতো দিকপালদের উত্তরসূরি হিসেবে হুমায়ূন আহমেদ এক সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারার সাহিত্য নির্মাণ করেন। তার লেখার ভাষা ছিল সহজ, অথচ হৃদয়স্পর্শী। পাঠককে মুগ্ধ করার জন্য তিনি কখনো কৃত্রিম শব্দচয়নের আশ্রয় নেননি। বরং জীবনের খুব সাধারণ ঘটনাকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন, যা পাঠকের নিজের জীবনের অংশ বলে মনে হয়।

হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যজগতের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার চরিত্র নির্মাণ। মিসির আলী, হিমু, শুভ্র, বাকের ভাই, ‘আজ রবিবার’-এর পরিবারের সদস্য কিংবা অসংখ্য উপন্যাসের চরিত্র— সবাই যেন বাস্তব জীবনের মানুষ। তারা আমাদের পাশে হাঁটেন, আমাদের সঙ্গে কথা বলেন, আমাদের হাসান, কাঁদান এবং ভাবতে শেখান। একজন লেখকের সবচেয়ে বড় সাফল্য তখনই আসে, যখন তার চরিত্রগুলো বইয়ের পাতা ছাড়িয়ে মানুষের জীবনে প্রবেশ করে। হুমায়ূন আহমেদ সেই বিরল সাফল্যের অধিকারী।

বাংলাদেশে বইমেলাকে গণমানুষের উৎসবে পরিণত করার পেছনেও তার অবদান অনস্বীকার্য। একসময় বইমেলায় পাঠকের দীর্ঘ সারি মানেই ছিল হুমায়ূন আহমেদের নতুন বই। অনেক তরুণ-তরুণী তার বই পড়ার মধ্য দিয়েই সাহিত্যপাঠের জগতে প্রবেশ করেছেন। যারা আগে বই পড়তেন না, তারাও হুমায়ূন আহমেদের বই হাতে নিয়ে সাহিত্যকে ভালোবাসতে শিখেছেন। একজন লেখকের জন্য এর চেয়ে বড় অর্জন আর কী হতে পারে?

তার রচনায় মধ্যবিত্ত জীবনের সুখ-দুঃখ, প্রেম, পারিবারিক সম্পর্ক, মানবিক টানাপোড়েন, সামাজিক সংকট এবং আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে উঠে এসেছে। তিনি কখনো জীবনকে অলংকারে ঢেকে দেখাননি; বরং জীবনের সরল সত্যগুলোকে গভীর সৌন্দর্যে প্রকাশ করেছেন। তার লেখায় যেমন হাসি আছে, তেমনি কান্না আছে; যেমন প্রেম আছে, তেমনি বিচ্ছেদও আছে; যেমন রহস্য আছে, তেমনি রয়েছে দর্শনের সূক্ষ্ম ইঙ্গিত।

নাট্যকার হিসেবেও হুমায়ূন আহমেদের অবদান অসাধারণ। তার রচিত ধারাবাহিক নাটকগুলো একসময় পুরো দেশকে টেলিভিশনের সামনে বসিয়ে রাখত। ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘আজ রবিবার’, ‘অয়োময়’, ‘নক্ষত্রের রাত’— এসব নাটক কেবল বিনোদনের মাধ্যম ছিল না, এগুলো সমাজ-পরিবার ও মানুষের মনস্তত্ত্বকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ করে দিয়েছিল। তার নাটকের সংলাপ আজও মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হয়।

চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবেও তিনি নিজস্ব এক ভাষা তৈরি করেছিলেন। তার চলচ্চিত্রে বাংলাদেশের প্রকৃতি, গ্রাম, মানুষ এবং সংস্কৃতি জীবন্ত হয়ে উঠেছে। বাণিজ্যিক সাফল্যের পাশাপাশি তিনি শিল্পমানও বজায় রেখেছিলেন। তার চলচ্চিত্রে যেমন বিনোদন ছিল, তেমনি ছিল চিন্তার খোরাক।

হুমায়ূন আহমেদের আরেকটি বড় অবদান হলো বিজ্ঞানমনস্কতা ও কৌতূহলকে জনপ্রিয় করে তোলা। তিনি নিজে একজন রসায়নের অধ্যাপক ছিলেন। তাই তার লেখায় যুক্তিবোধ, বিজ্ঞানচেতনা ও রহস্য অনুসন্ধানের প্রবণতা স্বাভাবিকভাবেই এসেছে। বিশেষ করে মিসির আলী চরিত্রের মাধ্যমে তিনি পাঠকদের শিখিয়েছেন— অন্ধবিশ্বাস নয়, যুক্তি দিয়ে সত্যকে অনুসন্ধান করতে হয়।

একই সঙ্গে তিনি ধর্মীয় অনুভূতি, মানবিক মূল্যবোধ এবং আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানকেও সম্মানের সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন। তার অনেক লেখায় মানুষের আত্মিক জিজ্ঞাসা, স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস এবং জীবনের গভীর অর্থ অনুসন্ধানের প্রচেষ্টা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই ভারসাম্যই তাকে আরও অনন্য করেছে।

হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্ট নুহাশপল্লীও তার সৃজনশীলতার এক জীবন্ত প্রতীক। এটি শুধু একটি ব্যক্তিগত আবাস নয়; এটি প্রকৃতি, শিল্প, সাহিত্য ও স্বপ্নের মিলনস্থল। সেখানে গাছ, পুকুর, মাটির পথ এবং নিসর্গ যেন তার লেখারই এক সম্প্রসারিত রূপ।

