
মিতা রহমান

মানুষ মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে। কিন্তু এরই মাঝে কিছু মৃত্যু পাহাড়ের চেয়ে ভারী মনে হয়। বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যু অনেকটা সে রকম।
গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে আগমন, দীর্ঘ ৯ বছর স্বৈরাচারী সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলন, আপসহীন দেশনেত্রীতে রূপান্তর, দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়া, ওয়ান-ইলেভেনের মঈনউদ্দিন-ফখরুদ্দিনের সঙ্গে আপস না করে দেশের মাটিতে অবস্থান, বিগত প্রায় ১৭ বছর স্বৈরাচারী শাসকের প্রতিহিংসার শিকার হয়েও আপস না করে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জাতীয় বীরের সম্মানে ভূষিত হওয়া— সবকিছুই একটি কালের অধ্যায়। পৃথিবীতে খুব কম রাজনৈতিক নেতৃত্বই এমন সম্মানে ভূষিত হয়েছেন।
সব শ্রেণি, সব মতের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিই সব বলে দিয়েছে। গত ৩১ ডিসেম্বর তার জানাজায় লাখো মানুষের জনস্রোত ছিল মানুষের ভালোবাসারই বহির্প্রকাশ। তারা এসেছিলেন নিজেদের ভেতরের এক তাগিদ থেকে, এমন একজন মানুষকে শ্রদ্ধা জানাতে, যাকে তারা নিজেদেরই প্রতিনিধি মনে করতেন।
খালেদা জিয়ার সঙ্গে এ দেশের মানুষের এই বন্ধন যেন ছিল রাজনীতির ঊর্ধ্বে। তার জানাজায় আসা সবাই দলীয় নেতাকর্মী ছিলেন না। অধিকাংশই ছিলেন সাধারণ মানুষ। কীভাবে তিনি এত এত সাধারণ মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছিলেন, তা ছিল সত্যিই বিস্ময়কর। ইতিহাসের এক কালজয়ী অধ্যায়।
এত সংগ্রাম ও ত্যাগের পরও জীবদ্দশায় খালেদা জিয়াকে প্রাপ্য সম্মান দেখাতে পারে নাই রাষ্ট্র ও জাতি। সাত বছরেরও বেশি সময় তাকে কারান্তরীণ ও গৃহবন্দি অবস্থায় কাটাতে হয়েছে, যা ছিল আইনের অপব্যবহারের এক নগ্ন দৃষ্টান্ত। তিনবারের নির্বাচিত এই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বন্দিদশায় যে আচরণ করা হয়েছে, তা ছিল মর্যাদাহানিকর। দুই বছরের বেশি সময় তাকে নির্জন কারাবাসে রাখা ছিল নিষ্ঠুর ও অমানবিক।
একজন গৃহবধূ ছিলেন খালেদা জিয়া। স্বামী ও দেশের প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর সাত মাস পর এক বিশেষ পরিস্থিতিতে বিএনপিতে যোগ দিতে হয় তাকে। রাজনীতিতে আসার ১০ বছরের কম সময়ের মধ্যে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হন। তার প্রায় ৪৩ বছরের রাজনৈতিক জীবন ছিল ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁকের সমন্বয়। গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে এসে খালেদা জিয়া ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন এক দৃঢ়চেতা, সাহসী নেত্রী। তিনি বিপদে-দুর্যোগে বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছিলেন। আর শেষ জীবনে তিনি হয়ে ওঠেন জাতির ‘ঐক্যের প্রতীক’।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক গোলাম মোস্তফা ভুইয়ার মতে, ‘মূলত সামরিক স্বৈরশাসক এরশাদবিরোধী আন্দোলনই খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রচণ্ড একটি শক্ত ভিত্তি দিয়েছে, তাকে অটল এক ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। পরবর্তী সময়ে ওয়ান-ইলেভেনের প্রেক্ষাপটের মধ্য দিয়ে সময় তিনি ধীরে ধীরে রাজনীতিতে নিজের অবস্থান দৃঢ় করতে এতটাই সমর্থ হন যে তার উচ্চতা অনেককেই হার মানিয়েছে। আপসহীন রাজনৈতিক চরিত্রের কারণেই শেষ জীবনে এসে তিনি দলমত নির্বিশেষে সবার কাছে সম্মান ও ঐক্যের প্রতীক হয়ে ওঠেন।’
বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি একসঙ্গে একাধিক আসনে নির্বাচন করছেন, কিন্তু কখনো পরাজিত হননি। যখন যেখানে দাঁড়িয়েছেন, তুমুল জনপ্রিয়তায় ভর করে সেখান থেকে জয়ের মালা নিয়েই ফিরেছেন। কিন্তু ৩০ ডিসেম্বর তাকে থামতে হলো জীবনের পথে। ৮০ বছর বয়সে এসে থেমে গেল বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নিঃশ্বাস। এর মধ্য দিয়ে শেষ হলো তার রাজনৈতিক জীবন। কিন্তু অপরাজেয়-ই থাকলেন রাজনীতির মাঠে।
বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘ, উত্তাল অধ্যায় স্থায়ীভাবে ইতিহাসের পাতায় স্থান নিয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে রাজপথের রাজনীতি হারাল তার অন্যতম শক্তিশালী কণ্ঠস্বরকে, আর জাতি হারাল এমন এক নেত্রীকে যিনি দেশ ও জনগণের জন্য পুরা জীবন ব্যয় করেছেন।
খালেদা জিয়ার বিদায় শুধু একজন রাজনীতিকের মৃত্যু নয়, এটি এক যুগের পরিসমাপ্তি। খা তার রাজনীতিতে প্রবেশ ছিল আকস্মিক। স্বামী প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর নেতৃত্বশূন্য বিএনপির হাল ধরেই তিনি সামনে আসেন। রাজনীতিতে তার পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না, কিন্তু সময় খুব দ্রুতই তাকে পরিণত করে দৃঢ়চেতা নেত্রীতে।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বাংলাদেশ ও দেশের জনগণ, এমনকি বিশ্বের এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, যা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। দেশের রাজনীতিতে তিনি ছিলেন সংগ্রাম, সাহস, অকৃত্রিম দেশপ্রেম, সততা ও নীতিনিষ্ঠতার এক অনন্য উদাহরণ। তাকে ছাড়া একটি বাংলাদেশ কল্পনা করা আমার জন্য বেশ কঠিন বিষয়।
ওয়ান-ইলেভেনের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপে খালেদা জিয়ার পরিবারের ওপর চরম নির্যাতন নেমে আসে। তার দুই ছেলেকে গ্রেপ্তার ও নির্যাতন করা হয় এবং খালেদা জিয়াকেও কারাবরণ করতে হয়। শত চাপের মুখেও তিনি আপস করেননি, বিদেশ যেতে রাজি হননি। বরং উচ্চ কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশই আমার শেষ ঠিকানা।’
দুই ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে বাধ্য হলেও খালেদা জিয়া দেশে থেকে যান। চরম প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে ২০০৮ সালের নির্বাচনে অংশ নেন। পরিস্থিরি কারণে নির্বাচনে বিএনপির ভালো ফল করার কোনো সুযোগ ছিল না। নির্বাচনে জয় লাভ করে আওয়ামী লীগ। পরবর্তী ১৬ বছরে দেশে একধরনের স্বৈরাচারী বা ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম হয়। বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা দেদারছে গুম-খুনের শিকার হন, আয়নাঘর বানানো হয়। বিএনপির অসংখ্য নেতা-কর্মীর ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়।
খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধেও মামলা দেওয়া হয়। তাকে দীর্ঘ সময় পরিত্যক্ত নির্জন কারাগারে বন্দি রাখা হয়। সেখানে তিনি অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে পড়লে পরে তাকে কারাগার থেকে ছাড়লেও গৃহবন্দি অবস্থায় রাখা হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে স্বৈারাচারী সরকারের পতনের পর খালেদা জিয়া মুক্তি পান।
এটি ইতিবাচক বিষয় ছিল যে গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য অপেক্ষায় থাকা একটি দেশে খালেদা জিয়া মুক্তভাবে ফিরতে পেরেছিলেন। গত বছরের ২১ নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে তাকে শেষবারের মতো জনসমক্ষে দেখা যায়। এর দুই দিন পর তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন এবং অবশেষে ৩০ ডিসেম্বর সকল বন্ধন ছিন্ন করে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘আপসহীন’ শব্দটি এখন আর কেবল একটি সাধারণ কোনো বিশেষণ নয়, বরং এই শব্দটি একটি নামের সমার্থক হয়ে উঠেছে। সেই নাম— খালেদা জিয়া। একজন সাধারণ ‘অন্তর্মুখী গৃহবধূ’ থেকে সময়ের প্রয়োজনে রাজপথের অগ্নিকন্যা হয়ে ওঠা এই নারীর জীবন কাহিনী বাংলাদেশের গণতন্ত্র রক্ষার এক জীবন্ত উপাখ্যান, আপসহীনতার অবিনশ্বর প্রতীক, যা আমাদের এই উপমহাদেশের রাজনীতিতে খুবই বিরল। তার রাজনীতির মূল শক্তি ছিল সরলতা, নম্রতা ও অদম্য সাহস।
গ্রামের সাধারণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই নারীর ছিল এক মায়াবী মিষ্টি হাসি এবং মানুষকে খুব দ্রুতই আপন করে নেওয়ার ক্ষমতা। সবচাইতে লক্ষ্যণীয় বিষয়— বাংলাদেশের কট্টর ইসলামিক গোষ্ঠী ও স্কলাররাও তার পোশাক বা ব্যক্তিত্ব নিয়ে কখনো নেতিবাচক মন্তব্য করতে পারেননি, করেনওনি। তিনি ভোটের জন্য কখনো লোক দেখানো ধর্মীয় পোশাকের আশ্রয় নেননি, বরং নিজের স্বকীয়তা দিয়েই জয় করেছিলেন সর্বস্তরের মানুষের মন।
খালেদা জিয়া আজ কেবল একটি দলের নেত্রীই নন, তিনি বাংলাদেশের মানুষের কাছে দেশপ্রেম ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক মূর্ত প্রতীক। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখা, জণগণের অধিকার সুরক্ষাই ছিল তার রাজনীতির মূলমন্ত্র। যখনই বাংলাদেশের গণতন্ত্র সংকটে পড়বে, খালেদা জিয়ার ‘আপসহীন’ জীবনগাঁথা আজ ও আগামী প্রজন্মের জন্য ধ্রুবতারার মতো আলোকবর্তিকা হয়ে সামনে দাঁড়াবে।
লেখক: যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ ন্যাপ ও আহ্বায়ক, জাতীয় নারী আন্দোলন

মানুষ মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে। কিন্তু এরই মাঝে কিছু মৃত্যু পাহাড়ের চেয়ে ভারী মনে হয়। বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যু অনেকটা সে রকম।
গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে আগমন, দীর্ঘ ৯ বছর স্বৈরাচারী সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলন, আপসহীন দেশনেত্রীতে রূপান্তর, দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়া, ওয়ান-ইলেভেনের মঈনউদ্দিন-ফখরুদ্দিনের সঙ্গে আপস না করে দেশের মাটিতে অবস্থান, বিগত প্রায় ১৭ বছর স্বৈরাচারী শাসকের প্রতিহিংসার শিকার হয়েও আপস না করে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জাতীয় বীরের সম্মানে ভূষিত হওয়া— সবকিছুই একটি কালের অধ্যায়। পৃথিবীতে খুব কম রাজনৈতিক নেতৃত্বই এমন সম্মানে ভূষিত হয়েছেন।
