রাজপথ থেকে ‘গিরিপথে’ জ্বালানি সংকটে বন্দি জনজীবন— সমাধান কোথায়?

জাকির আহমদ খান কামাল
আপডেট : ২৮ মার্চ ২০২৬, ২০: ১৯
নেত্রকোনার পূর্বধলায় গিরিপথ ফিলিং স্টেশনে শুক্রবার গভীর রাতেও তেলের জন্য মানুষের ভিড়। ছবি: লেখকের সৌজন্যে

দেশের জ্বালানি খাতের সামান্য অস্থিরতাও কীভাবে জনজীবনে তীব্র প্রভাব ফেলে, তার এক জীবন্ত চিত্র আজ দেখা যাচ্ছে নেত্রকোনার পূর্বধলার গিরিপথ ফিলিং স্টেশনে। তীব্র সংকটের কারণে প্রতি মোটরসাইকেলে মাত্র ১০০ টাকার জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে, তাও আবার পুলিশ প্রহরায় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে!

গতকাল শুক্রবার (২৭ মার্চ) রাত ৯টা থেকে ১২টা পর্যন্ত এমন দৃশ্য দেখা গেল নেত্রকোনার পূর্বধলায়। তবে এ দৃশ্য কেবল একটিমাত্র এলাকার নয়, দেশের আরও অনেক এলাকার। এটি কি বৃহত্তর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা? নাকি সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন?

সম্ভবত এসব দিক বিবেচনায় নিয়েই আজ শনিবার (২৮ মার্চ) তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা ইমরানুল হাসানের সই করা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সরকার চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রয়োজনীয় তেল কিনছে। ফলে দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ঘাটতির কোনো সম্ভাবনা নেই। দেশের সব পাম্পে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে ট্যাগ অফিসার।

সতর্ক করে আরও বলা হয়েছে, পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল অত্যন্ত দাহ্য পদার্থ। এ ধরনের জ্বালানি তেল ব্যক্তিগতভাবে মজুত করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। যারা অতিরিক্ত লাভের আশায় অবৈধভাবে জ্বালানি তেল মজুত করছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে বিজ্ঞপ্তিতে জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুতকে ‘না’ বলার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সরকার যাই বলুক, ভুক্তভোগী তথা সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যাচ্ছে— ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও পর্যাপ্ত জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না। কর্মজীবী মানুষ, জরুরি সেবা প্রদানকারী কিংবা দৈনন্দিন কাজে নির্ভরশীল সাধারণ নাগরিক— সবাই পড়ছেন চরম ভোগান্তিতে।

১০০ টাকার জ্বালানি দিয়ে একটি বাইক কত দূরই বা চলতে পারে? ফলে একই ব্যক্তি বারবার লাইনে দাঁড়াতে বাধ্য হচ্ছেন, যা সময় ও শ্রমের অপচয় তো বটেই, জনদুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

গিরিপথ ফিলিং স্টেশনের মতো দেশের সব ফিলিং স্টেশনেই একেকজনের কাছে জ্বালানি তেল বিক্রি করা হচ্ছে খুব অল্প পরিমাণে। ছবি: লেখকের সৌজন্যে
গিরিপথ ফিলিং স্টেশনের মতো দেশের সব ফিলিং স্টেশনেই একেকজনের কাছে জ্বালানি তেল বিক্রি করা হচ্ছে খুব অল্প পরিমাণে। ছবি: লেখকের সৌজন্যে

ফুয়েল স্টেশনে পুলিশের পাহারা পরিস্থিতির গুরুত্বকেই তুলে ধরে। এটি ইঙ্গিত করে, চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা এতটাই প্রকট যে নিয়ন্ত্রণের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা প্রয়োজন হচ্ছে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়— এই সংকট কি হঠাৎ সৃষ্টি, নাকি পূর্বপরিকল্পনার অভাবের ফল?

জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় যদি যথাযথ পরিকল্পনা ও নজরদারি থাকত, তাহলে এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হওয়ার কথা নয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও পূর্বধলায় ভিন্ন চিত্র। এখানে বেশি দামে বিক্রির জন্য দালাল ও খুচরা ব্যাবসায়ীদের টেংকি ভরে গভীর রাতে জ্বালানি পাচার হতে দেখা যায়। ফিলিং স্টেশনের কাছেই সারি সারি খালি টেংকি দেখতে পাওয়া যায়।

নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় কেন এমন সংকট দেখা দেয়, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। কোথাও কি মজুতদারি, কৃত্রিম সংকট তৈরি বা পরিবহন জটিলতা রয়েছে? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত কারণ উদঘাটন করা।

অন্যদিকে এ সংকট আমাদের জ্বালানিনির্ভরতার বাস্তবতাও সামনে নিয়ে আসে। বিকল্প জ্বালানি, গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও জ্বালানি ব্যবহারে সচেতনতা— এই তিনটি দিকেই এখন জোর দেওয়া প্রয়োজন। শুধু সরবরাহ বাড়ালেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী নীতি ও কার্যকর বাস্তবায়ন।

স্থানীয় প্রশাসনেরও এখানে সক্রিয় ভূমিকা থাকা উচিত। লাইনে শৃঙ্খলা বজায় রাখা, সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এবং অসাধু চক্রের তৎপরতা রোধ করা— এসব বিষয়ে কঠোর নজরদারি জরুরি। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে সঠিক তথ্য জানানোও গুরুত্বপূর্ণ, যেন গুজব বা অহেতুক আতঙ্ক পরিস্থিতিকে আরও জটিল না করে তোলে।

সবশেষে বলা যায়, গিরিপথ ফিলিং স্টেশনের এই দৃশ্য একটি বড় সংকেত— আমাদের জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় কোথাও না কোথাও ফাঁক রয়েছে। এই সংকট শুধু সাময়িক ভোগান্তি নয়, এটি একটি সতর্কবার্তা। এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও বড় সংকটে পড়তে হতে পারে। জনস্বার্থে দ্রুত ও টেকসই সমাধানই একমাত্র পথ।

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

মেগা-ইভেন্ট: ভূ-রাজনৈতিক শক্তির হাতিয়ার

ফিফা বিশ্বকাপ, অলিম্পিক গেমসের মতো, প্রায়শই ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও মানবিক সাফল্যের উৎসব হিসাবে উপস্থাপিত হয়। কিন্তু জৌলুস আর আড়ম্বরের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও তাৎপর্যপূর্ণ এক বাস্তবতা: মেগা-ক্রীড়া ইভেন্টগুলো আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

৯ দিন আগে

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রক্ষায় রাষ্ট্রের পদক্ষেপ জরুরি

প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতি মানুষের জীবনকে সহজ, দ্রুত এবং বিশ্বসংযুক্ত করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর এই বিশ্ব নতুন কিছু সামাজিক, মানসিক ও শিক্ষাগত সংকটও তৈরি করেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্ফোরণমূলক বিস্তার শিশু, কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের বিকাশ, শিক্ষাগ্রহণ, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা এ

১১ দিন আগে

বিআরআই: আঞ্চলিক ভূরাজনীতির বাস্তবতা ও বাংলাদেশের কৌশলগত সুযোগ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরকে ঘিরে বেইজিংয়ের কূটনৈতিক তৎপরতা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করছে যে বাংলাদেশকে এখন আর কেবল একটি উন্নয়ন সহযোগী দেশ হিসেবে দেখা হচ্ছে না, বরং দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার উদীয়মান ভূরাজনৈতিক সমীকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

১১ দিন আগে

খোলা চিঠি: রাষ্ট্র, মানুষ ও আস্থার সংকট

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আসসালামু আলাইকুম। এই চিঠি আপনার কাছে পৌঁছাবে কি না, জানি না। কিন্তু আমি জানি, বাংলাদেশের মাটি, নদী, মাঠ, জনপদ, শহর, বন্দর, শ্রমিক কলোনি, চরাঞ্চল, পাহাড়, চা বাগান এবং বস্তির মধ্যে যে দীর্ঘশ্বাস প্রতিদিন ঘুরে বেড়ায়, তার ভাষা একদিন না একদিন রাষ্ট্রের দরজায় কড়া নাড়বেই।

১২ দিন আগে