‘মানবিক করিডোর’ দেওয়া এই সরকারের কাজ না

ড. ইমতিয়াজ আহমেদ

দুদিন ধরে আলোচনায় আসা ‘মানবিক করিডোর’ ইস্যুটি আমার কাছে পরিষ্কার না। এই শব্দটির মানে আগে বুঝতে হবে। আমরা বারবার বলছি জাতিসংঘের কথা। কিন্তু জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলেছে বলে আমার জানা নেই। জাতিসংঘের কোনো চিঠিপত্র বা লিখিত কিছু থাকলে তা বলতে পারেন।

আবার জাতিসংঘের কথা যখন বলবেন তখন স্থায়ী পাঁচ সদস্যের সমর্থন আছে কি না, সেটিও জানান। তা না থাকলে জাতিসংঘের প্রস্তাব বা অনুরোধের কথা আমরা শুনব কেন? জাতিসংঘের মহাসচিব রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গিয়ে বক্তৃতায় অনেক কথার মধ্যে মানবিক করিডোরের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। এ ছাড়া জাতিসংঘের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য কারও জানা নেই। তাই কীসের ভিত্তিতে সরকার এই ‘মানবিক করিডোর’ দিতে চায়, সেটি আগে স্পষ্ট করতে হবে।

এই করিডোর কেন বা কী উদ্দেশ্যে দেওয়া হচ্ছে, সেটিও এখন পর্যন্ত স্পষ্ট না। এখানে বাংলাদেশের স্বার্থ কী এবং জাতিসংঘের স্বার্থ কী— এগুলো পরিস্কার করা দরকার। হতে পারে, কক্সবাজার বিমানবন্দর ব্যবহার করে জাতিসংঘ রাখাইনে কোনো মানবিক সহায়তা বা ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে চায়। এ রকম কিছু হলে তার অনুমোদন দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু করিডরের নামে সেখানে আরাকান আর্মি বা রাখাইনরা যদি বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহারের সুযোগ পায়, তাহলে তা দেশের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে না।

এখন ইস্যু যদি হয় ত্রাণসামগ্রী মিয়ানমার সীমান্তে পৌঁছে দেওয়া, সেটি বড় কোনো সমস্যা না। এর জন্য জাতিসংঘেরও প্রয়োজন হয় না। কারণ মিয়ানমারের সীমান্তে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতা বাংলাদেশের আছে। বাংলাদেশে দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষম একটি দেশ। প্রতিবেশী দেশ চাইলে সে এই সহায়তাটুকু করতেই পারে।

মিয়ানমার যদি বলে যে দেশের মধ্যে দিয়ে ত্রাণ নেওয়া সম্ভব না, তাহলে বাংলাদেশ সীমান্তে ত্রাণ পৌঁছে দিতেই পারে। এর জন্য বাইরের দেশের যুক্ত হওয়ার প্রয়োজন দেখি না। কারণ করিডোর দেওয়ার পর সেই করিডোরের অপব্যবহারের দৃষ্টান্ত আছে কিছু দেশে। তাই আমার দেশের মাটি অন্যকে ব্যবহার করতে দেওয়ার আগে অনেক কিছু ভাবতে হবে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে— মিয়ানমার এমন সহায়তা আমাদের কাছে চেয়েছে কি না। কারণ সেখানে সেনা সমর্থিত সরকারের পাশাপাশি বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তারা পৃথকভাবে বা যৌথভাবে বাংলাদেশকে এ রকম করিডোর দেওয়ার অনুরোধ করেছে কি না, সেটি জানতে হবে। তাদের কারও পক্ষ থেকে এ রকম কোনো অনুরোধ যদি না থাকে, তাহলে কেন আমরা এর মধ্যে জড়াব?

মিয়ানমারের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক স্বাভাবিক না। সেখানে দুটি পক্ষই শক্তিশালী। আবার আরাকান আর্মির সঙ্গে আমরা সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার কথা বলছি। সেটি হয়তো মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ভালোভাবে দেখবে না। তাই সেনাবাহিনী বা আরাকান আর্মি করিডোর দেওয়ার এই উদ্যোগকে পছন্দ নাও করতে পারে। তারা নিজেরা এত মারামারি করছে, সেখানে আমাদের দিকে একটি বোমা ছুড়ে দিলে তার দায় কে নেবে? জাতিসংঘ? নাকি অন্য কোনো দেশ?