সব শ্রেণি, সব মতের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিই সব বলে দিয়েছে। গত ৩১ ডিসেম্বর তার জানাজায় লাখো মানুষের জনস্রোত ছিল মানুষের ভালোবাসারই বহির্প্রকাশ। তারা এসেছিলেন নিজেদের ভেতরের এক তাগিদ থেকে, এমন একজন মানুষকে শ্রদ্ধা জানাতে, যাকে তারা নিজেদেরই প্রতিনিধি মনে করতেন।
খালেদা জিয়ার সঙ্গে এ দেশের মানুষের এই বন্ধন যেন ছিল রাজনীতির ঊর্ধ্বে। তার জানাজায় আসা সবাই দলীয় নেতাকর্মী ছিলেন না। অধিকাংশই ছিলেন সাধারণ মানুষ। কীভাবে তিনি এত এত সাধারণ মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছিলেন, তা ছিল সত্যিই বিস্ময়কর। ইতিহাসের এক কালজয়ী অধ্যায়।
এত সংগ্রাম ও ত্যাগের পরও জীবদ্দশায় খালেদা জিয়াকে প্রাপ্য সম্মান দেখাতে পারে নাই রাষ্ট্র ও জাতি। সাত বছরেরও বেশি সময় তাকে কারান্তরীণ ও গৃহবন্দি অবস্থায় কাটাতে হয়েছে, যা ছিল আইনের অপব্যবহারের এক নগ্ন দৃষ্টান্ত। তিনবারের নির্বাচিত এই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বন্দিদশায় যে আচরণ করা হয়েছে, তা ছিল মর্যাদাহানিকর। দুই বছরের বেশি সময় তাকে নির্জন কারাবাসে রাখা ছিল নিষ্ঠুর ও অমানবিক।
একজন গৃহবধূ ছিলেন খালেদা জিয়া। স্বামী ও দেশের প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর সাত মাস পর এক বিশেষ পরিস্থিতিতে বিএনপিতে যোগ দিতে হয় তাকে। রাজনীতিতে আসার ১০ বছরের কম সময়ের মধ্যে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হন। তার প্রায় ৪৩ বছরের রাজনৈতিক জীবন ছিল ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁকের সমন্বয়। গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে এসে খালেদা জিয়া ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন এক দৃঢ়চেতা, সাহসী নেত্রী। তিনি বিপদে-দুর্যোগে বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছিলেন। আর শেষ জীবনে তিনি হয়ে ওঠেন জাতির ‘ঐক্যের প্রতীক’।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক গোলাম মোস্তফা ভুইয়ার মতে, ‘মূলত সামরিক স্বৈরশাসক এরশাদবিরোধী আন্দোলনই খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রচণ্ড একটি শক্ত ভিত্তি দিয়েছে, তাকে অটল এক ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। পরবর্তী সময়ে ওয়ান-ইলেভেনের প্রেক্ষাপটের মধ্য দিয়ে সময় তিনি ধীরে ধীরে রাজনীতিতে নিজের অবস্থান দৃঢ় করতে এতটাই সমর্থ হন যে তার উচ্চতা অনেককেই হার মানিয়েছে। আপসহীন রাজনৈতিক চরিত্রের কারণেই শেষ জীবনে এসে তিনি দলমত নির্বিশেষে সবার কাছে সম্মান ও ঐক্যের প্রতীক হয়ে ওঠেন।’
বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি একসঙ্গে একাধিক আসনে নির্বাচন করছেন, কিন্তু কখনো পরাজিত হননি। যখন যেখানে দাঁড়িয়েছেন, তুমুল জনপ্রিয়তায় ভর করে সেখান থেকে জয়ের মালা নিয়েই ফিরেছেন। কিন্তু ৩০ ডিসেম্বর তাকে থামতে হলো জীবনের পথে। ৮০ বছর বয়সে এসে থেমে গেল বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নিঃশ্বাস। এর মধ্য দিয়ে শেষ হলো তার রাজনৈতিক জীবন। কিন্তু অপরাজেয়-ই থাকলেন রাজনীতির মাঠে।
বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘ, উত্তাল অধ্যায় স্থায়ীভাবে ইতিহাসের পাতায় স্থান নিয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে রাজপথের রাজনীতি হারাল তার অন্যতম শক্তিশালী কণ্ঠস্বরকে, আর জাতি হারাল এমন এক নেত্রীকে যিনি দেশ ও জনগণের জন্য পুরা জীবন ব্যয় করেছেন।
খালেদা জিয়ার বিদায় শুধু একজন রাজনীতিকের মৃত্যু নয়, এটি এক যুগের পরিসমাপ্তি। খা তার রাজনীতিতে প্রবেশ ছিল আকস্মিক। স্বামী প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর নেতৃত্বশূন্য বিএনপির হাল ধরেই তিনি সামনে আসেন। রাজনীতিতে তার পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না, কিন্তু সময় খুব দ্রুতই তাকে পরিণত করে দৃঢ়চেতা নেত্রীতে।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বাংলাদেশ ও দেশের জনগণ, এমনকি বিশ্বের এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, যা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। দেশের রাজনীতিতে তিনি ছিলেন সংগ্রাম, সাহস, অকৃত্রিম দেশপ্রেম, সততা ও নীতিনিষ্ঠতার এক অনন্য উদাহরণ। তাকে ছাড়া একটি বাংলাদেশ কল্পনা করা আমার জন্য বেশ কঠিন বিষয়।
ওয়ান-ইলেভেনের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপে খালেদা জিয়ার পরিবারের ওপর চরম নির্যাতন নেমে আসে। তার দুই ছেলেকে গ্রেপ্তার ও নির্যাতন করা হয় এবং খালেদা জিয়াকেও কারাবরণ করতে হয়। শত চাপের মুখেও তিনি আপস করেননি, বিদেশ যেতে রাজি হননি। বরং উচ্চ কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশই আমার শেষ ঠিকানা।’
দুই ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে বাধ্য হলেও খালেদা জিয়া দেশে থেকে যান। চরম প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে ২০০৮ সালের নির্বাচনে অংশ নেন। পরিস্থিরি কারণে নির্বাচনে বিএনপির ভালো ফল করার কোনো সুযোগ ছিল না। নির্বাচনে জয় লাভ করে আওয়ামী লীগ। পরবর্তী ১৬ বছরে দেশে একধরনের স্বৈরাচারী বা ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম হয়। বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা দেদারছে গুম-খুনের শিকার হন, আয়নাঘর বানানো হয়। বিএনপির অসংখ্য নেতা-কর্মীর ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়।
খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধেও মামলা দেওয়া হয়। তাকে দীর্ঘ সময় পরিত্যক্ত নির্জন কারাগারে বন্দি রাখা হয়। সেখানে তিনি অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে পড়লে পরে তাকে কারাগার থেকে ছাড়লেও গৃহবন্দি অবস্থায় রাখা হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে স্বৈারাচারী সরকারের পতনের পর খালেদা জিয়া মুক্তি পান।
