কারও লাভ হয়নি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাংলাদেশ

অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী
আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২৫, ১১: ০৪

গোপালগঞ্জে যা ঘটেছে তা খুবই দুঃখজনক, হতাশজনক। দিনভর সংঘর্ষ, রক্তপাত, হামলা, ১৪৪ ধারা, কারফিউ— এসব মোটেও ভালো লক্ষণ নয়। এ সহিংসতায় আসলে লাভবান কেউ হয়নি, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাংলাদেশ।

এমন সময় এ ঘটনা ঘটেছে যখন গণঅভ্যুত্থানের এক বছর উপলক্ষ্যে নানা কর্মসূচি শুরু হয়েছে। গতকাল বুধবার (১৬ জুলাই) পালিত হলো শহিদ আবু সাঈদ দিবস, জুলাই আন্দোলনে প্রথম শহিদ আবু সাঈদের স্মরণে। এই তরুণ পুলিশের গুলির সামনে দুই হাত প্রসারিত করে বুক পেতে দিয়েছিল। সেই ১৬ জুলাই যে ঘটনা ঘটল, তার রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেশি। এর নেপথ্যে নানা ষড়যন্ত্র থাকতে পারে।

ভারতের গণমাধ্যমে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর মাটিতে মিশিয়ে দেওয়ার দৃষ্টান্ত তুলে ধরে বলা হলো, এবার শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধি ভাঙতে যাচ্ছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটি এখনকার এ পরিস্থিতিতে সেখানে কেন সমাবেশ করতে গেল, তাও বড় প্রশ্ন।

এনসিপির নেতারাও ফেসবুকে নানা বক্তব্য রেখেছেন। এ বিষয়টি সরকার বা রাজনৈতিক দলগুলো ঠিকমতো সামাল দিতে পারেনি। কিন্তু পরাজিত শক্তি এই প্রথম এক ধরনের সাহস দেখাতে পেরেছে। সেখানকার স্থানীয়রা ওই শক্তির পাশে দাঁড়িয়েছে।

কেন এক বছর বাদে এমন ঘটনা ঘটল? কারণ জুলাই-আগস্টের পর যে বিপ্লবী সরকার গঠন হওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি। কাটাছেঁড়া করা সংবিধানের অধীনে শপথ নিয়ে যে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে, সেটি ঠিকমতো কাজ করতে পারছে না। সংস্কার ও বিচার সেভাবে দৃশ‍্যমান হয়নি।

তাছাড়া এই সরকার গত সরকারের সহযোগীদের শুদ্ধিকরণ বা অপসারণ করতে পারেনি। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের হাতে অস্ত্র আছে, টাকা আছে, ত‍্যাগী কর্মী বাহিনী আছে, পুলিশ ও প্রশাসনে তাদের লোকজন আছে, আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতিশীল মানুষ আছে, এমনকি বিএনপির মধ্যেও আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতিশীল মানুষ আছে। ফলে তারা যথেষ্ট শক্তিশালী।

GopalGanj Clash Photo 6-07-2025 (3)

এনসিপির সমাবেশ ঘিরে বুধবার রণক্ষেত্রে পরিণত হয় গোপালগঞ্জ। ছবি: ফোকাস বাংলা

আর প্রতিবেশী দেশ ভারতের অবস্থান তো কারও অজানা নয়। এসব সুবিধাই পরাজিত শক্তি নিচ্ছে বা নিতেই থাকবে। এমনকি এ-ও মনে করা হয়, বাংলাদেশে বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ হলে আওয়ামী লীগ স্বাগত জানাবে!

এত কিছুর মধ্যে আবার ৫ আগস্ট ঘিরে যে রাজনৈতিক ঐক‍্য গড়ে উঠেছিল, তার মধ্যে তৈরি হয়েছে ভয়ংকর ফাটল।

আরও একটি কথা না বললেই নয়, গত জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সঙ্গে ছিল প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। রিকশাচালক বা শ্রমজীবী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ এই আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে গেছে। কিন্তু এলিট শ্রেণি, যারা এ দেশের ৮০ শতাংশ সম্পদ উপভোগ করে, তাদের একটি অংশ নতুন বাংলাদেশ চায় না।

আগস্টের পর যে ধরনের সরকার-সংস্কার ও বিচার প্রয়োজন ছিল, তা গত এক বছরে দৃশ্যমান হয়নি। উপরোক্ত বিভিন্ন কারণে সরকারের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জনগণ বেশ কিছুটা হতাশ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে। সামাজিক অস্থিরতা বাড়ছে। জনরোষের শিকার হচ্ছে বহু মানুষ।

একটু খেয়াল করলে দেখা যায় পরিকল্পিতভাবে দেশে অস্থিতিশীল অবস্থা তৈরি করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা জাতীয় রাজনীতিতে যেমন উত্তেজনা তৈরি করেছে, তেমনি নানা আলোচনা-সমালোচনারও জন্ম দিয়েছে।