তাছাড়া আমরা পারছি না, তোমরা সহায়তা করো— এমন আহ্বানও মিয়ানমারের কোনো পক্ষ জানায়নি। তাহলে কীসের ভিত্তিতে আমরা সেখানে নাক গলাতে চাই? আমরা আরেকটি দেশের সার্বভেৌমত্ব খণ্ডন করছি কি না, সেটিও ভেবে দেখার বিষয়।

আরেকটি বড় প্রশ্ন রয়েছে। এই করিডোরের মধ্যে কি বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর ইস্যু আছে? এখনো রোহিঙ্গারা ঢুকছে। আমরা কি তাদের ঢোকা সহজ করব? নাকি ফেরত পাঠানোর উপায় খুঁজব?

এ রকম অনেক প্রশ্ন সামনে চলে আসে। এসব প্রশ্নের জবাব না দিয়ে যদি আমরা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি, তাতে দেশের লাভ হবে না।

দেখতে হবে, ওই করিডোরের মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকট দূর হবে কি না। যেখানে জাতিসংঘ নিজেই বলছে তাদের অর্থ কমে গেছে, রোহিঙ্গাদের জন্য আর সহায়তা দিতে পারবে না, সেখানে হঠাৎ মানবিক সহায়তার এই অর্থ কোথা থেকে আসছে? জাতিসংঘে প্রতিনিধিত্বকারী যেসব দেশ আছে তারা এ বিষয়ে কী বলছে, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।

দেখা গেল, এই করিডোর সুবিধা দিতে গিয়ে রোহিঙ্গা সংকট ও দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংকট আরও বেড়ে গেল। তখন কী হবে? তাদের (জান্তা সরকার ও আরাকান আর্মি) লড়াইয়ের মধ্যে আমরা যেন কোনোভাবে যুক্ত হয়ে না যাই, সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা যাবে না। তাহলে আমরা কীভাবে জানব ওই করিডোরে কী হবে? তাই সবার আগে করিডোরের উদ্দেশ্য ও শর্তগুলো স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

সবচেয়ে বড় কথা, এই যে মানবিক করিডোর দেওয়ার প্রশ্ন, এটি তো অন্তবর্তী সরকারের কাজ না। এই সরকারের কাজ একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা, প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা। মানবিক করিডোর দেওয়ার ইস্যুতে না জড়িয়ে সেই মৌলিক দায়িত্বের দিকে মনোযোগী হওয়াটাই সরকারের জন্য ভালো হবে।

লেখক: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক

Ad
Ad
ad
ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

মুসলিম বিশ্বের অর্থনৈতিক হাতিয়ার হোক ‘ইসলামি দিনার’

মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বাইরের কোনো শক্তি নয়, নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিভাজন। সুন্নি-শিয়া বিভাজন, আরব-অনারব বৈরিতা, রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সম্মিলিত শক্তিকে দুর্বল করেছে। তাই কোনো অভিন্ন অর্থনৈতিক উদ্যোগের আগে প্রয়োজন আস্থা, সহযোগিতা ও অভিন্ন উন্নয়ন-দর্শন গড়ে তোলা।

৭ দিন আগে

এখনই চাই ‘শিক্ষক সুরক্ষা আইন’

কেন আজ শিক্ষক এত অসহায়? কারণ রাষ্ট্রের আইনেই তাদের সুরক্ষার জন্য আলাদা ও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই। বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ কিংবা শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নীতিমালায় শিক্ষকদের কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার বিষয়ে সুস্পষ্ট বিধান নেই।

৭ দিন আগে

সমালোচনা হোক যোগ্যতা নিয়ে, নারী পরিচয় নিয়ে নয়

বহু শতাব্দীর পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামো নারীর সাফল্যকে প্রায়ই সন্দেহের চোখে দেখেছে। একজন পুরুষের পদোন্নতি ‘যোগ্যতার স্বীকৃতি’, আর একজন নারীর পদোন্নতি ‘বিশেষ সুবিধা’— এই ধারণা শুধু বৈষম্যমূলক নয়, এটি তথ্যবিবর্জিতও। কারণ কোনো প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ বা পদোন্নতির সমালোচনা করতে হলে তথ্য, নীতি ও যোগ্যতার

৮ দিন আগে

নারী নয়, প্রশ্ন হোক নিয়োগের যোগ্যতা নিয়ে

দুর্ভাগ্যজনকভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, কাজী জেসিনের যোগ্যতা নিয়ে যুক্তি উপস্থাপনের পরিবর্তে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে— তিনি কার সঙ্গে ‘ঘুমিয়েছেন’, কাকে ‘খুশি করেছেন’ বা কীভাবে এই পদ পেয়েছেন। এসব মন্তব্য কোনোভাবেই রাজনৈতিক সমালোচনা নয়, এগুলো নারীবিদ্বেষের প্রকাশ।

৮ দিন আগে