বিকৃত ইতিহাস, অনুর্বর জাতি, অসুস্থ মস্তিষ্ক

এম ডি মাসুদ খান

ইতিহাস কেবল অতীতের ঘটনাবলির ধারাবিবরণী নয়; এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, নৈতিক কাঠামো ও ভবিষ্যৎ অভিযাত্রার দিকনির্দেশনা। যে জাতি তার ইতিহাসকে সঠিকভাবে জানে ও ধারণ করে, সেই জাতি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে আগামীর পথে এগিয়ে যেতে পারে।

বিপরীতভাবে, ইতিহাস যখন বিকৃত হয়— ইচ্ছাকৃতভাবে কিংবা অবহেলার কারণে— তখন একটি জাতি ধীরে ধীরে তার শেকড় হারাতে শুরু করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ইতিহাস বিকৃতির বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই একটি গভীর ও বহুমাত্রিক সংকট হিসেবে বিদ্যমান।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাসের অংশ হিসেবে ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ— এ ঘটনাগুলো শুধু জাতীয় গৌরবের স্মারক নয়, বরং রাষ্ট্র গঠনের নৈতিক ভিত্তি। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো— বিভিন্ন রাজনৈতিক শাসনামলে ক্ষমতার স্বার্থ, মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব ও দলীয় বয়ানের কারণে এসব ঐতিহাসিক ঘটনার ব্যাখ্যা ও উপস্থাপনা বারবার পরিবর্তিত হয়েছে। ফলস্বরূপ, ইতিহাস এখানে একাডেমিক সত্যের চেয়ে অনেক সময় রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

এই বিকৃতির সবচেয়ে বড় শিকার নতুন প্রজন্ম। পাঠ্যপুস্তক, গণমাধ্যম ও জনপরিসরে পরস্পরবিরোধী বয়ান তাদের সামনে একটি অস্পষ্ট ও বিভ্রান্তিকর অতীত উপস্থাপন করে। তারা জানতে পারে না—কারা প্রকৃত নেতৃত্ব দিয়েছিল, কোন আদর্শে রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল, কিংবা কোন মূল্যবোধের ভিত্তিতে আত্মত্যাগ করা হয়েছিল। ইতিহাসের এই অস্পষ্টতা তরুণ সমাজকে শেকড়হীন করে তোলে, যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় ঐক্য ও সামাজিক সংহতিকে দুর্বল করে।

যখন একটি জাতি সঠিক ইতিহাসচর্চা থেকে বিচ্যুত হয়, তখন সে জাতি কেবল তথ্যগতভাবে নয়, মানসিক ও সাংস্কৃতিকভাবেও অনুর্বর হয়ে পড়ে। এখানে ‘অনুর্বরতা’ বলতে বোঝানো হচ্ছে চিন্তার দৈন্য, নৈতিক দ্বিধা ও সৃজনশীলতার সংকটকে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিতে পারলে একটি সমাজ ভুলের পুনরাবৃত্তি করে, সহিষ্ণুতা হারায় এবং মতভিন্নতাকে শত্রুতা হিসেবে দেখতে শুরু করে। এর ফলে গণতান্ত্রিক চর্চা দুর্বল হয় এবং সমাজ ক্রমশ মেরুকরণের দিকে ধাবিত হয়।

আরও উদ্বেগজনক হলো— বিকৃত ইতিহাসের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়ে একটি জাতির মানসিক গঠনে। ভুল তথ্য ও অসম্পূর্ণ বয়ানের ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠা প্রজন্ম সমালোচনামূলক চিন্তায় দুর্বল হয়ে পড়ে। তারা সহজেই গুজব, উগ্র মতাদর্শ কিংবা আবেগনির্ভর প্রচারণার শিকার হয়। এ থেকেই জন্ম নেয় একটি ‘অসুস্থ মস্তিষ্কে’র সামাজিক কাঠামো, যেখানে যুক্তি ও মানবিকতা ক্রমশ জায়গা হারায়, আর সংকীর্ণতা ও প্রতিহিংসা শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো— বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়কে বৈধতা দিতে এবং ক্ষমতার অবস্থান সুদৃঢ় করতে ইতিহাসকে সচেতনভাবে ব্যবহার করে চলেছে। কেউ ইতিহাসের নির্দিষ্ট অংশকে অতিরঞ্জিত করে তুলে ধরে, কেউ আবার অস্বস্তিকর অধ্যায়গুলো আড়াল বা অস্বীকার করার চেষ্টা করে।

