
ড. মিহির কুমার রায়

আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে বসছে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। এমন একসময়ে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন বৈশ্বিক অর্থনীতি, বাণিজ্য ও ভূরাজনীতিতে দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে। যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত, জ্বালানি নিরাপত্তা, ডলারের আধিপত্য নিয়ে বিতর্ক এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থায়ন-সংকট— এসব মিলিয়ে বিশ্বব্যবস্থা ক্রমেই আরও বহুমুখী হয়ে পড়ছে।
এ বাস্তবতায় ব্রিকসের দিল্লি সম্মেলন শুধু সদস্য রাষ্ট্রগুলোর নিয়মিত বৈঠক নয়, এটি গ্লোবাল সাউথের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অবস্থান নির্ধারণেরও গুরুত্বপূর্ণ হবে।
বাংলাদেশের জন্য এই সম্মেলনটির গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ ঢাকা একইসঙ্গে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখে। ফলে ব্রিকসকে বাংলাদেশের কাছে কোনো একটি ভূরাজনৈতিক বলয় হিসেবে দেখার চেয়ে বরং বিকল্প অর্থায়ন, বাণিজ্যিক বৈচিত্র্য, জ্বালানি নিরাপত্তা ও কৌশলগত ভারসাম্য তৈরির একটি বড় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখা বেশি বাস্তবসম্মত হবে।
অর্থনৈতিক জোট ব্রিকসের শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ পেয়েছেন পর্যবেক্ষক হিসেবে। ভারতীয় গণমাধ্যম অবশ্য বলছে, এখন পর্যন্ত ঢাকার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো খবর দেওয়া হয়নি। বাংলাদেশসহ আটটি দেশকে ওই সম্মেলনে যোগদানের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে জানা গেছে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীকে আলাদাভাবে দ্বিপাক্ষিক ভারত সফরের আমন্ত্রণও রয়েছে। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটিকে সরাসরি ব্রিকসের সদস্যপদ মর্যাদার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং এটি বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভূমিকা এবং বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে ঢাকার গুরুত্বের স্বীকৃতি।
১১ সদস্যের সংগঠনে পরিণত হওয়ায় এখন ব্রিকসের গুরুত্ব অনেক বেড়ে গেছে। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে— ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও ইন্দোনেশিয়া। ব্রিকসের মূল আকাঙ্ক্ষার মধ্যে রয়েছে— আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো, ডলারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো, স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানো এবং উন্নয়ন অর্থায়নের বিকল্প উৎস তৈরি করা।
বর্তমানে ব্রিকস গ্রুপ পশ্চিমের উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর বাইরে একটি শক্তিশালী জোটে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে এই জোটভুক্ত দেশগুলোর মোট জনসংখ্যা ৩৪২ কোটি এবং মোট আয়তন ৪০ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার, যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৪২ শতাংশ এবং মোট আয়তনের ৩০ শতাংশ।
ব্রিকস গ্রুপের উদ্দেশ্য দুটি— এর সদস্যদের জাতীয় স্বার্থকে এগিয়ে নেওয়া ও স্বায়ত্তশাসন অর্জন করা। অর্থাৎ, এই প্রক্রিয়ায় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে পশ্চিমা আধিপত্যের মোকাবিলা করা।
এখানে উল্লেখ্য, চলমান ইউক্রেন যুদ্ধ এবং চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতার পটভূমিতে ব্রিকস জোটের সম্প্রসারণের গতি বাড়ছে। ভৌগোলিকভাবে বিশ্বের প্রায় ২৮ শতাংশ ভূখণ্ডজুড়ে এর ব্যাপ্তি, যেখানে বিশ্বের ৪৫ শতাংশ মানুষের বসবাস। সব মিলিয়ে ব্রিকসভুক্ত দেশগুলো বিশ্বের ২৫ শতাংশ জ্বালানি তেল ও ইস্পাত তৈরিতে ৫০ ভাগ আকরিক লোহা উৎপাদন করে থাকে। এ ছাড়া বিশ্বের ৪০ শতাংশ ও এবং ৪৬ শতাংশ গমও এ জোটভুক্ত দেশগুলোয় উৎপন্ন হয়ে থাকে। এসব কারণে ব্রিকসভুক্ত দেশগুলো তাদের প্রভাব ও উপস্থিতির জানান দিতে পেরেছে।
