নির্বাচনের তিন দিন আগে এমন চুক্তি না করলে কি মাথায় বাজ পড়বে?

আনু মুহাম্মদ

জাতীয় নির্বাচনের বাকি আর মাত্র কয়েকদিন। এমন সময়ে এসেও অন্তর্বর্তী সরকার নানা ধরনের চুক্তি করে চলেছে, নানা ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে চলেছে। এই সময়ে এসে অন্তর্বর্তী সরকারের এসব চুক্তি, সমঝোতা বা খসড়া খুবই রহস্যজনক।

প্রশ্ন ওঠে— এসব চুক্তি করতে সরকারের দায়বদ্ধতা কোথায় এবং কীসের? এত সমালোচনা, প্রশ্ন ও বিরোধিতার মধ্যে তো এগুলো করার কথা নয়। বিশেষ করে যখন এসব খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষজন, বিশেষ করে প্রধান অংশীদার ব্যবসায়ীরাও এসব চুক্তি নিয়ে অনেকটাই অন্ধকারে রয়েছেন। তাদের সঙ্গে ঠিকমতো কথাও বলা হয়নি।

প্রকৃতপক্ষে দেশের প্রয়োজনের সঙ্গে এসব কর্মকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক নেই। যদি থাকত, তাহলে সরকার এর ব্যাখ্যা দিতে পারত। আমরা জাতীয় উন্নয়ন বা অর্থনীতির বিকাশের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক দেখি না।

অন্তর্বর্তী সরকার যেভাবে যেকোনো মূল্যে চুক্তি করতে বাধ্য হচ্ছে, তাতে মনে হয় তাদের কোথাও কোনো অঙ্গীকার করা আছে। রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যৎ চিন্তা, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বা কমিশন, যেটাই হোক না কেন, কমিশনের বিষয় থাকে। কিন্তু এই সরকারের কী আছে? সেটিই বড় প্রশ্ন। নির্বাচনের তিন দিন আগে এমন চুক্তি না করলে কি মাথায় বাজ পড়বে বা বাংলাদেশের বড় ধরনের সর্বনাশ হয়ে যাবে?

যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক চুক্তি বহুবার সংশোধন করেছে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, এর পরিবর্তন হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উচিত ছিল সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া। তা না করে ট্রাম্প ঘোষণা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়লেন, সেটি সঠিক ছিল না। কারণ আমরা দেখতে পাচ্ছি— শুল্ক কমাতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়াতে হবে, অস্ত্র কিনতে হবে, গোপনীয়তা রাখতে হবে, চীনের সঙ্গে সম্পর্কের সীমারেখা টানতে হবে।

কেবল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির সিদ্ধান্ত নয়, অন্তর্বর্তী সরকারের যে দায়িত্ব, তাতে এমন আরও অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া তার এখতিয়ারে পড়ে না। তারা আলোচনা করতে পারে, সুপারিশ করতে পারে; যেমন সংস্কার কমিশন করেছে। এ নিয়ে আলাপ-আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত আসবে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে রাজনীতি ও অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে— এমন কোনো কাজ তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। এগুলো করা এক ধরনের অপরাধও বটে।

এই সরকারের ওপর বিদেশে অবস্থান করা কিছু ব্যক্তির প্রভাব লক্ষ্যণীয়, যাদের বাংলাদেশ সম্পর্কে বোঝাপড়া বা ভূমিকা কখনোই ছিল না। তারা বিশেষ সহকারী বা উপদেষ্টা পদের আড়ালে বিদেশি কোম্পানি বা অন্য রাষ্ট্রের লবিস্ট হিসেবে কাজ করছেন বলে মনে হয়। বাংলাদেশে জন্ম হলেও তারা এখন বিদেশি নাগরিক, আর কদিন পর চলে যাবেন।

আগামী ৫০ বছরে বাংলাদেশ কোথায় যাবে— এসব লোকজন দিয়ে সেসব বিষয়ে পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়গুলো হাস্যকর। তাদের ন্যূনতম কোনো জবাবদিহি কিন্তু থাকছে না।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান কাজ হলো একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক রূপান্তর এগিয়ে নেওয়া। এ জন্য যে ধরনের সংস্কার দরকার, সে সংস্কার নিশ্চিত করতে হ। আর কদিন পর নির্বাচন। নির্বাচন ভালোমতো করার জন্য যা যা করা দরকার, সেটি করার জন্য এখন মনোযোগ দেওয়া দরকার।

সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য দরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক করা। পাশাপাশি সর্বস্তরের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অথচ এসব দিকে সরকারের মনোযোগ বা সক্রিয়তা ততটা নেই। বরং যেটিতে তাদের এখতিয়ার নেই, সেই দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতেই তাদের যত আগ্রহ।

অন্তর্বর্তী সরকার এখন রীতিমতো জোরজবরদস্তি করে এসব চুক্তি করছে। দেশের মানুষ, বিশেষজ্ঞ— কারও কথা না শুনে, জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা না করে ভয় দেখিয়ে একের পর এক চুক্তি করছে।

বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করছি, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো এসব রহস্যজনক চুক্তিগুলোর বিষয়ে নীরবতা পালন করছে। এ দেখে মনে হয়, তারা কথা বললে কেউ রুষ্ট হতে পারে— এমন ভাবনা তাদের মধ্যে কাজ করছে। তা না হলে জাতীয় স্বার্থবিরোধী এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তাদের চুপ থাকার কথা নয়। এই দায় তাদের ওপরেও কিন্তু বর্তাবে।

তাই রাজনৈতিক দলগুলোকেও নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে। সরকার যেসব ‘স্পর্শকাতর’ সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কিংবা বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যেসব চুক্তি করছে সেগুলো সম্পর্কে তারা কী ভাবছে, সেটি তাদেরই স্পষ্ট করতে হবে জনগণের সামনে।

লেখক: অর্থনীতিবিদ; সাবেক অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

হাম বিতর্কে মায়ের ওপর দায় চাপানো বন্ধ করুন

কিছুসংখ‍্যক মানুষ গত কয়েকদিন ধরে এই কথা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছেন যে, মায়েরা তাদের শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না, তাই হামের সংক্রমণ বাড়ছে! শিশুরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে। আর ‘কান নিয়েছে চিলে’— সেই কানের খোঁজ না করেই কিছু মূলধারার সংবাদমাধ্যম লিখেছে, মায়েরা শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না বলেই হামের

৫ দিন আগে

পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলকে হটিয়ে বিজেপি— নির্বাচনি ফলাফলের কাটাছেঁড়া

তৃণমূল নেতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভোট ব্যাংক ছিল মূলত সংখ্যালঘু ও নারী ভোট। ফলাফলে দেখা গেছে, যে তৃণমূলের ৮০ জন জয়ী প্রার্থীর মধ্যে ৩২ জন মুসলিম, যা ঠিক ঠিক ৪০ শতাংশ। এ ছাড়া অন্যান্য দলের আরও ছয়টি আসনে মুসলিম প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। তাহলে কংগ্রেস, সিপিএম ও বিশেষত নওসাদ সিদ্দিকির ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট

৬ দিন আগে

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বেজে উঠেছে পুরোদস্তুর এক মহাযুদ্ধের দামামা

চলমান এই স্নায়ুযুদ্ধ যদি সত্যি সত্যি আগামী সপ্তাহে পূর্ণাঙ্গ সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়, তবে তার মাশুল শুধু মধ্যপ্রাচ্যকে নয়, বরং পুরো বিশ্বকে দিতে হবে। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ আর পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই সংঘাত কূটনৈতিক টেবিলে সমাধান হবে, নাকি বিশ্বকে এক নতুন অর্থনৈতিক মন্দা ও তৃতীয়

৮ দিন আগে

বাংলাদেশ-ভারতের স্বার্থে ফারাক্কা ভেঙে দেওয়া প্রয়োজন

ফারাক্কা বাঁধ চালুর ৫২ বছর পর আজ স্বয়ং ভারতীয় রাজনীতিবিদরা যখন এটি ভেঙে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন, তখন ফারাক্কা বাঁধ যে কতটা ক্ষতিকর প্রকল্প তা বুঝতে আর কারও বাকি থাকার কথা নয়। ভারতীয় রাজনীতিবিদদের এই দাবির প্রেক্ষিতে ফারাক্কা বাঁধের অপ্রয়োজনীয়তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

৯ দিন আগে