জাকির নায়েকের পাকিস্তান সফর কি ধর্মীয় উত্তেজনা বাড়াবে?

ডয়চে ভেলে
৫৮ বছর বয়সি জাকির নায়েক নিজ দেশ ভারত থেকে অর্থপাচার ও ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগ মাথায় নিয়ে পলাতক আছেন। মালয়শিয়ায় আশ্রয় নেয়া এই বক্তা তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

এ সপ্তাহে পাকিস্তানে গিয়েছেন বিতর্কিত ইসলামী বক্তা জাকির নায়েক৷ মাসব্যাপী তিনি করাচি, ইসলামাবাদসহ দেশটির বড় শহরগুলোতে বক্তৃতা দেবেন। ৫৮ বছর বয়সি জাকির নায়েক নিজ দেশ ভারত থেকে অর্থপাচার ও ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগ মাথায় নিয়ে পলাতক আছেন।

মালয়শিয়ায় আশ্রয় নেয়া এই বক্তা তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি তার কট্টর মতাদর্শের কারণে ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও যুক্তরাজ্যের মতো বেশ কয়েকটি দেশে নিষিদ্ধ হয়েছেন। ১৯৯২ সালের পর এটি তার প্রথম পাকিস্তান সফর৷ পাকিস্তান সরকারের এ আমন্ত্রণে অনেকে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

পাকিস্তানের পরমাণুবিজ্ঞানী পারভেজ হুদভয় ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘জাকির নায়েককে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানোয় আমি দুঃখিত, তবে অবাক হইনি। রাষ্ট্র আগুনে আরো ঘি ঢালছে।’

নায়েকের প্রভাব নিয়ে বিতর্ক

২০১৬ সালে ঢাকায় হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলাকারী জিহাদীরা জাকির নায়েকের ভক্ত ও অনুসারী ছিলেন বলে খবর প্রকাশ হবার পর বাংলাদেশ সরকার তার টেলিভিশন পিস টিভির সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়৷ এই হামলায় ২৯ জন মারা গিয়েছিলেন এবং ইসলামিক স্টেট এর দায় নিয়েছিল।

ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ সিঙ্গাপুরের দক্ষিণ এশিয়া স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের গবেষক অমিত রঞ্জন মনে করেন, জাকির নায়েকের বক্তব্যগুলো ও তার অনুসারীরা বাংলাদেশ ও মালদ্বীপে সমস্যা তৈরি করেছিল৷

তিনি বলেন, ‘তাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় অতিথি করা দেশটির সামাজিক ও ধর্মীয় কাঠামোর উপকার বয়ে আনবে না।’

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক কুরাত উল আইন সিরাজি বলেন, পাকিস্তানে বাড়তে থাকা ব্লাসফেমি সংক্রান্ত সহিংস ঘটনাগুলোর বিষয়ে নায়েক ভিন্ন ধারণা দিয়েছেন৷ তিনি ব্লাসফেমির অভিযোগ উঠলে আইন যেন জনগণ নিজের হাতে তুলে না নেন তিনি তা প্রচার করেছেন৷ ধর্মের নামে সন্ত্রাসবাদের বিষয়েও তিনি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিতে পারেন বলে মত তার৷

‘ধর্মের নামে সন্ত্রাসবাদের ধারণার বিরোধিতা করেছেন তিনি,’ বলেন কুরাত৷

ভারতের সঙ্গে উত্তেজনা

নায়েকের সফর পাকিস্তান-ভারত সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে৷ অতীতে তার বক্তৃতাগুলি ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতাকে উসকে দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে৷

পারমাণবিক শক্তিধর দুই প্রতিবেশীর মধ্যে সম্পর্ক ইতিমধ্যেই উত্তেজনাপূর্ণ৷ কোনো কোনো বিশ্লেষক আশঙ্কা করছেন পাকিস্তানের পক্ষ থেকে নায়েককে রাজকীয় অভ্যর্থনা দেয়া ধর্মীয় মৌলবাদের প্রতি রাষ্ট্রের আনুগত্য প্রকাশ করবে এবং ভারতের সঙ্গে দ্বন্দ্ব বাড়াবে৷