গত বছরের ১৮ জুলাই শেখ হাসিনার গুলির নির্দেশের ফাঁস হওয়া অডিও রেকর্ডিং নিয়ে বিবিসির প্রতিবেদন, ঢাকায় মিটফোর্ড হাসপাতাল এলাকায় রাস্তায় প্রকাশ্য দিবালোকে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা, খুলনায় যুবদলের এক নেতাকে হত্যার পর পায়ের রগ কেটে দেওয়া, চাঁদপুরে মসজিদের ভেতরে ইমামকে চাপাতি দিয়ে কোপানোসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় হামলা, চাঁদাবাজিসহ কিছু ঘটনা আলোচনায় এসেছে।

সবশেষ বুধবার গোপালগঞ্জে দিনব্যাপী যা ঘটল, তা ভয়াবহ। সবকিছুই একে অন্যকে ছায়া দিচ্ছে এবং একটি অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরির পথে এগিয়ে নিচ্ছে বাংলাদেশকে।

আমার মনে হয়, গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে একটি বিপ্লবী সরকার হওয়া উচিত ছিল। বিপ্লবী সরকার গঠিত না হলেও অন্তর্বর্তী সরকার একটি স্পষ্ট আইনি কাঠামোর মধ্য দিয়ে গণপরিষদ নির্বাচন আয়োজন করতে পারত। সেই নির্বাচন থেকে দুই বছরের মধ্যে একটি সংশোধিত ও গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়ন সম্ভব হতো। এর মাধ্যমেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারত। সে ক্ষেত্রে আজকের এই অনিশ্চয়তা ও দ্বন্দ্বের জায়গা থাকত না। রোজ রোজ রাজনৈতিক দলগুলোকে ডেকে এভাবে সংবিধান সংশোধনসহ সংস্কারের কথা বলতে হতো না।

যে অবস্থা দেখছি তাতে জাতীয় নির্বাচন করা মনে হয় কঠিন হবে। এখন তো রাজনৈতিক দলগুলো ঐক‍্যের পরিবর্তে নিজেদের মধ‍্যে বিভেদ বাড়াচ্ছে এবং একে অন্যকে দোষারোপ করে চলছে। এর ফলে সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে।

এখন মনে হচ্ছে, অনেকেরই দেশের কথা বা মানুষের কথা ভাবার সময় নেই। আসলেই আমাদের অস্তিত্বে টান পড়েছে। ১৮ কোটি মানুষের ভাগ্যের কথা বিবেচনা করে রাজনেতিক দলগুলো এখনই যদি ঐক্যের পথে না হাঁটে তাহলে বড় বিপদ অপেক্ষা করছে। যে অশুভ শক্তিকে তাড়ানোর জন্য সবাই মিলে সংগ্রাম করেছি, সেই শক্তি সবাইকে আবার চেপে ধরবে।

এ অবস্থায় এই সংকট থেকে বের হওয়া খুবই কঠিন। তবে জাতীয় স্বার্থে ৫ আগস্টের পর যে ঐক্য এসেছিল, তা ফিরিয়ে আনতেই হবে। এর তো কোনো বিকল্প দেখি না।

লেখক: রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিষয়ের সাবেক অধ্যাপক

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

মেগা-ইভেন্ট: ভূ-রাজনৈতিক শক্তির হাতিয়ার

ফিফা বিশ্বকাপ, অলিম্পিক গেমসের মতো, প্রায়শই ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও মানবিক সাফল্যের উৎসব হিসাবে উপস্থাপিত হয়। কিন্তু জৌলুস আর আড়ম্বরের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও তাৎপর্যপূর্ণ এক বাস্তবতা: মেগা-ক্রীড়া ইভেন্টগুলো আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

৯ দিন আগে

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রক্ষায় রাষ্ট্রের পদক্ষেপ জরুরি

প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতি মানুষের জীবনকে সহজ, দ্রুত এবং বিশ্বসংযুক্ত করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর এই বিশ্ব নতুন কিছু সামাজিক, মানসিক ও শিক্ষাগত সংকটও তৈরি করেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্ফোরণমূলক বিস্তার শিশু, কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের বিকাশ, শিক্ষাগ্রহণ, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা এ

১১ দিন আগে

বিআরআই: আঞ্চলিক ভূরাজনীতির বাস্তবতা ও বাংলাদেশের কৌশলগত সুযোগ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরকে ঘিরে বেইজিংয়ের কূটনৈতিক তৎপরতা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করছে যে বাংলাদেশকে এখন আর কেবল একটি উন্নয়ন সহযোগী দেশ হিসেবে দেখা হচ্ছে না, বরং দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার উদীয়মান ভূরাজনৈতিক সমীকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

১২ দিন আগে

খোলা চিঠি: রাষ্ট্র, মানুষ ও আস্থার সংকট

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আসসালামু আলাইকুম। এই চিঠি আপনার কাছে পৌঁছাবে কি না, জানি না। কিন্তু আমি জানি, বাংলাদেশের মাটি, নদী, মাঠ, জনপদ, শহর, বন্দর, শ্রমিক কলোনি, চরাঞ্চল, পাহাড়, চা বাগান এবং বস্তির মধ্যে যে দীর্ঘশ্বাস প্রতিদিন ঘুরে বেড়ায়, তার ভাষা একদিন না একদিন রাষ্ট্রের দরজায় কড়া নাড়বেই।

১২ দিন আগে