তথ্য বলছে, এই নতুন সংস্থায় যোগ দেওয়ার অনেক সুবিধা রয়েছে। যেমন— ব্রিকসে যোগ দিলে শুধু অর্থনীতি নয়, ভূরাজনীতিতেও নতুন মেরুকরণ ঘটবে, বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হবে, ব্রিকস জোটভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ভবিষ্যতে বিকল্প মুদ্রা বা বিকল্প বাণিজ্য সহায়ক হবে এবং ভবিষ্যতে আইএমএফসহ বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানে পরিণত হলে তা থেকে বড় আকারের ঋণ সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ব্রিকসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক সম্ভবত অর্থায়ন। বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য না হলেও ২০২১ সাল থেকে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সদস্য। এনডিবির সদস্য তালিকায় বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি রয়েছে এবং ব্যাংকটি অবকাঠামো ও টেকসই উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন করে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে এর সুফল পেতে শুরু করেছে।
চলতি বছর এনডিবি রূপপুর-পরবর্তী অবকাঠামো, বিদ্যুৎ-পরিবহন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বাংলাদেশের প্রকল্প নিয়ে সক্রিয় হয়েছে। চলতি বছরের মার্চে নরসিংদীর রায়পুরায় ১৫০ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে এনডিবির প্রস্তাবিত অর্থায়নসীমা ১৩০ দশমিক ৪৫ মিলিয়ন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া গত মাসে এনডিবির ভাইস প্রেসিডেন্টের ঢাকা সফরে বাংলাদেশের জন্য নতুন ঋণ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম কর্ড লাইন, চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের আঞ্চলিক কার্গো হাব, সড়ক ও রেল সক্ষমতা বৃদ্ধি, পর্যটন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের আমদানিতে আর্থিক বাণিজ্যের মতো প্রকল্প নিয়ে আলোচনা করেছে।
এটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উন্নয়ন-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অবকাঠামো, জ্বালানি, নগর পরিবহন, জলবায়ু অভিযোজন ও শিল্প প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে। প্রচলিত বহুপাক্ষিক ঋণের পাশাপাশি এনডিবির মতো বিকল্প উন্নয়ন ব্যাংক সেই অর্থায়নের উৎস বৈচিত্র্যপূর্ণ করতে পারে।
অতএব দিল্লির সম্মেলনে ব্রিকস-ঘনিষ্ঠ আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে এনডিবি থেকে বাংলাদেশ কীভাবে আরও বেশি উন্নয়ন অর্থায়ন পেতে পারে, সেটিই হওয়া উচিত বাস্তব অগ্রাধিকার।
এই সম্মেলন বাংলাদেশের জন্য কেবল অর্থনৈতিক নয়, কূটনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। ভারত আসন্ন সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে, যা অনায়াসে গ্রহণ করা উচিত। কারণ এটি বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভূমিকা এবং বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে ঢাকার গুরুত্বের স্বীকৃতি। তারপরও রাজনৈতিক তাৎপর্য কম নয়।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক গত কয়েক বছরে নানা কারণে টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে গেছে। সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য, নিরাপত্তা, প্রত্যর্পণ এবং পারস্পরিক রাজনৈতিক আস্থার প্রশ্নে দুই দেশের মধ্যে বেশ কিছু অমীমাংসিত বিষয় রয়েছে। এই বাস্তবতায় একই মঞ্চে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতি সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে ব্রিকস সম্মেলনে ভারত, চীন, রাশিয়া, উপসাগরীয় দেশসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শক্তির প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন। বাংলাদেশের জন্য এটি একই সময়ে বহু দেশের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভারত-চীন প্রতিযোগিতার মধ্যে নিজের স্বার্থ রক্ষা করা। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ভৌগোলিক, নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। অন্যদিকে চীন বাংলাদেশের অন্যতম বড় বাণিজ্য ও উন্নয়ন অংশীদার। ব্রিকস এই দুই সম্পর্ককে একই মঞ্চে ব্যবস্থাপনার একটি সুযোগ তৈরি করে।
বাংলাদেশকে কোনো পক্ষ বেছে নেওয়ার পরিবর্তে উভয় দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে। এই জায়গায় কৌশলগত ভারসাম্য বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক কমিয়ে চীন-রাশিয়ার দিকে যাওয়া নয়, আবার চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক সীমিত করে পশ্চিমা জোটের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হওয়াও নয়। বরং প্রত্যেক অংশীদারের সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থভিত্তিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সতর্কতার জায়গা এখানেই। ব্রিকসের অর্থনৈতিক সুযোগ যতই আকর্ষণীয় হোক, বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতি এখনো পশ্চিমা বাজারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় হয়েছে প্রায় ৩৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়েছে ৭ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার। যুক্তরাজ্য ও কানাডাতেও উল্লেখযোগ্য রপ্তানি হয়েছে।