২০১২ সালের ১৯ জুলাই তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। কিন্তু একজন স্রষ্টার মৃত্যু কি সত্যিই হয়? যার লেখা প্রতিদিন নতুন পাঠক পড়ে, যার সংলাপ মানুষ উদ্ধৃত করে, যার চরিত্র নিয়ে নতুন প্রজন্ম আলোচনা করে, তাকে কি মৃত বলা যায়? প্রকৃত শিল্পীর জীবন তার সৃষ্টির মধ্যেই অব্যাহত থাকে। সেই অর্থে হুমায়ূন আহমেদ আজও আমাদের মাঝে জীবন্ত।

বর্তমান সময়ে প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ডিজিটাল বিনোদনের যুগে বই পড়ার অভ্যাস কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে। তবু আশার কথা হলো, নতুন প্রজন্ম এখনো হুমায়ূন আহমেদের বই খুঁজে নেয়। কারণ, মানুষের হৃদয়ের গল্প কখনো পুরোনো হয় না। প্রযুক্তি বদলায়, সময় বদলায়; কিন্তু মানুষের অনুভূতি বদলায় না। আর সেই অনুভূতিরই শিল্পী ছিলেন হুমায়ূন আহমেদ।

তার সাহিত্য আমাদের শেখায়— জীবনকে ভালোবাসতে, ছোট ছোট আনন্দকে মূল্য দিতে, মানুষকে বুঝতে এবং সম্পর্ককে সম্মান করতে। তিনি দেখিয়েছেন, অসাধারণ গল্প বলার জন্য অসাধারণ ঘটনা নয়; দরকার অসাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি সাধারণ মানুষের জীবন থেকেই অসাধারণ সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন।

আজকের দিনে আমাদের প্রয়োজন তার সাহিত্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে আরও সুসংগঠিতভাবে পৌঁছে দেওয়া। বিদ্যালয়, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, গণগ্রন্থাগার ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তার সাহিত্য নিয়ে নিয়মিত পাঠচক্র, আলোচনা ও গবেষণার আয়োজন করা উচিত। তার নাটক ও চলচ্চিত্র সংরক্ষণ এবং একটি ডিজিটাল আর্কাইভ গড়ে তোলাও সময়ের দাবি। একই সঙ্গে তার সাহিত্য বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদের মাধ্যমে বিশ্বপাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

একটি জাতি তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মরণ করে কেবল আনুষ্ঠানিকতার জন্য নয়; তাদের চিন্তা, আদর্শ ও সৃষ্টিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। হুমায়ূন আহমেদ আমাদের জাতীয় সম্পদ। তিনি কেবল একজন জনপ্রিয় লেখক নন; তিনি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়।

মহাপ্রয়াণ দিবসে তার প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা জানাই। তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি। একই সঙ্গে প্রতিজ্ঞা করি— তার সৃষ্টি, তার মানবিকতা ও তার সাহিত্যচর্চার উত্তরাধিকার আমরা আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেবো।

মানুষের জীবন সীমিত, কিন্তু মহান সৃষ্টির জীবন অসীম। সেই কারণেই বলা যায়— হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু তার সৃষ্টি অমর। যতদিন বাংলা ভাষা থাকবে, যতদিন মানুষ গল্প পড়ে, হাসবে, কাঁদবে, স্বপ্ন দেখবে, ততদিন হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন পাঠকের হৃদয়ে। বাংলা সাহিত্যের এই বরপুত্রের মৃত্যু নেই; তিনি তার অমর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে চিরকাল আমাদের আপনজন হয়ে থাকবেন।

লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক

Ad
Ad
ad
ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

ভয়, পতন আর উৎসব: আমার দেখা ৫ আগস্ট

৫ আগস্ট রাতের সেই এক ধরনের ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ পরিস্থিতি একটা চাপা শঙ্কা তৈরি করেছিল, সন্দেহ নেই। কিন্তু তার পাশেই যা দেখেছিলাম— দেশের ইতিহাসে স্বৈরাচার পতনের পর সাধারণ মানুষের মুখে ফুটে ওঠা সেই অবর্ণনীয় আনন্দ— তা ছিল সম্পূর্ণ খাঁটি, সম্পূর্ণ অকৃত্রিম।

৪ দিন আগে

কী দিয়েছে ৫ আগস্ট, কী দিতে পারেনি?

আজ ৫ আগস্ট ২০২৬। সেই দুপুরের ঠিক দুই বছর পর। যে মিছিল সেদিন শাহবাগ, শহিদ মিনার আর যমুনার সামনের রাস্তায় থেমে গিয়েছিল আনন্দ-উল্লাসে, তার পায়ের শব্দ আজও যেন মিলিয়ে যায়নি। বদলেছে সরকার, বদলেছে সংসদ, বদলেছে রাষ্ট্রের নথিপত্র। কিন্তু সেই দিনের প্রশ্নগুলো এখনো বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে।

৪ দিন আগে

৫ আগস্ট: ইতিহাস নির্মাণের গণঅভ্যুত্থান দিবস

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দিন ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টানা কয়েক সপ্তাহের ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ, রক্তক্ষয় এবং দেশ জুড়ে অশান্তির পর ক্ষমতা ত্যাগ করে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। তার পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ক্ষমতার মসনদে চেপে বসা ১৬ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে।

৪ দিন আগে

চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন সমীকরণ

বাংলাদেশ আজ আর সাহায্যনির্ভর রাষ্ট্র নয়; বরং উদীয়মান একটি আঞ্চলিক অর্থনীতি। সেই বাস্তবতার আলোকে কূটনীতিও হতে হবে আত্মবিশ্বাসী, ভারসাম্যপূর্ণ এবং দূরদর্শী। বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রেখে, কিন্তু কারও প্রভাববলয়ে আবদ্ধ না হয়ে, বাংলাদেশ তার সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা অটু

৫ দিন আগে