৫ মার্চ ১৯৭১: গণহত্যার প্রতিবাদে উত্তাল মুক্তিপাগল বাঙালি

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০২৬, ১২: ০৮

মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতির শেষ পর্ব একাত্তরের মার্চ মাস। ১৯৬২ সালে যে লক্ষ্য নির্ধারণ করে গঠিত হয় ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’। ছাত্রলীগের ভেতরের এই গোপন সংগঠন প্রতিটি আন্দোলনেই সক্রিয়। ধাপে ধাপে আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে গেছে স্বাধীনতার পথে। একাত্তরের মার্চের প্রতিটি প্রতিটি ঘটনায় এই গোপন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ নানা কর্মসূচি দিয়ে স্বাধিকারের দাবিকে নিয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধের পথে।

১৯৭০ সালের জুন মাসে জাতীয় পতাকা তৈরি, একাত্তরের ২রা মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পতাকা উত্তোলন, ৩রা মার্চ স্বাধীনতার ইশতেহার ঘোষণা ইত্যাদি কর্মসূচির নেতৃত্ব দেয় স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ। সংগঠনের সকল কর্মসূচির পেছনে ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমর্থন।

১লা মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া স্থগিত ঘোষণা করার পর থেকেই শাসকগোষ্ঠী হিংস্র রূপ ধারণ করে। আন্দোলন দমনের নামে পশুশক্তির আশ্রয় নেয়। সামরিক বাহিনী দিয়ে আন্দোলন দমনের নামে হত্যাযজ্ঞ চালায়। সারাদেশে আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে গণহত্যা শুরু করে। সেনাবাহিনীর গুলি বর্ষণ জনতাকে আরও বিক্ষুদ্ধ করে তোলে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, সিলেটসহ সারাদেশে নিরস্ত্র মানুষের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়ে ওঠে। আজও চট্টগ্রামে স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দেন ২২২ বীর বাঙালি। আগের দিন এ সংখ্যা ছিলো ১২১ জন। নির্বিচারে গণহত্যায় শহর-বন্দর, গ্রামে-গঞ্জ, শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র-জনতা সবার মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। সর্বস্তরের জনতা যোগ দেয় মুক্তির সংগ্রামে।

আজও সারা দেশে সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। সামরিক বাহিনী আজও যশোর, টঙ্গীসহ সারাদেশে আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়। টঙ্গী শিল্প এলাকায় শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে এলে সেনাবাহিনীর গুলিতে ৪ জন শহিদ এবং ২৫ জন শ্রমিক আহত হন। ঢাকায় এ সংবাদ পৌঁছালে জনসাধারণ আরো বিক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠে। কৌশলের আশ্রয় নিয়ে সন্ধ্যায় সরকার ঘোষণা দেয় যে, ঢাকায় সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেয়া হয়েছে।

একাত্তরে এই দিনটি ছিলো শুক্রবার। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে হরতালের পর ব্যাংক খোলা থাকে। বিভিন্ন মসজিদে জুমার নামাজের পর শহিদদের আত্মার শান্তি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। লাহোরেও দেশের পূর্বাঞ্চলে আন্দোলনে শহিদদের জন্য গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। দেশের সংহতি কামনা করে লাহরেও বিভিন্ন মসজিদে বিশেষ করা হয়।

পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো এদিন রাওয়ালপিন্ডির প্রেসিডেন্ট ভবনে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সাথে ৫ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বৈঠক করে। বৈঠক শেষে পার্টির মুখপাত্র আবদুল হাফিজ পীরজাদা মন্তব্য করে, জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত রাখার পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়া যেভাই বিচার করা হোক না কেন, তা অত্যন্ত অবাঞ্ছিত এবং আদৌ যুক্তিযুক্ত নয়।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, সিলেট ও অন্যান্য স্থানে নিরস্ত্র জনতাকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে আমি তার তীব্র নিন্দা জানাই। বিভিন্ন স্থানে মিলিটারির বুলেটে নিরীহ-নিরস্ত্র মানুষ, শ্রমিক, কৃষক ও ছাত্রদের হত্যা করা হচ্ছে। নির্বিচারে নিরস্ত্র মানুষকে এভাবে হত্যা করা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ছাড়া আর কিছুই নয়। তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি বিভিন্ন মহল থেকে উঠেছে। এই সময় পশ্চিম পাকিস্তানের সাধারণ মানুষেরও উচিত বাংলাদেশের নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের ওপর গণহত্যা বন্ধের দাবি তোলা।