অমিত রঞ্জন বলেন, ‘যেহেতু পাকিস্তানে এমনিতেই সামাজিক ও রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনাগুলো ঘটছে, তাই নায়েককে সুযোগ দেয়া মানে চলমান উত্তেজনা বাড়ানো ছাড়া কিছুই নয়।’

পারভেজ হুদভয় বলেন, ‘বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্যের জন্য জাকির নায়েককে ভারতসহ বেশ কয়েকটি দেশ থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাকে রাজকীয় সংবর্ধনা দেয়ার মাধ্যমে পাকিস্তান মৌলবাদের প্রতি আনুগত্য দেখিয়েছে এবং তারা বৈশ্বিক মতামতের পরোয়া করছে না।’

তবে কুরাত উল আইন মনে করেন, নায়েক কাশ্মীর নিয়ে নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছেন। তিনি এ বিষয়ে যেহেতু কোনো কথা বলেননি, এর অর্থ তিনি চান না পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হোক।

ধর্মীয় বিভাজন

বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন নায়েকের সফর পাকিস্তানে ধর্মীয় বিভেদ আরও বৃদ্ধি করতে পারে৷ তার ইসলামি মতাদর্শ পাকিস্তানের বিভিন্ন ধর্মীয় মতাবলম্বীদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে।

অমিত রঞ্জন মনে করেন, পাকিস্তান বহুমতের ধর্মীয় গোষ্ঠীর সমাজ যেখানে নায়েকের মতাদর্শ বিভিন্ন মুসলিম গোষ্ঠীর মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে৷ হুদভয়ও মনে করেন, নায়েককে আমন্ত্রণ জানানো পাকিস্তানে ধর্মীয় শক্তির ভারসাম্যকে বিপদগ্রস্ত করতে পারে।

তবে কুরাত উল আইন মনে করেন, যেহেতু জাকির নায়েক বিভিন্ন গোষ্ঠীর কাছে সমালোচিত, তিনি এই সফরের মাধ্যমে নিজের ভাবমূর্তি উদ্ধারের চেষ্টা করতে পারেন।

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

ছয় শিশুর মৃত্যুর বিচার হয়, ছয়শো শিশুর ঘাতকরা শাস্তি পায় না!

বর্তমান সরকার হাম প্রতিরোধে সকল ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। এই মৃত্যুর দায় কোনোভাবেই বর্তমান সরকারের ওপর বর্তায় না। তাহলে এক্ষেত্রে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনতে বাধা কোথায়? হামে ছয় শতাধিক শিশুর মৃত্যুর ঘটনার সঠিক তদন্ত এবং দোষীদের বিচারের আওতায় না আনা হলে, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ব

৫ দিন আগে

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দুষ্টু লোক, স্বাস্থ‍্যমন্ত্রীর কোটি টাকা ও মিরাকল প্রতিমন্ত্রী

সাম্প্রতিক সময়ের তিনটি আলোচিত ঘটনা যেন একই নাটকের তিনটি দৃশ্য। চরিত্র আলাদা, সংলাপ আলাদা, কিন্তু প্রশ্ন একটাই— প্রকৃত সত্য কী? সবটাই যে সত্য, তা নয়। আবার সবটাই যে মিথ্যা, সেটিও বলা যায় না। আর এই ধূসর অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি ক্ষয় হয় জনবিশ্বাসের।

৬ দিন আগে

মেগা-ইভেন্ট: ভূ-রাজনৈতিক শক্তির হাতিয়ার

ফিফা বিশ্বকাপ, অলিম্পিক গেমসের মতো, প্রায়শই ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও মানবিক সাফল্যের উৎসব হিসাবে উপস্থাপিত হয়। কিন্তু জৌলুস আর আড়ম্বরের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও তাৎপর্যপূর্ণ এক বাস্তবতা: মেগা-ক্রীড়া ইভেন্টগুলো আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

১১ দিন আগে

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রক্ষায় রাষ্ট্রের পদক্ষেপ জরুরি

প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতি মানুষের জীবনকে সহজ, দ্রুত এবং বিশ্বসংযুক্ত করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর এই বিশ্ব নতুন কিছু সামাজিক, মানসিক ও শিক্ষাগত সংকটও তৈরি করেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্ফোরণমূলক বিস্তার শিশু, কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের বিকাশ, শিক্ষাগ্রহণ, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা এ

১২ দিন আগে