তাই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে এমন কোনো অবস্থান নেওয়া উচিত হবে না, যাতে ব্রিকসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের জন্য নেতিবাচক সংকেত তৈরি করে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা হচ্ছে— একদিকে চীন থেকে বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও শিল্পপণ্য আসে; অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে তৈরি পোশাক রপ্তানি করে বাংলাদেশ বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে বিপুল রেমিট্যান্স। ভারত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী ও বাণিজ্যিক অংশীদার। রাশিয়ার সঙ্গে রয়েছে জ্বালানি ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ সহযোগিতা।
এই বহুমাত্রিক সম্পর্কই বাংলাদেশের শক্তি। তাই ব্রিকসের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর অর্থ হওয়া উচিত সম্পর্কের বহুমুখীকরণ, কোনো একটি পক্ষের দিকে ঝুঁকে পড়া নয়।
লেখক: অর্থনীতিবিদ ও গবেষক

আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে বসছে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। এমন একসময়ে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন বৈশ্বিক অর্থনীতি, বাণিজ্য ও ভূরাজনীতিতে দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে। যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত, জ্বালানি নিরাপত্তা, ডলারের আধিপত্য নিয়ে বিতর্ক এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থায়ন-সংকট— এসব মিলিয়ে বিশ্বব্যবস্থা ক্রমেই আরও বহুমুখী হয়ে পড়ছে।
এ বাস্তবতায় ব্রিকসের দিল্লি সম্মেলন শুধু সদস্য রাষ্ট্রগুলোর নিয়মিত বৈঠক নয়, এটি গ্লোবাল সাউথের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অবস্থান নির্ধারণেরও গুরুত্বপূর্ণ হবে।
বাংলাদেশের জন্য এই সম্মেলনটির গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ ঢাকা একইসঙ্গে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখে। ফলে ব্রিকসকে বাংলাদেশের কাছে কোনো একটি ভূরাজনৈতিক বলয় হিসেবে দেখার চেয়ে বরং বিকল্প অর্থায়ন, বাণিজ্যিক বৈচিত্র্য, জ্বালানি নিরাপত্তা ও কৌশলগত ভারসাম্য তৈরির একটি বড় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখা বেশি বাস্তবসম্মত হবে।
অর্থনৈতিক জোট ব্রিকসের শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ পেয়েছেন পর্যবেক্ষক হিসেবে। ভারতীয় গণমাধ্যম অবশ্য বলছে, এখন পর্যন্ত ঢাকার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো খবর দেওয়া হয়নি। বাংলাদেশসহ আটটি দেশকে ওই সম্মেলনে যোগদানের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে জানা গেছে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীকে আলাদাভাবে দ্বিপাক্ষিক ভারত সফরের আমন্ত্রণও রয়েছে। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটিকে সরাসরি ব্রিকসের সদস্যপদ মর্যাদার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং এটি বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভূমিকা এবং বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে ঢাকার গুরুত্বের স্বীকৃতি।
১১ সদস্যের সংগঠনে পরিণত হওয়ায় এখন ব্রিকসের গুরুত্ব অনেক বেড়ে গেছে। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে— ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও ইন্দোনেশিয়া। ব্রিকসের মূল আকাঙ্ক্ষার মধ্যে রয়েছে— আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো, ডলারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো, স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানো এবং উন্নয়ন অর্থায়নের বিকল্প উৎস তৈরি করা।
বর্তমানে ব্রিকস গ্রুপ পশ্চিমের উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর বাইরে একটি শক্তিশালী জোটে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে এই জোটভুক্ত দেশগুলোর মোট জনসংখ্যা ৩৪২ কোটি এবং মোট আয়তন ৪০ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার, যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৪২ শতাংশ এবং মোট আয়তনের ৩০ শতাংশ।
