পিংক বাস: একটি রঙ, একটি পরিবর্তন ও অনেক প্রশ্ন

নাহিদ আক্তার

বাংলাদেশের গণপরিবহনে নারীদের জন্য ‘পিংক বাস’ চালু হওয়া নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ঢাকার রাস্তায় যখন নারী চালক, নারী সহকারী আর নারী যাত্রীদের নিয়ে বাস চলছে, তখন সেটা দেখতে ভালো লাগে। কিন্তু এই ভালো লাগার ভেতরেই কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন লুকিয়ে আছে, যে প্রশ্নগুলো শুধু বাসের রং নিয়ে নয়, বরং আমাদের সমাজের গভীরতর বাস্তবতা নিয়ে।

নিরাপত্তা নাকি বিচ্ছিন্নতা

গণপরিবহনে নারীর যৌন হয়রানি বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। ব্র‍্যাক-এর গবেষণা বলছে, গণপরিবহনে জরিপে অংশ নেওয়া ৯৪ শতাংশ নারী কোনো না কোনো ধরনের যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। এই পরিসংখ্যান শুধু নারীর অনিরাপত্তার কথা বলে না; এটি আমাদের সমাজের পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোরও প্রতিচ্ছবি।

এমন বাস্তবতায় পিংক বাস তাৎক্ষণিক স্বস্তি দিতে পারে। কাজের জন্য, পড়াশোনার জন্য নারীদের চলাচলের একটি বিকল্প তৈরি হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সমাধান কি এটাই? নারীদের আলাদা বাসে পাঠিয়ে দেওয়া মানে কি এই বার্তা দেওয়া নয় যে, সাধারণ বাসে নারীর উপস্থিতি অনিরাপদ, আর সেটাই স্বাভাবিক?

একজন নারীর নাগরিক অধিকার শুধু একটি নির্দিষ্ট রঙের বাসে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। জনপরিসরে নারীর উপস্থিতি কোনো বিশেষ সুবিধা নয়, এটা তার অধিকার। কিন্তু পিংক বাস যদি আমাদের এই আত্মতুষ্টি দেয় যে, নারীর নিরাপত্তার সমস্যা সমাধান হয়ে গেছে, তাহলে সেটা হবে বিপজ্জনক। কারণ তখন প্রশ্নটা দাঁড়াবে, নারীটি কেন সাধারণ বাসে উঠল, পিংক বাসে উঠল না কেন? অপরাধীর আচরণ থেকে দায় সরে গিয়ে নারীর সিদ্ধান্তের ওপর এসে পড়বে।

এটাই ভিক্টিম ব্লেইমিং— নিরাপত্তার দায়িত্ব প্রতিষ্ঠান ও অপরাধীর আচরণ থেকে সরিয়ে সম্ভাব্য ভুক্তভোগীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া। প্রশ্নের অভিমুখ বদলানো জরুরি: “নারীটি ওই বাসে উঠল কেন?” নয়, বরং “লোকটি তাকে হয়রানি করার সাহস পেল কেন?”

নারী চালকদের সংগ্রাম ও পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টি

পিংক বাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নারী চালকদের কর্মসংস্থান। বাংলাদেশে ‘নারী বাসচালক’ একটি নতুন ধারণা। খাদিজা আক্তারের মতো নারীরা প্রশিক্ষণ নিয়ে চাকরি পেয়েছেন—এটা অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু তাদের প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা আমাদের সমাজের আরেকটি অস্বস্তিকর সত্য উন্মোচন করেছে।

ফ্লাইওভারে বাস ওঠানোর সময় এক নারী চালকের সামান্য সমস্যা হওয়াকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ট্রলের বন্যা বয়ে গেছে, সেটা দেখে মনে হয়েছে, অনেকেই যেন এই ব্যর্থতার অপেক্ষায় ছিলেন। পুরুষ চালকদের ভুল প্রতিদিন ঘটে, কিন্তু তা নিয়ে এমন হাসাহাসি হয় না। কিন্তু একজন নারী যখন চালকের আসনে বসেন, তখন তাকে যেন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়। প্রতিটি ভুলকে প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয় যে, “নারী দিয়ে বাস চালানো সম্ভব না।”

