ঋণে জর্জরিত এবং যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত বিশ্ব অর্থনীতি

সমসাময়িক বিশ্ব অর্থনীতির প্রেক্ষাপট আজ প্রবৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষা থেকে বিচ্যুত হয়ে এক রক্ষণাত্মক ও সংকোচনমূলক পরিস্থিতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। প্রথাগত মন্দা সাধারণত ব্যবসায়িক চক্রের স্বাভাবিক উত্থান-পতনের কারণে ঘটে। কিন্তু বর্তমানে লক্ষণগুলো আরও গভীরতর কাঠামোগত ব্যাধির ইঙ্গিত দিচ্ছে, যাকে অর্থনীতিবিদরা ‘গ্লোবাল ব্যালান্স শিট রিসেশন’ বা ‘বৈশ্বিক উদ্বর্তপত্র মন্দা’ হিসেবে উল্লেখ করছেন। ২০২৬ সালের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বহুমুখী যুদ্ধের সংকট এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

এই সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে বেসরকারি খাতের আচরণের মৌলিক পরিবর্তন। দীর্ঘ সময় ধরে ‘সহজলভ্য ঋণ’ (ইজি মানি) গ্রহণের পর সুদের হার হঠাৎ করে বেড়ে গেলে বেসরকারি খাতের ঋণের বোঝা পাহাড়সম হয়ে দাঁড়ায়। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাথমিক লক্ষ্য ‘মুনাফা সর্বোচ্চকরণ’ থেকে সরে গিয়ে ‘ঋণ সর্বনিম্নকরণে’ কেন্দ্রীভূত হয়।

এমন পরিস্থিতিতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ গ্রহণে অনীহা প্রদর্শন করে (Debt-Allergic)। মূল্যস্ফীতি কমে গেলেও তারা নতুন বিনিয়োগ বা উদ্ভাবনের পরিবর্তে নিজেদের ‘ব্যালান্স শিট’ মেরামতের দিকে বেশি নজর দেয়। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার কমালেও বাজারে তার সুফল সীমিত থাকে। কারণ বেসরকারি খাত কেবল টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকে।

মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনে চলমান সংঘাত এখন আর কেবল আঞ্চলিক সমস্যা নয়; বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতির ‘সাপ্লাই চেইনে’র জন্য বড় একটি ধাক্কা। যুদ্ধ কেবল অবকাঠামো ধ্বংস করছে না, বরং জ্বালানি ও বাণিজ্যের বৈশ্বিক স্নায়ুতন্ত্রকে অচল করে দিচ্ছে।

যুদ্ধ সরাসরি উৎপাদন ও পরিবহণকে প্রভাবিত করছে। চলমান সংঘাত কাঁচামালের সরবরাহে বড় শক তৈরি করেছে। তেলের দাম বেড়ে যাওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও খাদ্যদ্রব্যের সরবরাহে বাধা বিশ্ববাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ প্রবাহ এবং মুদ্রা বাজারও প্রভাবিত হযচ্ছে। ঝুঁকি বাড়লে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সরাসরি অর্থ বাজার থেকে সরে যায়।

এমন পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাতও বিনিয়োগে অনীহা প্রদর্শন করছে। যুদ্ধের কারণে উৎপাদন খরচ যখন আকাশছোঁয়া, তখন সামগ্রিক চাহিদা বজায় রাখার দায়িত্ব সরাসরি রাষ্ট্রের ওপর এসে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে একটি বৈশ্বিক ‘হারানো দশক’ (Lost Decade) এড়াতে নিচের পদক্ষেপগুলো অপরিহার্য—

  • রাষ্ট্রকে ‘ঋণগ্রহীতা’ হিসেবে এগিয়ে আসা: বেসরকারি খাতের শূন্যতা পূরণে সরকারকে বড় ধরনের জনকল্যাণমূলক ও কৌশলগত বিনিয়োগ প্রকল্প হাতে নিতে হবে। উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় বাড়িয়ে জিডিপি পতন প্রতিরোধ সম্ভব।
  • সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণ: শিল্প উৎপাদন ব্যয় কমাতে সুনির্দিষ্ট নীতি প্রয়োগ অপরিহার্য। যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বাড়লে শিল্প খাতের জন্য সরাসরি সহায়তা বা বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থা করতে হবে।
  • সুশাসনসহ মূলধন পুনর্ভরণ: ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্থবিরতা কাটাতে মূলধন সরবরাহ করতে হবে, তবে শর্তসাপেক্ষে, যাতে অর্থনীতির মূল কাঠামোর দিকে মূলধন পৌঁছায়।

আজকের বিশ্ব অর্থনীতি ঋণের ভারে জর্জরিত এবং যুদ্ধের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত। কেবল মুদ্রানীতির ওপর নির্ভর করে পুনর্জীবন সম্ভব নয়। স্থবিরতা কাটিয়ে টেকসই পুনরুদ্ধারের জন্য সাহসী, কৌশলগত রাজস্ব হস্তক্ষেপ অপরিহার্য।

* এই নিবন্ধে উপস্থাপিত তথ্য ও বিশ্লেষণ একান্তই লেখকের ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ এবং শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে রচিত। এটি কোনো প্রকার আর্থিক, বিনিয়োগ বা আইনি পরামর্শ হিসেবে গণ্য হবে না।

লেখক: কলামিস্ট ও অর্থনীতি বিষয়ক বিশ্লেষক

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

হজের শিক্ষা: ব্যক্তি পরিবর্তন থেকে সমাজ উন্নয়ন

হজ শুধু একটি ইবাদত নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রশিক্ষণ। এর মাধ্যমে একজন ব্যক্তি আত্মশুদ্ধি অর্জন করেন এবং সমাজের জন্য একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠেন। ব্যক্তি পরিবর্তনের মাধ্যমেই সমাজ উন্নয়ন সম্ভব— এই চিরন্তন সত্য হজ আমাদের শিখিয়ে দেয়।

৩ দিন আগে

ছাত্র ইউনিয়ন ও আগামীর সাংস্কৃতিক আন্দোলন

বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের জন্ম ও বিকাশ একটি নির্দিষ্ট আদর্শিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে— প্রগতিশীলতা, অসাম্প্রদায়িকতা, বিজ্ঞানমনস্কতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা। এই চারটি স্তম্ভ কেবল রাজনৈতিক অবস্থান নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক দর্শনেরও প্রতিনিধিত্ব করে। ফলে তাদের প্রতিটি আন্দোলন, প্রতিটি কর্মসূচি সরাসরি

৩ দিন আগে

পরীক্ষার হল কি রাজনৈতিক মঞ্চ?

পরীক্ষার কক্ষে পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারও প্রবেশ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে— মন্ত্রী, এমপি, বিরোধী নেতা কিংবা সাংবাদিক— কেউই এর ব্যতিক্রম নন। আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। কোনো ধরনের প্রদর্শনমূলক কার্যক্রম বা রাজনৈতিক উপস্থিতি এই সংবেদনশীল পরিবেশে অনুমোদন করা উচিত নয়।

৬ দিন আগে

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন সরকারের অগ্রাধিকারে থাকা আবশ্যক

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসব দেশের সঙ্গে আলোচনায় রোহিঙ্গা ইস্যুটি অগ্রাধিকারে রাখলে এবং পূর্বের ন্যায় দ্বিপাক্ষিক, ত্রিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখলে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব বলে আশা করা যায়।

৬ দিন আগে