ব্রিকস গ্রুপের উদ্দেশ্য দুটি— এর সদস্যদের জাতীয় স্বার্থকে এগিয়ে নেওয়া ও স্বায়ত্তশাসন অর্জন করা। অর্থাৎ, এই প্রক্রিয়ায় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে পশ্চিমা আধিপত্যের মোকাবিলা করা।
এখানে উল্লেখ্য, চলমান ইউক্রেন যুদ্ধ এবং চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতার পটভূমিতে ব্রিকস জোটের সম্প্রসারণের গতি বাড়ছে। ভৌগোলিকভাবে বিশ্বের প্রায় ২৮ শতাংশ ভূখণ্ডজুড়ে এর ব্যাপ্তি, যেখানে বিশ্বের ৪৫ শতাংশ মানুষের বসবাস। সব মিলিয়ে ব্রিকসভুক্ত দেশগুলো বিশ্বের ২৫ শতাংশ জ্বালানি তেল ও ইস্পাত তৈরিতে ৫০ ভাগ আকরিক লোহা উৎপাদন করে থাকে। এ ছাড়া বিশ্বের ৪০ শতাংশ ও এবং ৪৬ শতাংশ গমও এ জোটভুক্ত দেশগুলোয় উৎপন্ন হয়ে থাকে। এসব কারণে ব্রিকসভুক্ত দেশগুলো তাদের প্রভাব ও উপস্থিতির জানান দিতে পেরেছে।
তথ্য বলছে, এই নতুন সংস্থায় যোগ দেওয়ার অনেক সুবিধা রয়েছে। যেমন— ব্রিকসে যোগ দিলে শুধু অর্থনীতি নয়, ভূরাজনীতিতেও নতুন মেরুকরণ ঘটবে, বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হবে, ব্রিকস জোটভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ভবিষ্যতে বিকল্প মুদ্রা বা বিকল্প বাণিজ্য সহায়ক হবে এবং ভবিষ্যতে আইএমএফসহ বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানে পরিণত হলে তা থেকে বড় আকারের ঋণ সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ব্রিকসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক সম্ভবত অর্থায়ন। বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য না হলেও ২০২১ সাল থেকে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সদস্য। এনডিবির সদস্য তালিকায় বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি রয়েছে এবং ব্যাংকটি অবকাঠামো ও টেকসই উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন করে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে এর সুফল পেতে শুরু করেছে।
চলতি বছর এনডিবি রূপপুর-পরবর্তী অবকাঠামো, বিদ্যুৎ-পরিবহন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বাংলাদেশের প্রকল্প নিয়ে সক্রিয় হয়েছে। চলতি বছরের মার্চে নরসিংদীর রায়পুরায় ১৫০ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে এনডিবির প্রস্তাবিত অর্থায়নসীমা ১৩০ দশমিক ৪৫ মিলিয়ন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া গত মাসে এনডিবির ভাইস প্রেসিডেন্টের ঢাকা সফরে বাংলাদেশের জন্য নতুন ঋণ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম কর্ড লাইন, চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের আঞ্চলিক কার্গো হাব, সড়ক ও রেল সক্ষমতা বৃদ্ধি, পর্যটন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের আমদানিতে আর্থিক বাণিজ্যের মতো প্রকল্প নিয়ে আলোচনা করেছে।
এটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উন্নয়ন-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অবকাঠামো, জ্বালানি, নগর পরিবহন, জলবায়ু অভিযোজন ও শিল্প প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে। প্রচলিত বহুপাক্ষিক ঋণের পাশাপাশি এনডিবির মতো বিকল্প উন্নয়ন ব্যাংক সেই অর্থায়নের উৎস বৈচিত্র্যপূর্ণ করতে পারে।
অতএব দিল্লির সম্মেলনে ব্রিকস-ঘনিষ্ঠ আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে এনডিবি থেকে বাংলাদেশ কীভাবে আরও বেশি উন্নয়ন অর্থায়ন পেতে পারে, সেটিই হওয়া উচিত বাস্তব অগ্রাধিকার।
এই সম্মেলন বাংলাদেশের জন্য কেবল অর্থনৈতিক নয়, কূটনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। ভারত আসন্ন সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে, যা অনায়াসে গ্রহণ করা উচিত। কারণ এটি বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভূমিকা এবং বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে ঢাকার গুরুত্বের স্বীকৃতি। তারপরও রাজনৈতিক তাৎপর্য কম নয়।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক গত কয়েক বছরে নানা কারণে টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে গেছে। সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য, নিরাপত্তা, প্রত্যর্পণ এবং পারস্পরিক রাজনৈতিক আস্থার প্রশ্নে দুই দেশের মধ্যে বেশ কিছু অমীমাংসিত বিষয় রয়েছে। এই বাস্তবতায় একই মঞ্চে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতি সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে ব্রিকস সম্মেলনে ভারত, চীন, রাশিয়া, উপসাগরীয় দেশসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শক্তির প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন। বাংলাদেশের জন্য এটি একই সময়ে বহু দেশের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভারত-চীন প্রতিযোগিতার মধ্যে নিজের স্বার্থ রক্ষা করা। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ভৌগোলিক, নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। অন্যদিকে চীন বাংলাদেশের অন্যতম বড় বাণিজ্য ও উন্নয়ন অংশীদার। ব্রিকস এই দুই সম্পর্ককে একই মঞ্চে ব্যবস্থাপনার একটি সুযোগ তৈরি করে।
