মেধা ও রাজনীতি প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, পরিপূরক

মো. হাসান আলী রেজা

বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় ‘ভালো ছাত্র’ বলতে আমরা এমন এক শ্রেণিকে বুঝি, যারা পরীক্ষায় সফল, প্রতিযোগিতায় এগিয়ে এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারে সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এই মেধাবী শ্রেণি ও রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দুর মধ্যে একটি দৃশ্যমান দূরত্ব রয়েছে।

রাষ্ট্র পরিচালনা করেন রাজনীতিবিদরা; তাদের সহায়তা করে প্রশাসন, বিশেষ করে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস; আর নীতিগত সুবিধা অনেকাংশে পায় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। এই ত্রিমুখী কাঠামোর ভেতরে মেধাবী ছাত্রদের অবস্থান কোথায়— এই প্রশ্নটি আজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

মেধার রুটম্যাপ: একটি পূর্বনির্ধারিত পথ

বাংলাদেশে মেধাবীদের জন্য একটি অলিখিত ক্যারিয়ার সিঁড়ি রয়েছে—

  • মেডিকেল → ডাক্তার
  • ইঞ্জিনিয়ারিং → প্রকৌশলী
  • বিশ্ববিদ্যালয় → শিক্ষক/গবেষক
  • বিদেশে উচ্চশিক্ষা → স্থায়ী বসবাস
  • দেশে থাকলে → বিসিএস / করপোরেট চাকরি
  • ব্যবসা → পরবর্তী ধাপ
  • রাজনীতি → সর্বশেষ বা অনুপস্থিত

উদাহরণ ১:

ঢাকা মেডিকেল বা বুয়েট থেকে পাস করা অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা কানাডায় উচ্চশিক্ষা নিয়ে সেখানেই স্থায়ী হচ্ছেন।

➡ ফলাফল: দেশের স্বাস্থ্য বা প্রযুক্তি নীতিনির্ধারণে তাদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা নেই।

উদাহরণ ২:

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীরা বিসিএস দিয়ে প্রশাসনে যোগ দেন।

➡ তারা নীতি তৈরি করেন না, বরং বাস্তবায়ন করেন।

ক্ষমতার বাস্তব কাঠামো

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো তিনটি প্রধান শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে—

(ক) রাজনীতিবিদ

নীতিনির্ধারণ করেন, আইন প্রণয়ন করেন, রাষ্ট্রের দিকনির্দেশনা ঠিক করেন।

(খ) প্রশাসন (বিসিএস)

নীতিগুলো বাস্তবায়ন করে, মাঠপর্যায়ে কাজ চালায়।

(গ) ব্যবসায়ী গোষ্ঠী

নীতির অর্থনৈতিক সুযোগ গ্রহণ করে, প্রভাব বিস্তার করে।

উদাহরণ ৩:

একটি বড় অবকাঠামো প্রকল্প (যেমন সেতু বা বিদ্যুৎকেন্দ্র):

  • সিদ্ধান্ত → রাজনৈতিক
  • বাস্তবায়ন → প্রশাসনিক
  • লাভ/কন্ট্রাক্ট → ব্যবসায়িক

➡ এখানে একজন মেধাবী প্রকৌশলী হয়তো কাজ করছে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না।

ব্যতিক্রমী মেধাবী রাজনীতিবিদ

বাংলাদেশে এমন কিছু ব্যক্তি আছেন যারা প্রমাণ করেছেন যে মেধা ও রাজনীতি একসঙ্গে চলতে পারে। তাদের মধ্যে রয়েছেন—

ড. মঈন খান, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, সালাউদ্দিন আহমেদ, শিরিন শারমীন চৌধুরী।

উদাহরণ ৪:

ড. মঈন খান একজন উচ্চশিক্ষিত অর্থনীতিবিদ হয়েও সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন।

➡ কিন্তু তার মতো ব্যক্তির সংখ্যা খুবই সীমিত।

বিশ্লেষণ: এই উদাহরণগুলো দেখায় যে, সম্ভাবনা আছে, কিন্তু সিস্টেম এটিকে নিয়মে পরিণত করতে পারেনি।

ব্রেইন ড্রেইন: রাষ্ট্রের নীরব ক্ষতি

উদাহরণ ৫:

এমআইটি, অক্সফোর্ড, হার্ভার্ডে পড়তে যাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বড় অংশ বিদেশে থেকে যায়। তারা গবেষণা, প্রযুক্তি ও নীতিতে অবদান রাখেন— কিন্তু অন্য দেশের জন্য।

➡ ফলাফল:

  • দেশ হারায় সম্ভাব্য নীতিনির্ধারক।
  • গবেষণাভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ দুর্বল হয়।

তুলনামূলক বিশ্লেষণ: বাংলাদেশ বনাম উন্নত রাষ্ট্র

উন্নত দেশগুলোতে শীর্ষ শিক্ষার্থীরা সরাসরি রাজনীতিতে আসে।

  • ‘থিংক ট্যাংক’ নীতি নির্ধারণে সক্রিয়
  • গবেষণা → নীতি → বাস্তবায়ন (একই চক্র)

আর বাংলাদেশে গবেষণা, প্রশাসন, রাজনীতি— তিনটি আলাদা সেক্টর

  • সমন্বয়ের অভাব।

উদাহরণ ৬:

যুক্তরাষ্ট্রে একজন হার্ভার্ড গ্র্যাজুয়েট সহজেই পলিসি অ্যাডভাইজার বা রাজনীতিবিদ হতে পারে। বাংলাদেশে একই ছাত্র বিসিএস বা করপোরেট চাকরিতে যায়।

সামাজিক ও মানসিক কারণ

(ক) নিরাপত্তা বনাম ঝুঁকি

  • ডাক্তার/বিসিএস→ স্থিতিশীল
  • রাজনীতি → অনিশ্চিত

(খ) পারিবারিক চাপ

  • ‘ভালো চাকরি আগে’— এই ধারণা মেধাবীদের রাজনীতি থেকে দূরে রাখে।

উদাহরণ ৭:

একজন মেধাবী ছাত্র যদি বলে ‘আমি রাজনীতিতে যাব’, পরিবার সাধারণত নিরুৎসাহিত করে।

এই ঘূর্ণিচক্রের ফলাফল

  • নীতিনির্ধারণে গবেষণার ঘাটতি;
  • দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় দুর্বলতা;
  • উদ্ভাবনী নেতৃত্বের অভাব;
  • মেধা ও ক্ষমতার মধ্যে দূরত্ব বৃদ্ধি।

করণীয়: একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি

  • (১) রাজনীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক করা

রাজনীতি যেন একটি সম্মানজনক, দক্ষতা-নির্ভর পেশা হয়।

  • (২) প্রবাসী মেধা ফিরিয়ে আনা

নীতি নির্ধারণে অন্তর্ভুক্তি

গবেষণা সংযোগ তৈরি

  • (৩) বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক নেতৃত্ব গড়ে তোলা; সহিংসতা নয়, পলিসি-ভিত্তিক ছাত্ররাজনীতি
  • (৪) থিংক ট্যাংক ও গবেষণা শক্তিশালী করা

উদাহরণ ৮:

বাংলাদেশে যদি শক্তিশালী নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে, তাহলে মেধাবীরা রাজনীতিতে যুক্ত হতে উৎসাহিত হবে।

পরিশেষে, বাংলাদেশে সমস্যা মেধার অভাব নয়, সমস্যা মেধার সঠিক ব্যবহার ও অবস্থান নির্ধারণে। বর্তমানে একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য কাজ করছে। যারা সবচেয়ে যোগ্য, তারা সিদ্ধান্ত নেন না; আর যারা সিদ্ধান্ত নেন, তারা সবসময় সেই মেধার পূর্ণ সহায়তা পান না।

এই দূরত্ব কমাতে হলে প্রয়োজন একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে মেধা ও রাজনীতি একে অন্যের পরিপূরক হবে, প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। তখনই হয়তো বাংলাদেশ এমন এক রাষ্ট্রে পরিণত হবে, যেখানে সেরা মেধা শুধু নিজের ক্যারিয়ার গড়বে না, বরং রাষ্ট্র গঠনের কেন্দ্রবিন্দুতেও জায়গা করে নেবে।

লেখক: সমাজকর্মী, গবেষক ও অনলাইন সাংবাদিক

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

ভাষা ও রাজনীতি— কী শেখাচ্ছেন এই প্রজন্মকে?

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো— এই ভাষা কেবল বেনামি অ্যাকাউন্টে সীমাবদ্ধ নয়; শিল্পী, শিক্ষক, লেখক, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক ও জনপ্রিয় অনলাইন ব্যক্তিত্বদের মধ্যেও এর ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে— আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের সামনে কী ধরনের ভাষা ও সংস্কৃতির উদাহরণ রেখে যাচ্ছি?

৭ দিন আগে

বিশ্বকাপের উল্লাস: বিনোদন ও বিশ্বাসের সীমারেখা

কিন্তু যখন এই আনন্দ-উচ্ছ্বাস এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যেখানে ধর্মীয় প্রতীক, ঈমানের পরিচয় কিংবা পবিত্র বিশ্বাসকে বিনোদনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় দাঁড় করানো হয়, তখন বিষয়টি আর শুধুমাত্র খেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তখন এটি বিবেক, মূল্যবোধ এবং ধর্মীয় অনুভূতির প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

৭ দিন আগে

জুলাইয়ে নারীর ভূমিকা ও প্রাপ্তি

জুলাইয়ে দাঁড়িয়ে এই লেখার মাধ্যমে তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই এবং রাষ্ট্র, সমাজ ও ইতিহাসের কাছে দাবি রাখি— এই দেশ, এই ইতিহাস যেন তাদের নামেও উচ্চারিত হয়। দীর্ঘ জুলাইয়ে ঝরে যাওয়া অসংখ্য নারীর প্রাণ, যাদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে স্বৈরাচারী শাসনের অবসান হলেও নারীদের লড়াই এখনো চলমান।

৯ দিন আগে

শিশুরা মেধাবী, আমরা কি তাদের মেধা বিকাশের সুযোগ দিচ্ছি?

বাংলাদেশের গ্রাম থেকে শহর— সবখানেই অসংখ্য মেধাবী শিশুর জন্ম হচ্ছে। তারা প্রশ্ন করতে জানে, নতুন কিছু ভাবতে জানে, স্বপ্ন দেখতে জানে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই বিপুল সম্ভাবনার একটি বড় অংশ সঠিক পরিচর্যা, দিকনির্দেশনা ও সহায়ক পরিবেশের অভাবে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।

১১ দিন আগে