ন্যাপ প্রধান মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী বলেন, দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে অনেক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মাধ্যমে দেশ আজ যে অবস্থায় এসে পৌঁছেছে, এই মুহূর্তে দলমত নির্বিশেষে সকল প্রকার সঙ্কীর্ণতা ও নেতৃত্বের কোন্দল ভুলে স্বাধিকার সংগ্রামে কাতারবন্দী হওয়া প্রয়োজন। যে কোনো ব্যক্তি বা দলের সাথে আমি ও আমার দল এক কাতারে সংগ্রাম করতে প্রস্তুত।

পূর্ব পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ওয়ালী গ্রুপ) সভাপতি মোজাফ্ফর আহমদ ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আলতাফ হোসেন যুক্ত বিবৃতিতে বলেন, ‘পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াশীল শাসকগোষ্ঠী দেশে গণতন্ত্র বিকাশের পথ রুদ্ধ ও জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বাতিল করেছে। শান্তিপূর্ণভাবে গণপ্রতিনিধিদের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর অস্বীকার এবং বাংলার জনগণের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক মুক্তি প্রভৃতি দাবিকে নস্যাৎ করার জন্য নানা রকম হীন ষড়যন্ত্র ও যাবতীয় নির্যাতনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ঢাকা শহরেই শত শত মানুষের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে। এহেন গণহত্যা চলতে থাকলে জনগণের পক্ষে পরিবেশ শান্ত রাখা সম্ভব হবে না। ফলে কোনো মারাত্মক পরিস্থিতির উদ্ভব হলে শাসকগোষ্ঠীকেই দায়ী হবে।’ এদিকে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করার ঘোষণাকে অবাঞ্ছিত ও অগণতান্ত্রিক ঘোষণা করে বেলুচিস্তান ন্যাপ।

পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া গ্রুপ) কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে এক জনসভা করে। জনসভায় মতিয়া চৌধুরী বলেন, বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলনের সংগ্রামকে সার্থক করার জন্য মুক্তিবাহিনী গঠন করতে হবে। সরকার যদি মনে করে রক্ত নিয়ে বাঙালিকে দমন করা যাবে, তাহলে ভুল করেছে। ঘটনা যাই ঘটুক, বাংলার বুকে স্বাধিকারের যে পতাকা আজ উড়ছে, তা নামানো যাবে না।

ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম এক বিবৃতিতে বলেন, এই স্বাধীকার সংগ্রাম, জনতার সংগ্রাম। এই সংগ্রামে আমাদের বিজয় সুনিশ্চিত। এখন যা দরকার তাহল ঐক্যবদ্ধভাবে দুর্বার গণআন্দোলন আরো জোরদার করা।

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার তিন আসামি স্টুয়ার্ড মুজিবুর রহমান, এস এম সুলতান উদ্দিন এবং এল এম নূর মোহাম্মদ এক যুক্ত বিবৃতিতে বাংলার স্বাধিকার আদায়ের চূড়ান্ত সংগ্রামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতকে শক্তিশালী করার জন্য দলমত নির্বিশেষে বাঙালিদের প্রতি আহ্বান জানান।

আন্দোলন সংগ্রাম অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেয় পূর্ববাংলা শ্রমিক ফেডারেশন, শ্রমিক লীগ, শ্রমিক ফেডারেশন, মজদুর ফেডারেশন, নিখিল পাকিস্তান মহিলা সমিতি, সরকারি কলেজ শিক্ষক সমিতি, মহিলা সংসদ, পান রফতানি সমিতি, গণমুক্তি দল ও চলচ্চিত্র সমাজসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠন।