এর ফলে ইতিহাস আর জাতির সামষ্টিক স্মৃতি হিসেবে বিবেচিত না হয়ে দলীয় সাফল্য, ব্যর্থতা কিংবা প্রতিপক্ষকে হেয় করার উপকরণে পরিণত হয়। এ প্রবণতা ইতিহাসকে নিরপেক্ষ মূল্যায়নের সুযোগ সংকুচিত করে এবং সমাজে বিভাজনকে আরও গভীর করে তোলে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ইতিহাস বিকৃতি তাই কেবল একটি শিক্ষাগত সমস্যা নয়, এটি একটি গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ভাষা আন্দোলনের আত্মত্যাগ এবং বাঙালির অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক ঐতিহ্য— এসবকে সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও উপস্থাপন করা রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়ের দায়িত্ব। ইতিহাসকে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির ঊর্ধ্বে তুলে এনে গবেষণা, নথি সংরক্ষণ এবং মুক্ত বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মাধ্যমে সত্যনিষ্ঠ ইতিহাস প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।

শিক্ষাব্যবস্থায় নিরপেক্ষ, প্রমাণভিত্তিক ও বহুমাত্রিক ইতিহাসচর্চা নিশ্চিত করতে হবে, যেন শিক্ষার্থীরা কেবল ঘটনা মুখস্থ না করে, বরং ইতিহাস থেকে মূল্যবোধ ও শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। একই সঙ্গে গণমাধ্যম, গবেষক ও নাগরিক সমাজকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে, যেন ইতিহাস আর বিকৃত বয়ানের শিকার না হয়।

অতএব, বিকৃত ইতিহাসের প্রভাব থেকে জাতিকে মুক্ত করা নিছক একাডেমিক প্রয়াস নয়, এটি একটি নৈতিক ও নাগরিক দায়িত্ব। সঠিক ইতিহাসের আলোকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তুলতে পারলেই বাংলাদেশ একটি সৃজনশীল, শক্তিশালী ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন জাতি হিসেবে বৈশ্বিক পরিসরে তার অবস্থান সুদৃঢ় করতে পারবে। ইতিহাসকে সত্যের ভিত্তিতে ফিরিয়ে আনাই হতে পারে সেই পথচলার প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

লেখক: কলামিস্ট ও ব‍্যবসায়ী

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

শুধু দাবিদাওয়ার আন্দোলন নয়, রাস্তায় নেমে আসা সাধারণ মানুষের গল্প

২০ জুলাইয়ের সেই দিন এবং এরপর পুলিশি দমন-পীড়ন প্রত্যক্ষ করার পরও মানুষ যে আবার যন্তর মন্তরে ফিরে এসেছে, তা সম্ভব হতো না, যদি এমন এক শ্রেণির মানুষ এতে যুক্ত না হতো, যারা এতদিন সংগঠিত রাজনীতির বাইরে ছিল। তারা এতদিন শুধু পর্যবেক্ষক ছিল। কিন্তু এবার তারা সিদ্ধান্ত নেয়, আর নয়। নিরাপত্তা কর্মকর্তারাও স্বী

৭ দিন আগে

পোল্ট্রি খামার: লোকসানে প্রান্তিক খামারিরা

বিশ্ব জুড়ে মানুষের খাদ্যতালিকায় প্রোটিনের অন্যতম প্রধান উৎস এখন পোল্ট্রি বা ফার্মের মুরগির মাংস। জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এই মাংসের চাহিদাও দিন দিন বাড়ছে। তবে এই প্রতিযোগিতায় বিশ্ববাজারে এখনো বেশ পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) তথ্যমতে, বি

৭ দিন আগে

ককরোচ আন্দোলনে উত্তাল দিল্লি, ভারতের বুকেও কি ‘জুলাইয়ের আবহ’?

দুই দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, আন্দোলনের কারণ ও প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে আন্দোলনের সূচনা, তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং পরে রাজপথে বড় আকারের বিক্ষোভের কারণে ভারতের চলমান ঘটনাপ্রবাহকে ঘিরে অনেকেই ‘জুলাইয়ের আবহ’-এর সঙ্গে তুলনা করছেন।

৯ দিন আগে

হুমায়ূন আহমেদ—একটি প্রজন্মের অনুভূতি

আজ তার মহাপ্রয়াণ দিবসে আমরা কেবল একজন লেখককে স্মরণ করছি না, আমরা স্মরণ করছি এমন এক আলোকবর্তিকাকে, যিনি বাংলা সাহিত্যকে সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন। তিনি প্রমাণ করেছিলেন— সহজ ভাষাও গভীর হতে পারে, নীরবতাও অনেক কথা বলতে পারে, আর ছোট ছোট সুখ-দুঃখও সাহিত্যের মহৎ বিষয় হতে পারে।

১১ দিন আগে