এই মনোভাবই আসল সমস্যা। নারী চালকদের জন্য প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ আর সহনশীল পরিবেশ দরকার। প্রথম দিনেই তাদের কাছ থেকে পুরুষ চালকদের সমান দক্ষতা আশা করা অন্যায্য। এমনকি অভিজ্ঞ পুরুষ চালকরাও ভুল করেন। কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে প্রতিটি ভুলকে বড় করে দেখা হয়, কারণ পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কাছে নারীকে সবসময় প্রমাণ করতে হয় যে, সে যোগ্য।

আর এই ট্রলের জন্য অনেকাংশে দায়ী সংবাদমাধ্যমও। একজন নারী চালকের সামান্য সমস্যাকে নিয়ে ভাইরাল কনটেন্ট বানানো, সেটা সংবাদের নামে চাঞ্চল্যকরতা মাত্র। নারী চালকদের অভিযোগ, “সাংবাদিকদের জন্য আমরা রাস্তায় ভালোভাবে গাড়ি চালাতে পারছি না” — এই কথাটি গভীরভাবে ভাবার বিষয়। সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব কি সমাজকে সচেতন করা, নাকি মানুষের দুর্বল মুহূর্তকে পুঁজি করে ক্লিকবেইট তৈরি করা?

সামাজিক নীরবতা ভাঙতে হবে

পিংক বাস নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমরা যেন মূল সমস্যাটি ভুলে না যাই। সমস্যা বাসের রং নয়, সমস্যা হলো জনপরিসরে নারীর শরীর ও উপস্থিতিকে আমরা যেভাবে দেখি, সেই দৃষ্টিভঙ্গি। গণপরিবহনে যৌন হয়রানি বন্ধ করতে হলে শুধু আলাদা বাস চালু করলে চলবে না; দরকার সামাজিক অসহিষ্ণুতা।

একজন নারী যখন বাসে হয়রানির শিকার হন এবং প্রতিবাদ করেন, তখন অন্য যাত্রীরা কি করেন? চুপ করে তাকিয়ে থাকেন? নাকি এগিয়ে আসেন? এই নীরবতাই হয়রানিকারীর সাহস বাড়ায়। আইন অপরাধের শাস্তি দিতে পারে, কিন্তু জনমতই নির্ধারণ করে কোন আচরণকে সমাজ স্বাভাবিক বলে মেনে নেবে না।

আমাদের দরকার এমন একটি সামাজিক পরিবেশ, যেখানে একজন নারী নিরাপদে যেকোনো বাসে চলাচল করতে পারবেন—সেটা পিংক হোক বা সাধারণ। দরকার কার্যকর অভিযোগব্যবস্থা, চালক-সহকারীদের প্রশিক্ষণ, নিরাপদ বাসস্টপ, নজরদারি আর অপরাধের দৃশ্যমান আইনি পরিণতি। নীতির মূল কথা হওয়া উচিত সহজ— নারীর চলাচল সীমিত করব না; বরং, হয়রানিকারীর সুযোগ সীমিত করব।

পিংক বাস থেকে পিংক শহরে

পিংক বাসের পক্ষে বা বিপক্ষে নয়, বরং প্রশ্ন হলো, আমরা কি নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করছি, নাকি নিরাপত্তার নামে নারীকে আলাদা করে পুরুষের অবাধ উপস্থিতিকেই জনপরিসরের “স্বাভাবিক” অবস্থা হিসেবে রেখে দিচ্ছি?