এটি ইতিবাচক বিষয় ছিল যে গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য অপেক্ষায় থাকা একটি দেশে খালেদা জিয়া মুক্তভাবে ফিরতে পেরেছিলেন। গত বছরের ২১ নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে তাকে শেষবারের মতো জনসমক্ষে দেখা যায়। এর দুই দিন পর তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন এবং অবশেষে ৩০ ডিসেম্বর সকল বন্ধন ছিন্ন করে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘আপসহীন’ শব্দটি এখন আর কেবল একটি সাধারণ কোনো বিশেষণ নয়, বরং এই শব্দটি একটি নামের সমার্থক হয়ে উঠেছে। সেই নাম— খালেদা জিয়া। একজন সাধারণ ‘অন্তর্মুখী গৃহবধূ’ থেকে সময়ের প্রয়োজনে রাজপথের অগ্নিকন্যা হয়ে ওঠা এই নারীর জীবন কাহিনী বাংলাদেশের গণতন্ত্র রক্ষার এক জীবন্ত উপাখ্যান, আপসহীনতার অবিনশ্বর প্রতীক, যা আমাদের এই উপমহাদেশের রাজনীতিতে খুবই বিরল। তার রাজনীতির মূল শক্তি ছিল সরলতা, নম্রতা ও অদম্য সাহস।
গ্রামের সাধারণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই নারীর ছিল এক মায়াবী মিষ্টি হাসি এবং মানুষকে খুব দ্রুতই আপন করে নেওয়ার ক্ষমতা। সবচাইতে লক্ষ্যণীয় বিষয়— বাংলাদেশের কট্টর ইসলামিক গোষ্ঠী ও স্কলাররাও তার পোশাক বা ব্যক্তিত্ব নিয়ে কখনো নেতিবাচক মন্তব্য করতে পারেননি, করেনওনি। তিনি ভোটের জন্য কখনো লোক দেখানো ধর্মীয় পোশাকের আশ্রয় নেননি, বরং নিজের স্বকীয়তা দিয়েই জয় করেছিলেন সর্বস্তরের মানুষের মন।
খালেদা জিয়া আজ কেবল একটি দলের নেত্রীই নন, তিনি বাংলাদেশের মানুষের কাছে দেশপ্রেম ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক মূর্ত প্রতীক। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখা, জণগণের অধিকার সুরক্ষাই ছিল তার রাজনীতির মূলমন্ত্র। যখনই বাংলাদেশের গণতন্ত্র সংকটে পড়বে, খালেদা জিয়ার ‘আপসহীন’ জীবনগাঁথা আজ ও আগামী প্রজন্মের জন্য ধ্রুবতারার মতো আলোকবর্তিকা হয়ে সামনে দাঁড়াবে।
লেখক: যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ ন্যাপ ও আহ্বায়ক, জাতীয় নারী আন্দোলন

এই ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট থেকেই আসে ‘নতুন বাংলাদেশে’র ধারণা। এটি কোনো সাময়িক রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি একটি নৈতিক অঙ্গীকার, একটি সামাজিক চুক্তি— যেখানে রাষ্ট্র হবে মানুষের সেবক, প্রভু নয়।
৫ দিন আগে
আন্তর্জাতিক আইনের কোনো তোয়াক্কা না করে, আইনকে পদদলিত করে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে নিয়ে গেছে, সেই দৃশ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী নীতিরই নগ্ন বহির্প্রকাশ ছাড়া অন্য কিছুই হতে পারে না।
৫ দিন আগে
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কখনো বৃত্তি পরীক্ষা বাতিল, কখনো পুনর্বহাল— এই দোদুল্যমান সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষক— সবার মধ্যেই বিভ্রান্তি তৈরি করছে। প্রশ্ন জাগে, কেন এই হঠকারিতা? যদিও প্রকাশ্যে বোঝা যায়, হাইকোর্টে মামলাজনিত কারণে এ বিরূপ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কিন্তু শিশুদের মনে বিরূপ প্রভাব ফ
৭ দিন আগে
শান্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধা বহির্জগতের নয়, বরং মানুষের অন্তর্গত দুর্বলতা। লোভ, হিংসা, অহংকার, প্রতিশোধস্পৃহা, ক্ষমতার মোহ এবং অন্যের প্রতি অসহিষ্ণুতা সমাজকে ভেতর থেকে ক্ষয় করে দেয়। এই প্রবৃত্তিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ না করলে কোনো রাষ্ট্র, কোনো ধর্মীয় আহ্বান কিংবা কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থাই স্থায়ী শান্
৯ দিন আগে