এই দিন পাকিস্তানের অবসরপ্রাপ্ত এয়ার মার্শাল আসগর খান বিকেলে করাচি থেকে ঢাকায় পৌঁছোন। তিনি রাতে বঙ্গবন্ধুর সাথে ধানমন্ডিস্থ বাসভবনে সাক্ষাৎ করেন।

বিদেশি একটি বেতারে প্রচারিত হয় যে, ‘শেখ মুজিব জনাব ভুট্টোর সঙ্গে ক্ষমতা ভাগ ভাটোয়ারা করতে রাজি আছেন’। রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই সংবাদকে ‘অসদুদ্দেশ্যমূলক’ ও ‘কল্পনার ফানুস’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

বঙ্গবন্ধুর আহবানে সাড়া দিয়ে বিকেলে কবি সাহিত্যিক ও শিক্ষকরা মিছিল নিয়ে রাজপথে নেমে আসে। ছাত্রলীগ ও ডাকসুর উদ্যোগে বায়তুল মোকাররম থেকে মিছিল বের হয়।

৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু যে ভাষণ দেবেন, তোফায়েল আহমদ সেই ভাষণ সরাসরি রিলে করার জন্য ঢাকা বেতার কেন্দ্রের প্রতি আহ্বান জানান।

লেখক: চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের (ডিএফপি) সাবেক মহাপরিচালক

তথ্যসূত্র:

  • মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, ঢাকা
  • দৈনিক ইত্তেফাক, ঢাকা
  • ১৯৭১: আমেরিকার গোপন দলিল, মিজানুর রহমান খান
Ad
Ad
ad
ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

ভয়, পতন আর উৎসব: আমার দেখা ৫ আগস্ট

৫ আগস্ট রাতের সেই এক ধরনের ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ পরিস্থিতি একটা চাপা শঙ্কা তৈরি করেছিল, সন্দেহ নেই। কিন্তু তার পাশেই যা দেখেছিলাম— দেশের ইতিহাসে স্বৈরাচার পতনের পর সাধারণ মানুষের মুখে ফুটে ওঠা সেই অবর্ণনীয় আনন্দ— তা ছিল সম্পূর্ণ খাঁটি, সম্পূর্ণ অকৃত্রিম।

৪ দিন আগে

কী দিয়েছে ৫ আগস্ট, কী দিতে পারেনি?

আজ ৫ আগস্ট ২০২৬। সেই দুপুরের ঠিক দুই বছর পর। যে মিছিল সেদিন শাহবাগ, শহিদ মিনার আর যমুনার সামনের রাস্তায় থেমে গিয়েছিল আনন্দ-উল্লাসে, তার পায়ের শব্দ আজও যেন মিলিয়ে যায়নি। বদলেছে সরকার, বদলেছে সংসদ, বদলেছে রাষ্ট্রের নথিপত্র। কিন্তু সেই দিনের প্রশ্নগুলো এখনো বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে।

৪ দিন আগে

৫ আগস্ট: ইতিহাস নির্মাণের গণঅভ্যুত্থান দিবস

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দিন ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টানা কয়েক সপ্তাহের ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ, রক্তক্ষয় এবং দেশ জুড়ে অশান্তির পর ক্ষমতা ত্যাগ করে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। তার পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ক্ষমতার মসনদে চেপে বসা ১৬ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে।

৫ দিন আগে

চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন সমীকরণ

বাংলাদেশ আজ আর সাহায্যনির্ভর রাষ্ট্র নয়; বরং উদীয়মান একটি আঞ্চলিক অর্থনীতি। সেই বাস্তবতার আলোকে কূটনীতিও হতে হবে আত্মবিশ্বাসী, ভারসাম্যপূর্ণ এবং দূরদর্শী। বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রেখে, কিন্তু কারও প্রভাববলয়ে আবদ্ধ না হয়ে, বাংলাদেশ তার সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা অটু

৫ দিন আগে