বিজয়ের ৪৫ দিন পর স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়ল মিরপুরে

আপডেট : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ১৬: ৩৯
১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি লে. সেলিমের নেতৃত্বে একটি দল মিরপুর শত্রুমুক্ত করতে গিয়ে বিহারীদের অ্যামবুশের ফাঁদে পড়ে। বুলেটের আঘাতে তিনি আহত হয়েও যুদ্ধ চালিয়ে যান, পরে বিহারীদের হাতে আটক হলে তারা পৈশাচিক নির্যাতন চালিয়ে তাকে হত্যা করে। ছবি: সংগৃহীত

আজ মিরপুর মুক্ত দিবস। দুদিনের এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি মিরপুর শত্রুমুক্ত হয়। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জিত হলেও খুলনা, সিলেটসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যুদ্ধ চালিয়ে যায়। রাজধানী ঢাকার মিরপুর ছিলো তেমনি এক জনপদ।

একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ৯৩ হাজার সৈন্য নিয়ে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) নিয়াজী আত্মসমর্পণ করে। এ সময়ে প্রতীকী কিছু অস্ত্র সমর্পণ করা হয়। নিয়াজী তার অস্ত্র সমর্পণ করেন ১৮ ডিসেম্বর।

১৯ ডিসেম্বর সকাল পৌনে ১১টায় ঢাকা সেনানিবাসের গলফ মাঠে হানাদার বাহিনীর ৪৭৮ জন অফিসার অস্ত্র সমর্পণ করেন। এদিন ঢাকা সেনানিবাসের বিভিন্ন ইউনিটে প্রায় ৩০ হাজার সৈন্য মিত্রবাহিনীর কাছে সমর্পণ করেছেন। বিজয় দিবসের পরবর্তী দুই দিনে হানাদার বাহিনীর অনেকে সাদা পোশাকে ইউনিট ছেড়ে পালিয়ে যায়। তাঁরা সেখান থেকে মিরপুরে গিয়ে আশ্রয় নেয়।

স্বাধীনতার আগে থেকেই মিরপুরে ছিলো বিহারীদের বসবাস। দেশের যেসব এলাকায় বিহারীরা বসবাস করতো, সেইসব এলাকায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যুদ্ধ শুরুর পূর্ব থেকেই বিহারীদের সামরিক প্রশিক্ষণ দিতো। এই বিহারীরা বিভিন্ন সময়ে বাঙালিদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালাতো।

যুদ্ধ চলাকালে অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে পাকিস্তানি হানাদারা ২০ হাজার বিহারি নিয়ে সশস্ত্র "সিভিল আর্মড ফোর্সেস (সিএএফ)" গঠন করে। তাদের একটা বড় অংশ ছিল মিরপুরে। যুদ্ধের নয়মাস হানাদার বাহিনী ও রাজাকাররা ঢাকায় আতঙ্কের মধ্যে চলাচল করলেও মিরপুর ছিলো তাদের অভয়ারণ্য।

বিজয় অর্জনের পর মিরপুরে বিহারিদের সাথে যোগ দেয় রাজাকার, আলবদর, আলসামস ও দলছুট পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অনেকে। মোহাম্মদপুর সদর দপ্তর থেকেও হিজরতের নামে আলবদররা মিরপুরে চলে আসে। ফলে মিরপুর হয়ে ওঠে এক দুর্ভেদ্য দুর্গ।

নিয়াজীর আত্মসমর্পণের দলিলে বলা ছিলো, ...This surrender includes all PAKISTAN land, air and naval forces as also all para-military forces and civil armed forces. দলিলের এই প্যারা মিলিটারি ফোর্স ছিলো রাজাকার, সিএএফ, আলবদর, আলশামস বাহিনী। কিন্তু বাস্তবে এরা কেউই অস্ত্রসমর্পন করে নাই।

আগে থেকেই মিরপুর ছিলো স্বাধীনতা বিরোধীদের শক্ত অবস্থান। রাজাকার, আলবদর, আলসামস ও দলছুট পাকিস্তানি সৈন্যরা এসে এখানে জমায়েত হওয়ায় সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের ভেতর মিরপুর হয়ে ওঠে আরেক রাষ্ট্র। এ সময়ে ঢাকা থেকে মিরপুর প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এখান থেকে গোয়েন্দারাও তেমন তথ্যও পেতো না। এর ওপর বিহারিদের তৎপরতায় বিজয়ের ৪৫ দিন পরও সাধারণ মানুষের কাছে মিরপুর ছিলো ঢাকার বুকে এক টুকরো "মিনি পাকিস্তান"।

১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি, প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান, পুলিশ অফিসার লোদীসহ বেশ কয়েকজন বাঙালিকে বিহারী ও পাকিস্তানি বাহিনীর পলাতক সৈন্যরা নৃশংসভাবে হত্যা করে।

এই পরিস্থিতিতে মিরপুর শত্রুমুক্ত করা জরুরি হয়ে পড়ে। দ্বিতীয় ও চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে দায়িত্ব দেয়া হয় মিরপুরকে শত্রুমুক্ত করার। এমন জনবসতি এলাকা মুক্ত করার জন্য প্রয়োজন ছিল ঘরে ঘরে যুদ্ধ বা door to door fight। কারণ অবরুদ্ধ এমন এলাকায় প্রত্যেকটা বাড়িতে শত্রু অবস্থান করতে পারে। এ ধরনের অভিযানে ভারী অস্ত্র ও সামরিক যান ছাড়াই আক্রমণকারী বাহিনীকে প্রত্যেকটা বাড়িতে close quarters combat এর সম্মুখীন হতে হয়।