আজ পিংক বাস প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য “পিংক পৃথিবী” নয়। আমাদের লক্ষ্য এমন একটি সমাজ, যেখানে নিরাপদ থাকার জন্য একজন নারীকে নিজের বাস, রাস্তা, সময় কিংবা চলাচলের রং আলাদা করে নিতে হবে না। সমতা মানে নারীর জন্য নিরাপদ একটি আলাদা জায়গা তৈরি করা নয়; সমতা মানে পুরো জনপরিসরটিকেই নারীরও করে তোলা।

নারী চালকদের জন্য আমাদের সমর্থন ও সহানুভূতি দরকার। তাঁদের সংগ্রাম শুধু রাস্তায় গাড়ি চালানো নয়; সমাজের পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধেও লড়াই। খাদিজা আক্তাররা যতই বলেন, “ট্রল করা হোক, আমরা দমব না”—সেই সাহসের পাশে দাঁড়ানো সমাজের দায়িত্ব।

পিংক বাস একটা শুরু হতে পারে, কিন্তু শেষ কথা নয়। আসল পরিবর্তন আসবে তখনই, যখন একজন নারী ভোরবেলা, রাতের শহরে, ভিড়ের বাসে নিরাপদে চলাচল করতে পারবেন শুধু এ জন্য যে, এ শহরটাও তাঁর, এই রাস্তাটাও তাঁর, আর এই বাসটাও তার।

লেখক: শিক্ষক ও সমাজবিশ্লেষক

Ad
Ad
ad
ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ, উত্তরণে প্রয়োজন অর্থনীতি-রাজনীতির সমন্বিত কৌশল

একটি নবনির্বাচিত বা নতুন গঠিত সরকারের সামনে রাষ্ট্র পরিচালনার নানাবিধ সংকট ও চ্যালেঞ্জ এসে দাঁড়ায়। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের পথচলা নিছক রুটিন রাষ্ট্র পরিচালনার বিষয় নয়; বরং এটি একই সঙ্গে রাজনৈতিক সমীকরণ সামলানো, গণআকাঙ্ক্ষা রক্ষা ও অর্থনৈতিক কাঠামোর ধ্বংসস্তূপ থেকে পুনরুত্থানের এক কঠিন পর

১৭ দিন আগে

সাংঘর্ষিক রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষণ এখনো দৃশ্যমান নয়

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূক্ষ্মতা স্পষ্ট করা দরকার— আমি রাজনৈতিক প্রতিবাদ বা আন্দোলনকে অন্যায় বলছি না। আমার মূল যুক্তিটি প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক নিয়ে— রাজপথকে যদি প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে রাখা হয়, তাহলে সংসদীয় গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

২০ দিন আগে

খাদ্য নিরাপত্তা— নতুন নেতৃত্বে নতুন প্রত্যাশা

মানুষের জীবনে কিছু প্রয়োজন আছে, যেগুলো নিয়ে কোনো আপস চলে না। খাদ্য তার প্রথম সারিতে। সকালে শ্রমজীবী মানুষের নাশতার রুটি, দুপুরে পরিবারের ভাতের হাঁড়ি, কৃষকের গোলায় ধান কিংবা দুর্যোগে অসহায় মানুষের হাতে পৌঁছে যাওয়া খাদ্যসহায়তা—সবকিছুর পেছনেই রয়েছে একটি বিশাল রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা। সেই ব্যবস্থাপনার কেন

২২ দিন আগে

আমরা যা দেখাই, আমরা কি সত্যিই তাই?

মানুষের একটা অদ্ভুত স্বভাব আছে— সে নিজেকে যেমন, তার চেয়ে একটু ভালো করে দেখাতে চায়। আগে এই প্রবণতার সীমা ছিল পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, অফিস কিংবা বন্ধুমহল পর্যন্ত। এখন সেই ছোট পরিসরটি বিস্ফোরিত হয়ে গেছে। হাতে একটি স্মার্টফোন, সামনে একটি ক্যামেরা, আর পেছনে কোটি কোটি দর্শকের সম্ভাবনা। ফলে মানুষ এখন

২৪ দিন আগে
Advertisement