বাংলাদেশকে কোনো পক্ষ বেছে নেওয়ার পরিবর্তে উভয় দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে। এই জায়গায় কৌশলগত ভারসাম্য বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক কমিয়ে চীন-রাশিয়ার দিকে যাওয়া নয়, আবার চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক সীমিত করে পশ্চিমা জোটের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হওয়াও নয়। বরং প্রত্যেক অংশীদারের সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থভিত্তিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সতর্কতার জায়গা এখানেই। ব্রিকসের অর্থনৈতিক সুযোগ যতই আকর্ষণীয় হোক, বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতি এখনো পশ্চিমা বাজারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় হয়েছে প্রায় ৩৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়েছে ৭ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার। যুক্তরাজ্য ও কানাডাতেও উল্লেখযোগ্য রপ্তানি হয়েছে।
তাই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে এমন কোনো অবস্থান নেওয়া উচিত হবে না, যাতে ব্রিকসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের জন্য নেতিবাচক সংকেত তৈরি করে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা হচ্ছে— একদিকে চীন থেকে বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও শিল্পপণ্য আসে; অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে তৈরি পোশাক রপ্তানি করে বাংলাদেশ বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে বিপুল রেমিট্যান্স। ভারত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী ও বাণিজ্যিক অংশীদার। রাশিয়ার সঙ্গে রয়েছে জ্বালানি ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ সহযোগিতা।
এই বহুমাত্রিক সম্পর্কই বাংলাদেশের শক্তি। তাই ব্রিকসের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর অর্থ হওয়া উচিত সম্পর্কের বহুমুখীকরণ, কোনো একটি পক্ষের দিকে ঝুঁকে পড়া নয়।
লেখক: অর্থনীতিবিদ ও গবেষক

মানুষের একটা অদ্ভুত স্বভাব আছে— সে নিজেকে যেমন, তার চেয়ে একটু ভালো করে দেখাতে চায়। আগে এই প্রবণতার সীমা ছিল পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, অফিস কিংবা বন্ধুমহল পর্যন্ত। এখন সেই ছোট পরিসরটি বিস্ফোরিত হয়ে গেছে। হাতে একটি স্মার্টফোন, সামনে একটি ক্যামেরা, আর পেছনে কোটি কোটি দর্শকের সম্ভাবনা। ফলে মানুষ এখন
১৫ দিন আগে
পশ্চিমা অর্থনীতিবিদদের তৈরি করা এই ‘স্টেয়ারকেস মডেল’ থেকে যে ধারণার জন্ম, চীনের বিরুদ্ধে মূলত সেই ধারণাটিই প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু এই ধারাবাহিকতাকেই কেন অর্থনীতির চূড়ান্ত নিয়ম হিসেবে মেনে নিতে হবে? প্রতিটি দেশেরই অধিকার আছে, তার সম্পদভিত্তি, শ্রমশক্তি, পুঁজিবাজার ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা যে উন্নয়নপথকে ধরে
১৮ দিন আগে
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে বাণিজ্যিক ব্যবসা হিসেবে না দেখে পুনরায় 'সেবা খাত' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। বিগত দিনে এ খাতে অপরাধের মাধ্যমে যে লুণ্ঠনের সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে, তার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল সরকার সংকট মোকাবিলায় কাঙ্ক্ষিত সফলতা অর্জন করতে পারবে।
১৯ দিন আগে
অর্থনৈতিক সফলতার দরজা খুললেও সামনে বহুমাত্রিক ‘কিন্তু’ ও চ্যালেঞ্জ ঝুলছে। এই ছয় মাসের প্রাথমিক সাফল্য দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী হবে কি না, তা নির্ভর করবে সরকার কীভাবে এসব ভূ-রাজনৈতিক সংকট মোকাবেলা করে, কীভাবে রাজস্ব বাড়ায় এবং অর্থনৈতিক ঝুঁকিগুলোর সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনা করতে পারে তার ওপর। দক্ষ ব্যবস্থাপনা
১৯ দিন আগে