মিরপুর ১২, কালাপানি, মিরপুর সিরামিক্স, বর্তমান মিরপুর সেনানিবাস এলাকা ছিল শত্রুদের মূল ঘাঁটি। এই তথ্য নিয়ে ৩০ জানুয়ারি ক্যাপ্টেন হেলাল মোর্শেদ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের তিন প্লাটুন সৈন্য নিয়ে আগ্রসর হয়।

বীর মুক্তিযোদ্ধা লে. সেলিমের নেতৃত্বে একটি দল মিরপুর ১২ নম্বর দিয়ে এগিয়ে যায়। বেলা সাড়ে এগারোটা নাগাদ হঠাৎই লে. সেলিমের দল অ্যামবুশের ফাঁদে পড়ে। এ সময়ে বুলেটের আঘাতে লে. সেলিম আহত হন। আহত অবস্থায় তিনি যুদ্ধ চালিয়ে যান। কভার ফায়ার দিয়ে তিনি দলের অন্যদের নিরাপদ অবস্থানে সরে যাওয়ার সুযোগ করে দেন। কিন্তু নিজে আর নিরাপদ অবস্থানে আসতে পারেননি, বিহারীদের হাতে আটক হন। পৈশাচিক নির্যাতন চালিয়ে বিহারীরা তাকে হত্যা করে। এই অ্যামবুশে প্রায় ৪২ জন শহিদ হন।

অপর একটি গ্রুপ ডি ব্লকে প্রবেশ করে। সাথে সাথেই আশেপাশের সব বাড়ি থেকে হামলা শুরু হয়। মিরপুর সাড়ে এগারোতে অবস্থান নেওয়া হাবিলদার বাকীর প্লাটুনের ওপরও হামলা হয়। তিনি সাহসিকতার সাথে এই আক্রমণ প্রতিহত করেন।

বিহারীরা মিরপুর ১২ নম্বরের অস্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ির দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে তুমুল যুদ্ধ হয় সেখানে। বিকেলে ভারী অস্ত্র নিয়ে সেনাবাহিনী বিহারীদের অবস্থানে আক্রমণ চালায়। আক্রমণকালে ১২ নম্বর লক্ষ্য করে ৮১ মিলিমিটার মর্টার চার্জ করা হয়। সারা রাত যুদ্ধ চলে।

পরদিন ৩১ জানুয়ারি সকালে সেনাবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধারা সাঁড়াশি আক্রমন শুরু করে। আক্রমণে পিছু হটা শুরু করে বিহারীরা। মিরপুরের যুদ্ধে জিয়াউল হক লোদী, লেফটেন্যান্ট সেলিমসহ সামরিক বাহিনীর ৪১ জন এবং শতাধিক পুলিশ ও মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। অবশেষে ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি মিরপুর শত্রুমুক্ত হয়।

লেখক: চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের (ডিএফপি) সাবেক মহাপরিচালক

তথ্যসূত্র:

১. আলবদর (উর্দু ভাষায় রচিত), লেখক: সেলিম মনসুর খালেদ, পাকিস্তানী গবেষক।

২. একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায়। মুক্তিযুদ্ধ চেতনা বিকাশ কেন্দ্র।

৩. রোয়ার মিডিয়া।

Ad
Ad
ad
ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ, উত্তরণে প্রয়োজন অর্থনীতি-রাজনীতির সমন্বিত কৌশল

একটি নবনির্বাচিত বা নতুন গঠিত সরকারের সামনে রাষ্ট্র পরিচালনার নানাবিধ সংকট ও চ্যালেঞ্জ এসে দাঁড়ায়। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের পথচলা নিছক রুটিন রাষ্ট্র পরিচালনার বিষয় নয়; বরং এটি একই সঙ্গে রাজনৈতিক সমীকরণ সামলানো, গণআকাঙ্ক্ষা রক্ষা ও অর্থনৈতিক কাঠামোর ধ্বংসস্তূপ থেকে পুনরুত্থানের এক কঠিন পর

১৭ দিন আগে

সাংঘর্ষিক রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষণ এখনো দৃশ্যমান নয়

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূক্ষ্মতা স্পষ্ট করা দরকার— আমি রাজনৈতিক প্রতিবাদ বা আন্দোলনকে অন্যায় বলছি না। আমার মূল যুক্তিটি প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক নিয়ে— রাজপথকে যদি প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে রাখা হয়, তাহলে সংসদীয় গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

২০ দিন আগে

খাদ্য নিরাপত্তা— নতুন নেতৃত্বে নতুন প্রত্যাশা

মানুষের জীবনে কিছু প্রয়োজন আছে, যেগুলো নিয়ে কোনো আপস চলে না। খাদ্য তার প্রথম সারিতে। সকালে শ্রমজীবী মানুষের নাশতার রুটি, দুপুরে পরিবারের ভাতের হাঁড়ি, কৃষকের গোলায় ধান কিংবা দুর্যোগে অসহায় মানুষের হাতে পৌঁছে যাওয়া খাদ্যসহায়তা—সবকিছুর পেছনেই রয়েছে একটি বিশাল রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা। সেই ব্যবস্থাপনার কেন

২২ দিন আগে

পিংক বাস: একটি রঙ, একটি পরিবর্তন ও অনেক প্রশ্ন

বাংলাদেশের গণপরিবহনে নারীদের জন্য ‘পিংক বাস’ চালু হওয়া নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ঢাকার রাস্তায় যখন নারী চালক, নারী সহকারী আর নারী যাত্রীদের নিয়ে বাস চলছে, তখন সেটা দেখতে ভালো লাগে। কিন্তু এই ভালো লাগার ভেতরেই কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন লুকিয়ে আছে, যে প্রশ্নগুলো শুধু বাসের রং নিয়ে নয়, বরং আ

২৩ দিন আগে
Advertisement